যশোর সংবাদদাতা

গুদামে পর্যাপ্ত সার থাকার সরকারি দাবি, কিন্তু কৃষকের হাতে প্রয়োজনের সময় সার নেই। আমন ধানের ভরা মৌসুমে যশোরের মাঠে এমনই বিপরীত চিত্র দেখা দিয়েছে। ইউরিয়া, টিএসপি ও ডিএপি সার সংগ্রহ করতে কৃষকদের এক দোকান থেকে অন্য দোকানে ছুটতে হচ্ছে। কোথাও সীমিত পরিমাণে সার মিললেও অনেক ক্ষেত্রে নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বাড়তি টাকা দিয়েও প্রয়োজনীয় সার পাওয়া যাচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছেন কৃষকেরা। এতে একদিকে বাড়ছে উৎপাদন ব্যয়, অন্যদিকে সময়মতো সার প্রয়োগ করতে না পারায় আমনের ফলন নিয়েও শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

কৃষকদের অভিযোগ, চাহিদার তুলনায় কম সরবরাহের সুযোগ নিয়ে কোনো কোনো ডিলার ও খুচরা বিক্রেতা কৃত্রিম সংকট তৈরি করছেন। ফলে সরকারি গুদামে মজুত থাকার পরও মাঠপর্যায়ে সার নিয়ে হাহাকার তৈরি হয়েছে। কৃষকের প্রশ্নÑগুদামে যদি সার থাকে, তাহলে সেই সার যাচ্ছে কোথায়?

যশোরের বিভিন্ন এলাকার কৃষকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আমন আবাদে বর্তমানে ইউরিয়া, টিএসপি ও ডিএপি সারের চাহিদা বেড়েছে। কিন্তু অনেক কৃষক প্রয়োজন অনুযায়ী সার পাচ্ছেন না।

জাফর নামের এক কৃষক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, সাত দিন ধরে বিভিন্ন দোকানে ঘুরেও দুই বস্তার জায়গায় মাত্র এক বস্তা সার পেয়েছেন। আরেক কৃষক জানান, প্রয়োজনের সময় সার না পেয়ে অনুরোধ-উপরোধ করে বাড়তি দামে এক বস্তা টিএসপি সংগ্রহ করতে হয়েছে।

কৃষকদের অভিযোগ, কোনো কোনো দোকানে সার থাকলেও তা চাহিদা অনুযায়ী দেওয়া হচ্ছে না। আবার কোথাও সরকারি নির্ধারিত মূল্যের চেয়ে বেশি টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। এতে সার সংগ্রহের পাশাপাশি পরিবহন ও অতিরিক্ত দামের কারণে কৃষকের উৎপাদন খরচও বেড়ে যাচ্ছে।

কৃষি বিভাগের তথ্যেও সারের চাহিদা ও বরাদ্দের মধ্যে ঘাটতির বিষয়টি উঠে এসেছে। চলতি অর্থবছরে যশোরে ইউরিয়া সারের বার্ষিক চাহিদা ৮৭ হাজার ৩৫০ মেট্রিক টন। এর বিপরীতে বরাদ্দ প্রায় ২২ শতাংশ কম। টিএসপির চাহিদা ৩৬ হাজার ১৫০ মেট্রিক টনের বিপরীতে বরাদ্দ প্রায় ৪৯ শতাংশ কম। ডিএপির চাহিদা ৩৯ হাজার ৬৬০ মেট্রিক টন এবং এমওপির চাহিদা ৩০ হাজার ২৫০ মেট্রিক টন। এমওপির বরাদ্দও চাহিদার তুলনায় প্রায় ১৫ শতাংশ কম।

অন্যদিকে বাহাদুরপুর বাফার গুদামের উপমহাব্যবস্থাপক (বাণিজ্য) আক্তারুল ইসলাম দাবি করেন, গুদামে ইউরিয়া সারের বড় ধরনের মজুত রয়েছে এবং প্রতিদিন নিয়মিতভাবে সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর যশোরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক সুলতানা আফরোজ বলেন, মাঠপর্যায়ে সারের বিষয়ে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা নিরসনে কর্মকর্তারা নিয়মিত মনিটরিং করছেন। কৃষকদের উদ্বিগ্ন না হওয়ার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, জেলায় সারের পর্যাপ্ত মজুত রয়েছে।

যশোর জেলা ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শাহজালাল হোসেন বলেন, ডিলার ও কৃষক উভয়েই বর্তমানে বিভ্রান্তির মধ্যে রয়েছেন। একজন বিক্রেতার যেখানে ১৫০ থেকে ২০০ বস্তা সারের প্রয়োজন, সেখানে অনেক সময় মাত্র ৫০ বস্তা সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে। সার সমস্যার স্থায়ী সমাধানে সংশ্লিষ্ট সব পক্ষকে নিয়ে দ্রুত বৈঠক করা প্রয়োজন।

গুদামে পর্যাপ্ত মজুত থাকার পরও কৃষকের হাতে কেন প্রয়োজনীয় সার পৌঁছাচ্ছে নাÑএ প্রশ্ন এখন যশোরের কৃষকদের মুখে মুখে। তাদের দাবি, ডিলার পর্যায়ে কঠোর নজরদারি, নির্ধারিত মূল্যে বিক্রি নিশ্চিত এবং ইউনিয়নভিত্তিক সরবরাহের স্বচ্ছ হিসাব প্রকাশ করতে হবে।

আমন মৌসুমের গুরুত্বপূর্ণ সময়ে সারের সংকট দ্রুত নিরসন করা না গেলে এর সরাসরি প্রভাব পড়তে পারে ধানের উৎপাদন ও কৃষকের অর্থনীতিতে। তাই গুদামের মজুত নয়, কৃষকের মাঠে প্রয়োজনের সময় সার পৌঁছানোই এখন বড় চ্যালেঞ্জ।