কামাল উদ্দিন সুমন
১৯৯৫ সালে ভোলার বোরহান উদ্দিন উপজেলার শাহবাজপুর প্রথম গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করে বাপেক্স। সেখান থেকে গ্যাস উৎপাদন শুরু হয় ২০০৯ সালে। ২০১৮ সালে আবিষ্কৃত গ্যাসক্ষেত্র ভোলা নর্থ এবং ২০২৩ সালে আবিষ্কৃত ইলিশা থেকে এখনো উৎপাদন শুরু হয়নি। শাহবাজপুর গ্যাস আবিষ্কারের পর ৩১ বছর কেটে গেলেও তা জাতীয় গ্রিডে যোগ হয়নি। গ্যাস সংকটে এসময়ে ভোলার গ্যাসের উপযুক্ত ব্যবহার করার দাবী তোলা হয়েছে বিভিন্ন মহল থেকে। ভোলায় গ্যাসের চাহিদা না থাকায় দৈনিক মাত্র ৮০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করা হচ্ছে। আবার পাইপলাইন না থাকায় জাতীয় গ্রিডে দেওয়া যাচ্ছে না।
তবে পেট্রোবাংলার একটি সূত্র জানায়, ভোলার গ্যাস জাতীয় গ্রিডে আনার সম্ভাব্যতা জরিপ চলছে। একইসঙ্গে দরপত্র আহ্বানের প্রস্তুতিও চলছে। নতুন করে ভোলা-বরিশাল-খুলনা গ্যাস পাইপলাইন করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। খুলনা পর্যন্ত জাতীয় গ্রিড আনা সম্ভব হলে এই গ্যাস উত্তরবঙ্গ পর্যন্ত সরবরাহ করা যাবে বলে মনে করা হচ্ছে।
জ্বালানিমন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে বলেছেন, ভোলার গ্যাস নিয়ে মালয়েশিয়ার রাষ্ট্রীয় জ্বালানি প্রতিষ্ঠান পেট্রোনাসের সঙ্গে কাজ করার বিষয়ে সরকার আশাবাদী। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রী মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে এ বিষয়ে আলাপ করেছেন। এরপর আমরা অনলাইনে পেট্রোনাসের সঙ্গে কথা বলেছি। তাদের চেয়ারম্যানের সঙ্গেও কথা হয়েছে। আমাদের একটি টিম সেখানে গিয়েছিল এবং ফিরেও এসেছে। আমরা খুবই আশাবাদী, পেট্রোনাসের সঙ্গে কোলাবোরেশন করে ভোলার গ্যাসের বিষয়ে ভালো কিছু করতে পারবো।
জানা গেছে, দেশে তীব্র গ্যাস সংকটের কারণে ফের আলোচনায় এসেছে ভোলার গ্যাস। সিলেটের পর অন্যতম প্রধান গ্যাসক্ষেত্র ভোলা থেকে বিপুল পরিমাণ গ্যাস পাওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও যথাসময়ে পাইপলাইন না হওয়ায় তার খেসারত দিচ্ছে দেশ।
ভোলার বোরহানউদ্দিনে ১৯৯৫ সালে গ্যাস পাওয়ার পর আওয়ামী লীগের আমলে পাইপলাইন করার উদ্যোগ নেওয়া হলেও সেটি আলোর মুখ দেখেনি। এখন আবার সম্ভাব্যতা যাচাই ও দরপত্র আহ্বানের কাজ হচ্ছে। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, এখনই উদ্যোগ নিলে পাইপ লাইন করতে কমপক্ষে তিন থেকে ৫ বছর সময় লাগবে।
পেট্রোবাংলার পরিচালক (পিএসসি) প্রকৌশলী মো. শোয়েব বলেন,ভোলার গ্যাস স্থলভাগে আনতে দরপত্র আহ্বান ও প্রকল্পটির সম্ভাব্যতা জরিপের কাজ চলছে। তিনি জানান, ভোলায় ৯টি কূপ করা হয়েছে, প্রত্যেকটিতেই গ্যাস পাওয়া গেছে। ভোলা এবং আশপাশের উপকূলীয় অঞ্চলে আরও গ্যাসের মজুতে থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ভোলার গ্যাস স্থলভাগে আনার জন্য আমরা চেষ্টা করছি।
