• গুদামে আক্রমণ করে লুট থামছে না
  • অস্থিরতা তৈরীর পেছনে আওয়ামী লীগ আমলের ডিলার সিন্ডিকেট
  • আতঙ্ক ও মজুতদারিকেই দায়ী করছে মন্ত্রণালয়
  • নির্ধারিত দামের চেয়ে প্রতি বস্তায় ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা বেশি

কামাল উদ্দিন সুমন

সার নিয়ে দেশে তুঘলকি কাণ্ড চলছে। সারের প্রাপ্যতা ও দাম নিয়ে অভিযোগের শেষ নেই কৃষকের। দিন দিন এ সংকট নিয়ে কৃষকদের মাঝে বাড়ছে উদ্বেগ উত্তেজনা। অনেক স্থানে বিক্ষোভ মিছিল সড়ক অবরোধের ঘটনা ঘটেছে। এছাড়া সারের গুদামে আক্রমণ, লুট থামছে না। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে অনেক স্থানে ডিলারশিপ বাতিল এবং কৃষি কর্মকর্তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।

এদিকে সার পরিস্থিতি তদারকিতে কৃষি মন্ত্রণালয় ও প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয় থেকে আলাদা দুটি কমিটি করা হয়েছিল গত মাসে। ওইসব কমিটি সারাদেশের সার পরিস্থিতি তদারকি করছে। এ কমিটির একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, সার নিয়ে আওয়ামী লীগ আমলে ডিলারদের একটি সিন্ডিকেট সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে সারাদেশে আরও বেশি অস্থিরতা উসকে দিচ্ছে। এছাড়া কোনো সমস্যা নেই।

সরকার বলছে, দেশে পর্যাপ্ত সার আছে। ডিলাররাও বলছেন, তাদের কাছে মজুত আছে। কিন্তু, বিভিন্ন জেলার কৃষকের অভিযোগ, ডিলারদের কাছ থেকে তারা চাহিদা অনুযায়ী সার পাচ্ছেন না, কিংবা একজন কৃষককে সর্বোচ্চ এক বস্তা সার দিচ্ছেন। ফলে, বাধ্য হয়ে তাদের বেশি দামে অননুমোদিত বিক্রেতাদের কাছ থেকে সার কিনতে হচ্ছে।

কৃষিমন্ত্রী মোহাম্মদ আমিন উর রশিদ সম্প্রতি বলেছেন, দেশে সারের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে। একটি সিন্ডিকেট সারা দেশে অরাজকতা তৈরি করছে। তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা হচ্ছে।’ এর পর থেকে অবশ্য সারা দেশে মনিটরিং জোরদার হয়েছে কিন্তু পরিস্থিতির খুব বেশি পরিবর্তন হয় নি। কৃষি মন্ত্রণালয় সূত্র বলছে, এ পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগ আমলে ডিলারদের একটি সিন্ডিকেট সরকারকে বেকায়দায় ফেলতে সারা দেশে আরও বেশি অস্থিরতা উসকে দিচ্ছে।

কৃষকেরা বলছেন, তারা আতঙ্কে অতিরিক্ত কিনছেন না, মজুত করছেন না। কিন্তু কর্মকর্তারা সার সংকটের জন্য কৃষকদের এই অহেতুক আতঙ্ক ও মজুতদারিকেই দায়ী করছেন। পাশাপাশি তারা বলছেন, কৃষকরা প্রয়োজনের চেয়ে বেশি সার ব্যবহার করছেন।

কৃষি মন্ত্রণালয় বলছে, সারের কোনো সংকট নেই; বরং চাহিদার তুলনায় অতিরিক্ত মজুত রয়েছে। ডিলারদের চাহিদা অনুযায়ী নিয়মিত বরাদ্দ দেওয়া হলেও তারা প্রয়োজনীয় সার উত্তোলন না করে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছেন।

