স্টাফ রিপোর্টার
সংসদে দেশের চলমান সংকটের সমাধান না হওয়ায় ১১ দল রাজপথে নেমেছে বলে মন্তব্য করেছেন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল, সাবেক এমপি ও ১১ দলীয় ঐক্যের সমন্বয়ক ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ।
গতকাল রোববার দুপুরে রাজধানীর ২৯ মিন্টো রোডে বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে ১১ দলীয় ঐক্যের লিয়াজোঁ কমিটির এক প্রস্তুতি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। বৈঠকে সভাপতিত্ব করেন ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ।
বৈঠকে জাতীয় নাগরিক পার্টির মুখ্য সংগঠক নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, এলডিপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব বিল্লাল হোসেন মিয়াজী, বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের যুগ্ম মহাসচিব তোফাজ্জল হোসেন মিয়াজী, বাংলাদেশ নেজামে ইসলাম পার্টির সিনিয়র নায়েবে আমীর মাওলানা আব্দুল মাজেদ আতহারী ও মহাসচিব মুফতি মুসা বিন ইযহার, এবি পার্টির যুগ্ম মহাসচিব অ্যাডভোকেট আব্দুল্লাহ আল মামুন রানা, বাংলাদেশ লেবার পার্টির ভাইস চেয়ারম্যান এসএম ইউসূফ আলী ও মুখপাত্র নাজমুল ইসলাম, জাগপার সহসভাপতি ইঞ্জিনিয়ার রাশেদ প্রধান ও সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ইকবাল হোসাইন, বিডিপির জেনারেল সেক্রেটারি নিজামুল হক নাঈম, বাংলাদেশ খেলাফত আন্দোলনের মহাসচিব মুফতি ফখরুল ইসলাম এবং বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর কেন্দ্রীয় নির্বাহী পরিষদ সদস্য মোবারক হোসাইনসহ সংশ্লিষ্ট নেতারা উপস্থিত ছিলেন।
বৈঠক শেষে ব্রিফিংয়ে ড. হামিদুর রহমান আযাদ বলেন, জনগণের অধিকার, নিরাপত্তা ও দেশের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সামগ্রিকভাবে অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনের পাশাপাশি বাংলাদেশকে নতুন রাজনৈতিক ব্যবস্থার দিকে নিয়ে যেতে ১১ দল ভূমিকা পালন করে আসছে। এ লক্ষ্যে জনগণের দাবি নিয়ে গত ৫ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত ঢাকা-চট্টগ্রাম প্রথম লংমার্চে আশাতীত সাড়া পাওয়া গেছে। জনবান্ধব ইস্যু হওয়ার কারণেই জনগণ এতে সাড়া দিয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তিনি বলেন, গণভোটের গণরায় বাস্তবায়ন, জুলাই গণহত্যার বিচার, বিদ্যুৎ, তেল, গ্যাস ও সার সংকট নিরসন, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের ঊর্ধ্বগতি রোধ, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির উন্নয়ন, দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও দখলদারি বন্ধ এবং প্রশাসনের সর্বস্তরে সংকীর্ণ দলীয়করণ বন্ধের দাবিতে আগামী ১৯ সেপ্টেম্বর দ্বিতীয় লংমার্চ ঢাকা-রংপুর অনুষ্ঠিত হবে।
তিনি জানান, ১৯ সেপ্টেম্বর সকাল ৭টায় রাজধানীর মানিক মিয়া এভিনিউতে লংমার্চের জমায়েত শুরু হবে। সকাল ৮টা পর্যন্ত উদ্বোধনী সমাবেশ শেষে রংপুরের উদ্দেশে লংমার্চ যাত্রা করবে। পথে গাজীপুর, টাঙ্গাইল, সিরাজগঞ্জ, বগুড়া ও গাইবান্ধায় পাঁচটি পথসভা অনুষ্ঠিত হবে। পরে রংপুর জিলা স্কুল মাঠে সমাপনী সমাবেশ হবে।
ড. হামিদুর রহমান বলেন, ১১ দলের লংমার্চ কর্মসূচি অব্যাহত থাকবে। তাদের ৬ দফা দাবি এখন ৭ দফায় রূপান্তরিত হয়েছে। নতুন করে দুর্নীতি, দখলদারি ও চাঁদাবাজি বন্ধের দাবি যুক্ত হয়েছে। এসব পরিস্থিতি বিগত ফ্যাসিস্ট আমলের চেয়েও খারাপ হয়েছে বলে দাবি করেন তিনি।