গ্যাস ট্রান্সমিশন কোম্পানির (জিটিসিএল) সূত্র জানায়, উদাহরণ হিসেবে চট্টগ্রাম-ফৌজদারহাট-বাখরাবাদ ৩৬ ইঞ্চি, ১৮১ কিলোমিটার পাইপ লাইনের প্রকল্প ব্যয় ২ হাজার ৪৭৯.৪১ কোটি টাকা। অর্থাৎ প্রতি কিলোমিটারের ব্যয় প্রায় ১৩.৭০ কোটি টাকা। কিন্তু ভোলা-বরিশাল খুলনা পাইপ লাইনের বাস্তবতা ভিন্ন। এখানের বড় একটি অংশ নদীর মধ্যে দিয়ে নির্মাণ করতে হবে। এজন্য ব্যয় বেড়ে যাবে। চট্টগ্রাম-ফৌজদারহাট-বাখরাবাদ প্রকল্পটি ২০১৬ থেকে ২০২১ এরমধ্যে নির্মাণ করা হয়। ওই সময়ের তুলনায় এখন ডলারের দামও বেশি। ফলে ভোলা-বরিশাল-খুলনার পাইপ লাইন প্রকল্পে ব্যয় বৃদ্ধি স্বাভাবিক।
সূত্র জানায়, গত কয়েক বছর ধরেই ভোলা-বরিশাল-খুলনা পাইপলাইন নিয়ে কথা চলছিল। আওয়ামী লীগের এই প্রকল্পের আলোচনা হলেও সেটি আলোর মুখ দেখেনি। এরপর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ভোলা-বরিশাল অংশ অপরিবর্তিত রেখে ভোলা-বরিশাল-ঢাকা পাইপলাইন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল। সেখানে সম্ভাব্যতা যাচাইও শুরু হয়। কিন্তু সেটি ঝুলে যায়। এরপর বর্তমান সরকার ক্ষমতায় আসার পর নতুন করে ভোলা-বরিশাল-খুলনা গ্যাস পাইপলাইন করার পরিকল্পনা করা হয়। সেজন্য আবার সম্ভাব্যতা যাচাই শুরু হয়েছে।
পেট্রোবাংলার একজন কর্মকর্তা জানান, ভোলা-বরিশাল-খুলনা গ্যাস পাইপলাইন করার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। এজন্য সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের কাজ চলছে। দরপত্র করারও প্রক্রিয়া চলছে। তবে এই পাইপলাইন করতে ৩ থেকে ৫ বছরের মতো সময় প্রয়োজন হবে।
জিটিসিএল সূত্র জানায়, ভোলা থেকে বরিশাল হয়ে খুলনা নিতে গেলে ১৫০ কিলোমিটার পাইপলাইন দরকার। এই পাইপলাইন করতে গেলে বিপুল পরিমাণ অর্থের প্রয়োজন হবে। গ্যাস মজুত বেশি না থাকলে পাইপলাইনের খরচ উঠবে কীভাবে, অর্থায়নের নিশ্চয়তা চাইলে ২০০৪ সালে পাইপলাইন নির্মাণে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক প্রকল্প ভেস্তে যায়।
জানা গেছে, ভোলা ইস্ট থেকে ভোলা নর্থের দূরত্ব ৪০ কিলোমিটার মূলত এই এলাকাসহ আশপাশের এলাকায় গ্যাসের মজুত রয়েছে। মুলাদি, বেগমগঞ্জ, সুন্দলপুর, ভোলা, সাঙ্গুতেও গ্যাস পাওয়া গেছে। ইতোমধ্যেই ভোলায় ৩টি গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কৃত হয়েছে তাতে প্রায় ১.