- পাহাড়ে আটকে আছে ৫০ লাখ ঘনমিটার পানি
- আকস্মিক বানের মুখে উচ্চ সতর্কতা জারি
নেপাল-তিব্বত সীমান্ত অঞ্চলে ভয়াবহ আকস্মিক ঢলে প্রাণহানির সংখ্যা বেড়েছে। প্রাণহানির সংখ্যা বেড়ে অন্তত ৫৬২ হয়েছে। নেপাল পুলিশের বরাতে বিবিসির খবরে গতকাল শুক্রবার এ তথ্য জানা গেছে।
দুর্যোগের ৪৮ ঘণ্টার মাথায় প্রাণহানির নতুন এ তথ্য জানা গেলে। গত বুধবার সকালে নেপাল-তিব্বত সীমান্ত অঞ্চলে ভয়াবহ আকস্মিক ঢল হয়। এএফফি, রয়টার্স, কাঠমান্ডু পোস্ট, সিসিটিভি ও গ্লোবাল টাইমস।
এর আগে চীনের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে বলা হয়েছিল, এ ঘটনায় তিব্বতে পাঁচজন মারা গেছেন।
বার্তা সংস্থা এএফপির প্রতিবেদনে বলা হয়, এ দুর্যোগে শত শত বিদেশি নাগরিকসহ ১ হাজার ৪০০ জনের বেশি মানুষ এখনো নিখোঁজ। এর মধ্যে তিব্বতে নিখোঁজ রয়েছেন ৫৫৮ জনের বেশি মানুষ।
ধ্বংসস্তূপে পরিণত হওয়া এলাকায় দ্বিতীয় দফা বন্যা আঘাত হানতে পারে, এমন খবরের কারণে জীবিত ব্যক্তিদের সন্ধানে থাকা উদ্ধারকারীরা ‘উদ্বিগ্ন ও সতর্ক’ অবস্থায় আছেন। বিবিসিকে এ কথা বলেছেন রেডক্রসের একজন কর্মকর্তা।
চীন-নেপাল সীমান্তের কাছে পানি বেড়ে একটি হ্রদের সৃষ্টি হয়েছে। হ্রদটির পানি উপচে পড়তে পারে বলে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। বেইজিং থেকে বিবিসির সাংবাদিক লরা বিকার এ তথ্য জানিয়েছেন।
রয়টার্স ও কাঠমান্ডু পোস্ট জানায়, দুর্যোগের কারণ নিয়ে এখনো বিশ্লেষণ চলছে। তবে স্যাটেলাইটের ছবি বিশ্লেষণ করে বিজ্ঞানীরা বলছেন, নেপালের লাংটাং লিরুং পর্বতের উত্তর ঢাল থেকে বিপুল পরিমাণ বরফ ও পাথরের ধস নেমে লহেন্দেখোলা নদীতে পড়ে। এতে লহেন্দে নদীর প্রবাহ সাময়িকভাবে আটকে গিয়ে একটি প্রাকৃতিক বাঁধ তৈরি হয়। পরে সেই বাঁধ ভেঙে বিপুল পানি, বরফ, পাথর ও কাদার স্রোত প্রবল বেগে ভাটির দিকে নেমে আসে।
প্রাণে বাঁচতে ফের ছুটছে নেপাল-তিব্বতের মানুষ
নেপাল ও চীনের তিব্বত সীমান্তে ভূমিধসে সৃষ্ট একটি কৃত্রিম হ্রদের পানি উপচে পড়তে শুরু করায় ভাটি অঞ্চলে নতুন করে বিধ্বংসী বন্যার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে গতকাল শুক্রবার সীমান্তসংলগ্ন দুই দেশেই উদ্ধার তৎপরতা সাময়িকভাবে স্থগিত ঘোষণা করা হয়েছে। নদীর পানি আশঙ্কাজনক হারে বৃদ্ধি পাওয়ার শঙ্কায় নেপালের রাসুয়া জেলাসহ ঝুঁকিপূর্ণ নিম্নাঞ্চলের বাসিন্দারা ঘরবাড়ি ছেড়ে উঁচু পাহাড়ে আশ্রয় নিতে শুরু করেছেন।
হ্রদটির প্রাকৃতিক বাঁধ ভেঙে বড় ধরনের জলচ্ছ্বাসের আশঙ্কায় চীনের সব উদ্ধারকর্মী ও প্রয়োজনীয় যানবাহনকে নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে বলে দেশটির রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম সিসিটিভি নিশ্চিত করেছে। নেপাল অংশেও উদ্ধার তৎপরতা পুরোপুরি বন্ধ রাখার কথা জানিয়েছে দেশটির সেনাবাহিনী। চীনা প্রকৌশলীদের তথ্যানুযায়ী, শুক্রবার হ্রদটিতে আটকে থাকা পানির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে প্রায় ২৫ লাখ ঘনমিটারে, যা আগের দিনের হিসাবের চেয়ে অনেক বেশি। সম্ভাব্য বিপর্যয় ঠেকাতে আকাশপথে ড্রোনের মাধ্যমে হ্রদের ত্রিমাত্রিক নকশা তৈরি করে সার্বিক পরিস্থিতি নজরদারি করছে চীনের একটি বিশেষজ্ঞ দল।
নেপালের রাসুয়া জেলার জ্যেষ্ঠ সরকারি কর্মকর্তা নরেন্দ্র পারিয়ার জানিয়েছেন, হ্রদের পানি বৃদ্ধির পর স্থানীয় জনপদে জরুরি সতর্কবার্তা পাঠানো হয়েছে এবং নদীতীরবর্তী অঞ্চলে পানির উচ্চতা ক্রমেই বাড়ছে। অন্যদিকে চীনের জিরং কাউন্টিতেও ধ্বংসস্তূপ জমে থাকায় গতকাল শুক্রবার পর্যন্ত সীমান্ত পারাপার এলাকায় পৌঁছাতে পারেননি চীনা উদ্ধারকর্মীরা। সিসিটিভির তথ্য অনুযায়ী, তিব্বতের এই অংশে অন্তত তিনজন নিহত হয়েছেন এবং ২৬০ জন বিদেশি নাগরিকসহ নিখোঁজ রয়েছেন ৫৫৮ জন।
হিমালয় অঞ্চলের এই ভয়াবহ প্রাকৃতিক দুর্যোগ মোকাবিলায় নেপালকে সব ধরনের জরুরি সহায়তা দেওয়ার প্রস্তাব দিয়েছেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। তিনি এই পরিস্থিতিকে অভূতপূর্ব উল্লেখ করে বলেন, ‘এমন বিধ্বংসী রূপ আগে কখনো দেখা যায়নি, যেখানে অত্যন্ত মজবুত ও সুনির্মিত ভবনগুলো টুথপিকের মতো নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে। এটি অত্যন্ত ভয়াবহ এক দুর্যোগ। আমরা সেখানে সহায়তা পাঠাচ্ছি এবং দেশটির নেতাদের জানিয়ে দিয়েছি যে তাদের প্রয়োজনে যা চাওয়া হবে, আমরা তা-ই সরবরাহ করব।’
পাহাড়ে আটকে আছে ৫০ লাখ ঘনমিটার পানি
নেপালের পার্বত্য এলাকায় নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ আটকে তৈরি হয়েছে একটি বড় জলাধার। এরই মধ্যে সেখানে জমেছে প্রায় ২০ লাখ ঘনমিটার পানি। আগামী তিন দিনে আরও ৩০ লাখ ঘনমিটার পানি ঢোকার আশঙ্কা রয়েছে। ফলে পানির পরিমাণ ৫০ লাখ ঘনমিটারে পৌঁছাতে পারে। এতে অস্থায়ী বাঁধটি ভেঙে যাওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে বলে সতর্ক করেছে চীনা কর্তৃপক্ষ।
কাঠমান্ডু পোস্টের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বৃহস্পতিবার সকালে জলাধারটিতে প্রায় ২০ লাখ ঘনমিটার পানি জমেছিল। চীনের পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের হিসাবের বরাত দিয়ে চীনা রাষ্ট্রীয় সম্প্রচারমাধ্যম চায়না সেন্ট্রাল টেলিভিশন বা সিসিটিভি জানিয়েছে, আগামী তিন দিনে সেখানে আরও প্রায় ৩০ লাখ ঘনমিটার পানি প্রবেশ করতে পারে।
পানি বাড়লে ঝুঁকি কতটা
পানির পরিমাণ বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে অস্থায়ী বাঁধের ওপর চাপও বাড়ছে। ফলে সেটি ভেঙে গেলে বিপুল পরিমাণ পানি একসঙ্গে নিচের দিকে নেমে আসতে পারে। এতে নদীর আশপাশের জনবসতি ও অবকাঠামো নতুন করে ঝুঁকিতে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে।
