# জ্বালানি সংকটের আশঙ্কায় ক্রয়াদেশ স্থগিত করেছে অনেক বিদেশী ক্রেতা : বিসিআই সভাপতি

জ্বালানি সংকটের কারণে দেশের তৈরি পোশাক শিল্পে অশনি সংকেত দেখা দিয়েছে। একদিকে গ্যাস সংকট অন্যদিকে বিদ্যুতের ভয়াবহ লোডশেডিংয়ে এ শিল্পের নাজুক পরিস্থিতি। তার মধ্যে নতুন করে জ্বালানি সংকটের কারণে গার্মেন্টসে ব্যবহৃত নিজস্ব জেনারেটর সচল রাখতে না পারার কারণে উৎপাদন চরমভাবে ব্যাহত হচ্ছে। ব্যবসায়িরা বলছেন, চরম দুঃসময় দরজায় কড়া নাড়ছে। জ্বালানি সংকট প্রকট হওয়ায় গার্মেন্টসের ক্রয়াদেশ অন্যদেশে চলে যাচ্ছে।

বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার-উল আলম (পারভেজ) গতকাল বুধবার এক সেমিনারে আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেছেন, আগামী দুই থেকে তিন মাসের মধ্যে জ্বালানি শূন্য হবে বাংলাদেশ এমন আশঙ্কায় ক্রয়াদেশ স্থগিত করেছে অনেক বিদেশী ক্রেতা। বাংলাদেশ ছেড়ে এসব ক্রয়াদেশ ভারতসহ অন্য দেশে চলে যাচ্ছে। এতে দেশের অর্থনীতি ও বৈদেশিক মুদ্রার প্রধান উৎস তৈরি পোশাক খাত এক গভীর সংকটের মুখে পড়তে যাচ্ছে ।

জানা গেছে, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট আর প্রতিযোগিতামূলক বাজারে পিছিয়ে পড়ার খেসারত দিচ্ছে রপ্তানি খাত। দেশের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো টানা ৮ মাস রপ্তানি আয় নিম্নমূখী রয়েছে। মূলত তৈরি পোশাক শিল্প কাক্সিক্ষত রপ্তানি আয় অর্জন করতে না পারায় সার্বিকভাবে এ খাত পিছিয়ে পড়ছে। এমন পরিস্থিতির মধ্যেই বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে চলমান ইসরাইল-যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের যুদ্ধ। এই যুদ্ধের ফলে সৃষ্ট জ্বালানি-সংকট এরই মধ্যে পোশাক শিল্পে ‘মরার ওপর খাড়ার ঘা’ হয়ে বসেছে। জ্বালানির অভাবে এই শিল্প আরও গভীর সংকটে পড়তে পারে বলে মনে করছেন খাতসংশ্লিষ্টরা।

ব্যবসায়ীরা বলছেন, শিল্পমালিকরা কারখানা সচল রাখতে চাহিদামতো ডিজেল, ফার্নেস অয়েল, প্রাকৃতিক গ্যাস ও এলএনজি পাচ্ছেন না। অনেক পাম্পে তেল থাকলেও দিচ্ছে না। অনেক সময় তেল নিতে অতিরিক্ত টাকা দিতে হচ্ছে। এতে করে অনেক প্রতিষ্ঠানকে এরই মধ্যে বিপাকে পড়তে হয়েছে।

জানা গেছে, পোশাক শিল্পের অনেক কারখানায় গ্যাসের চাপ কমে যাওয়ায় পূর্ণ সক্ষমতার অর্ধেকও উৎপাদন করা যাচ্ছে না। বিকল্প হিসেবে ডিজেলচালিত জেনারেটর ব্যবহার করতে গিয়ে উৎপাদন খরচ দ্বিগুণ হয়ে যাচ্ছে। এ অবস্থায় শিল্পকারখানায় নিরবচ্ছিন্ন জ্বালানি, গ্যাস ও বিদ্যুৎ সরবরাহে সরকারের প্রয়োজনীয় উদ্যোগ গ্রহণের দাবি জানাচ্ছেন তারা।

