মুঃ শফিকুল ইসলাম, গোমস্তাপুর : চাঁপাইনবাবগঞ্জে চলতি বোরো মৌসুমে ধান কাটা-মাড়াই এখন পুরোদমে চলছে। তবে মৌসুমের শুরু থেকেই যখন-তখন বৃষ্টি হওয়ায় জেলার কৃষকরা চরম বেকায়দায় পড়েছেন। একদিকে অনিয়মিত বৃষ্টি, অন্যদিকে শ্রমিক সংকট, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি এবং বাজারে ধানের দাম কম থাকায় কৃষকদের মধ্যে বাড়ছে হতাশা ও উদ্বেগ। বিশেষ করে ব্যাংক ও এনজিও থেকে নেওয়া ঋণের কিস্তি পরিশোধ নিয়ে অনেক কৃষক এখন দুশ্চিন্তায় দিন কাটাচ্ছেন।

জেলার সদর, শিবগঞ্জ, গোমস্তাপুর, নাচোল ও ভোলাহাট উপজেলার বিস্তীর্ণ মাঠজুড়ে এখন ধান কাটার ব্যস্ততা। কোথাও কাস্তে দিয়ে ধান কাটা হচ্ছে, কোথাও আবার কম্বাইন হারভেস্টারের মাধ্যমে দ্রুত ফসল ঘরে তোলার চেষ্টা চলছে। কিন্তু কয়েকদিন পরপর বৃষ্টি হওয়ায় কাটা ধান শুকানো, মাড়াই ও সংরক্ষণে তৈরি হয়েছে চরম দুর্ভোগ। অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে ভেজা ধানই বাড়িতে তুলছেন।

জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি মৌসুমে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলায় প্রায় ৩৮ হাজার ৫০০ হেক্টর জমিতে বোরো ধানের আবাদ হয়েছে। উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে প্রায় ১ লাখ ৬০ হাজার মেট্রিক টন চাল। আবহাওয়া শুরুতে অনুকূলে থাকায় ফলনের সম্ভাবনাও ভালো ছিল। তবে মৌসুমজুড়ে থেমে থেমে বৃষ্টি কৃষকদের স্বস্তি কেড়ে নিয়েছে।

কৃষি বিভাগ বলছে, জেলার অধিকাংশ জমিতে উচ্চ ফলনশীল ও হাইব্রিড জাতের ধান চাষ হয়েছে। প্রতি বিঘায় গড়ে ১৮ থেকে ২২ মণ পর্যন্ত ফলনের আশা করছেন কৃষকরা। কিন্তু সময়মতো ধান কাটতে না পারলে এবং বৃষ্টিতে ধান ভিজে গেলে ফলনের পাশাপাশি ধানের গুণগত মানও কমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

শিবগঞ্জ উপজেলার কৃষক আব্দুল হান্নান বলেন, “ধান ভালো হয়েছে, কিন্তু আবহাওয়া আমাদের বড় চিন্তায় ফেলেছে। যখনই ধান কাটতে যাই তখনই বৃষ্টি আসে। ভেজা ধান শুকাতে অনেক কষ্ট হচ্ছে।”

গোমস্তাপুর উপজেলার কৃষক রহিম উদ্দিন বলেন, “শ্রমিক সংকট এবার ভয়াবহ। বেশি টাকা দিয়েও সময়মতো শ্রমিক পাওয়া যাচ্ছে না। আবার ধানের দামও কম। এতে খরচ উঠানোই কঠিন হয়ে গেছে।”

জেলার বিভিন্ন এলাকায় বর্তমানে কৃষি শ্রমিকের মজুরি অনেক বেড়ে গেছে। একজন শ্রমিককে প্রতিদিন ৯০০ থেকে ১২০০ টাকা পর্যন্ত দিতে হচ্ছে। কোথাও কোথাও খাবারসহ চুক্তিভিত্তিক ধান কাটার খরচ আরও বেশি। এতে উৎপাদন ব্যয় উল্লেখযোগ্য হারে বেড়েছে।

অন্যদিকে, বাজারে নতুন বোরো ধান উঠতে শুরু করলেও অন্য বছরের তুলনায় ধানের দাম কম থাকায় কৃষকরা হতাশ। বর্তমানে জেলার বিভিন্ন হাটে প্রতি মণ ধান ১১০০ থেকে ১৩০০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। কৃষকদের অভিযোগ, সার, সেচ, ডিজেল, কীটনাশক ও শ্রমিক খরচ বাড়লেও সেই তুলনায় ধানের বাজারমূল্য বাড়েনি।

নাচোল উপজেলার এক কৃষক বলেন, “ধান বিক্রি করে ঋণের কিস্তি দিতে হবে। কিন্তু যে দাম পাওয়া যাচ্ছে, তাতে সংসার চালানোই কঠিন হয়ে পড়বে। লাভ তো দূরের কথা।”

কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অনেক কৃষক ব্যাংক, সমবায় সমিতি ও এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে বোরো আবাদ করেছেন। এখন উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যাওয়া এবং বাজারে ধানের দাম কম থাকায় ঋণের টাকা পরিশোধ নিয়ে তারা চাপের মুখে পড়েছেন।

যদিও আধুনিক কৃষিযন্ত্র কিছুটা স্বস্তি দিচ্ছে, তবে সব কৃষকের পক্ষে সেই সুবিধা নেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। কম্বাইন হারভেস্টারের ভাড়া তুলনামূলক বেশি হওয়ায় ক্ষুদ্র ও প্রান্তিক কৃষকরা এখনও শ্রমিকনির্ভর। এছাড়া অতিরিক্ত কাদামাটির কারণে অনেক জমিতে যন্ত্র প্রবেশ করানোও কঠিন হয়ে পড়ছে।

চাঁপাইনবাবগঞ্জ কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, দ্রুত ধান কাটার জন্য কৃষকদের নিয়মিত পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি কৃষিযন্ত্র ব্যবহারে সরকারি ভর্তুকি সুবিধাও চালু রয়েছে। আবহাওয়া অনুকূলে থাকলে উৎপাদনের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব হবে বলেও আশা করছেন তারা।