সরদার আবদুর রহমান, রাজশাহী ব্যুরো:

দেশের উত্তরাঞ্চলের খাদ্যভাণ্ডার বলে পরিচিত বরেন্দ্র অঞ্চলে ঠিক মওসুম ধরে আর বৃষ্টি হয় না। বৃষ্টির এই ‘অসম’ বর্ষণ এলোমেলো করে দিচ্ছে প্রচলিত কৃষিপঞ্জি। ফলে কৃষকের পক্ষে পরিস্থিতি মোকাবেলা করে ফসল আবাদ করা রীতিমত চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়াচ্ছে।

বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বরেন্দ্রভূমিতে অসময়ের বৃষ্টিপাত এবং চরম অনাবৃষ্টির মতো বৈরী আবহাওয়া প্রকট হয়ে উঠেছে। একে জলবায়ু পরিবর্তনের মারাত্মক প্রভাব হিসেবে বর্ণনা করা হচ্ছে। বর্ষা মওসুমে পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হওয়ায় কৃষকদের আমন চাষে গভীর নলকূপের সেচের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে, যা উৎপাদন খরচ বহুগুণ বাড়িয়ে দিচ্ছে। অন্যদিকে, শীতের শুরুতে বা ফসলের পরিপক্বতার সময়ে হঠাৎ অসময়ের ভারী বৃষ্টিতে পাকা ধান ও অন্যান্য রবি শস্যের ব্যাপক ক্ষতি হচ্ছে।

বৃষ্টি কমে যাচ্ছে প্রতিবছর

গবেষকদের মতে, দেশের অন্যান্য এলাকার চেয়ে বরেন্দ্র অঞ্চলের বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাত প্রায় ৪০ শতাংশ কম। এই ধারা অব্যাহত থাকলে আর দু-আড়াই দশক পর এই অঞ্চলে বৃষ্টিপাতের পরিমাণ স্বাভাবিকের চেয়ে সর্বোচ্চ ২৩ শতাংশ পর্যন্ত কমে যেতে পারে বলে আশঙ্কা রয়েছে। এর ফলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর আরো নিচে নেমে যাবে- যাতে মরুকরণের ঝুঁকিও বাড়াবে।

কৃষিপঞ্জিতে এখন (আষাঢ়-শ্রাবণ) বর্ষার ভরা মওসুম হওয়ার কথা। কিন্তু এই সময়েও পর্যাপ্ত বৃষ্টি নেই। দেশের অনেক অঞ্চলে টানা বৃষ্টিতে বন্যার মতো পরিস্থিতি তৈরি হলেও বরেন্দ্রভূমির চিত্র উল্টো। বর্ষার মাঝামাঝি সময় পার হয়ে গেলেও এই অঞ্চলে কাক্সিক্ষত বৃষ্টির দেখা মিলছে না। প্রায় প্রতিদিন আকাশে মেঘ জমলেও পর্যাপ্ত বৃষ্টি না হওয়ায় শুকিয়ে থাকছে মাটি। পুকুর-খাল ও জলাশয়গুলো ভরছে।

প্রাপ্ত তথ্যে দেখা যায়, গত জুন মাসে রাজশাহী বিভাগে গড় বৃষ্টিপাত ছিল স্বাভাবিক পরিমাণের তুলনায় ৩৭ দশমিক ৩ মিলিমিটার কম। জুনে সারাদেশে গড় বৃষ্টিপাত হয় স্বাভাবিকের চেয়ে প্রায় ৩০ শতাংশ কম। আবহাওয়া অফিসের দেয়া হিসাব বিশ্লেষণ করলে এই অঞ্চলের বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ার এক ভয়াবহ চিত্র ফুটে ওঠে। তথ্যে দেখা যায়, ১৯৭৮ থেকে ১৯৯০ সালের মধ্যে রাজশাহীতে গড় বর্ষাকালীন বৃষ্টিপাত ছিল ১ হাজার ৪০৬ মিলিমিটার। অথচ ২০১১ থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে তা আশঙ্কাজনকভাবে কমে দাঁড়িয়েছে মাত্র ৯২৫ মিলিমিটারে। অর্থাৎ, প্রায় প্রতিবছর গড়ে ১২ মিলিমিটার করে বৃষ্টিপাত কমছে এই অঞ্চলে। রাজশাহী আবহাওয়া অফিসের তথ্য বলছে, গত বছর জুলাইয়ে বৃষ্টি হয়েছিল ৬৮১ মিলিমিটার। আর এ বছর ১৩ জুলাই পর্যন্ত বৃষ্টিপাতের পরিমাণ মাত্র ১২৮ দশমিক ৩ মিলিমিটার। আর গত বছর জুলাইয়ের ১৩ পর্যন্ত বৃষ্টি হয়েছিল ১৮০ দশমিক ৪ মিলিমিটার।

