প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেছেন যে দীর্ঘ দেড় দশকের ফ্যাসিবাদী শাসন ও শোষণের অভিশাপ থেকে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডও (এনবিআর) মুক্ত থাকতে পারেনি। এনবিআরের নীতি ও নিয়ম উপেক্ষা করে ব্যক্তি কিংবা দলীয় স্বার্থে কাউকে অন্যায্য পৃষ্ঠপোষকতা করা, কারও প্রতি উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিরূপ মনোভাব দেখানো কিংবা রাজস্ব আহরণে স্বেচ্ছাচারিতা চালানোর মাধ্যমে এনবিআরকে চরমভাবে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়েছিল। এতে করে প্রতিষ্ঠানটির ওপর থেকে সাধারণ মানুষের আস্থা সম্পূর্ণ বিনষ্ট হয়। তবে ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশে এবার আমাদের ঘুরে দাঁড়ানোর পালা এসেছে।
মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) দুপুরে রাজধানীর আগারগাঁওয়ে অবস্থিত বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রে অনুষ্ঠিত জাতীয় ‘রাজস্ব সম্মেলনে’ প্রধান অতিথির ভাষণে তিনি এসব কথা বলেন।
বক্তব্যের পূর্বে তিনি ঐতিহ্যবাহী এই সম্মেলনের আনুষ্ঠানিক উদ্বোধন করেন এবং সম্মেলন প্রাঙ্গণে স্থাপিত বিভিন্ন স্টল ঘুরে দেখেন। আয়োজনে বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের অর্থ মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ সম্পদ বিভাগের অধীনস্থ জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) এই সম্মেলনের মূল আয়োজক।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান তাঁর বক্তব্যে উল্লেখ করেন, দেশের সাধারণ জনগণ বর্তমানে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে একটি অত্যন্ত নির্ভরযোগ্য ও বিশ্বস্ত প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখতে চায়। বিশেষ করে সম্মানিত করদাতারা এনবিআরকে তাদের পূর্ণ আস্থাভাজন প্রতিষ্ঠান হিসেবে দেখতে আগ্রহী। কেবলমাত্র একটি দক্ষ, স্বচ্ছ ও টেকসই রাজস্ব ব্যবস্থাপনার মাধ্যমেই এই হারিয়ে যাওয়া জন-আস্থা পুনরায় ফিরিয়ে আনা বা অর্জন করা সম্ভব। করদাতাদের সেই ন্যায্য প্রত্যাশা পূরণের মূল দায়িত্ব রাজস্ব কর্মকর্তাদেরই গ্রহণ করতে হবে। তিনি স্পষ্ট জানান, বর্তমান সরকার এনবিআর তথা সমগ্র দেশের রাজস্ব কাঠামোকে একটি জনবান্ধব সেবা খাত হিসেবে গড়ে তুলতে সম্পূর্ণ বদ্ধপরিকর।
অতীতের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের তীব্র সমালোচনা করে তিনি বলেন, ছাত্র-জনতার গণঅভ্যুত্থানের মুখে বিতাড়িত ফ্যাসিস্ট চক্র দেশের অর্থনীতিকে চূড়ান্তভাবে একটি ঋণনির্ভর ও আমদানিনির্ভর রাষ্ট্রে পরিণত করে দেশ ছেড়ে পালিয়েছে। বর্তমান সরকার কেবল বৈদেশিক সহায়তার ওপর চোখ বন্ধ করে নির্ভর করে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাঁধে বিপুল ঋণের বোঝা চাপিয়ে দেওয়ার নীতিতে বিশ্বাসী নয়। এটি বর্তমান সরকারের নীতির সম্পূর্ণ বিরোধী। ফলে টেকসই রাজস্ব আহরণের জন্য আমাদেরকে অবশ্যই নিজস্ব অভ্যন্তরীণ আয়ের ক্ষেত্র ও নতুন নতুন উৎস বহুগুণ বাড়াতে হবে।
অভ্যন্তরীণ আয় বৃদ্ধির কৌশল হিসেবে সরকার ইতোমধ্যে গণমুখী উৎপাদননীতি গ্রহণ করেছে বলে জানান প্রধানমন্ত্রী। এই দূরদর্শী নীতির ফলে দেশে দেশি-বিদেশি মোট বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে। একই সাথে শিল্পায়ন, ব্যবসা-বাণিজ্য প্রসারিত হবে, মানুষের সার্বিক ব্যক্তিগত আয় বাড়বে এবং দেশজুড়ে ব্যাপক কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হবে। ফলে জনগণ আরও উন্নত ও মানসম্মত সরকারি সেবা পাবে। এই পুরো প্রক্রিয়ায় জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের একটি অত্যন্ত দক্ষ, প্রাতিষ্ঠানিক ও কার্যকর ভূমিকা পালন করা অনস্বীকার্য।
