নেপাল-চীন সীমান্তবর্তী এলাকায় ভয়াবহ আকস্মিক বন্যায় নিহতের সংখ্যা বেড়ে ৫৭৯ জনে দাঁড়িয়েছে। এখনো নিখোঁজ রয়েছেন ১ হাজার ৯২৪ জন। দেশটির জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি হ্রাস ও ব্যবস্থাপনা কর্তৃপক্ষ (এনডিআরআরএমএ) এ তথ্য জানিয়েছে।
নিখোঁজদের মধ্যে ৫১৭ জন বিদেশি নাগরিক। তাদের মধ্যে পর্যটক, তীর্থযাত্রী এবং বিভিন্ন প্রকল্পে কাজ করা বিদেশি নাগরিক রয়েছেন।
নিখোঁজদের সন্ধানে নেপালের ১৪ হাজারের বেশি নিরাপত্তাকর্মী কাজ করছেন। এখন পর্যন্ত ৩ হাজার ৭০০ জনের বেশি মানুষকে উদ্ধার করা হয়েছে বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে।
গত বুধবার নেপাল-তিব্বত সীমান্ত এলাকায় হিমবাহ ধসের পর ব্যাপক পানির স্রোত নেমে আসে। এতে নদীগুলোতে আকস্মিক বন্যা দেখা দেয়। বন্যার পানির সঙ্গে কাদা, পাথর ও ধ্বংসাবশেষ ভেসে এসে বিস্তীর্ণ এলাকা তছনছ করে দেয়।
নেপালের রসুয়া, নুয়াকোট, ধাদিং ও গোরখাসহ কয়েকটি এলাকায় সবচেয়ে বেশি ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। ত্রিশূলী ও ভোতেকোশী নদীর আশপাশের এলাকাও ভয়াবহভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
বন্যায় সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎকেন্দ্র ও বিভিন্ন অবকাঠামো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। নেপাল-চীন সীমান্তের গুরুত্বপূর্ণ কেরুং-গ্যিরং সীমান্ত এলাকাতেও বড় ধরনের ধ্বংসযজ্ঞ হয়েছে।
বন্যাকবলিত দুর্গম পাহাড়ি এলাকায় উদ্ধার অভিযান চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। খারাপ আবহাওয়ার কারণে অনেক সময় হেলিকপ্টার উড়তে পারছে না। কোথাও কোথাও কাদা ও ধ্বংসাবশেষের স্তূপের কারণে উদ্ধারকারীদের পায়ে হেঁটে ঘটনাস্থলে পৌঁছাতে হচ্ছে।
বন্যার পর বিভিন্ন এলাকায় নতুন করে জলাধার ও হিমবাহজাত হ্রদ তৈরি হওয়ায় পরিস্থিতি এখনো ঝুঁকিপূর্ণ। এসব হ্রদের পানি বেড়ে গেলে আবারও আকস্মিক বন্যা হতে পারে বলে সতর্ক করা হয়েছে।
তবে চীনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সীমান্তের একটি হিমবাহ হ্রদের পানির উচ্চতা কমতে শুরু করেছে। তারপরও নেপাল ও চীন পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে এবং নতুন বন্যার ঝুঁকি মোকাবিলায় সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
নিখোঁজদের তালিকায় শত শত বিদেশি নাগরিক থাকায় বিভিন্ন দেশ তাদের নাগরিকদের সন্ধানে নেপালের সঙ্গে যোগাযোগ করছে। ভারত, অস্ট্রেলিয়া, ফ্রান্সসহ বিভিন্ন দেশের নাগরিক নিখোঁজ রয়েছেন।
অস্ট্রেলিয়া জানিয়েছে, তাদের অন্তত ৪১ নাগরিকের বিষয়ে এখনো তথ্য পাওয়া যায়নি। দেশটি নেপালে অতিরিক্ত সংকট মোকাবিলা কর্মী পাঠিয়েছে এবং আর্থিক সহায়তার ঘোষণাও দিয়েছে।
ফ্রান্সও জানিয়েছে, তাদের চার নাগরিক এখনো নিখোঁজ রয়েছেন।
বিদেশি সহায়তা চায় নেপাল
নেপাল জানিয়েছে, সাধারণ অনুসন্ধান ও উদ্ধার কার্যক্রম নিজেদের সক্ষমতায় চালিয়ে যেতে পারছে তারা। তবে কিছু বিশেষায়িত কাজে আন্তর্জাতিক সহায়তা প্রয়োজন।
নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিষির খানাল জানিয়েছেন, টানেলে উদ্ধার অভিযান, ডিএনএ পরীক্ষা, মরদেহ সংরক্ষণ এবং জরুরি অবকাঠামো নির্মাণের মতো বিশেষ কাজে বিদেশি সহায়তা প্রয়োজন। বিশেষ করে ধ্বংস হয়ে যাওয়া সেতুর পরিবর্তে অস্থায়ী বেইলি সেতু নির্মাণে সহায়তা চেয়েছে নেপাল।
৯৩ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত
আন্তর্জাতিক রেড ক্রসের হিসাব অনুযায়ী, এই দুর্যোগে প্রায় ৯৩ হাজার মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। অনেক এলাকায় খাবার, পানি ও চিকিৎসাসেবার প্রয়োজন দেখা দিয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে স্কুল, স্বাস্থ্যকেন্দ্র এবং বিদ্যুৎ ও যোগাযোগব্যবস্থা।
নেপাল সরকারের সামনে এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো নিখোঁজদের সন্ধান, মরদেহ উদ্ধার, দুর্গতদের নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া এবং ক্ষতিগ্রস্ত যোগাযোগ ও বিদ্যুৎব্যবস্থা পুনরুদ্ধার করা।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, হিমালয় অঞ্চলে হিমবাহ দ্রুত গলে যাওয়ার কারণে এ ধরনের হঠাৎ বন্যা ও হিমবাহ হ্রদ বিস্ফোরণের ঝুঁকি বাড়ছে। তাই বর্তমান উদ্ধার অভিযানের পাশাপাশি ভবিষ্যতে আগাম সতর্কতা ও ঝুঁকি মোকাবিলায় দীর্ঘমেয়াদি ব্যবস্থা নেওয়াও জরুরি।