একজন গবেষক জানান, রাজশাহী অঞ্চলে গড় বৃষ্টিপাত মাত্র ১ হাজার ২৩৫ মিলিমিটার, অথচ সারাদেশে গড় বৃষ্টিপাত ২ হাজার মিলিমিটার। বরেন্দ্র বহুমুখি উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের হিসেবেও উত্তরাঞ্চলে বৃষ্টিপাত কমেছে। রাজশাহী বিভাগে যার পরিমাণ প্রতি দশকে গড়ে ৫৪ মিলিমিটার। কমেছে ভূগর্ভস্থ পানির স্তরও। এই সঙ্গে বিপজ্জনক খবর হলো, গত ৫০ বছরে উত্তরাঞ্চলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমেছে প্রায় ৮০ মিটার। পাশাপাশি বৃষ্টিপাত কমে যাওয়ায় নতুন করে পূরণ (রিচার্জ) হতে পারছে না ভূগর্ভস্থ পানির স্তর। ২০২২ সালের একটি গবেষণায় দেখা যায়, অতিরিক্ত পানি উত্তোলনের কারণেই ৫০ বছরে কমেছে পানির স্তর।

ব্যাহত হচ্ছে আবাদ

দীর্ঘদিন ধরে চলা অনিয়মিত বৃষ্টিপাত, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমাগত নিচে নেমে যাওয়া এবং তাপমাত্রা বৃদ্ধির কারণে বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষি ও জীবিকা নতুন বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছে। আমন ধানের চারা রোপণ ব্যাহত হচ্ছে, সেচ নিভর্রতা বাড়ায় উৎপাদন ব্যয়ও বাড়ছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব এখন আর ভবিষ্যতের আশঙ্কা নয়, বরং বরেন্দ্রের কৃষিতে তা দৃশ্যমান বাস্তবতা হয়ে উঠেছে। তাই শুধু সেচের ওপর নির্ভরতা বাড়িয়ে নয়, কৃষি ও পানি ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘমেয়াদি পরিবর্তন, পানি-সাশ্রয়ী প্রযুক্তির বিস্তার, বৃষ্টির পানি সংরক্ষণ এবং খরাসহিষ্ণু ও উচ্চমূল্যের ফসল চাষে নীতিগত গুরুত্ব বাড়ানো ছাড়া এ সংকট মোকাবিলা কঠিন হবে।

কৃষি বিভাগের একজন কর্মকর্তা বলেন, বরেন্দ্র অঞ্চলের কৃষি ফসল উৎপাদনে ব্যাপক পরিবর্তন করতে হচ্ছে। কারণ কৃষকের কাছে ধান চাষ এখন অলাভজনক। বেশির ভাগ কৃষকই নিরূপায় হয়ে ধান চাষ করেন। যাদের সামর্থ্য আছে, তারা লাভজনক ও উচ্চমূল্যের ফসল চাষ করছেন। বেশির ভাগই আবহাওয়ার সঙ্গে খাপ খাইয়ে ফসল চাষের দিকে ঝুঁকছেন। কৃষকদের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী সপ্তাহ খানেক সেচ না পেলেই ফেটে যায় মাটি। এমন অবস্থায় ফসল ফলানো হয়ে পড়েছে কঠিন। জীবনযাপন হচ্ছে বাধাগ্রস্ত। আবহাওয়া অধিদপ্তরের মতে গত বছরের বর্ষাকালে সর্বোচ্চ তাপমাত্রা বেড়েছে রাজশাহীতে। কম বৃষ্টিপাতই বাড়িয়েছে তাপমাত্রা। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে ফসলের পরাগায়ন। সাথে বাড়ছে কীটপতঙ্গের পরিমাণ। এতে একদিকে যেমন কমছে ফসলের উৎপাদন অন্যদিকে ফসলে কীটনাশক প্রয়োগের ফলে বাড়ছে ক্ষতির সম্ভাবনাও।

এবিষয়ে নদী ও পরিবেশ গবেষক মাহবুব সিদ্দিকী বলেন, ৩০/৪০ বছর আগেও এই অঞ্চলে পাঁচদিন/সাতদিন ধরে টানা বৃষ্টি হতো। যাকে কোথাও বাদলা লাগা কোথাও গাজল লাগা বলা হতো। এর ফলে সারা বছরের পানির চাহিদা অনেকাংশেই পূরণ হতো। এখন সেই পরিস্থিতি নেই। ভারতের বিহার এবং পশ্চিমবঙ্গের বাংলাদেশসংলগ্ন এলাকার জেলাগুলোতে বিরাজমান শুষ্ক আবহাওয়ার প্রভাব বরেন্দ্র অঞ্চলে পড়ছে। এই পরিস্থিতিতে সেচের পানি বা বৃষ্টির পানি কম লাগে- এমন ফসল আবাদের দিকে নজর দিতে হবে। বিশেষ করে ডাল জাতীয় ফসল, গম, যব, তুলা প্রভৃতি উৎপাদন করে পুষিয়ে নেয়ার চেষ্টা করতে হবে বলে তিনি মনে করেন।