তিনি বলেন, ১১ দলের নির্বাচিত সংসদ সদস্যরা শুরু থেকেই সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ নিয়ে সংসদে নোটিশ দিয়ে গণভোটের গণরায় বাস্তবায়নের জন্য সোচ্চার ভূমিকা পালন করে আসছেন। কিন্তু সরকার প্রথম দিনেই সংবিধান সংস্কার পরিষদের শপথ না নিয়ে গণভোটে প্রায় ৭০ শতাংশ মানুষের দেওয়া রায়কে উপেক্ষা ও প্রত্যাখ্যান করেছে। এটি গণতন্ত্রের ওপর চপেটাঘাত এবং গণরায়ের প্রতি অবজ্ঞা বলেও মন্তব্য করেন তিনি।
তেল, গ্যাস ও সার সংকট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দেশের এসব সংকট নিরসনে সরকার ব্যর্থ হয়েছে। সংকট মোকাবিলায় বিরোধীদলীয় নেতা একটি টাস্কফোর্স গঠনের প্রস্তাব দিলেও সরকার তা আমলে নেয় নি। বরং সংকটের কৃত্রিম অজুহাত দেখিয়ে তেলের দাম বাড়িয়েছে। এভাবে সরকার তাদের নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
ড. হামিদুর রহমান আরও বলেন, গ্যাস সংকটের কারণে একের পর এক শিল্পপ্রতিষ্ঠান বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। সরকার এ বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারে নি। কোনো সংকট সৃষ্টি হলে তা মোকাবিলায় সরকার বারবার যে অদক্ষতার পরিচয় দিচ্ছে, তা জাতির কাছে স্পষ্ট। গত ছয় মাসে সংকট নিরসনে কোনো বিকল্প ব্যবস্থা না নিয়ে সরকার সিঙ্গেল ট্র্যাকে চলছে, যা ঝুঁকিপূর্ণ।
সার সংকট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, দেশে সার সংকট কৃষি উৎপাদনকে ব্যাহত করছে। এর ফলে গোটা জাতি খাদ্য সংকট ও ভোগান্তিতে পড়তে পারে। একই সঙ্গে নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের লাগামহীন ঊর্ধ্বগতি অব্যাহত রয়েছে। বাজার সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ ও বাজার মনিটরিংয়ে সরকার পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে বলে অভিযোগ করেন তিনি।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়েও সরকারের সমালোচনা করেন ড. হামিদুর রহমান। তিনি বলেন, আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি ভয়াবহ রূপ ধারণ করছে। খুন, গুম ও অপহরণের ঘটনা ঘটছে। বিরোধী দলের ওপর হামলা হচ্ছে। জামায়াতের পাঁচ নেতাকর্মীকে হত্যা করা হয়েছে বলেও দাবি করেন তিনি। এসব ঘটনার প্রতিবাদে সংসদে আলোচনা এবং রাজপথে ভূমিকা রেখে যাচ্ছে বিরোধী দলগুলো।
তিনি আরও বলেন, নির্বাচনের আগে বিএনপি দুর্নীতি দমনের কথা বলেছিল। কিন্তু সরকার গঠনের পর দুর্নীতি, চাঁদাবাজি ও দখলদারি বন্ধ হয় নি। এতে জনজীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠেছে, জনগণের নাভিশ্বাস উঠেছে এবং বাংলাদেশ অর্থনৈতিক সংকটে পড়েছে। এ সংকট মোকাবিলায় জাতীয় ঐকমত্য প্রয়োজন হলেও সরকার বিরোধী দলের কোনো প্রস্তাবই আমলে নিচ্ছে না।
ড. হামিদুর রহমান বলেন, সংসদে সংকটের সমাধান না হওয়ায় ১১ দল রাজপথে নেমেছে। জনগণের দাবি ও দেশের স্বার্থে ধারাবাহিকভাবে আন্দোলন কর্মসূচি পালন করা হবে। সরকারের উচিত জনগণের দাবিগুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া।
তিনি আগামী ১৯ সেপ্টেম্বর ঢাকা-রংপুর লংমার্চ শান্তিপূর্ণভাবে বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট সবার সহযোগিতা কামনা করেন। একই সঙ্গে লংমার্চ ও পথে অনুষ্ঠিতব্য পথসভাগুলো সফল করতে দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানান।