২৪-এর জুলাই বিজয় জনগণের, কোনো ব্যক্তি বা দলের নয়’ বলে মন্তব্য করেছেন জাতীয় সংসদের বিরোধীদলীয় নেতা ও জামায়াত আমীর ডা. শফিকুর রহমান।
গতকাল শুক্রবার জাতীয় প্রেসক্লাবে বাংলাদেশ পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশন (রেজি. নং বি-২২২৩)-এর উদ্যোগে ত্রি-বার্ষিক জাতীয় সম্মেলনে এ মন্তব্য করেন তিনি।
ডা. শফিকুর রহমান বলেন, ২০২৪ সালের ৩১ জুলাই ছিল দেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। তিনি বলেন, সেদিন সরকার জামায়াতে ইসলামীকে নিষিদ্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল, যা পরে একদিন পিছিয়ে ১ আগস্ট কার্যকর করা হয়। সরকারের ওই সিদ্ধান্ত প্রত্যাখ্যান করে সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে জনগণের প্রতি আহ্বান জানানো হয়, যেহেতু সরকার জামায়াতকে নিষিদ্ধ করে নিশ্চিহ্ন করতে চেয়েছে, তাই স্বৈরাচারের বিরুদ্ধে আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে অংশগ্রহণ করা ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই।
তিনি বলেন, “আলহামদুলিল্লাহ, আমাদের সেই আহ্বানের মাত্র তিন দিনের মাথায় তারা দেশ ছেড়ে পালাতে বাধ্য হয়। ১ আগস্ট তারা আমাদের নিষিদ্ধ করেছিল, আর ৫ আগস্ট রান্না করা খাবারও খেতে পারেনি। আল্লাহ তাআলা তাদের কপালে সেই খাবারও রাখেননি। তারা ভেবেছিল, আগের বছরের মতো এবারও অত্যাচার করে পার পেয়ে যাবে, ফ্যাসিবাদী কায়দায় আন্দোলন দমন করবে। কিন্তু জমিনের মালিক আল্লাহ। তাঁর ফয়সালার বিরুদ্ধে গিয়ে কোনো শক্তিই টিকে থাকতে পারে না।”
ডা. শফিকুর রহমান আরো বলেন, মানুষ সেদিন মুখে মুখে বলেছে, আল্লাহ তা,আলা যেন আবাবিল পাখির মতো সাহায্য পাঠান। তিনি বলেন, আল্লাহ চাইলে ক্ষুদ্র শক্তিকেও বিজয়ী করতে পারেন এবং পৃথিবীর সবচেয়ে বড় বাহিনীকেও পরাজিত করতে পারেন। ইতিহাসে এমন ঘটনা একাধিকবার ঘটেছে, কিন্তু স্বৈরাচারীরা কখনোই সেখান থেকে শিক্ষা নেয় না।
ডাক্তার শফিকুর রহমান বলেন, আন্দোলনের সময় একদিকে ছিল সশস্ত্র সরকারি বাহিনী ও সরকারদলীয় সন্ত্রাসীরা, অন্যদিকে নিরস্ত্র মানুষ ঈমান ও দেশপ্রেমের স্লোগান নিয়ে রাজপথে নেমেছিল। আল্লাহ সেই ঈমান ও ন্যায়ের পক্ষে দাঁড়ানো মানুষদেরই বিজয় দিয়েছেন।”
জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শ্রমিকদের আত্মত্যাগের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, জাতিসংঘের হিসাব অনুযায়ী ১,৪০০ শহীদের পেশাগত পরিচয় বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, সর্বাধিক শহীদ শ্রমিক সমাজের। এরপর ছাত্র এবং তারপর সাধারণ মানুষের অবস্থান। তিনি বলেন, শ্রমিকরা কোনো কোটা পাওয়ার জন্য আন্দোলন করেনি; তারা বৈষম্যের বিরুদ্ধে লড়েছে। তারা চেয়েছিল সম্মানজনকভাবে পরিবার-পরিজন নিয়ে দুমুঠো ভাত খেয়ে বেঁচে থাকতে।