কোথাও কোথাও জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তারাও গুদাম দেখিয়ে বলছেন, মাসিক চাহিদার কয়েকগুণ সার মজুত রয়েছে। কিন্তু মাঠের চিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন। আমনের ভরা মৌসুমে প্রয়োজনীয় সার পেতে কৃষককে দোকানে দোকানে ঘুরতে হচ্ছে। সরকার নির্ধারিত দামে না পেয়ে অনেককে বাড়তি টাকায় কিনতে হচ্ছে। কোথাও সার মিলছে না, কোথাও মিললেও নির্ধারিত দামের চেয়ে অনেক বেশি দামে।

তবে কৃষকদের অভিযোগ, সরকার নির্ধারিত পরিবেশকদের একটি অংশ ভর্তুকির সার কালোবাজারে বিক্রি করছে। পরে সেই সারই খোলাবাজারে বেশি দামে বিক্রি হচ্ছে। পরিস্থিতি নিয়ে ক্ষোভ জমতে জমতে তা এখন গড়িয়েছে বিক্ষোভ, সড়ক অবরোধ এমনকি গুদাম ভেঙে সার নিয়ে যাওয়ার মতো ঘটনায়।

সোমবার কুড়িগ্রামে ডিলারের গুদাম ভেঙে সার নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি রাজশাহীর বিভিন্ন এলাকায় সারের দাবিতে সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ হয়েছে। প্রশ্ন উঠেছে, সরকারি গুদামে সার থাকার পরও তা কৃষকের হাতে পৌঁছাচ্ছে না কেন। বরাদ্দ থেকে কৃষকের হাতে পৌঁছানোর মাঝের পথেই কৃত্রিম সংকট তৈরি হচ্ছে কি না, সেই প্রশ্নও উঠেছে।

এর সঙ্গে এবার যুক্ত হয়েছে আরও বড় উদ্বেগ। কৃষি মন্ত্রণালয়ের নথিতেই উঠে এসেছে ডিএপি (ডাই-অ্যামোনিয়া ফসফেট) সারের মজুত নিয়ে ঘাটতির আশঙ্কা। চলতি সেপ্টেম্বরের চাহিদা মেটানোর পর অক্টোবরে প্রয়োজনীয় পরিমাণ ডিএপি সরকারের হাতে থাকবে না। আগামী মাসে চাহিদা প্রায় দেড় লাখ টন হলেও হাতে থাকবে মাত্র প্রায় ৪১ হাজার টন। বিদেশ থেকে আমদানির কিছু সার পথে থাকলেও সময়মতো সরবরাহ ব্যবস্থায় যুক্ত না হলে পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হতে পারে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের কাছে গত রোববার পর্যন্ত বিএডিসি যে মজুত চিত্র দিয়েছে, তাতে প্রতিষ্ঠানটির কাছে বিভিন্ন ধরনের প্রায় ৩ লাখ ৩২ হাজার মেট্রিক টন সার রয়েছে। চলতি মাসের বরাদ্দে প্রায় ১ লাখ টন ব্যবহারের পরও মজুত থাকবে প্রায় ২ লাখ ৩২ হাজার টন। এ হিসাবে সামগ্রিকভাবে আগামী মাসে বড় ঘাটতির কথা নয়। কিন্তু সব ধরনের সার একসঙ্গে হিসাব করলে সমস্যার আসল চিত্র পাওয়া যায় না। বিশেষ করে ডিএপির পরিস্থিতি ভিন্ন। মন্ত্রণালয়ের সরকারি ক্রয়-সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির জন্য তৈরি সারসংক্ষেপে বলা হয়েছে, ৩ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত বিএডিসির কাছে ডিএপি ছিল মাত্র ১ লাখ ৪১ হাজার মেট্রিক টন। এ মজুত দিয়ে শুধু চলতি মাসের চাহিদাই পূরণ করা সম্ভব। আগামী মাসের বাড়তি চাহিদা পূরণের মতো পর্যাপ্ত মজুত নেই।

