মুরাদনগর (কুমিল্লা) সংবাদদাতা : কুমিল্লার মুরাদনগর উপজেলায় অবৈধ দখলের কারণে ক্রমেই হারিয়ে যাচ্ছে খাল-বিল ও নদী-নালা। বসতবাড়ি, দোকানঘর ও সড়ক নির্মাণের মাধ্যমে এসব গুরুত্বপূর্ণ জলপথ ভরাট হয়ে পড়ায় কৃষি ও পরিবেশ মারাত্মক হুমকির মুখে পড়েছে। এর ফলে বোরো মৌসুমে প্রায় ৫ হাজার হেক্টর, আউশে ৭ হাজার এবং রোপা আমনে প্রায় ১৬ হাজার হেক্টর কৃষিজমি অনাবাদি থেকে যাচ্ছে।

স্থানীয়দের মতে, একসময় এসব খাল ছিল প্রান্তিক মানুষের জীবন-জীবিকার গুরুত্বপূর্ণ অংশ। খালপথে নৌকা ও ট্রলারের মাধ্যমে পণ্য পরিবহন সহজ ও সাশ্রয়ী ছিল। পাশাপাশি উন্মুক্ত জলাশয়ে প্রচুর দেশীয় মাছ পাওয়া যেত। কিন্তু প্রভাবশালীদের দখলে এসব জলপথ বিলীন হওয়ায় সেই ঐতিহ্য হারিয়ে গেছে। সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন কৃষকরা। অনেক জমি বছরের অধিকাংশ সময় জলাবদ্ধতায় ডুবে থাকে, আবার কোথাও সেচ সুবিধার অভাবে চাষাবাদ সম্ভব হচ্ছে না।

উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা যায়, মুরাদনগরে মোট কৃষিজমির পরিমাণ ২৩ হাজার ৯১৫ হেক্টর। এর মধ্যে প্রতি মৌসুমেই ৫ থেকে ১৬ হাজার হেক্টর জমি জলাবদ্ধতার কারণে অনাবাদি থাকে।

বিশেষ করে জাহাপুর ইউনিয়নের বড়ইয়াকড়ি, রানিমুহুরী, বল্লভদী, কাচারিকান্দি, নয়াকান্দি, তিতারকান্দি ও রতননগর গ্রামের প্রায় ৬০০ কৃষকের ৩ হাজার বিঘা জমি প্রায় ৩০ বছর ধরে জলাবদ্ধতায় নিমজ্জিত। এছাড়া ছালিয়াকান্দি, দারোরা, ধামঘর, রামচন্দ্রপুর, শ্রীকাইল, আন্দিকুট, আকবপুর, পূর্বধৈইর, বাঙ্গরা, চাপিতলা, টনকী, যাত্রাপুর, নবীপুর পূর্ব-পশ্চিম ও মুরাদনগর সদর ইউনিয়নসহ বিভিন্ন এলাকায় খাল দখলের কারণে জলাবদ্ধতা প্রকট আকার ধারণ করেছে। এতে পরিবেশের ভারসাম্যও নষ্ট হচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, খাল দখল ও ভরাটের ফলে প্রাকৃতিক পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ভেঙে পড়েছে, যা জলাবদ্ধতা সমস্যাকে আরও তীব্র করে তুলছে।

এই পরিস্থিতি মোকাবিলায় পানি উন্নয়ন অধিদপ্তর মুরাদনগরে নদী ও খাল পুনঃখননের একটি বৃহৎ উদ্যোগ হাতে নিয়েছে।

সরেজমিন পরিদর্শনের ভিত্তিতে প্রায় ১০০ কিলোমিটারের বেশি নদী ও খাল পুনঃখননের পরিকল্পনা করা হয়েছে। এর মধ্যে বুড়ি নদীর ৩২ কিলোমিটার, আর্সি নদীর ৪০ কিলোমিটার এবং সংশ্লিষ্ট ২৪টি খাল পুনঃখনন করা হবে। পাশাপাশি অদের খাল, নিমাইজুরী, হিঞ্জুরী, আর্চি, দৌলতপুর, সিদ্ধেশ্বরী ও শৈলীখালী খাল এই প্রকল্পের আওতায় আনা হয়েছে।

এদিকে বিএডিসিও কিছু খাল পুঃনখননের তালিকা পাঠিয়েছেন বলে জানাগেছে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, খাল ও নদী পুনঃখনন করা হলে জলাবদ্ধতা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে আসবে এবং কৃষিজমিতে সেচব্যবস্থা স্বাভাবিক হবে। ফলে জমিতে দীর্ঘদিন পানি জমে থাকার সমস্যা দূর হবে এবং কৃষকরা সহজে চাষাবাদ করতে পারবেন।

একই সঙ্গে দেশীয় মাছের আবাসস্থল পুনরুদ্ধার হওয়ায় জীববৈচিত্র্যও ফিরে আসবে।

উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়নের সচেতন নাগরিকরা দীর্ঘদিনের দুর্ভোগের কথা তুলে ধরে দ্রুত খাল দখলমুক্ত ও পুনঃখননের দাবি জানিয়েছেন।

উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা পাভেল খাঁন পাপ্পু বলেন, “খালগুলো পুনঃখনন করা হলে কৃষিতে আমূল পরিবর্তন আসবে। সেচ ব্যবস্থার উন্নয়ন ঘটবে এবং ফসল উৎপাদন উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে।”

কুমিল্লা পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তা রাশেদ শাহরিয়ার বলেন, “পরিকল্পিতভাবে নদী ও খাল পুনঃখনন বাস্তবায়ন করা গেলে জলাবদ্ধতা নিরসনের পাশাপাশি কৃষি ও পরিবেশ—উভয় ক্ষেত্রেই ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে। ইতিমধ্যে বেশ কয়েকটি খাল পুঃনখননের অফিসিয়াল কার্যক্রম চূড়ান্ত পর্যায়ে আছে ।”