- ২০ ও ২১ মে অনুষ্ঠিত হচ্ছে গণশুনানি
- বিইআরসির সভা অনুষ্ঠিত কারিগরি কমিটি গঠন
- ১৭ থেকে সর্বোচ্চ ২১ শতাংশ দাম বাড়ানোর প্রস্তাব
জ্বালানি তেলের পর এবার বিদ্যুতের দাম বাড়াতে চায় সরকার। দাম বাড়ানোর প্রস্তাব নীতিগত অনুমোদন দিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। পরিপ্রেক্ষিতে পাইকারি পর্যায়ে ১৭ থেকে সর্বোচ্চ ২১ শতাংশ দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (পিডিবি)। প্রস্তাব আমলে নিয়ে কারিগরি কমিটি গঠন করেছে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি)।
গ্রাহক পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব করার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) চেয়ারম্যান জালাল আহমেদ। তিনি বলেন, পাইকারি দামের সঙ্গে সমন্বয় করে খুচরা দাম বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে বিতরণ সংস্থা ও কোম্পানিগুলো।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঝড়ো গতিতে চলছে বিদ্যুতের দাম বৃদ্ধির তৎপরতা। পাইকারি এবং খুচরা দাম বৃদ্ধির পাশাপাশি সঞ্চালন চার্জ বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে। আগামী ২০ ও ২১ মে অনুষ্ঠিত হচ্ছে গণশুনানি, সব ঠিক থাকলে জুন থেকেই বাড়তি বিল গুণতে হতে পারে ভোক্তাদের।
পাইকারি পর্যায়ে ইউনিট প্রতি ১ দশমিক ২০ টাকা (১৭ শতাংশ) থেকে ১ দশমিক ৫০ টাকা (২১ শতাংশ) দাম বাড়ানোর প্রস্তাব দিয়েছে বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি)। অন্যদিকে গ্রাহক পর্যায়ে ১ দশমিক ২৯ টাকা (১৪ দশমিক ২১ শতাংশ) থেকে ১ দশমিক ৬১ টাকা (১৭ দশমিক ৭৬ শতাংশ) বৃদ্ধির প্রস্তাব করা হয়েছে।
পিছিয়ে নেই পিজিসিবিও (পাওয়ার গ্রিড বাংলাদেশ পিএলসি), সঞ্চালন কোম্পানিটি প্রতি ইউনিটে ১৬ পয়সা চার্জ বাড়ানোর প্রস্তাব করেছে। পাশাপাশি, পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড, ডেসকো, ডিপিডিসি, ওজোপাডিকো এবং নেসকো।
বিপিডিবির পাইকারি দাম বৃদ্ধির প্রস্তাবে বলা হয়েছে, ২০২৬-২৭ অর্থবছরে বিদ্যুতের সম্ভাব্য উৎপাদন খরচ পড়বে প্রায় ১ লাখ ৪৩ হাজার ১০৮ কোটি টাকা। প্রতি ইউনিট বিদ্যুতের দাম পড়বে ১২ দশমিক ৯১ টাকার মতো। বিদ্যমান পাইকারি দামে বিক্রিতে আয় হবে ৭৭ হাজার ৫৫৩ কোটি টাকা। এতে করে ঘাটতি দাঁড়াবে প্রায় ৬৫ হাজার ৫৫৫ কোটি টাকা। ইউনিট প্রতি ১ দশমিক ২০ টাকা (১৭ শতাংশ) বৃদ্ধি হলে ঘাটতি কমবে ১ হাজার ৩২৯ কোটি আর ১ দশমিক ৫০ টাকা (২১ শতাংশ) হারে দাম বাড়লে ঘটতি কমবে ১ হাজার ৬৬৬ কোটি টাকা।
আইন অনুযায়ী বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর এখতিয়ার বিইআরসির হাতে। নিয়ম অুনযায়ী প্রস্তাব পাওয়ার পর যাচাই-বাছাইয়ের জন্য টেকনিক্যাল কমিটি গঠন করা হয়। দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব এবং টেকনিক্যাল কমিটির রিপোর্ট গণশুনানিতে উপস্থাপন করা হয়। সেখানে সকল পক্ষের মতামত নিয়ে সিদ্ধান্ত দেন বিইআরসি। তবে প্রস্তাব পাওয়ার এক সপ্তাহের কম সময়ে টেকনিক্যাল কমিটি গঠন এবং গণশুনানির তারিখ নির্ধারণের ঘটনা নজির বিহীন।
সর্বশেষ ২০২৪ সালের ২৯ ফেব্রুয়ারি নির্বাহী আদেশে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়। ওই আদেশে পাইকারি বিদ্যুতের গড় দর ৬ দশমিক ৭০ টাকা থেকে ৫ শতাংশ বাড়িয়ে ৬ দশমিক ৯৯ টাকা করা হয়। অন্যদিকে গ্রাহক পর্যায়ে গড়ে ৮ দশমিক ৫০ শতাংশ হারে দাম বৃদ্ধি করা হয়। তার আগে ৩০ জানুয়ারি এবং ১২ জানুয়ারি বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে গেজেট প্রকাশ করে বিদ্যুৎ বিভাগ।
আর বিইআরসি সর্বশেষ ২০২২ সালের ২১ নভেম্বর পাইকারিতে ইউনিট প্রতি ১৯ দশমিক ৯২ শতাংশ বাড়িয়ে ৬ দশমিক ২০ টাকা নির্ধারণ করে। তারপর বিতরণ কোম্পানিগুলোর আবেদনের প্রেক্ষিতে ২০২৩ সালের ৮ জানুয়ারি গণশুনানি করে প্রায় গুছিয়ে এনেছিল নতুন দর ঘোষণার প্রস্তুতি। নির্বাহী আদেশে দাম বাড়িয়ে দেয় তৎকালীন সরকার। তারপর আইনও সংশোধন করে বিইআরসির ক্ষমতায় ভাগ বসায় নির্বাহী বিভাগ। অন্তর্বর্তীকালীন সরকার আইনটি বাতিল করায় একক এখতিয়ার ফিরে পেয়েছে বিইআরসি।
সম্প্রতি অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বে উচ্চপর্যায়ের কমিটির পরামর্শে বিদ্যুৎ বিভাগ সোমবার দাম বৃদ্ধির এই প্রস্তাব বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) কাছে পাঠিয়েছে। তবে রীতি অনুযায়ী, বিদ্যুৎ বিতরণ কোম্পানিগুলো কমিশনের কাছে দাম বৃদ্ধির প্রস্তাব দিয়ে থাকে।
জানা গেছে, জ্বালানি আমদানি ব্যয়ে ঊর্ধ্বগতি, উৎপাদন খরচ ও বিক্রয়মূল্যের বড় ব্যবধান এবং ভর্তুকির বাড়তি চাপ সামাল দিতে এই পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে বলে জানিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। এর আগে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি খাতে বাড়তি ব্যয় সামাল দিতে অর্থমন্ত্রীর নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের মন্ত্রিসভা কমিটি গঠন করে সরকার। ওই কমিটির পরামর্শেই বিদ্যুৎ বিভাগ প্রস্তাব দিয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, প্রস্তাবিত মূল্যবৃদ্ধি ভর্তুকির চাপ কিছুটা কমাতে সহায়ক হতে পারে। তবে এর ফলে শিল্প উৎপাদন ব্যয় বাড়বে এবং সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার খরচেও নতুন চাপ তৈরির শঙ্কা রয়েছে।
বর্তমানে প্রতি ইউনিট বিদ্যুৎ উৎপাদনের গড় খরচ গ্রাহকদের কাছ থেকে আদায় করা দামের তুলনায় প্রায় ৫ টাকা ৫০ পয়সা বেশি। এই ঘাটতির কারণে ভর্তুকির ওপর নির্ভরতা বাড়ছে। চলতি ২০২৫-২৬ অর্থবছরে পিডিবির সম্ভাব্য ঘাটতি দাঁড়াতে পারে প্রায় ৫৬ হাজার ৪৭৫ কোটি টাকা। তবে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির উচ্চমূল্যের কারণে আরও প্রায় ১৫ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত ভর্তুকির প্রয়োজন হতে পারে। সরকার ইতোমধ্যে এ খাতে ৩৬ হাজার কোটি টাকা ভর্তুকি বরাদ্দ দিয়েছে।
জানা গেছে, বিদ্যুৎ উৎপাদনে ব্যবহৃত এলএনজি, কয়লা ও তেলের বড় অংশ আমদানি করতে হয়। আন্তর্জাতিক বাজারে এসব জ্বালানির দাম বৃদ্ধির ফলে বিদ্যুতের উৎপাদন ব্যয় বেড়েছে। এছাড়া অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র পুরোপুরি উৎপাদনে না থাকলেও চুক্তি অনুযায়ী ‘ক্যাপাসিটি চার্জ’ পরিশোধ করতে হচ্ছে।
গত আওয়ামী লীগ সরকার বিশেষ ক্ষমতা আইন করে দরপত্র ছাড়া একের পর এক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণ করেছে। এতে বিদ্যুৎকেন্দ্রের ভাড়া (ক্যাপাসিটি পেমেন্ট) দিতে গিয়ে ব্যাপক চাপে পড়ে সরকার। যদিও জ্বালানির অভাবে সক্ষমতার অর্ধেক বিদ্যুৎ উৎপাদন করা যায় না। ২০২২ সালের শেষ দিকে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর ক্ষমতা কমিশনের কাছ থেকে সরকারের হাতে নেয় তারা।
দেড় দশকে পাইকারিতে ১২ বার ও গ্রাহক পর্যায়ে ১৪ বার দাম বাড়ায় আওয়ামী লীগ সরকার। এরপর অন্তর্বর্তী সরকার এসে দাম না বাড়িয়ে খরচ কমানোর সিদ্ধান্ত নেয়। দাম বাড়ানোর ক্ষমতা বিইআরসির হাতে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। কিছু খাতে খরচ কমলেও সেটি তেমন কাজে আসেনি। গত অর্থবছরে সর্বোচ্চ ভর্তুকি দিতে হয়েছে, ৫৮ হাজার কোটি টাকা যা সর্বোচ্চ।
জানা গেছে, মঙ্গলবার বিদ্যুৎ বাড়ানোর প্রস্তাব নিয়ে সভা করেছে বিইআরসি। সেই সভায় প্রস্তাবটি বিবেচনায় নিয়ে বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন (বিইআরসি) ইতোমধ্যে একটি কারিগরি কমিটি গঠন করেছে।
বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের (বিইআরসি) চেয়ারম্যান জালাল আহমেদের মতে, প্রস্তাবগুলো বর্তমানে প্রযুক্তিগত কমিটির পর্যালোচনায় রয়েছে। তবে আগামী ঈদুল আজহার আগে দাম বৃদ্ধির চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হওয়ার সম্ভাবনা কম। সাধারণত প্রস্তাব অনুমোদনের পর জুন মাস থেকেই নতুন দর কার্যকর হতে পারে বলে বিভিন্ন সংবাদে আভাস দেওয়া হয়েছে।
জালাল আহমেদ বলেন, পাইকারি পর্যায়ে মূল্যবৃদ্ধির সঙ্গে আনুপাতিক হারে খুচরা পর্যায়ে দাম সমন্বয় করা হয়। তাই পাইকারি দামের প্রস্তাব আমলে নিয়ে কারিগরি কমিটি করা হয়েছে। ইতোমধ্যে পাঁচটি বিতরণ সংস্থার মধ্যে একটি কোম্পানি দাম বাড়ানোর প্রস্তাব জমা দিয়েছে। আজ-কালের মধ্যেই বাকি বিতরণ সংস্থার প্রস্তাব জমা হতে পারে।
বর্তমানে পিডিবি সরকারি ও বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে চুক্তিভিত্তিক দামে বিদ্যুৎ কিনে তা নির্ধারিত পাইকারি দামে ছয়টি বিতরণ সংস্থার কাছে বিক্রি করে। উৎপাদন ব্যয় ও বিক্রয়মূল্যের মধ্যে ব্যবধান থাকায় ঘাটতি পূরণে সরকার থেকে ভর্তুকি নিতে হয় সংস্থাটিকে। তবে বিতরণ সংস্থাগুলো কোনো ভর্তুকি পায় না। তারা খুচরা দামে ভোক্তার কাছে বিদ্যুৎ বিক্রি করে মুনাফা করছে।
পিডিবি বলছে, দেশে মোট বিদ্যুৎ গ্রাহকের ৩৭ শতাংশ ব্যবহারকারীর বিদ্যুৎ বিল বাড়বে। কেননা দেশের বাকি ৬৩ শতাংশ ‘লাইফলাইন’ গ্রাহক, যারা ৭৫ ইউনিটের কম ব্যবহার করেন। এক্ষেত্রে বেশি বিদ্যুৎ ইউনিট ব্যবহারকারীদের ওপর বাড়তি দাম আরোপের চিন্তা করা হচ্ছে বলেও জানিয়েছে সংস্থাটি।