বিশ্ব প্রেক্ষাপট তুলে ধরে প্রধানমন্ত্রী বলেন, আন্তর্জাতিক অর্থনীতি প্রতিনিয়ত ও দ্রুত গতিতে পরিবর্তিত হচ্ছে। প্রতিনিয়ত একের পর এক আধুনিক ও যুগান্তকারী প্রযুক্তির বিকাশ ঘটছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের ধরণ, কাঠামো এবং ব্যবসার নতুন নতুন মডেলে বড় পরিবর্তন আসছে। বৈশ্বিক ও আঞ্চলিক কর নীতি বা রাজস্ব ব্যবস্থাপনায় এ কারণে ব্যাপক পরিবর্তন দৃশ্যমান। এই পরিবর্তিত বিশ্বের নানা অর্থনৈতিক সমস্যা, সম্ভাবনা, নতুন সুযোগ ও বড় চ্যালেঞ্জ সফলভাবে মোকাবিলা করার জন্য বাংলাদেশের রাজস্ব কর্মকর্তাদের বহুমাত্রিক পেশাগত দক্ষতা অর্জন করা এখন সময়ের দাবি।
দেশের বর্তমান কর ব্যবস্থার দুর্বলতা তুলে ধরে তিনি অত্যন্ত দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, আমাদের দেশে বর্তমানে ট্যাক্স-জিডিপি অনুপাত জাতীয় সক্ষমতার তুলনায় এখনো অনেক কম। করের ভিত্তি অত্যন্ত সংকুচিত ও সীমিত। তদুপরি, সামগ্রিক অর্থনীতির একটি বিশাল অংশ এখনো অনানুষ্ঠানিক খাত হিসেবে থেকে গেছে। ফলে অল্পসংখ্যক নিয়মিত ও নিবন্ধিত করদাতার ওপর বারবার করের অতিরিক্ত চাপ প্রয়োগ করা মোটেও সঠিক বা টেকসই পদ্ধতি নয়। নিয়মিত করদাতাদের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে করদাতার আওতা সম্প্রসারণ করতে হবে।
রাজস্ব প্রশাসন ও জনগণের সম্পর্কের বিষয়ে তিনি জোর দিয়ে বলেন, আধুনিক বিশ্বের কোনো আধুনিক কর প্রশাসনের মূল উদ্দেশ্য কেবল জোর করে বেশি রাজস্ব আদায় করা নয়; বরং দেশের বিপুল সংখ্যক মানুষকে স্বেচ্ছায় ও স্বতঃস্ফূর্তভাবে কর প্রদানে উৎসাহিত করা। একজন সচেতন নাগরিক বা করদাতা যিনি নিয়মিত রাষ্ট্রীয় কর পরিশোধ করছেন, রাষ্ট্র যেমন তাঁকে যথাযথ সম্মানে ভূষিত করবে; একইভাবে যিনি ইচ্ছাকৃতভাবে কর ফাঁকি বা পরিহার করছেন, তাঁকেও অত্যন্ত দক্ষ উপায়ে কর প্রদানে উৎসাহিত ও উদ্বুদ্ধ করতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী আরও জোর দেন যে, দেশের কর ব্যবস্থাপনা কিংবা কর আদায় পদ্ধতিকে দ্রুত সময়ের মধ্যে একদম সহজ, সম্পূর্ণ স্বচ্ছ, দুর্নীতিমুক্ত এবং হয়রানিমুক্ত করা প্রয়োজন, যেন মানুষ স্বেচ্ছাপ্রণোদিত হয়ে আনন্দের সাথে কর জমা দিতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। একই সাথে বর্তমানে কর প্রদানের সক্ষমতা থাকা ব্যক্তিদের সঠিকভাবে শনাক্ত করে একটি ডিজিটালি আধুনিক ও ডেটাভিত্তিক কর প্রশাসন গড়ে তোলার কোনো বিকল্প নেই।
সবশেষে মূল্যসংযোজন কর (ভ্যাট) প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ভ্যাট আধুনিক অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ও গুরুত্বপূর্ণ রাজস্ব উৎস। এর সফলতা নির্ভর করে যথাযথ ও কার্যকর বাস্তবায়নের ওপর। ভ্যাট প্রশাসনের প্রশাসনিক জটিলতার কারণে যেন ব্যবসায়ীদের ব্যবসা-বাণিজ্য কোনোভাবেই বিঘ্নিত বা বাধাগ্রস্ত না হয়, সেটিও জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের কর্মকর্তাদেরই সতর্কতার সঙ্গে নিশ্চিত করতে হবে। রাজস্ব আদায় কেবল আইন প্রয়োগের বিষয় নয়, বরং করদাতাদের সঙ্গে গভীর আস্থার সম্পর্ক গড়ে তোলাই এর প্রধান চাবিকাঠি। দক্ষতা ও আস্থার মাধ্যমে এনবিআরকে এমনভাবে প্রস্তুত করতে হবে, যেন মানুষ প্রতিষ্ঠানটিকে ভয় না পেয়ে ভালোবাসা ও বিশ্বাসের চোখে দেখে।