এদিকে মাঠে যে সংকটের অভিযোগ উঠছে, তার সঙ্গে ডিএপি ছাড়াও ইউরিয়া, টিএসপি (ট্রিপল সুপার ফসফেট) ও এমওপির (মিউরেট অব পটাশ) বিতরণ ব্যবস্থায় অনিয়মের অভিযোগ রয়েছে।

সোমবার কুড়িগ্রামের রৌমারী উপজেলার বন্দবেড় ইউনিয়নে সার বিতরণে দেরি হওয়ায় ডিলারের গুদামের দরজা ভেঙে সার নিয়ে যান বিক্ষুব্ধ কৃষকরা। বন্দবেড় বাজারের মেসার্স মিতা হাসান এন্টারপ্রাইজের গুদামে ঘটে এ ঘটনা। প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপক সাইফুল ইসলাম দাবি করেছেন, কৃষকরা অন্তত ১৫০ বস্তা সার নিয়ে গেছেন। একই দিনে ভূরুঙ্গামারীতে চাহিদামতো সার না পাওয়ার অভিযোগে সড়ক অবরোধ করেন কৃষকরা। এক পর্যায়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাকেও কিছুক্ষণ অবরুদ্ধ করে রাখা হয়। অথচ এর মাত্র ১৫ দিন আগেই একই উপজেলায় সরবরাহ না পেয়ে গুদাম ভেঙে সার নিয়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটেছিল। রাজশাহীর পুঠিয়ায় কৃষকরা ঢাকা-রাজশাহী মহাসড়ক প্রায় দেড় ঘণ্টা অবরোধ করেন।

তাদের অভিযোগ, আমন ধানের জন্য জমিতে সার প্রয়োগের উপযুক্ত সময় চলছে, কিন্তু প্রয়োজন অনুযায়ী সার পাওয়া যাচ্ছে না। বিক্রেতারা কৃত্রিম সংকট তৈরি করে বেশি দামে সার বিক্রি করছেন বলেও অভিযোগ করেন তারা। লালমনিরহাটেও সারের দাবিতে সড়ক অবরোধ ও বিক্ষোভ হয়েছে। জয়পুরহাটে অনিয়মের অভিযোগে দুই ডিলারকে জরিমানা করা হয়েছে। মাগুরায় সার উদ্ধারের ঘটনায় দুজনকে গ্রেফতার করেছে পুলিশ।

মঙ্গলবার বিভাগীয় কমিশনার ইউসুফ আলী রাজশাহী মহানগরীর নওদাপাড়ায় বিএডিসির গুদাম পরিদর্শন করে বলেছেন, সেখানে পর্যাপ্ত সার রয়েছে। বিসিআইসির বাফার গুদামে ৯ হাজার ৮০৪ টন ইউরিয়া, ৪৩০ টন টিএসপি ও ৮৫ দশমিক ৫ টন ডিএপি রয়েছে। বিএডিসির গুদামে রয়েছে ৬ হাজার ৩১২ টন টিএসপি, ৮০১ টন এমওপি ও ৪ হাজার ৩৪৮ টন ডিএপি।

চলতি মাসে রাজশাহীতে টিএসপির বরাদ্দ ১ হাজার ৪৫ টন হলেও গুদামে রয়েছে প্রায় ৬ হাজার ৩০০ টন। ইউরিয়ার বরাদ্দ ৫ হাজার ৭০০ টনের বিপরীতে একটি গুদামেই রয়েছে প্রায় ১০ হাজার টন। ফলে প্রশ্ন আরও জোরালো হচ্ছেÑ গুদামে যদি এত সার থাকে, কৃষকের কাছে তা পৌঁছাচ্ছে না কেন।

