স্টাফ রিপোর্টার

সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বহুল প্রতীক্ষিত নবম জাতীয় পে স্কেলের খসড়া প্রস্তাব মন্ত্রিসভায় উপস্থাপনের প্রস্তুতি চলছে। মন্ত্রিসভা সচিবের নেতৃত্বাধীন সচিব কমিটি এরই মধ্যে প্রস্তাবটি নীতিগতভাবে চূড়ান্ত করেছে। প্রধানমন্ত্রীর সম্মতি পাওয়া গেলে চলতি মাসের যে কোন কর্মদিবসে মন্ত্রিসভার বৈঠকে এটি উপস্থাপন করা হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে। তবে এ সম্ভাবনা চলতি সপ্তাহেই বেশি।

এরই মধ্যে গতকাল রোববার পে-স্কেল নিয়ে সুসংবাদ দিলেন প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব এ বি এম আব্দুস সাত্তার। সচিবালয়ে সাংবাদিকদের তিনি জানান, সরকারি চাকুরেদের নতুন এই বেতন কাঠামো চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। যেকোনো মুহূর্তে তা ঘোষণা হতে পারে। আব্দুস সাত্তারের ভাষায়, ‘পে-স্কেল বিবেচনাধীন আছে এবং সরকারের কমিটমেন্ট আছে। এটা আমরা বাস্তবায়ন করব। এটি চূড়ান্ত পর্যায়ে আছে। যেকোনো মুহূর্তে পে-স্কেল ঘোষণা হতে পারে।’

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে প্রস্তাবিত নতুন বেতন কাঠামোয় সরকারি চাকরিজীবীদের মূল বেতন সর্বোচ্চ ১০০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়েছে। তবে সব গ্রেডে সমান হারে বেতন বাড়ানোর প্রস্তাব রাখা হয়নি। উচ্চ গ্রেডের তুলনায় নি¤œ গ্রেডের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন তুলনামূলক বেশি হারে বাড়ানোর সুপারিশ করেছে সচিব কমিটি। খসড়া প্রস্তাব অনুযায়ী, নবম পে স্কেল দুই ধাপে বাস্তবায়নের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রথম ধাপে মূল বেতন বাড়ানো হবে। দ্বিতীয় ধাপে ভাতাসহ অন্যান্য আর্থিক সুবিধা বাড়ানোর প্রস্তাব করা হয়েছে।

গত বুধবার মন্ত্রিসভা সচিবের নেতৃত্বাধীন কমিটির বৈঠকে প্রস্তাবটি মন্ত্রিসভায় উপস্থাপনের জন্য নীতিগতভাবে চূড়ান্ত করা হয়। তবে প্রয়োজন অনুযায়ী খসড়ার বিভিন্ন বিষয় পরিবর্তন বা সংশোধনের সুযোগ রয়েছে। এমনকি পে স্কেল কত ধাপে বাস্তবায়ন করা হবে, সে বিষয়েও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে মন্ত্রিসভা।

খসড়া পরিকল্পনা অনুযায়ী, চলতি বছরের জুলাই থেকে নবম পে স্কেলের আংশিক বাস্তবায়ন শুরু হতে পারে। এরপর ধাপে ধাপে ২০২৮ সালের জানুয়ারির মধ্যে নতুন বেতন কাঠামোর পূর্ণ বাস্তবায়নের লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।

তবে নবম পে স্কেল চূড়ান্ত করার ক্ষেত্রে বিচার বিভাগ-সংক্রান্ত কিছু জটিলতা তৈরি হয়েছে। এসব জটিলতা নিরসনে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর নেতৃত্বে সাত সদস্যের একটি বিশেষ কমিটি গঠন করেছে সরকার।

জানা গেছে, ২০১৫ সালে অষ্টম জাতীয় পে স্কেল চালুর পর প্রায় এক দশক পেরিয়ে গেলেও নতুন কোনো জাতীয় বেতন কাঠামো কার্যকর হয়নি। এ সময়ে সরকারি চাকরিজীবীদের নিয়মিত ইনক্রিমেন্ট হলেও জীবনযাত্রার ব্যয় ও মূল্যস্ফীতি উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। ফলে নতুন পে স্কেলের দাবি ও প্রয়োজনীয়তা দিন দিন আরও জোরালো হয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে ২০২৫ সালের জুলাইয়ে নবম পে কমিশন সরকারের কাছে তাদের প্রতিবেদন জমা দেয়।

প্রতিবেদনে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মূল বেতন ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বাড়ানোর সুপারিশ করা হয়।কমিশনের সুপারিশে সর্বনি¤œ মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছিল।

এখন সচিব কমিটির চূড়ান্ত করা খসড়া প্রস্তাব মন্ত্রিসভায় উপস্থাপনের অপেক্ষায়। মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তের পরই নবম পে স্কেলের বাস্তবায়ন কাঠামো, বেতন বৃদ্ধির হার এবং কার্যকর হওয়ার সময়সূচি সম্পর্কে চূড়ান্ত চিত্র পাওয়া যাবে।