বিসিআই সভাপতি আনোয়ার-উল আলম চৌধুরী বলেন, বিশ্ববাজারে অস্থিরতা এবং বিদ্যুৎ সংকটসহ অভ্যন্তরীণ কিছু সীমাবদ্ধতার কারণে জুলাই-আগস্টের সম্ভাব্য অনেক ক্রয়াদেশ থমকে গেছে। একইসঙ্গে ছোট উদ্যোক্তাদের জন্য বিদ্যমান কর কাঠামো বড় বোঝা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তিনি বলেন, বিদেশি ক্রেতাদের মধ্যে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ পরিস্থিতি ও স্থিতিশীলতা নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। এ কারণে অনেক ক্রেতা প্রতিষ্ঠান এখন ইন্ডিয়া বা অন্য দেশের দিকে ঝুঁকছে। আগামী জুলাই এবং আগস্ট মাসের জন্য যে পরিমাণ অর্ডার আসার কথা ছিল, তা অত্যন্ত ধীর হয়ে গেছে। অনেক বড় ক্রেতা ইতিমধ্যে নেতিবাচক বার্তা দেওয়া শুরু করেছে।

তিনি বলেন, ক্রেতাদের ঢাকা অফিসগুলো পরিস্থিতি সামাল দেওয়ার চেষ্টা করলেও তাদের টপ ম্যানেজমেন্ট বর্তমানে বাংলাদেশে নতুন অর্ডার দেওয়ার ক্ষেত্রে পিছু হটছে।

বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিকেএমইএ) সভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, ‘কয়েক মাস ধরেই আমাদের রপ্তানি আয়ে নেতিবাচক ধারা চলছে। অতীতে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক খাত এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়নি। ট্রাম্প প্রশাসনের শুল্ক আরোপের পর আন্তর্জাতিক বাজারে মূল্যস্ফীতি কমার সম্ভাবনা দেখা দিলেও মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধ সব হিসাব পাল্টে দিয়েছে। দেশে ডিজেলের তীব্র সংকট দেখা দিয়েছে, যা উৎপাদন ব্যাহত করছে।

তিনি বলেন, ‘আমাদের ক্রয়াদেশ পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না। এ অবস্থায় ব্যবসার ক্ষতি পুষিয়ে নিতে সরকারকে দ্রুত নীতিগত সহায়তা দিতে হবে এবং শিল্পে জ্বালানি সরবরাহে অগ্রাধিকার নিশ্চিত করতে হবে।’

জ্বালানি-সংকট দীর্ঘায়িত হলে পোশাক শিল্প আরও বেশি ঝুঁকিতে পড়ার শঙ্কা প্রকাশ করেছেন বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি মাহমুদ হাসান খান।

তিনি বলেন, ‘বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়লে শুধু উৎপাদন খরচই বাড়ে না; বরং পশ্চিমা ক্রেতাদের ক্রয়ক্ষমতাও কমে যায়। ফলে আমাদের ক্রয়াদেশ হ্রাসের একটি বড় ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। তবে জ্বালানি-সংকটে এখনো আমাদের সেভাবে সমস্যায় পড়তে হচ্ছে না। যদি এটি দীর্ঘায়িত হয়, তখন এর প্রভাবে পোশাক শিল্প অনেক বড় ঝুঁকির মধ্যে পড়তে পারে।’

তিনি বলেন, ‘আমরা ইতোমধ্যেই আমাদের সদস্যদের কারখানা পরিচালনার জন্য জেনারেটরের কী পরিমাণ ডিজেল প্রয়োজন তার একটি চাহিদাপত্র সংগ্রহ করছি। এই চাহিদাপত্র নিয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনা করব। যেন আমাদের উৎপাদন ও ট্রান্সপোর্ট সচল থাকে।’

সূত্র জানায়,সদ্য সমাপ্ত মার্চসহ চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরের ৯ মাসের মধ্যে ৮ মাসেই দেশের তৈরি পোশাক শিল্পে রপ্তানি আয় নি¤œমুখী রয়েছে। সদ্য সমাপ্ত মার্চ মাসে পোশাক শিল্প থেকে রপ্তানি আয় কমেছে ১৯ দশমিক ৩৫ শতাংশ। আলোচিত মাসে নিট পোশাক থেকে রপ্তানি আয় হয়েছে ১ দশমিক ৪২ বিলিয়ন ডলার; গত বছরের মার্চের চেয়ে যা ২১ দশমিক ২০ শতাংশ কম। আর ওভেন পোশাক থেকে রপ্তানি আয় ১৭ দশমিক ৩২ শতাংশ কমে ১ দশমিক ৩৬ বিলিয়ন ডলার হয়েছে।

রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) তথ্য অনুযায়ী, চলতি অর্থবছরের প্রথম ৯ মাসে (জুলাই-মার্চ) দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাক শিল্প থেকে মোট রপ্তানি আয় এসেছে ২৮ দশমিক ৫৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এই আয় গত বছরের একই সময়ের তুলনায় ৫ দশমিক ৫১ শতাংশ কম। গত বছরের জুলাই-মার্চ সময়ে তৈরি পোশাক শিল্প থেকে রপ্তানি আয় হয়েছিল ৩০ দশমিক ২৪ বিলিয়ন ডলার।

নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা বিসিক শিল্পনগরীরর একটি পোশাক কারখানার কর্মকতা মাসুম শেখ জানান, দিনে দশ ঘণ্টা কারখানা চালু থাকে। এর মধ্যে পাঁচ থেকে সাত ঘণ্টাই বিদ্যুৎ থাকছে না, লোডশেডিং এতটাই বেড়েছে রপ্তানির বাজার ধরে রাখার ক্ষেত্রে পণ্যের গুণমান নিশ্চিত করাটা যেমন জরুরি, তেমনি নির্ধারিত সময়ের মধ্যে পণ্যগুলো ক্রেতাদের কাছে পৌঁছে দেওয়াও গুরুত্বপূর্ণ। সেজন্যই বিদ্যুৎ না থাকলেও আমরা কাজ বন্ধ রাখতে পারি না। জেনারেটর দিয়ে হলেও কাজ চালিয়ে যেতে হয়। কিন্তু দীর্ঘ সময় ধরে জেনারেটর চালানোর জন্য যে পরিমাণ জ্বালানি তেলের প্রয়োজন, বাংলাদেশের বর্তমান বাস্তবতায় সেটি জোগাড় করা মোটেও সহজ কোনো ব্যাপার নয়।

গার্মেন্টস ব্যবসায়ী সাঈদ হাসান জানান, ডিজেলের জন্য ছুটতে হচ্ছে এক পাম্প থেকে অন্য পাম্পে, লাইনে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হচ্ছে ঘণ্টার পর ঘণ্টা। তারপরও জেনারেটর চালানোর জন্য অনেক সময় যথেষ্ঠ পরিমাণ ডিজেলও পাচ্ছি না। ফলে কাজ বন্ধ রাখতে হচ্ছে, উৎপাদনে ব্যাঘাত ঘটছে। বিদ্যুৎ ও জ্বালানি সংকটের কারণে এভাবে কাজ বন্ধ রাখায় বাংলাদেশের রপ্তানিমুখী তৈরি পোশাক কারখানার উৎপাদন সক্ষমতা উল্লেখযোগ্য হারে কমে গেছে বলে জানিয়েছেন অনেক ব্যবসায়ী।