চাঁদাবাজির প্রসঙ্গে তিনি এক মন্ত্রীর বক্তব্য উদ্ধৃত করে বলেন, ‘সমঝোতার মধ্যে নিলে চাঁদা বলা যাবে না’ এ ধরনের বক্তব্য চাঁদাবাজিকে বৈধতা দেওয়ার শামিল। তিনি আরও বলেন, একজন হুইপ বলেছেন, ‘বিদেশ থেকে কেউ এসে দেশ চালালেও চাঁদাবাজি বন্ধ করা যাবে না।’ ডা. শফিকুর রহমানের ভাষায়, যদি এমন বক্তব্যই সত্য হয়, তবে তা চাঁদাবাজির একটি বৈধ কাঠামো দাঁড় করানোর শামিল।
তিনি আরও বলেন, দেড় কোটি মানুষের কর্মসংস্থানের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবে বাসস্ট্যান্ড, ট্রাকস্ট্যান্ড, সিএনজি স্ট্যান্ডসহ বিভিন্ন স্থানে চাঁদাবাজির মাধ্যমে যে অবৈধ উপার্জনের ব্যবস্থা তৈরি হয়েছে, সেটাকেই যেন চাকরি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হয়েছে। জনগণ এমন চাকরি চায় না; জনগণ এই চাঁদাবাজিকে ঘৃণা করে।
সরকারের দুর্নীতি ও ব্যর্থতার সমালোচনা করে তিনি বলেন, সরকারের একজন নেতা নিজেই স্বীকার করেছেন যে গত পাঁচ মাসে কোনো ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব হয়নি এবং দুর্নীতি বেড়েছে। তিনি প্রশ্ন রেখে বলেন, যদি প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশেই সবকিছু পরিচালিত হয়, তাহলে দুর্নীতিবাজরা তাঁর আশপাশে কীভাবে অবস্থান করে? দুর্নীতি বন্ধ হয় না কেন? যখন নিজেরাই ব্যর্থতার কথা স্বীকার করছেন, তখন ক্ষমতায় থাকার নৈতিক অধিকার কোথায়?
বাংলাদেশ পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের ১২ দফা দাবির প্রসঙ্গে তিনি বলেন, এসব দাবি আদায়ের জন্য আন্দোলন করতে হওয়াই দুঃখজনক। এগুলো তো শ্রমিকদের মৌলিক অধিকার হওয়া উচিত ছিল। অথচ অধিকার প্রতিষ্ঠার বদলে আজ অধিকার নিয়েই টানাটানি চলছে।
তিনি অভিযোগ করে বলেন, চাঁদাবাজদের হাতে পরিবহন শ্রমিকরা সর্বত্র নির্যাতনের শিকার হচ্ছেন। চাঁদা দিতে অস্বীকৃতি জানালে মারধর, হামলা, এমনকি যানবাহন ভাঙচুরের ঘটনাও ঘটছে। তিনি বলেন, এই অপকর্ম যারা করছে, তাদের বিরুদ্ধে সরকারকে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, জুলাইয়ের দাবিদার কোনো ব্যক্তি, দল বা গোষ্ঠী নয়; জুলাইয়ের দাবিদার বাংলাদেশের ১৮ কোটি মানুষ। কেউ এককভাবে এই আন্দোলনের কৃতিত্ব দাবি করতে পারে না। শহীদরা কোনো দলের সম্পত্তি নন; তারা জাতির সম্পদ।
জুলাই শহীদ ও আহত পরিবারের যথাযথ সম্মান নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, সরকার তাদের প্রাপ্য সম্মান দিতে ব্যর্থ হয়েছে। আমরা স্পষ্টভাবে দাবি জানাই, জুলাই শহীদ ও জুলাই-সন্তানদের মর্যাদা ও প্রাপ্য রাষ্ট্রকে নিশ্চিত করতে হবে। শহীদ পরিবারকে সম্মান দিলে ভবিষ্যতেও এই দেশের মাটিতে সাহসী সন্তান জন্ম নেবে।