পে-স্কেল ঘোষণার ফলে অর্থনীতিতে অতিরিক্ত চাপ ও মূল্যস্ফীতি বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে কি না এমন প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রীর মুখ্য সচিব বলেন, না, সেটা আমাদের মাথায় আছে। সাধারণত পাঁচ-ছয় বছর পর পর পে-স্কেল হওয়ার কথা। কিন্তু বিগত সরকার ১১ বছর যাবত কোনো পে-স্কেল ঘোষণা করেনি। যার ফলে এই ১৮ লাখ কর্মকর্তা-কর্মচারী আমরা চাপের মধ্যে আছি।

তিনি বলেন, ‘মূল্যস্ফীতির সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন বাড়াতে হবে। এটা হয়তো জনগণের জন্য একটু কষ্টকর হবে। কিন্তু কর্মকর্তা-কর্মচারীরা তাদের মূল্যস্ফীতির সঙ্গে জীবনযাত্রার যে সমন্বয়, সেটা দাবি করে। এজন্য এটা ধারাবাহিকতা, পাঁচ থেকে ছয় বছরের মধ্যে হওয়ার কথা। কিন্তু আজকে প্রায় ১২ বছর হয়ে যাচ্ছে।’

মূল্যস্ফীতি মোকাবিলায় সরকারের পরিকল্পনা প্রসঙ্গে মুখ্য সচিব বলেন, আমরা কর্মসংস্থান করব, তারপরে প্রোঅ্যাক্টিভিটি বাড়াবো। বিভিন্ন ক্ষেত্রে যারা অনেক চ্যালেঞ্জের মধ্যে আছেন, সেগুলো এক এক করে আমরা মোকাবিলা করব।

বাজার পরিস্থিতি প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘বাজারে কিছু সমস্যা আছে, এটাও আমরা চেষ্টা করছি। জ্বালানি এবং বিদ্যুতের কারণে হয়তো প্রোডাকশন চেইন একটু ডিস্টার্ব হয়েছে। এটা ঠিক হয়ে যাবে, ইনশাআল্লাহ।’

বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট নিয়ে এ প্রশ্নের জবাবে মুখ্য সচিব বলেন, ‘এই ধরনের সংকট দিনে দিনে ঠিক করা যায় না, সময় লাগে। আমরা বহুমুখী সাপ্লাই চেইন সৃষ্টি করছি। রাশিয়া, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া, এমনকি চীন থেকেও জ্বালানি নিয়ে আসার চেষ্টা করছি।

এদিকে নবম জাতীয় পে-স্কেলে সর্বনি¤œ বেতনে কাটছাঁটের শঙ্কায় বিবৃতি প্রকাশ করেছে বাংলাদেশ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কল্যাণ সমিতি। সংগঠনের সভাপতি আব্দুল মালেক ও মহাসচিব আশিকুল ইসলাম জানান, নবম জাতীয় পে স্কেলে সচিব কমিটির সুপারিশ করা সর্বনি¤œ ২০ হাজার টাকা বেতনও কাটছাঁট করা হলে, তা মেনে নেওয়া হবে না। বাজারমূল্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে সর্বনি¤œ বেতন আরও বাড়িয়ে দ্রুত প্রজ্ঞাপন জারি করতে হবে।

তারা বলেন, তথ্য অনুযায়ী সচিব কমিটি নি¤œ গ্রেডে ১০০ শতাংশ বেতন বৃদ্ধির সুপারিশ করেছে। সেই হিসাবে বর্তমান ৮ হাজার ২৫০ টাকার মূল বেতনে ১০০ শতাংশ বৃদ্ধি হলে তা দাঁড়ায় ১৬ হাজার ৫০০ টাকায়। এ সুপারিশ সরকারি কর্মচারীদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও হতাশার জন্ম দিচ্ছে।

বাংলাদেশ সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী কল্যাণ সমিতির মতে, অতীতের বিভিন্ন পে স্কেলে ১০ম থেকে ২০তম গ্রেডের কর্মীদের জন্য ১৪০ শতাংশ বা তারও বেশি বেতন বৃদ্ধির সুপারিশ বাস্তবায়ন করা হয়েছিল। সেই তুলনায় বর্তমান প্রস্তাব অপর্যাপ্ত।সচিব কমিটি ও মন্ত্রিসভার অনুমোদনের মাধ্যমে সর্বনি¤œ ২০ হাজার টাকার সুপারিশ আরও কিছুটা বাড়ানো হোক। বাজারমূল্যের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নতুন বেতন কাঠামো নির্ধারণ করে দ্রুত গেজেট প্রকাশেরও আহ্বান জানানো তারা।