সিরিয়াকে কেন্দ্র করে ইসরায়েলের সঙ্গে বড় ধরনের যুদ্ধ আসন্ন বলে সতর্ক করেছেন দেশটির প্রবাসীবিষয়ক মন্ত্রী আমিচাই চিকলি। তার দাবি, সিরিয়ায় শুরু হতে যাওয়া পরবর্তী যুদ্ধ গাজার সংঘাতের তুলনায় আরও ভয়াবহ হবে এবং তা এড়ানোর কোনো পথ নেই।

চিকলি বলেন, সিরিয়া গাজার তুলনায় কয়েক গুণ বড় মাত্রার সংঘাতের জন্ম দেবে। এটিই পরবর্তী যুদ্ধ এবং এ বিষয়ে তিনি পুরোপুরি নিশ্চিত। তার ভাষায়, এই যুদ্ধ এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই।

বর্তমানে ফিলিস্তিন, লেবানন, সিরিয়া ও ইরানসহ মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন এলাকায় সামরিক অভিযান চালাচ্ছে ইসরায়েল। দেশটির নেতারা চলমান সংঘাতকে একাধিক ফ্রন্টে পরিচালিত যুদ্ধ হিসেবে উল্লেখ করে আসছেন।

সিরিয়ার সঙ্গে সম্ভাব্য যুদ্ধ নিয়ে চিকলির এমন সতর্কতা অবশ্য নতুন নয়। গত জুনেও তিনি বলেছিলেন, কোনো না কোনো সময় ইসরায়েলকে সিরিয়ার সঙ্গে যুদ্ধে জড়াতে হবে। তখন তিনি দাবি করেছিলেন, ইরানের তুলনায় সিরিয়া ও তুরস্ক ইসরায়েলের জন্য আরও বড় উদ্বেগের কারণ।

এদিকে সিরিয়ার ভূখণ্ডে ইসরায়েলি বাহিনীর অভিযান ও সামরিক উপস্থিতি অব্যাহত রয়েছে। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে বাশার আল-আসাদ সরকারের পতনের পর ইসরায়েল ১৯৭৪ সালের যুদ্ধবিরতি চুক্তি বাতিলের ঘোষণা দেয়। এরপর গোলান মালভূমির সংলগ্ন জাতিসংঘ নিয়ন্ত্রিত বাফার জোনে প্রবেশ করে ইসরায়েলি বাহিনী। দক্ষিণ সিরিয়ার আরও ভেতরেও সামরিক অবস্থান গড়ে তোলে তারা।

নতুন সিরীয় নেতৃত্ব একাধিকবার ইসরায়েলের সঙ্গে যুদ্ধ না চাওয়ার অবস্থান জানালেও দেশটিতে ইসরায়েলি অভিযান থামেনি। সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট আহমেদ আল-শারা ইসরায়েলি বাহিনীকে আসাদ সরকারের পতনের আগে যেসব অবস্থানে ছিল, সেখানে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

অন্যদিকে, দক্ষিণ সিরিয়ার বিস্তীর্ণ এলাকায় একটি নিরস্ত্রীকরণ অঞ্চল প্রতিষ্ঠার দাবি জানিয়ে আসছে ইসরায়েল। ফলে দুই দেশের মধ্যে উত্তেজনা আরও বাড়ছে এবং নতুন করে বড় ধরনের সামরিক সংঘাতের আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

চিকলির সর্বশেষ মন্তব্যের কয়েক দিন আগেও ইসরায়েলি সেনারা সিরিয়ার কুনেইত্রা প্রদেশে প্রবেশ করে তল্লাশি চালায়। বিভিন্ন এলাকায় চৌকি স্থাপন করে বেসামরিক মানুষ ও যানবাহনে তল্লাশি চালানোর পাশাপাশি সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দক্ষিণ সিরিয়ায় অভিযান, গ্রেপ্তার ও গোলাবর্ষণের ঘটনাও ঘটেছে।

শুক্রবার সিরিয়ার রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যম জানায়, দারা প্রদেশের গ্রামাঞ্চলে বেসামরিক মানুষের বাড়িঘর লক্ষ্য করে ইসরায়েলি বাহিনী গুলি চালিয়েছে। এতে কয়েকজন বাসিন্দাকে বাড়িঘর ছেড়ে পালাতে হয়।

সিরিয়ায় সম্ভাব্য যুদ্ধের এই হুমকি এসেছে এমন এক সময়ে, যখন মধ্যপ্রাচ্যে ইসরায়েলের সামরিক তৎপরতা একাধিক এলাকায় বিস্তৃত হয়েছে। ফিলিস্তিনের ভূখণ্ডে ইসরায়েলের নিয়ন্ত্রণের পাশাপাশি দক্ষিণ লেবাননের কিছু এলাকা এবং গোলান মালভূমির বাইরে সিরিয়ার আরও কিছু ভূখণ্ডেও ইসরায়েলি বাহিনীর অবস্থান রয়েছে। এ বছরের শুরুতে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে ইরানের বিরুদ্ধেও বড় ধরনের সামরিক অভিযান চালিয়েছে ইসরায়েল।

লেবাননেও ইসরায়েলি বাহিনীর দীর্ঘমেয়াদি অবস্থানের ইঙ্গিত পাওয়া যাচ্ছে। দেশটির প্রতিরক্ষামন্ত্রী ইসরায়েল কাটজ এ সপ্তাহে জানিয়েছেন, হিজবুল্লাহকে নিরস্ত্র না করা পর্যন্ত ইসরায়েলি সেনারা তথাকথিত ‘নিরাপত্তা অঞ্চলে’ থাকবে। তিনি সেনাবাহিনীকে সেখানে দীর্ঘমেয়াদি অবস্থানের প্রস্তুতি নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন।

ইসরায়েলের ক্রমবর্ধমান সামরিক তৎপরতার মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোর নিরাপত্তা সম্পর্কেও পরিবর্তন দেখা যাচ্ছে। গত সপ্তাহে সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তান একটি প্রতিরক্ষা চুক্তি সই করেছে। চুক্তি অনুযায়ী, তিন দেশের যেকোনো একটির ওপর সশস্ত্র হামলাকে তিন দেশের সবার ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হবে।

তুরস্কের পররাষ্ট্রমন্ত্রী হাকান ফিদান এই চুক্তির পারস্পরিক প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে ন্যাটোর ৫ নম্বর অনুচ্ছেদের সঙ্গে তুলনা করেছেন। ওই অনুচ্ছেদ অনুযায়ী, ন্যাটোর কোনো একটি সদস্যের ওপর হামলা হলে সেটিকে জোটের সব সদস্যের ওপর হামলা হিসেবে বিবেচনা করা হয়।