অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, বাংলাদেশের বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকট চার থেকে ছয় মাস কিংবা এক বছরের মধ্যে সমাধান সম্ভব নয়; এটি নিরসনে অন্তত দুই বছর সময় লাগবে৷
রোববার (১৬ আগস্ট) রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে আমেরিকান চেম্বার অব কমার্স ইন বাংলাদেশ (অ্যামচেম) আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা জানান।
সভায় অর্থমন্ত্রী বলেন, 'বিদ্যুৎ ও গ্যাসের বিষয়ে ছয় মাসের মধ্যে কোনো কিছুরই সমাধান সম্ভব নয়। এক বছরের মধ্যেও সমাধান মিলবে না। এটি কাটিয়ে উঠতে অন্তত দুই বছর সময় লাগবে।'
বর্তমান বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংকটটি বিগত সরকারের কাছ থেকে উত্তরাধিকারসূত্রে পাওয়া বলে স্বীকার করেন মন্ত্রী। তবে যত দ্রুত সম্ভব এ সমস্যা সমাধানের লক্ষ্যে সরকার কাজ করে যাচ্ছে বলে জানান তিনি।
তিনি বলেন, 'ভাসমান এলএনজি টার্মিনাল এবং স্থলভাগে গ্যাস সংরক্ষণাগার নির্মাণের পরিকল্পনা চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে। আগামী কয়েক দিনের মধ্যে এ সংক্রান্ত বিস্তারিত বিষয়াদি ঘোষণা করা হবে।'
বিদ্যুৎ পরিস্থিতি প্রসঙ্গে মন্ত্রী উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের পর্যাপ্ত বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা রয়েছে; তবে সঞ্চালন ব্যবস্থা বর্তমানে বড় সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে।
তিনি জানান, সরকার দেশের বিদ্যুৎ ও জ্বালানি মিশ্রণ (এনার্জি মিক্স) চূড়ান্ত করার কাজ করছে। এই পরিকল্পনায় নবায়নযোগ্য এনার্জি ও গ্যাসভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের পাশাপাশি কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎ উৎপাদনকেও বিবেচনায় রাখা হচ্ছে।
আমির খসরু বলেন, 'আমরা একটি সমন্বিত জ্বালানি মিশ্রণ নীতি নিয়ে এগিয়ে যাচ্ছি।' যথা সময়ে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বড় ধরনের পরিবর্তন দৃশ্যমান হবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেন তিনি।
এসময় রাজস্ব খাতের সংস্কারের অংশ হিসেবে কর নীতি নির্ধারণের দায়িত্ব আমলাদের হাতে না রেখে বিশেষজ্ঞ গ্রুপের কাছে দেওয়ার পরিকল্পনার কথাও জানান মন্ত্রী।
তিনি বলেন, 'জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে (এনবিআর) দুই ভাগে ভাগ করা হবে, যার ফলে কর নীতি নির্ধারণ এবং নীতি বাস্তবায়নের কাজ আলাদা হয়ে যাবে।
তিনি সুস্পষ্টভাবে বলেন, 'নীতি নির্ধারণী সংস্থাটি হবে একটি বিশেষজ্ঞ গ্রুপ—কোনো আমলাতান্ত্রিক সংস্থা নয়।'
মন্ত্রী জানান, সরকার কর ব্যবস্থাকে সম্পূর্ণরূপে স্বয়ংক্রিয় করার দিকে এগোচ্ছে। এর ফলে কর রিটার্ন দাখিল, রিফান্ড ও অন্যান্য সেবা পর্যায়ক্রমে অনলাইনে রিয়েল-টাইম ভিত্তিতে পরিচালনা করা সম্ভব হবে।
অর্থ ও পরিকল্পনা মন্ত্রী আরও জানান, সরকারের নিয়ন্ত্রণমুক্তকরণ (ডি-রেগুলেশন) কার্যক্রম বাস্তবায়নের কাজ তদারক করতে একটি টাস্কফোর্স গঠন করা হয়েছে, যা প্রতিদিন কার্যক্রম বাস্তবায়নের সার্বিক বিষয়ে পর্যবেক্ষণ করবে।
তিনি উল্লেখ করেন, সরকার ঘোষিত নিয়ন্ত্রণমুক্তকরণ সংক্রান্ত পদক্ষেপগুলো সংশ্লিষ্ট সরকারি সংস্থাগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করছে কি না, তা এই টাস্কফোর্স তদারক করবে।
তিনি আরও জানান, কোনো সরকারি সংস্থা যদি নিয়ন্ত্রণমুক্তকরণের নির্দেশনা মেনে চলতে ব্যর্থ হয়, তবে ব্যবসায়ী ও নাগরিকরা যেন সে বিষয়ে অভিযোগ জানাতে পারেন—সেজন্য সরকার একটি ওয়েবসাইট তৈরির কাজও করছে।
মন্ত্রী জানান, এসব সংস্কার বাস্তবায়নের স্বার্থে কিছু আইন সংশোধনের প্রয়োজন হবে এবং সেই কাজ ইতোমধ্যেই শুরু হয়ে গেছে।
নিজের সাম্প্রতিক বাজেট বক্তৃতার প্রসঙ্গ টেনে আমির খসরু বলেন, 'চার সাড়ে চার ঘণ্টার দীর্ঘ বাজেট বক্তৃতার সাড়ে চার পৃষ্ঠা জুড়ে রাখা হয়েছিল নিয়ন্ত্রণমুক্তকরণের বিষয়টি। এর থেকেই ব্যবসা-বাণিজ্যের প্রশাসনিক ও নীতিগত বাধা কমানোর ক্ষেত্রে সরকারের অঙ্গীকারের বিষয়টি বোঝা যায়৷
বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের জটিল প্রশাসনিক নিয়মনীতি ও ব্যবস্থার কথা উল্লেখ করে তিনি স্বীকার করেন যে, এই নিয়ন্ত্রণমুক্তকরণ কার্যক্রম বাস্তবায়ন করা বেশ কঠিন হবে। তবে এই সংস্কার বাস্তবায়নে সরকার শতভাগ প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে তিনি জানান।