• এক মাসের মধ্যে রামিসা হত্যাকারীর শাস্তি নিশ্চিত করা হবে
  • জনগণের ভাগ্য নিয়ে ছিনিমিনি খেলা রুখতে হবে

প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন, ‘একটি নিরাপদ মানবিক রাষ্ট্র এবং সমাজ প্রতিষ্ঠা করতে হলে আমাদেরকে দেশে আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হবে, রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিবর্তন ঘটাতে হবে।’ তিনি বলেন, ‘আমাদের জাতীয় জীবনে পুনরায় বাংলাদেশের আবহমানকালের ধর্মীয় সামাজিক সাংস্কৃতিক মূল্যবোধের পুনরুজ্জীবন ঘটানো জরুরি। এক্ষেত্রেও কবি নজরুলের জীবন ও কর্ম আমাদের জন্য প্রাসঙ্গিক।

গতকাল শনিবার বিকালে ময়মনসিংহের ত্রিশালে ‘তবু আমারে দেব না ভুলিতে’ শীর্ষক নজরুল মঞ্চে আয়োজিত বর্ণাঢ্য এই অনুষ্ঠানের উদ্বোধন শেষে তিনি এসব কথা বলেন। কবি নজরুল জন্মজয়ন্তীর তিনদিনব্যাপী উৎসবের উদ্বোধন ঘোষণা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘বাংলাদেশ ও কাজী নজরুল ইসলাম এক অবিভাজ্য সত্তা। তিনি আমাদের জাতীয় সত্তার সার্থক প্রতিনিধি, আমাদের জাতীয় চেতনার প্রতীক। আমাদের জাতীয়তাবাদের পথিকৃৎ। জাতীয় কবির জন্মদিনে আমরা অন্যায়, অবিচার, ক্ষুধা, দারিদ্র্য ও বিভেদের গ্লানি মুছে ফেলি। সবার আগে বাংলাদেশকে ধারণ করি। একটি সমৃদ্ধ স্বনির্ভর গণতান্ত্রিক বাংলাদেশের জন্য নিজেদের নিবেদিত করার প্রত্যয়ে আমি কবি নজরুল জন্মজয়ন্তীর তিনদিনব্যাপী উৎসবের উদ্বোধন ঘোষণা করছি।’

সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়া ত্রিশালে 'জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা করেছিলেন উল্লেখ করে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘জাতীয় কবির প্রতি সর্বোচ্চ শ্রদ্ধা এবং সম্মান প্রদর্শনের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে কাউকে সম্মান জানালে নিজের সম্মান নষ্ট হয় না বরং বিনয় মানুষকে মহিমান্বিত করে। আমি মনে করি, এইসব কালজয়ী আদর্শ থেকে দূরে চলে যাওয়ার কারণেই বতর্মানে আমাদের সমাজে মূল্যবোধের অবক্ষয় দৃশ্যমান।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘কাজী নজরুল ইসলাম মানেই বাংলা সাহিত্যে এক নতুন ভোরের উদয়। বাংলা সাহিত্যের এক নতুন রুচির বিপ্লব। তিনিই কবিতায় এনেছেন যুদ্ধের গর্জন, কণ্ঠে তুলে নিয়েছেন রাষ্ট্রীয় ও আত্মিক স্বাধীনতার বজ্রনিনাদ। তিনি ছিলেন নারী অধিকার, মেহনতি মানুষের কল্যাণ আর অসাম্প্রদায়িক বিশ্বমানবতার এক অনন্য ফেরিওয়ালা। এই মহাকবি বাংলাদেশের আবহমানকালের সংস্কৃতির চিরযৌবনের প্রতীক হয়ে আমাদের হৃদয়ে জাগরুক হয়ে আছেন, থাকবেন।

ফ্যাসিবাদের সময়কার বিভিন্ন চিত্র তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিচার বিভাগসহ দেশের সমস্ত প্রতিষ্ঠানগুলোকে ধ্বংস করে দিয়েছে। সবচেয়ে যেটি বড়ো ক্ষতি হয়েছে বিশেষ করে বিতাড়িত ফ্যাসিবাদের সময় মানবতা মানবিকতা এবং দেশে আবহমানকালের ধর্মীয় সামাজিক মূল্যবোধগুলোকে একেবারেই বিনষ্ট করে দেয়া হয়েছে। ঢাকার মিরপুরে একটি নিষ্পাপ মেয়ের নির্মম মৃত্যুর মাধ্যমে মানুষের মানবিক মূল্যবোধের চূড়ান্ত অবক্ষয়ের চূড়ান্ত প্রমাণ মিলেছে।’