ভুক্তভুগী কৃষকেরা যা বলছেন

কুড়িগ্রামের ভূরুঙ্গামারীর কৃষক আফজাল হোসেন ১৫ বিঘা জমিতে আমন ধান চাষ করেছেন। আরও তিন বিঘা জমিতে আগাম শীতকালীন বেগুন চাষের প্রস্তুতিও নিচ্ছেন তিনি। এ জন্য তার তিন বস্তা ইউরিয়া ও দুই বস্তা ডিএপি প্রয়োজন। তিনি বলেন, ‘ডিলারের কাছ থেকে মাত্র এক বস্তা ইউরিয়া পেয়েছি। বাকি সার আমাকে কিনতে হলো অননুমোদিত ডিলারের কাছ থেকে।’

‘সরকার নির্ধারিত দামের চেয়ে প্রতি বস্তায় ৫০০ থেকে ৭০০ টাকা বেশি দিতে হয়েছে। বেশি টাকা দিলে আর সারের সংকট থাকে না। তখন ঠিকই পাওয়া যায়। কিন্তু, অনুমোদিত ডিলারের কাছে গেলেই বলে সার নেই।’

লালমনিরহাটের কালীগঞ্জের ৫৫ বছর বয়সি কৃষক শামসুল আলম জানান, আগাম শীতকালীন সবজি চাষের প্রস্তুতির পাশাপাশি আমন ধান চাষের জন্য সারের চাহিদা বেড়েছে।

তিনি বলেন, ‘স্থানীয় সারের ডিলার আমাদের কাছে সার বিক্রি করছিলেন না। তিনি গোপনে আরেক জায়গায় সব সার সরিয়ে ফেলেছিলেন এবং বেশি দামে কালোবাজারে বিক্রি করছিলেন। এ কারণেই আমরা ওই ডিলারকে আটকে রেখেছিলাম।পরে ইউএনও ও পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে এবং ডিলারকে জরিমানা করে। তবে শামসুল আলম জানান, এখনো চাহিদার তুলনায় সারের সরবরাহ কম।

ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গীর চা চাষি সামির উদ্দিন জানান, রোববার তিনি খোলাবাজার থেকে ৫০ কেজির প্রতি বস্তা ইউরিয়া ১ হাজার ৫৮০ টাকায় কিনেছেন, যেখানে নির্ধারিত দাম ১ হাজার ৩৫০ টাকা। আর ডিএপি কিনেছেন ১ হাজার ৪৫০ টাকায়, যার নির্ধারিত দাম ১ হাজার ১০০ টাকা।

রৌমারীর ডিলার সাইফুল ইসলাম জানান, চলতি মাসে তাকে ১ হাজার বস্তা ইউরিয়া বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে, যা পাঁচ ধাপে বিতরণ করার কথা। প্রত্যেক কৃষককে সর্বোচ্চ এক বস্তা করে দেওয়ার নির্দেশনা দেওয়ার কথাও জানান তিনি। তিনি বলেন,আমাদের কাছে বিক্রির জন্য যে পরিমাণ সার আছে, তারচেয়ে পাঁচ থেকে ছয় গুণ বেশি কৃষক লাইনে দাঁড়াচ্ছেন।’

বানেশ্বরের ডিলার এবং রাজশাহী জেলা সার ও কীটনাশক কমিটির সভাপতি ওসমান আলী তার এলাকায় কোনো সংকটের কথা অস্বীকার করে জানান, তার কাছে ১ হাজার ৪০ বস্তা (৫১ টন) ইউরিয়া, ১ দশমিক ৫ টন ডিএপি, প্রায় ১ টন এমওপি এবং ১ দশমিক ৬৫ টন টিএসপি মজুত রয়েছে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জুলাই-সেপ্টেম্বর সময়ে সারের চাহিদা ১৩ দশমিক ২১ লাখ টন। আর গতকাল সরকারের মজুত ছিল ১২ দশমিক ৪৫ লাখ টন। এর বাইরে ডিলারদের কাছে থাকা মজুত এবং এরইমধ্যে বিতরণ করা সারও রয়েছে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের হিসাবে, সারা দেশে প্রায় ১০ হাজার ডিলার সার বিতরণের সঙ্গে যুক্ত। প্রতি মাসে মন্ত্রণালয় জেলাভিত্তিক বরাদ্দ দেয়। জেলা প্রশাসকের নেতৃত্বাধীন সার বরাদ্দ ও বীজ বিতরণ মনিটরিং কমিটি ডিলারভিত্তিক বরাদ্দ নির্ধারণ করে। ডিলার নির্ধারিত গুদাম থেকে সার উত্তোলনের পর তা কৃষকের কাছে পৌঁছানোর কথা।

মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, অনেক ডিলার চাহিদা অনুযায়ী বরাদ্দ পেলেও যথাসময়ে সার উত্তোলন করছেন না। কেউ কেউ সার মজুত রেখে কৃত্রিম সংকট তৈরি করছেন। ভর্তুকির সার কালোবাজারে বিক্রির অভিযোগও রয়েছে। মন্ত্রণালয়ের অভ্যন্তরীণ তদন্তে মাঠ পর্যায়ের গাফিলতির বিষয়টিও উঠে এসেছে।

কৃষি মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন,মন্ত্রণালয় পর্যায় থেকে আমদানি ও বরাদ্দ সঠিক পরিমাণে ও সঠিক সময়ে করা হলেও কিছু ক্ষেত্রে কৃষি কর্মকর্তাদের উদাসীনতা এবং ডিলারদের সঙ্গে যোগসাজশ সংকট তৈরি করছে। ইতিমধ্যে জেলা পর্যায়ের তিন উপপরিচালককে বদলি করা হয়েছে। আরও এক উপজেলা কৃষি কর্মকর্তাকে বরখাস্তের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। যেখানে গাফিলতি, অবহেলা বা যোগসাজশ পাওয়া যাচ্ছে, সেখানে কারণ দর্শানো, ব্যাখ্যা তলব, প্রত্যাহার এবং ক্ষেত্রবিশেষে বরখাস্ত করা হচ্ছে।

বেসরকারি আমদানিতে দেরি

সরকারিভাবে প্রতি বছর সাড়ে ৯ লাখ টন নন-ইউরিয়া সার আমদানি করা হয়। এবারও সমপরিমাণ সার আমদানির দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। গত আগস্টে দেওয়া দরপত্রে চূড়ান্ত অনুমোদন না পাওয়া বেসরকারি খাতের আমদানিকারকরা ডিএপি, এমওপি এবং টিএসপি আমদানির এলসি খোলা শুরু করতে পারেনি। সরকার এ বছর ৫ লাখ টন ডিএপি, ২ লাখ টন টিএসপি এবং আড়াই লাখ টন এমওপি সার আমদানি করবে।

জানা গেছে, আগামী অক্টোবর থেকে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত পিক সিজনে শুধু ডিএপি সারের চাহিদা রয়েছে ১০ লাখ মেট্রিক টনের বেশি। এ আমদানি দেরি হওয়ায় সারের এ সংকট পিক সিজনেও পড়ার শঙ্কা রয়েছে।

তবে সারের এ সংকটের মধ্যে বেসরকারি আমদানি প্রক্রিয়া শুরু করতে অনেক দেরি হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এর আগে প্রতি বছর এপ্রিল থেকে মে মাসের মধ্যে এই আমদানির দরপত্র আহ্বান এবং জুনের মধ্যে কার্যাদেশ দেওয়ার রীতি ছিল। কারণ বেসরকারি আমদানির মাধ্যমে যে সার দেশে আসে তা সরবরাহ চেইনে যুক্ত হতে ৮০ থেকে ৯০ দিন সময় লেগে যায়।

এ রীতি পাল্টানো শুরুর দায়িত্বে ছিল অন্তবর্তী সরকারের সময় দায়িত্ব পাওয়া সাবেক কৃষি সচিব এমদাদ উল্লাহ মিয়ান ও তার সিন্ডিকেট। আওয়ামী লীগ আমলের এ সিন্ডিকেটটি শেখ হাসিনার পতনের ক্ষোভে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় থেকে দেশে সারের ব্যবস্থাপনায় এক ধরনের সংকট তৈরির পাঁয়তারা করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।