চীনা কর্তৃপক্ষ এরই মধ্যে জলাধারটির পরিস্থিতি নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ করছে। বাঁধ ভেঙে গেলে পানির প্রবাহ কোন দিকে এবং কীভাবে ছড়িয়ে পড়তে পারে, তা বোঝার জন্য বিভিন্ন সম্ভাব্য পরিস্থিতি নিয়ে সিমুলেশনও চালানো হচ্ছে। একই সঙ্গে জরুরি উদ্ধার তৎপরতার প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।
কোথায় তৈরি হয়েছে জলাধারটি
নতুন জলাধারটি তৈরি হয়েছে নেপালের ছোটচেনখোলা ও পুরেপু সাংপো নদীর মিলনস্থলের কাছে। নদী দুটির উৎপত্তি তিব্বতে। পরে তারা একসঙ্গে নেপালে প্রবেশ করেছে। নেপালে এই নদী ভোতে কোশি নামে পরিচিত।
ভোতে কোশি নদী ত্রিশূলী নদীর ওপরের দিকের অন্যতম প্রধান উপনদী। ফলে নতুন তৈরি হওয়া জলাধারটির পানির গতিবিধি এবং বাঁধের স্থায়িত্ব নিয়ে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে।
আগের বন্যার পরই নতুন ঝুঁকি
নতুন জলাধার নিয়ে এই সতর্কতা এসেছে নেপাল ও চীন সীমান্তবর্তী এলাকায় ভয়াবহ বন্যার মাত্র এক দিন পর। বুধবার সকালে নেপালের রাসুয়া জেলায় ভোতে কোশি নদীতে আকস্মিক বন্যা দেখা দেয়। তিমুরে ও স্যাফ্রুবেশি এলাকার ওপর দিয়ে প্রবল স্রোত বয়ে যায়।
ওই ঘটনায় সড়ক, সেতু, ভবনসহ বিভিন্ন অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত হয়। পরে বন্যার পানি নদীর নিম্নপ্রবাহ ধরে ত্রিশূলী নদীর দিকে চলে যায়।
বর্তমানে দুর্গত এলাকায় নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধানে উদ্ধারকারী দল কাজ করছে। নদীর নিম্নপ্রবাহের কয়েকটি এলাকায় মরদেহও উদ্ধার করা হয়েছে। আরও বন্যার ঝুঁকি বিবেচনায় গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি মহাসড়কে চলাচল সীমিত করা হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদেরও নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়া হয়েছে।
উদ্ধারকাজেও বাড়ছে জটিলতা
নতুন জলাধার তৈরি হওয়ায় আগের দুর্যোগের পর চলমান উদ্ধার তৎপরতার ওপরও বাড়তি চাপ তৈরি হয়েছে। অস্থায়ী বাঁধ ভেঙে গেলে আকস্মিকভাবে বিপুল পানি নেমে আসতে পারে। এতে নদীর আশপাশের এলাকায় নতুন করে বন্যার পরিস্থিতি তৈরি হওয়ার পাশাপাশি উদ্ধার অভিযানও আরও কঠিন হয়ে পড়তে পারে।
চীনা কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, জলাধারটির পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ অব্যাহত থাকবে। একই সঙ্গে পানির প্রবাহ ও নদীর পরিস্থিতি নিয়ে জলবিদ্যাগত বিশ্লেষণ চালানো হবে। সম্ভাব্য জরুরি উদ্ধার ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ কার্যক্রমের জন্যও প্রস্তুতি নেওয়া হচ্ছে।