যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা ইরানকে ফাঁকি দিয়ে পারস্য উপসাগর থেকে তেল রপ্তানি সচল রাখতে ইরানেরই ব্যবহৃত ছায়া জাহাজ ও ‘শিপ-টু-শিপ’ (এক জাহাজ থেকে অন্য জাহাজে) তেল স্থানান্তরের চোরাচালান কৌশল অবলম্বন করছে। চলমান ভূরাজনৈতিক উত্তেজনা এবং হরমুজ প্রণালীতে ইরানের কঠোর নজরদারি ও অবরোধের মুখে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে এই গোপন পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও সৌদি জোটের এই নতুন তেল রপ্তানি কৌশলের মূল দিকগুলো নিচে দেওয়া হলো:
১. শিপ-টু-শিপ (STS) গোপন তেল স্থানান্তর
কৌশল অনুকরণ: মার্কিন সামরিক বাহিনী ও তার মিত্ররা ইরানের সেই পুরোনো কৌশলই বেছে নিয়েছে, যা ইরান নিজে এতদিন মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এড়াতে ব্যবহার করত।
লোকেশন: সংযুক্ত আরব আমিরাতের (UAE) ফুজিরাহ উপকূল এবং ওমানের সোহার বন্দরের অদূরে সমুদ্রের বুকে এই গোপন কার্যক্রম চালানো হচ্ছে।
পদ্ধতি: ছোট ছোট ট্যাংকার ট্রান্সপন্ডার (অবস্থান ট্র্যাকিং সিস্টেম) বন্ধ করে এবং বাতি নিভিয়ে হরমুজ প্রণালী পার হয়। এরপর নির্ধারিত পয়েন্টে অপেক্ষমাণ বিশাল আকৃতির 'ভেরি লার্জ ক্রুড ক্যারিয়ার' (VLCC) জাহাজের পাশে নোঙর করে সরাসরি তেল স্থানান্তর করে। এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন হতে ২৪ থেকে ৪০ ঘণ্টা সময় লাগে।
পরিচালনা: উপগ্রহ চিত্রে দেখা গেছে, স্যাটেলাইট ফাঁকি দিতে ড্রোন এবং হেলিকপ্টারের মাধ্যমে এই পুরো লজিস্টিকস ও নিরাপত্তা ব্যবস্থা তদারকি করা হচ্ছে।
২. নতুন পাইপলাইন ও বিকল্প করিডোর
ইরাক-সিরিয়া পাইপলাইন: উত্তর ইরাকের কিরকুক থেকে সিরিয়ার ভূমধ্যসাগরীয় বন্দর বানিয়াস পর্যন্ত দীর্ঘদিন বন্ধ থাকা পুরোনো তেল পাইপলাইনটি পুনর্নির্মাণের চুক্তি হয়েছে। মার্কিন জ্বালানি জায়ান্ট চেভরন (Chevron) এই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে, যার প্রাথমিক ক্ষমতা হবে দৈনিক ২০ লাখ ব্যারেল।
সৌদি-ইসরায়েল রুট: পারস্য উপসাগরের ঝঁকি এড়াতে সৌদি আরব ও ইসরায়েলের ভেতর দিয়ে সরাসরি ভূমধ্যসাগরের বন্দরগুলোতে পাইপলাইন সংযোগের একটি দীর্ঘমেয়াদি ও উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা নিয়ে কাজ চলছে।
ফুজিরাহ বাইপাস: সংযুক্ত আরব আমিরাত হরমুজ প্রণালীর বাইরে অবস্থিত তাদের ফুজিরাহ তেল টার্মিনালের পাইপলাইন সক্ষমতা ২০২৭ সালের মধ্যে দ্বিগুণ করার কাজ দ্রুত এগিয়ে নিচ্ছে।
৩. আন্তর্জাতিক অর্থনৈতিক চাপ (Economic D-Day)
নতুন নিষেধাজ্ঞা: মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে 'ইকোনমিক ডি-ডে' বা চূড়ান্ত অর্থনৈতিক যুদ্ধের ঘোষণা দিয়েছেন। মার্কিন ট্রেজারি বিভাগ ইতিহাসের অন্যতম কঠিন নিষেধাজ্ঞা আরোপের প্রস্তুতি নিচ্ছে।
মিত্রদের সতর্কবার্তা: চীন (যারা ইরানের ৮০% তেলের ক্রেতা), সংযুক্ত আরব আমিরাত, তুরস্ক এবং ইরাকের মতো দেশগুলোকে ইরানের সঙ্গে বাণিজ্যিক লেনদেন বন্ধ করতে চাপ দিচ্ছে ওয়াশিংটন। অন্যথায় সেসব দেশও মার্কিন নিষেধাজ্ঞার মুখোমুখি হবে বলে হুঁশিয়ারি দেওয়া হয়েছে।এই সমন্বিত কৌশলের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র ও মধ্যপ্রাচ্যের তেল উৎপাদনকারী দেশগুলো (যেমন: ওমান, কুয়েত ও ইউএই) হরমুজ প্রণালীতে ইরানের সামরিক হুমকি এড়িয়ে এশিয়াসহ আন্তর্জাতিক বাজারে দৈনিক প্রায় ৮০-৯০ লাখ ব্যারেল জ্বালানি তেল নিরাপদে সরবরাহ করতে সক্ষম হচ্ছে।