মিয়ান সিন্ডিকেট তার সময়ে পাওয়া দুটি মৌসুমে এ টেন্ডার প্রক্রিয়া পেছাতে পেছাতে আগস্ট-সেপ্টেম্বরে নিয়ে গেছে। যারা প্রভাবে সার আসতে দেরি হয়েছে এবং সারা দেশে বেশি দাম দিয়ে কৃষককে সার কিনতে হয়েছে। এখনো এর ধারাবাহিকতাতেই নতুন নেতৃত্ব দেরি করে দরপত্র দিয়েছে এবং এখনো কার্যাদেশ দিতে পারেনি। অথচ মার্চ এপ্রিলে দরপত্র ডেকে দ্রুত কার্যাদেশ দিলে এখন সরকারের হাতে ডিএপি, টিএসপি সারের সংকট হওয়ার সুযোগ থাকতো না বলে মনে করেন মন্ত্রণালয়ের অনেক কর্মকর্তা।

বিএনপি সরকার আসার পর এই এমদাদ উল্লাহ মিয়ানকে বাধ্যতামূলক অবসরে পাঠানো হলেও তার সিন্ডিকেটের লোকবল এখনো মন্ত্রণালয়ে প্রভাব বিস্তার করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এর মধ্যে আমন মৌসুমের শুরু থেকে সার নিয়ে সারা দেশে অরাজকতা তৈরি হওয়ার পরও সরকার সার ব্যবস্থাপনা বিভাগের অতিরিক্ত সচিব আহমেদ ইমাম ফয়সালকে সরিয়ে জনপ্রশাসনে সংযুক্ত করে। তার সঙ্গে সেই বিভাগের যুগ্মসচিবকেও সরিয়ে দেওয়া হয়।

যা বলছে মন্ত্রণালয়

কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য বলছে, আগামী পাঁচ মাসে ইউরিয়ার চাহিদা ১৭ লাখ ২২ হাজার টন। এছাড়া ডিএপির চাহিদা ১১ লাখ ২৩ হাজার, এমওপির ৬ লাখ ৬৯ হাজার এবং টিএসপির ৫ লাখ ১৫ হাজার টন। সেখানে সরকারি মজুত ও সরকারি বেসরকারি আমদানি মিলিয়ে সরবরাহ হবে ইউরিয়ার ২০ লাখ ৭ হাজার টন, ডিএপি ১৩ লাখ ৪৮ হাজার, এমওপি ১০ লাখ ৮২ হাজার এবং টিএসপি ৯ লাখ ৩২ হাজার টন।

সরকারের কাছে গত ৬ সেপ্টেম্বর পর্যন্ত মজুত রয়েছে মোট ১২ লাখ ২২ হাজার টন। এর মধ্যে ইউরিয়া ৪ লাখ ২৭ হাজার টন, ডিএপি ৩ লাখ ৩২ হাজার, এমওপি ১ লাখ ১৭ হাজার এবং টিএসপি ৩ লাখ ৫২ হাজার টন।

এছাড়া বর্তমানে আমদানি করা সার পরিবহনাধীন (বিদেশ থেকে আসছে) ৪ লাখ ৫৯ হাজার টন। আগামী বছরের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সরকারি পর্যায়ে আমদানি (জিটুজি) ও বেসরকারি আমদানির আনুমতি দেওয়া রয়েছে ৩৬ লাখ ৮৩ হাজার টন সারের।

কৃষি সচিব মো. সেলিম খান সাংবাদিকরে বলেন,প্রকৃতপক্ষে সারের মজুত ও আমদানি নিয়ে কোনো সমস্যা নেই। সার নিয়ে যা হচ্ছে সেটা করছে পুরোনো ডিলাররা। যে পরিমাণ সার আমাদের রয়েছে ও বরাদ্দ দিয়েছি তাতে ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত সমস্যা হবে না। সবাই সার পাবে।