৩ টিসিএফ (ট্রিলিয়ন ঘনফুট) গ্যাস মজুত আশা করা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত মোট ৯টি কূপ খনন করা হয়েছে এখান থেকে দৈনিক প্রায় ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করা সম্ভব। ৯ কূপের মধ্যে ৫টি এখনই গ্যাস উৎপাদনে সক্ষম যেগুলো থেকে দৈনিক ১৩৫ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস সরবরাহ দেওয়া সম্ভব। অপর ৪টি কূপের মধ্যে ১টির পাইপলাইন এবং ৩টি কূপের প্রসেস প্ল্যান্ট রেডি হচ্ছে। ভোলায় আরও ১০টি কূপ খননের পরিকল্পনা করেছে বাপেক্স।
সূত্র জানায়, ভোলায় প্রাথমিকভাবে ১ দশমিক ৩ ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ) গ্যাস মজুত রয়েছে বলে প্রমাণিত।
তবে বাপেক্স ধারণা করছে, নতুন কূপ খনন করলে এই মজুতের পরিমাণ আরও বাড়তে পারে। ভোলায় নতুন করে ১০টি কূপ খনন করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে ভোলা নর্থ-৫ মূল্যায়ন কূপ, ভোলা নর্থ-৬ অনুসন্ধান কূপ, ভোলা নর্থ-৭ অনুসন্ধান কূপ, শাহবাজপুর-৯ মূল্যায়ন কূপ ও শাহবাজপুর-১০ অনুসন্ধান কূপের এলাকা এবং সংযোগ সড়কের জন্য প্রয়োজনীয় ভূমি হুকুমদখলের প্রস্তাব জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে পাঠিয়েছে বাপেক্স।
এর সঙ্গে আরও ৫টি কূপ খনন করার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। প্রতিটি কূপ থেকে ২০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া গেলে ভোলার এই ১০ কূপ থেকে দৈনিক ২০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যাবে। আর ভোলায় এখনই অব্যবহৃত আরও ৭০ থেকে ৮০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যাবে। ১০টি কূপ খনন শেষ করলে ভোলা থেকে দৈনিক ২৭০-২৮০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস পাওয়া যেতে পারে। উল্লেখ্য, ভোলায় বেশিরভাগ কূপ খনন করেছে রাশিয়ান কোম্পানি গ্যাজপ্রম।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আমরা আলোচনা করেই এত বছর কাটিয়ে দিলাম। এখন সংকট ঘনিভূত হওয়ায় জোরেশোরে আলোচনাও হচ্ছে। কিন্তু কাজটা শুরুর উদ্যোগ আসলে কতটা, সেটা দেখার বিষয়। পাইপলাইনের কাজ দীর্ঘ মেয়াদি কাজ। ফলে সময় বেশি লাগাটা স্বাভাবিক। আমরা আরও আগে শুরু করতে পারলে ভালো হতো।
পেট্রোবাংলা সূত্র বলছে, ২০১৫ সালের দিকে দেশীয় উৎস থেকে অন্তত দৈনিক ২ হাজার ৮০০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উত্তোলন করা হতো। এখন সেই উৎপাদন ১ হাজার ২০০ মিলিয়ন ঘনফুটেরও নিচে নেমে গেছে। সবচেয়ে শঙ্কার হচ্ছে, দেশের বড় গ্যাসক্ষেত্র বিবিয়ানার মজুত ফুরিয়ে আসছে। এক সময় ১৩৫০ মিলিয়ন ঘনফুট গ্যাস উৎপাদিত হলেও ২ সেপ্টেম্বর পাওয়া গেছে মাত্র ৭৩৩ মিলিয়ন ঘনফুট। দেশে এখন মোট গ্যাসের চাহিদা ৪ হাজার মিলিয়ন ঘনফুট। এর বিপরীতে সরবরাহ করা হয় ২ হাজার ৬০০ মিলিয়ন ঘনফুট। এর মধ্যে বর্তমানে ৭০০ মিলিয়ন ঘনফুট এলএনজি থেকে পাওয়া যাচ্ছে। দেশীয় খনি থেকে বুধবার (২ সেপ্টম্বের) বিকাল ৪টার হিসাবে ১ হাজার ৬২৫ মিলিয়ন ঘনফুট সরবারহ করা হচ্ছে।
বাপেক্সের হিসাবে ভোলায় বর্তমানে ১ দশমিক ৭৫ ট্রিলিয়ন ঘনফুট (টিসিএফ) গ্যাসের মজুত আছে। এর পরিমাণ আরও বেশি হতে পারে। ১৯৯৫ সালে ভোলায় প্রথম শাহবাজপুর গ্যাসক্ষেত্র আবিষ্কার করে বাপেক্স। সেখান থেকে গ্যাস উৎপাদন শুরু হয় ২০০৯ সালে। ২০১৮ সালে আবিষ্কৃত গ্যাসক্ষেত্র ভোলা নর্থ এবং ২০২৩ সালে আবিষ্কৃত ইলিশা থেকে এখনো উৎপাদন শুরু হয়নি।
একের পর এক গ্যাসক্ষেত্র পাওয়ায় ভোলার বাসিন্দারা সম্ভাবনার নতুন আশা দেখেছিলেন। কিন্তু সেই আশার বড় অংশ এখনো অপূর্ণ। কারণ, গ্যাসের প্রাচুর্য থাকলেও পুরো সুবিধা পাচ্ছেন না জেলার বাসিন্দারা। সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোর হিসাব বলছে, ভোলায় যে পরিমাণ গ্যাস আছে, তা দিয়ে যদি পুরোদমে জেলায় শিল্পায়ন গড়ে ওঠে, তাহলে অন্তত ৭০ বছরের চাহিদা মেটানো সম্ভব। এখানেই শিল্পকারখানা গড়লে গ্যাস কম খরচে ব্যবহার করা যাবে। পণ্য ভোলার পাশেই নদীপথে পায়রা ও চট্টগ্রাম বন্দরে নেওয়া যাবে।
সূত্র জানায়,বিভিন্ন সরকার ভোলার গ্যাস নিয়ে মোট চারটি পরিকল্পনা করেছিল। এর মধ্যে আছে পাইপলাইনের মাধ্যমে গ্যাস জাতীয় গ্রিডে নেওয়া, সিএনজিতে রূপান্তর করে জেলার বাইরে নেওয়া, এলএনজি করে জেলার বাইরে নেওয়া এবং ভোলাতেই ইপিজেড, শিল্পকারখানা ও বিদ্যুৎকেন্দ্র বানিয়ে সেখানে গ্যাস ব্যবহার করা। সরকারগুলোর তরফে এগুলো নিয়ে সম্ভাব্যতা যাচাইয়ের উদ্যোগও হয়েছে। তবে কোনো সরকারই এখন পর্যন্ত এ নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে পারেনি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, ভোলায় শিল্পাঞ্চল গড়ে তোলা, ইপিজেড ও বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপন করাই সবচেয়ে ব্যয়সাশ্রয়ী পরিকল্পনা। এটি বাস্তবায়ন করলে যেমন ভোলার অর্থনৈতিক অবস্থা বদলে যাবে, তেমনি গ্যাসের সবচেয়ে ভালো ব্যবহার হবে এটির মাধ্যমে। এই দাবিতে ভোলার মানুষও দীর্ঘদিন ধরে আন্দোলন করে আসছেন।
ভোলায় গ্যাস উত্তলোনের কাজটি করছে বাপেক্স। সেই গ্যাস কিনে ভোক্তা পর্যায়ে সরবরাহ করে সুন্দরবন গ্যাস বিতরণ কোম্পানি। কোম্পানিটি বলছে, বড় গ্রাহকদের মধ্যে এখানে দুটি বিদ্যুৎকেন্দ্র, তিনটি ক্যাপটিভ (শিল্পে উৎপাদিত নিজস্ব বিদ্যুৎ) ও সাতটি শিল্পকারখানা আছে। এছাড়া ২ হাজার ৩৪৪টি আবাসিক (নন-মিটার) এবং ৩১টি মিটারভিত্তিক গ্রাহককে সংযোগ দিয়েছে তারা। তবে সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী এখন আবাসিক সংযোগ দেওয়া বন্ধ আছে।