প্রায় দুই দশক পর ত্রিশালে জাতীয় পর্যায়ে নজরুল জয়ন্তী আয়োজনের প্রসঙ্গ টেনে সরকার প্রধান বলেন, ‘২০০৬ সালের পর থেকে জাতীয় কবির অমর স্মৃতি বিজড়িত ত্রিশালে জাতীয় পর্যায়ে নজরুল জয়ন্তী উদযাপন হয়নি। প্রায় দুই দশক পর পুনরায় রাষ্ট্রীয়ভাবে জাতীয় কবির জয়ন্তী আয়োজন করতে পেরে সরকার গৌরববোধ করছে।’

তিনি বলেন, ‘এই অনুষ্ঠানে আমি আরো একজন মানুষকে গভীর কৃতজ্ঞতায় স্মরণ করতে চাই, তিনি মরহুম দারোগা রফিজ উল্লাহ। ১৯১৪ সালে তিনি নজরুল ইসলামকে ত্রিশালের কাজীর শিমলা গ্রামে নিজ বাড়িতে এনে আশ্রয় দিয়েছিলেন।’

কবির চির-অম্লান স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আর দুদিন পরই আগামী ২৫ মে বাংলাদেশের মহান জনগণের পরম প্রিয়জন, আমাদের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের ১২৭তম জন্মবার্ষিকী। তার চির-অম্লান স্মৃতির প্রতি জানাই গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা। অনিঃশেষ কৃতজ্ঞতার সঙ্গে তাকে স্মরণ করছি। তার মাগফিরাত কামনা করছি।’ কবির বাল্যস্মৃতি বিজড়িত ত্রিশালের দরিরামপুরের নজরুল একাডেমি মাঠের নজরুল মঞ্চে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে জাতীয় কবির জন্মবার্ষিকীর তিনদিনব্যাপী এই অনুষ্ঠান হয়।

সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরীর সভাপতিত্বে সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম, পাট ও বস্ত্র প্রতিমন্ত্রী শরীফুল আলম, সংস্কৃতি সচিব কানিজ মওলা, জেলা পরিষদ প্রশাসক সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম ইনস্টিটিউটের নির্বাহী পরিচালক লতিফুর রহমান শিবলী, ইনস্টিটিউটের ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারম্যান কবিপৌত্রী খিলখিল কাজী, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক তারিখ মনজুর, ময়মনসিংহ-৭ আসনের সংসদ সদস্য মাহবুবুর রহমান লিটন এবং জেলা প্রশাসক সাইফুর রহমান বক্তব্য রাখেন।

এদিকে আগামী এক মাসের মধ্যে রামিসা হত্যাকারীর সর্বোচ্চ শাস্তি নিশ্চিত করা হবে বলে ঘোষণা দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তিনি বলেন, ‘সবচেয়ে যেটি বড় ক্ষতি হয়েছে, বিশেষ করে বিতাড়িত ফ্যাসিবাদের সময়ে মানবতা, মানবিকতা এবং দেশের আবহমানকালের ধর্মীয় সামাজিক মূল্যবোধগুলোকে একেবারেই বিনষ্ট করে দেয়া হয়েছে। ঢাকার মিরপুরে একটি নিষ্পাপ মেয়ের নির্মম মৃত্যুর মাধ্যমে মানুষের মানবিক মূল্যবোধের চূড়ান্ত অবক্ষয়ের চূড়ান্ত প্রমাণ মিলেছে।’

তিনি বলেন, ‘এই বিষয়ে আজকের অনুষ্ঠানে আমি পরিস্কারভাবে আপনাদের সামনে তুলে ধরতে চাই। এই ধরণের শিশু নির্যাতন বা নারী নির্যাতন বর্তমান সরকার কোনোভাবেই মেনে নেবে না। বর্তমান সরকার রামিসার এই হত্যাকারীর সর্বোচ্চ শাস্তি ইনশাল্লাহ আগামী এক মাসের মধ্যেই নিশ্চিত করবে। সেই সর্বোচ্চ শাস্তি হচ্ছে মৃত্যুদ-।’

কবির বাল্যস্মৃতি বিজড়িত ত্রিশালের দরিরামপুরের নজরুল একাডেমি মাঠের নজরুল মঞ্চে সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে জাতীয় কবির জন্মবার্ষিকীর তিনদিন ব্যাপী এই অনুষ্ঠান হয়।

দেশবাসীর উদ্দেশ্যে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ‘দেশে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টির পায়তারা চলছে, সতর্ক থাকুন।’ তিনি বলেন, ‘আজকে যারা দেশে এই অরাজক পরিস্থিতি তৈরি করতে চায় তাদের ব্যাপারে সবাইকে সতর্ক থাকতে হবে। কারণ, দেশে এই মুহূর্তে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি হলে সরকারের উন্নয়ন কর্মকা- বাধাগ্রস্ত হবে। দেশের মানুষ বিপদে পড়বে।’

ত্রিশালের বৈলর এলাকার ‘ধরার খাল’ পুনঃখননের পর উপস্থিত নেতা-কর্মীসহ গ্রামবাসীদের এক সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী কথা বলেন।

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এখন বাংলাদেশের মানুষ দেশ গঠন করতে চায়। বাংলাদেশের মানুষ তার ভাগ্যের পরিবর্তন করতে চায়। ভাগ্যের পরিবর্তন যদি করতে হয় আমাদের ২০ কোটি মানুষের ৪০ কোটি হাতকে সক্রিয় করে তুলতে হবে, আমাদের ২০ কোটি মানুষের ৪০ কোটি হাতকে কাজে ব্যবহার করতে হবে, তাহলেই আমরা এদেশের মানুষের ভাগ্য পরিবর্তন করতে পারব।’

প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘আমার ঘর আমাকেই দেখতে হবে। আমাদের দেশ আমাদেরকেই দেখতে হবে। আমাদের দেশের স্বাধীনতা, আমাদের দেশের সার্বভৌমত্ব, আমাদের দেশের মানুষের স্বার্থ আমরাই দেখব এবং যে কোন ষড়যন্ত্র প্রতিহত করব আমরা ইনশল্লাহ।’ ময়মনসিংহ-৭ আসনে সংসদ সদস্য মাহবুবুর রহমান লিটনের সভাপতিত্বে সমাবেশে দুযোর্গ ব্যবস্থাপনা মন্ত্রী আসাদুল হাবিব দুলুসহ স্থানীয় নেতৃবৃন্দ বক্তব্য রাখেন। এর আগে প্রধানমন্ত্রী খাল পূনঃখনন স্থলে এসেই ফলক উন্মোচন করেন। এরপর তিনি নিজে খালের কাছে গিয়ে কোদাল দিয়ে ‘ধরার খাল’ পুনঃখনন কর্মসূচির উদ্বোধন করেন। তিনি খালের পাশে একটি তাল গাছের চারাও রোপণ করেন।

প্রধানমন্ত্রীর আশ^াস

বৈদ্যুতিক গাড়ি উৎপাদনে সহযোগিতা করবে সরকার

মান ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করে দেশেই ইলেকট্রিক ভেহিকল (ইভি) উৎপাদন করলে সরকার সহযোগিতা করবে বলে আশ্বস্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তবে এর মাধ্যমে দেশ উপকৃত হয় কিনা সে বিষয়ও লক্ষ্য রাখার তাগিদ দেন তিনি। গতকাল শনিবার সকালে রাজধানীর তেজগাঁওয়ে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে আনা বাংলাদেশ অটো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেডের তৈরি করা কয়েকটি ইভি পরিদর্শনকালে তিনি এমন অভিমত ব্যক্ত করেন। এ সময় একটি স্পোর্টস ইউটিলিটি ভেহিক্যাল (এসইউভি) ও একটি কাভার্ড ভ্যান নিজে চালিয়েও দেখেন প্রধানমন্ত্রী। তিনি নির্মাতাদের প্রশংসা করেন এবং প্রয়োজনীয় সহযোগিতার আশ্বাস দেন।

নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে প্রধানমন্ত্রীকে জানানো হয়, বাংলাদেশ অটো ইন্ডাস্ট্রিজ লিমিটেড দেশের প্রথম ইলেক্ট্রিক ভেহিক্যাল নির্মাতা। গাড়িগুলো সম্পূর্ণ ব্যাটারিচালিত ও পরিবেশবান্ধব। এতে জ্বালানি তেলের প্রয়োজন হয় না এবং বিদ্যুৎ খরচও তুলনামূলক কম। একইসঙ্গে গাড়িগুলোর দামও সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে রাখার চেষ্টা করা হয়েছে। প্রধানমন্ত্রীকে দেখানোর জন্য কার্যালয় প্রাঙ্গণে আনা হয় দুটি এসইউভি, একটি কাভার্ড ভ্যান, একটি ট্রাক, একটি অটোরিকশা এবং দুটি মোটরসাইকেল।

পরে প্রধানমন্ত্রী নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান এ মান্নান হোসেন খান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মীর মাসুদ কবিরকে নিয়ে নিজ দফতরে যান। সেখানে ইভি গাড়ির বাজারজাতকরণ ও সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা হয়। বৈঠক শেষ নির্মাতা প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যান এ মান্নান হোসেন খান বলেন, গাড়িগুলো দেশীয় প্রযুক্তিতে তৈরি হলেও কিছু কাঁচামাল বিদেশ থেকে আমদানি করতে হয়। এসব কাঁচামালের ওপর শুল্ক সুবিধা পেলে বেশ কম খরচে গাড়ি বাজারে আনা সম্ভব হবে।