তিনি বলেন, আমরা কোনো আধিপত্যবাদী শক্তির কাছে মাথা নত করব না। বাংলাদেশের মানুষের অধিকার প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত আমাদের আন্দোলন চলবে। রুখে দাঁড়াতে হবে, কারণ মাথা নত করলে সব শেষ হয়ে যাবে। আমরা হারব না, ইনশাআল্লাহ জয়ী হব।
গণভোটের রায় বাস্তবায়নের দাবি জানিয়ে তিনি বলেন, ৭০ শতাংশ মানুষের গণরায়কে নিজেদের গণতান্ত্রিক দল দাবি করলে সেই রায় অবশ্যই মেনে নিতে হবে। জনগণের রায় অমান্য করা মানেই জনগণকে অসম্মান করা।”
বক্তব্যের শেষাংশে তিনি বলেন, আমরা অতীতেও মজলুম ছিলাম, এখনও মজলুম। আল্লাহ আমাদের অভিভাবক। তাঁর সাহায্যের ওপর ভরসা করেই আমরা আন্দোলন চালিয়ে যাব। ইনশাআল্লাহ, জনগণের ন্যায্য দাবির কাছে একদিন সবাই মাথা নত করতে বাধ্য হবে।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি মাওলানা রফিকুল ইসলাম খান এমপি বলেন, এদেশের শ্রমিকরা আজও বঞ্চিত রয়েই গেলো ২৪-এর বিল্পবের পর আমরা আশা করেছিলাম, তাদের অবস্থার উন্নতি হবে কিন্তু এখন তাদের অবস্থা আগের চেয়ে শোচনীয়, উপরন্ত চাঁদাবাজদের অত্যাচারে আজ পরিবহন শ্রমিকরা বড়ই অতিষ্ট।
শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি এডভোকেট আতিকুর রহমান বলেন, এক শ্রেণির নব্য চাঁদাবাজেরা আজ গোটা পরিবহন সেক্টর কে গ্রাস করে ফেলতে চাইছে; আমরা কথা দিচ্ছি এই চাঁদাবাজি সহ সকল অন্যায়ের বিরুদ্ধে আমাদের আন্দোলন চলবে, শ্রমিকর মুক্তির আন্দোলন চলবে, আমরা শ্রমিকদের তাদদর অধিকার ফিরে না পাওয়া পর্যন্ত লড়াই চালিয়ে যাবো ইনশাআল্লাহ্।
বাংলাদেশ পরিবহন শ্রমিক ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি কবির আহমদ এর সভাপতিত্বে এবং এসএম আতিকুর রহমান এর সঞ্চালনায় সম্মেলনে বিশেষ অতিথি হিসেবে আরো বক্তব্য রাখেন ডাকসু পরিবহন সম্পাদক আসিফ আব্দুল্লাহ, শ্রমিকল্যাণ ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি গোলাম রব্বানী ও মুজিবুর রহমান ভুঁইয়া, কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদক লসকর মো. তসলিম, পরিবহন ফেডারেশনের সহসভাপতি লোকমান আহমদ, প্রতিষ্ঠাতা সাধারন সম্পাদক ডঃ সারোয়ার ছিদ্দিকী, অন্যদের মধ্যে শ্রমিক কল্যাণের কেন্দ্রীয় সহসাধারণ সম্পাদক এডভোকেট আলমগীর হোসাইন, মুহিবুল্লাহ, কেন্দ্রীয় প্রচার সম্পাদক হাফিজুর রহমান সহ বিভিন্ন পর্যায়ের জাতীয় শ্রমিক নেতৃবৃন্দ।
সম্মেলনে দেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আগত প্রতিনিধিরা অংশগ্রহণ করেন। ত্রি-বার্ষিক জাতীয় সম্মেলনে সংগঠনের ৫১ সদস্য বিশিষ্ট কেন্দ্রীয় কমিটি গঠন করা হয়।