ভুক্তভোগী গার্মেন্টস মালিকরা জানান, বিদ্যুত সংকটের কারণ সার্বিকভাবে পোশাক কারখানাগুলোর উৎপাদন সক্ষমতা গড়ে প্রায় ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ কমে গেছে বলে আমরা ধারণা করছি । যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের তৈরি পোশাকের একক বৃহত্তম রপ্তানি বাজার। কিন্তু ট্রাম্প প্রশাসন বাড়তি শুল্ক ঘোষণার পর গত টানা আট মাস ধরে পোশাকখাতে রপ্তানি কমার ধারা অব্যাহত রয়েছে।

সূত্র জানায়, গত কয়েক বছর ধরেই একের পর এক সংকটের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বাংলাদেশের বিদ্যুৎখাত। করোনা মহামারির পর ডলার সংকটের কারণে তেল, গ্যাস ও কয়লার মতো জ্বালানি আমদানি কমে যাওয়ায় সরকারি অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ হয়ে গেছে। অন্যদিকে, বকেয়া টাকা পরিশোধ করতে না পারায় বেসরকারি খাতের বিদ্যুৎ সরবরাহও কমে গেছে। এর মধ্যে ইরান যুদ্ধের প্রভাবে বিদ্যুৎ সংকট আরও তীব্র আকার ধারণ করেছে।

এদিকে বিদ্যুৎ ও জ্বালানির অভাবকে ঘিরে তৈরি পোশাকখাতে যে সংকট লক্ষ্য করা যাচ্ছে, সেটি সমাধানের জন্য সম্প্রতি এ খাতের শীর্ষ কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন ব্যবসায়ী নেতারা। কারখানাগুলো বাঁচাতে তারা অনুরোধ জানান এবং সরকার যেন বিশেষ ব্যবস্থায় বিদ্যুৎ ও জ্বালানির সরবরাহ নিশ্চিত করার বিষয়ে ব্যবস্থা গ্রহণ করেন।

জ্বালানি সংকটে গার্মেন্টস শিল্পে উৎপাদন ধস ঠেকাতে বিজিএমইএর নতুন উদ্যোগ :

বিদ্যুতের পাশাপাশি জ্বালানি সংকটে ভুগতে থাকা গার্মেন্টস শিল্পে উৎপাদন ধস ঠেকাতে বিকল্প ব্যবস্থা হিসেবে প্রতিটি কারখানার ছাদে সোলার প্যানেল স্থাপনের নির্দেশনা দিয়েছে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রফতানিকারক সমিতি (বিজিএমইএ)।

এ উদ্যোগের আওতায় ৫ শতাংশ সুদে ঋণ সুবিধার ব্যবস্থা করা হচ্ছে, পাশাপাশি সার্ভিস ফি-তে ৫০ শতাংশ মওকুফের ঘোষণা দেয়া হয়েছে। তবে সোলার প্যানেল আমদানি নীতিতে পরিবর্তন না আনলে এ উদ্যোগের সুফল মিলবে না বলে মনে করছেন গার্মেন্টস মালিকরা।

মধ্যপ্রাচ্যে যুদ্ধের প্রভাবে জ্বালানি সংকটে ভুগছে দেশের গার্মেন্টস কারখানাগুলো। প্রতিদিন ৩ থেকে ৪ ঘণ্টা লোডশেডিং এখন সাধারণ বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। এ সময়ে জেনারেটর চালু থাকলেও প্রয়োজনীয় ডিজেল না পাওয়ায় উৎপাদন স্বাভাবিক রাখা যাচ্ছে না। ফলে কারখানাগুলোতে উৎপাদন কমে গেছে অন্তত ৪০ শতাংশ।

এই পরিস্থিতিতে সদস্য কারখানাগুলোর ছাদে সোলার প্যানেল স্থাপনের জন্য বিশেষ নোটিশ দিয়েছে গার্মেন্টস মালিকদের সংগঠন বিজিএমইএ। এ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের সঙ্গে আলোচনাও সম্পন্ন হয়েছে বলে জানিয়েছেন সংগঠনের নেতারা।