বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশনের কেন্দ্রীয় সভাপতি অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমান বলেছেন, সার সংকট স্বীকার করে তা সমাধানের উদ্যোগ নিতে হবে এবং কৃষকের দোরগোড়ায় সার পৌঁছানোর ব্যবস্থা করতে হবে। শ্রমিকদের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য কোনো কার্ডের প্রয়োজন নেই; তাদের প্রয়োজন ন্যায্য মজুরি ও শ্রমিক অধিকার।

শুক্রবার (১১ সেপ্টেম্বর) সকাল ৯টায় নরসিংদী শিশু একাডেমি মিলনায়তনে বাংলাদেশ শ্রমিক কল্যাণ ফেডারেশন নরসিংদী জেলা শাখার উদ্যোগে আয়োজিত ইউনিট প্রতিনিধি সম্মেলনে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।

অ্যাডভোকেট আতিকুর রহমান বলেন, তেল, গ্যাস ও বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে শ্রমিকের মজুরি নির্ধারণ না করে দুই হাজার টাকা মূল্যের কোনো কার্ড ধরিয়ে দিয়ে নতুন বাংলাদেশে শ্রমিকদের সঙ্গে প্রতারণা করা চলবে না। শ্রমিকদের ন্যায্য মজুরি ও অধিকার নিশ্চিত করতে হবে।

ফেডারেশনের জেলা সভাপতি মুহাম্মদ শামসুল ইসলাম তালুকদারের সভাপতিত্বে সম্মেলনে বিশেষ অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন ফেডারেশনের জেলা উপদেষ্টা ইব্রাহিম ভূঁইয়া, কেন্দ্রীয় দপ্তর সম্পাদক নুরুল আমিন, সহকারী অঞ্চল পরিচালক ড. কাজী আবুল বাশার এবং কেন্দ্রীয় ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক সম্পাদক হাফেজ আব্দুল মোমিনসহ অন্যরা।

প্রধান অতিথি বলেন, দেশের প্রতিটি অর্জনে শ্রমিকদের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে। পোশাক খাতে প্রায় ৫০ লাখ নারী-পুরুষ শ্রমিক স্বল্প মজুরিতে কাজ করছেন। প্রায় আড়াই কোটি কৃষি শ্রমিক রোদ-বৃষ্টি ও বজ্রপাত উপেক্ষা করে মাঠে ফসল উৎপাদন করে দেশের খাদ্যনিরাপত্তা নিশ্চিত করছেন। পরিবহন, নির্মাণ, পরিচ্ছন্নতাসহ সব পেশার শ্রমিক নিজ নিজ অবস্থান থেকে দেশের অর্থনীতি ও জনজীবন সচল রাখতে ভূমিকা রাখছেন। অথচ দেশের সাধারণ শ্রমজীবী মানুষের অধিকার ও মর্যাদা এখনো প্রতিষ্ঠিত হয়নি।

তিনি বলেন, পরিচ্ছন্নতাকর্মীরা এক সপ্তাহ কাজ বন্ধ করে দিলে দেশের শহরগুলো ময়লার স্তূপে পরিণত হবে। নির্মাণ শ্রমিকেরা কাজ না করলে দৃষ্টিনন্দন ভবন নির্মাণ থেমে যাবে। দেশের প্রতিটি পেশার শ্রমিকের শ্রমের কারণেই মানুষের জীবনযাত্রা সহজ ও সুন্দর হয়েছে। অথচ অধিকার আদায়ের জন্য শ্রমিকদের রাজপথে নেমে রাষ্ট্রীয় দমন-পীড়নের শিকার হতে হয়। এর চেয়ে দুর্ভাগ্যজনক পরিস্থিতি আর কী হতে পারে?

কৃষকদের ন্যায্যমূল্য না পাওয়ার প্রসঙ্গে কেন্দ্রীয় সভাপতি বলেন, কৃষক উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্য দাম পান না, অথচ খুচরা পর্যায়ে ভোক্তাদের বেশি দামে পণ্য কিনতে হয়। মাঝখানে একটি অসাধু চক্র ও সিন্ডিকেট রাজনৈতিক আশ্রয়ে বিনা পরিশ্রমে অধিক মুনাফা করছে। এ ধরনের ব্যবস্থা বন্ধ করে কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হবে।

সার সংকট প্রসঙ্গে তিনি বলেন, কৃষকরা সার পাচ্ছেন না—এটাই বাস্তবতা। সরকারের দায়িত্বশীল ব্যক্তিরা বিষয়টি দেখেও না দেখার এবং শুনেও না শোনার ভান করছেন। এভাবে দেশ চলতে পারে না। সার সংকট না থাকলে কৃষকরা বিক্ষোভ করছেন কেন এবং সারের দাম বাড়ছে কেন—এ প্রশ্নের জবাব সরকারকে দিতে হবে।

তিনি অবিলম্বে সার সংকট স্বীকার করে বন্ধ সার কারখানাগুলো চালু, ডিলারদের সতর্ক করা এবং কৃষকের দোরগোড়ায় সার পৌঁছানোর ব্যবস্থা নিশ্চিত করার দাবি জানান।

শ্রমিক ছাঁটাই প্রসঙ্গে আতিকুর রহমান বলেন, সরকারি সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে শ্রমিক ছাঁটাইয়ের কারণ যথাযথভাবে খতিয়ে দেখতে হবে। নতুন কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং কর্মরত শ্রমিকরা যাতে অন্যায়ভাবে চাকরি না হারান, সেদিকে সরকারকে নজর দিতে হবে।

তিনি বলেন, মজুরি নির্ধারণ একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। সাধারণত নির্দিষ্ট সময় পরপর মজুরি পুনর্নির্ধারণ করা হয়। বাংলাদেশে বিভিন্ন পেশায় সরকার মজুরি নির্ধারণ করে দিলেও শ্রমিকদের ক্ষেত্রে মজুরি নির্ধারণে দীর্ঘসূত্রতা দেখা যায়। এখনো দেশের অনেক খাতে ন্যূনতম মজুরি নির্ধারণ হয়নি। ফলে মালিকপক্ষ নানা উপায়ে শ্রমিকদের বঞ্চিত করার সুযোগ পাচ্ছে।

সরকারের উদ্দেশে তিনি বলেন, স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন-পরবর্তী সময়ে শ্রমিকদের ভাগ্য পরিবর্তন ও অধিকার ফিরিয়ে দেওয়ার যে প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে, তা বাস্তবায়ন করতে হবে। সরকার যদি সত্যিই শ্রমিকবান্ধব হয়, তাহলে কোনো কার্ড দেওয়ার প্রয়োজন নেই। ন্যায্য মজুরি নির্ধারণ এবং শ্রমিকের অধিকার নিশ্চিত করলেই শ্রমিকদের ভাগ্য পরিবর্তনের পথ তৈরি হবে।