সরকারি চাকরির ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের নিয়োগে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার নম্বরের ভারসাম্য পরিবর্তন করে ভাইভার নম্বর বাড়ানোর উদ্যোগের তীব্র সমালোচনা করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল ও সাবেক এমপি মিয়া গোলাম পরওয়ার। তিনি এ সিদ্ধান্তকে প্রশাসনে দলীয়করণের অশুভ ইঙ্গিত হিসেবে উল্লেখ করে সংশ্লিষ্ট বিধিমালা বাতিলের দাবি জানিয়েছেন।

বৃহস্পতিবার (১০ সেপ্টেম্বর) দেওয়া এক বিবৃতিতে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, সরকারি চাকরির নিয়োগে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষার নম্বরের ভারসাম্য পরিবর্তন করে ভাইভার নম্বর অস্বাভাবিকভাবে বাড়ানোর উদ্যোগে তিনি গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করছেন এবং এর নিন্দা ও প্রতিবাদ জানাচ্ছেন।

বিবৃতিতে তিনি অভিযোগ করেন, বর্তমান সরকার রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ বিভিন্ন জায়গায় দলীয়করণ শুরু করেছে। তাঁর দাবি, ইতোমধ্যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়, সিটি করপোরেশন, জেলা প্রশাসনসহ সচিবালয়ের গুরুত্বপূর্ণ পদে দলীয় বিবেচনায় চুক্তিভিত্তিক নিয়োগ দেওয়া হয়েছে। মেধা ও যোগ্যতার পরিবর্তে রাজনৈতিক বিবেচনায় নিয়োগ দেওয়া হলে রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো ক্ষতিগ্রস্ত হবে বলেও মন্তব্য করেন তিনি।

মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, বৈষম্যহীন, দুর্নীতিমুক্ত, ন্যায়ভিত্তিক ও মেধাভিত্তিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ছিল জুলাই গণঅভ্যুত্থানের অন্যতম আকাঙ্ক্ষা। কিন্তু সরকারি চাকরির নিয়োগব্যবস্থায় এমন বিধিমালা প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে, যা মেধার মূল্যায়নকে দুর্বল করে নিয়োগে অনিয়ম, স্বজনপ্রীতি, রাজনৈতিক প্রভাব ও দুর্নীতির সুযোগ তৈরি করতে পারে।

তিনি বলেন, “সরকারি চাকরির নিয়োগে ভাইভার নম্বর বৃদ্ধির সিদ্ধান্ত বিএনপি সরকারের নির্লজ্জ দলীয়করণের অশুভ ইঙ্গিত।”

মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের চাকরিতে লিখিত ও মৌখিক পরীক্ষায় সমান ৫০ নম্বর রাখার সিদ্ধান্ত উদ্বেগজনক। তাঁর দাবি, ভাইভার নম্বরের ওজন বাড়ানো হলে প্রশাসনকে দলীয়করণের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

তিনি বলেন, লিখিত পরীক্ষা একজন প্রার্থীর জ্ঞান, মেধা, বিশ্লেষণী সক্ষমতা ও প্রস্তুতি তুলনামূলকভাবে বস্তুনিষ্ঠভাবে যাচাইয়ের সুযোগ দেয়। লিখিত পরীক্ষার উত্তরপত্র সংরক্ষণ, পুনর্মূল্যায়ন ও অডিট করা সম্ভব হলেও মৌখিক পরীক্ষার মূল্যায়ন অনেকাংশে বোর্ডের ব্যক্তিগত পছন্দ-অপছন্দ ও বিবেচনার ওপর নির্ভরশীল। ফলে মৌখিক পরীক্ষার নম্বরের ওজন অস্বাভাবিকভাবে বাড়ানো হলে প্রার্থীদের মেধাগত ব্যবধান পরিবর্তনের সুযোগ সৃষ্টি হবে। এতে লিখিত পরীক্ষায় অর্জিত মেধা ও যোগ্যতার অবমূল্যায়ন হতে পারে এবং যোগ্য প্রার্থীরা ন্যায্য অধিকার থেকে বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

তিনি বলেন, সরকারি চাকরির ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের পদগুলোতে বিপুলসংখ্যক তরুণ-তরুণী প্রতিযোগিতা করেন। অনেক চাকরিপ্রার্থী দীর্ঘদিন প্রস্তুতি নিয়ে এবং সীমিত আর্থিক সামর্থ্যের মধ্যে কঠোর পরিশ্রম করে পরীক্ষায় অংশ নেন। তাঁদের মেধা ও পরিশ্রমের মূল্যায়ন এমন কোনো অনিশ্চিত ব্যবস্থার ওপর ছেড়ে দেওয়া উচিত নয়, যেখানে মৌখিক পরীক্ষার অতিরিক্ত নম্বর দিয়ে লিখিত পরীক্ষার ফলাফল পরিবর্তন করা সম্ভব।

মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, প্রক্সি, জালিয়াতি ও পরীক্ষায় অনিয়ম প্রতিরোধ করা জরুরি। তবে জালিয়াতি বন্ধের অজুহাতে ভাইভার নম্বর বাড়ানো গ্রহণযোগ্য সমাধান নয়। প্রযুক্তিনির্ভর পরীক্ষাব্যবস্থা, বায়োমেট্রিক যাচাই, পরীক্ষাকেন্দ্রে কঠোর নজরদারি, প্রশ্নপত্রের নিরাপত্তা, ডিজিটাল মনিটরিং এবং অনিয়মের ক্ষেত্রে কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা গ্রহণের মাধ্যমে নিয়োগ পরীক্ষায় জালিয়াতি ও অনিয়ম প্রতিরোধ করা সম্ভব।

জামায়াতে ইসলামীর সেক্রেটারি জেনারেল বলেন, অতীতে সরকারি চাকরি ও রাষ্ট্রের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানে দলীয়করণের যে সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল, জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে জনগণ তার অবসান চেয়েছে। সরকারের দায়িত্ব হচ্ছে সেই গণআকাঙ্ক্ষা ধারণ করা, নতুন কোনো পদ্ধতিতে পুরোনো দলীয়করণের সুযোগ তৈরি করা নয়। এমন কোনো নিয়োগব্যবস্থা গ্রহণযোগ্য হতে পারে না, যা ভবিষ্যতে প্রশাসনে দলীয় আনুগত্যশীল জনবল প্রতিষ্ঠার পথ তৈরি করে।

তিনি বলেন, “আমরা এমন একটি প্রশাসন চাই, যেখানে নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তা-কর্মচারীর পরিচয় হবে তাঁর মেধা, যোগ্যতা, সততা ও কর্মদক্ষতা; কোনো রাজনৈতিক পরিচয় নয়।”

রাষ্ট্রের প্রশাসনকে দলীয় প্রভাবমুক্ত রাখতে নিয়োগ প্রক্রিয়াকে স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ করার ওপর গুরুত্ব দিয়ে তিনি বলেন, নিয়োগে দলীয় পরিচয়, রাজনৈতিক আনুগত্য, আত্মীয়তা, ব্যক্তিগত সুপারিশ কিংবা অর্থের প্রভাবের কোনো স্থান থাকা উচিত নয়। রাষ্ট্রের প্রতিটি নিয়োগ মেধা, যোগ্যতা, সততা ও দক্ষতার ভিত্তিতে হওয়া প্রয়োজন।

সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়ে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, সরকারি চাকরির ১১ থেকে ২০তম গ্রেডের নিয়োগে ভাইভার নম্বর বৃদ্ধির বিতর্কিত সিদ্ধান্ত এবং সংশ্লিষ্ট বিধিমালা অবিলম্বে বাতিল করতে হবে। একই সঙ্গে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় রাজনৈতিক প্রভাব, স্বজনপ্রীতি, অর্থের লেনদেন ও সুপারিশের সংস্কৃতি বন্ধ করে মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে স্বচ্ছ নিয়োগ নিশ্চিত করতে হবে।

তিনি বলেন, জুলাইয়ের শহীদ ও আহতদের আত্মত্যাগের বিনিময়ে অর্জিত নতুন বাংলাদেশে পুরোনো বৈষম্য, দলীয়করণ ও অনিয়মের পুনরাবৃত্তি জনগণ মেনে নেবে না। তরুণ সমাজের মেধা, শ্রম ও ন্যায্য অধিকার রক্ষায় সরকারকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান তিনি।

দেশের চাকরিপ্রার্থী, শিক্ষার্থী ও তরুণ সমাজের ন্যায্য দাবি ও অধিকারের প্রতি সংহতি জানিয়ে মিয়া গোলাম পরওয়ার বলেন, মেধার মর্যাদা প্রতিষ্ঠা, বৈষম্যের অবসান এবং দুর্নীতিমুক্ত রাষ্ট্রব্যবস্থা গড়ে তোলাই নতুন বাংলাদেশের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত।