বেসরকারি খাতে স্থাপিত ৫৫৭ মেগাওয়াট ক্ষমতার ফার্নেস অয়েলভিত্তিক ৬টি রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের বকেয়া ৭১৬ কোটি ৮০ লাখ টাকার বিল পরিশোধ প্রস্তাব সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠক থেকে প্রত্যাহার করে নিয়েছে বিদ্যুৎ বিভাগ। গতকাল বৃহস্পতিবার সচিবালয়ে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকে প্রস্তাবটি উপস্থান করার কথা ছিল।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, বিদ্যুৎ বিভাগের পক্ষ থেকে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড (বিপিডিবি) কর্তৃক বেসরকারি খাতে স্থাপিত ফার্নেস অয়েলভিত্তিক মদনগঞ্জ ১০২ মেগাওয়াট, মেঘনাঘাট ১০০ মেগাওয়াট, সিদ্দিরগঞ্জ ১০০ মেগাওয়াট, নোয়াপাড়া ৪০ মেগাওয়াট, খুলনা ১১৫ মেগাওয়াট এবং জুলদা ১০০ মেগাওয়াট রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্রের উৎপাদনকালীন বকেয়া বিল পরিশোধের জন্য ভূতাপেক্ষ অনুমোদন চাওয়ার পরিকল্পনা করা হয়। সে অনুযায়ী সরকারি ক্রয় সংক্রান্ত মন্ত্রিসভা কমিটির বৈঠকের আলোচ্যসূচিতেও ছিলো প্রস্তাবটি।
তবে বিদ্যুৎ বিভাগ থেকে প্রস্তাবটি প্রত্যাহার করে নেওয়ার অনুরোধ জানানো হয়। তার প্রেক্ষিতে প্রস্তাবটি বৈঠকের আলোচনা থেকে প্রত্যাহার করে নেওয়া হয়।
জানা গেছে, ২০২৪ সালের ২৯ এপ্রিল থেকে ১৯ আগস্ট পর্যন্ত সময়ে বিদ্যুৎ উৎপাদনের বিপরীতে মোট ৭১৬ কোটি ৮০ লাখ টাকার বিল তৈরি হয়। সরকারি তহবিল থেকে এই অর্থ পরিশোধ করার পরিকল্পনা করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ফুয়েল পেমেন্ট চুক্তি অনুযায়ী ডলারভিত্তিক হিসাব যাচাই করে বিল পরিশোধ করা হয়। এ ক্ষেত্রে প্রতি মার্কিন ডলারের বিনিময় হার ১২২ টাকা ৮০ পয়সা ধরা হয়। বর্তমানে ছয়টি বিদ্যুৎকেন্দ্রই উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ রেখেছে।এদিকে বৈঠকে সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়ায় নতুন সরবরাহকারী ও প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানকে অংশগ্রহণের সুযোগ বাড়াতে ফ্যাক্টরি পরিদর্শন সংক্রান্ত নতুন শর্ত অন্তর্ভুক্তির একটি প্রস্তাব নিয়ে আসে বিদ্যুৎ বিভাগ।
জানা গেছে, বিদ্যুৎ বিভাগের প্রস্তাবের ভিত্তিতে বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ড (আরইবি) এ সংক্রান্ত প্রস্তাব উপস্থাপন করে। প্রস্তাবে সরকারি ক্রয় প্রক্রিয়ায় বিদ্যমান ক্রয় বিধিমালার সংশ্লিষ্ট অনুচ্ছেদ এবং আদর্শ টেন্ডার ডকুমেন্টে নতুন সরবরাহকারী বা প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের জন্য ফ্যাক্টরি ইন্সপেকশন সংক্রান্ত ধারা অন্তর্ভুক্ত করার কথা বলা হয়।
প্রস্তাবনায় বলা হয়, বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন বোর্ডের নির্বাহী কমিটির সভায় দরপত্র আহ্বানের ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি এবং দেশীয় শিল্পায়ন কার্যক্রম ত্বরান্বিত করার লক্ষ্যে স্থানীয় মুদ্রায় স্থানীয় দরপত্রে নতুন প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানকে অংশগ্রহণের সুযোগ দেওয়ার সুপারিশ করা হয়। এ ক্ষেত্রে ফ্যাক্টরি ইন্সপেকশনের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের আর্থিক ও কারিগরি সক্ষমতা যাচাই-বাছাই করে যোগ্য প্রতিষ্ঠান নির্ধারণের সুপারিশ করা হয়।
তবে বাংলাদেশ সরকারি ক্রয় কর্তৃপক্ষ (বিপিপিএ) মতামতে জানায়, নতুন প্রস্তুতকারকদের ক্ষেত্রে নির্দিষ্ট অভিজ্ঞতার শর্ত শিথিল করা বিধিসম্মত হবে না।
এরপরও সিন্ডিকেশন রোধ, প্রতিযোগিতা বৃদ্ধি, সাশ্রয়ী মূল্যে পণ্য সংগ্রহ, দেশীয় শিল্পের বিকাশ এবং জরুরি বৈদ্যুতিক মালামাল দ্রুত সরবরাহ নিশ্চিত করতে নতুন দেশীয় প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানকে অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরির লক্ষ্যে ফ্যাক্টরি পরিদর্শন সংক্রান্ত ধারা অন্তর্ভুক্তির প্রস্তাব অনুমোদনের জন্য উপস্থাপন করে বিদ্যুৎ বিভাগ।
এদিকে সংসদের প্রথম অধিবেশনে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রী ইকবাল হাসান মাহমুদ জানিয়েছেন, ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিদ্যুৎ খাতের কুইক রেন্টাল প্রকল্পের নামে লুটপাট ও বিদেশে পাচার হওয়া টাকা দেশে ফিরিয়ে আনার প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। এজন্য অর্থ মন্ত্রণালয় ও বাংলাদেশ ব্যাংক কাজ করছে। পাবনা-৫ আসনের সরকারি দলের সংসদ সদস্য মো. শামছুর রহমান শিমুল বিশ্বাসের টেবিলে উত্থাপিত এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে তিনি এ কথা জানান।
বিদ্যুৎমন্ত্রী জানান, বিগত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ‘বিদ্যুৎ ও জ্বালানির দ্রুত সরবরাহ বৃদ্ধি (বিশেষ বিধান) আইন, ২০১০’ জারি করা হয়েছিল। এই আইনের আওতায় কোনো ধরনের উন্মুক্ত দরপত্র বা ক্রয় প্রক্রিয়া ছাড়াই বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনের অযাচিত প্রস্তাব অনুমোদনের সুযোগ তৈরি করা হয়।
তিনি আরো বলেন, এই আইনের ৫ ধারা অনুযায়ী গঠিত নেগোসিয়েশন কমিটির মাধ্যমে বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ট্যারিফ অনুমোদন করা হতো। এই প্রক্রিয়ায় প্রায়ই বিদ্যুতের অন্যায্য মূল্য এবং অস্বাভাবিক ক্যাপাসিটি চার্জ নির্ধারণ করা হতো। এসব বিদ্যুৎ কেন্দ্র স্থাপনকারী ব্যবসায়ীদের মধ্যে আওয়ামী লীগের দলীয় প্রভাবশালী নেতৃবৃন্দ এবং তাদের আত্মীয়-স্বজনরাও জড়িত ছিলেন। এতে দেশের হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট করে বিদেশে পাচার করা হয়েছে।
তিনি আরো জানান, লুটপাট ও পাচার হওয়া অর্থ দেশে ফেরত আনার লক্ষ্যে অর্থ মন্ত্রণালয় এবং বাংলাদেশ ব্যাংক সমন্বিতভাবে কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। দোষীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার প্রক্রিয়াও চলমান রয়েছে।