যুদ্ধযুক্তরাষ্ট্র যদি আবারও নতুন করে হামলা চালায়, তাহলে এই যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্যের আঞ্চলিক সীমানা ছাড়িয়ে আরও দূরে ছড়িয়ে দেওয়ার হুমকি দিয়েছে ইরান। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে পুনরায় সামরিক অভিযান শুরুর সিদ্ধান্ত থেকে মাত্র এক ঘণ্টার দূরত্বে ছিলেন বলে জানানোর পর গতকাল বুধবার ওই হুমকি দিয়েছে তেহরান।ইরানের বিরুদ্ধে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের ‘অপারেশন এপিক ফিউরি’ স্থগিত করে যুদ্ধবিরতি ঘোষণার পর ছয় সপ্তাহ পেরিয়ে গেছে। যুদ্ধ অবসানের আলোচনাও বর্তমানে অনেকাংশে স্থবির হয়ে পড়েছে।চলতি সপ্তাহে যুক্তরাষ্ট্রের কাছে একটি নতুন প্রস্তাব জমা দিয়েছে ইরান। তবে এই প্রস্তাবের যেসব বিবরণ প্রকাশ্যে এসেছে, তাতে ট্রাম্পের পূর্ব-প্রত্যাখ্যাত শর্তগুলোরই পুনরাবৃত্তি দেখা গেছে। এর মধ্যে রয়েছে, হরমুজ প্রণালির নিয়ন্ত্রণ, যুদ্ধের ক্ষয়ক্ষতি বাবদ ক্ষতিপূরণ, সব ধরনের নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, জব্দ করে রাখা তহবিল ছাড় এবং ওই অঞ্চল থেকে মার্কিন সৈন্য প্রত্যাহার।নতুন কোনও হামলা হলে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ঘাঁটি থাকা দেশগুলোতে পাল্টা আঘাত হানার হুমকি ইরান আগেই দিয়ে রেখেছিল। তবে গতকাল বুধবার তেহরান ইঙ্গিত দিয়ে বলেছে, এবার তাদের লক্ষ্যবস্তু আরও দূরবর্তী অঞ্চল পর্যন্ত বিস্তৃত হতে পারে। ইরানের রাষ্ট্রীয় গণমাধ্যমে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে দেশটির ইসলামিক বিপ্লবী গার্ড কোর (আইআরজিসি) বলেছে, ‘ইরানের ওপর যদি আবারও আগ্রাসন চালানো হয়, তাহলে এবার প্রতিশ্রুত আঞ্চলিক যুদ্ধ এই অঞ্চলের সীমানা ছাড়িয়ে বাইরেও ছড়িয়ে পড়বে।’ সর্বশেষ কূটনৈতিক তৎপরতার অংশ হিসেবে ইরানের তাসনিম নিউজ এজেন্সি বলেছে, পাকিস্তানের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তেহরানে পৌঁছেছেন। গত মাসে অনুষ্ঠিত একমাত্র দফার শান্তি আলোচনার মধ্যস্থতা করেছিল পাকিস্তান এবং দেশটির মাধ্যমেই দুই পক্ষের মধ্যে বার্তা আদান-প্রদান চলছে।রয়টার্স নিউইয়র্ক টাইমস, এক্স।

আহমেদিনেজাদকে নিয়ে গোপন

পরিকল্পনা করেছিল যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল

ইরানের সর্বোচ্চ নেতা ও শীর্ষ কর্মকর্তাদের হত্যার পর দেশটিতে নেতৃত্ব পরিবর্তনের পরিকল্পনা করেছিল যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল। সেই পরিকল্পনায় সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমাদিনেজাদকে নতুন নেতা হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছিল বলে দাবি করা হয়েছে নিউইয়র্ক টাইমসের এক প্রতিবেদনে।ইসরাইলের হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনি ও শীর্ষ কর্মকর্তারা যুদ্ধের শুরুর দিকেই নিহত হওয়ার কয়েক দিন পর যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প প্রকাশ্যে মন্তব্য করেন, ইরানের ক্ষমতা যদি ‘ভেতরের কেউ’ গ্রহণ করত, তাহলে সেটাই সবচেয়ে ভালো হতো।পরে জানা যায়, যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল যুদ্ধ শুরুর সময় এক নির্দিষ্ট ও বিস্ময়কর ব্যক্তিত্বকে সামনে রেখে পরিকল্পনা করেছিল। তিনি আর কেউই নন—ইরানের সাবেক প্রেসিডেন্ট মাহমুদ আহমেদিনেজাদ। তিনি কঠোর ইসরাইলবিরোধী ও আমেরিকাবিরোধী অবস্থানের জন্য পরিচিত।তবে মার্কিন কর্মকর্তাদের ভাষ্য, ইসরাইলিদের তৈরি সেই সাহসী পরিকল্পনা খুব দ্রুতই ভেঙে পড়ে। কর্মকর্তারা বলেন, পরিকল্পনা সম্পর্কে আহমাদিনেজাদকেও অবহিত করা হয়েছিল। তবে তিনি কী সাড়া দিয়েছিলেন, সেই বিষয়ে কিছু জানা যায়নি।তাদের এবং আহমাদিনেজাদের এক সহযোগীর উদ্ধৃতি দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, যুদ্ধের প্রথম দিনেই তেহরানে তার বাড়িতে একটি ইসরাইলি হামলায় আহমাদিনেজাদ আহত হন। হামলাটি তাকে গৃহবন্দিত্ব থেকে মুক্ত করার উদ্দেশ্যেই চালানো হয়েছিল। এরপর থেকে তাকে জনসমক্ষে দেখা যায়নি এবং তার বর্তমান অবস্থানও অজানা।আহমাদিনেজাদকে কেন ইরানের শীর্ষ ক্ষমতায় নিয়োগের চিন্তা করেছিল ওয়াশিংটন-তেল আবিব, তা এখনও অজানা।

৪২টি সামরিক বিমান-ড্রোন ধ্বংস-ক্ষতিগ্রস্ত করেছে ইরান: যুক্তরাষ্ট্র

ইরান যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্রের ৪২টি সামরিক বিমান ও ড্রোন ধ্বংস এবং ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে দাবি করেছে মার্কিন কংগ্রেসের গবেষণা শাখা ‘কংগ্রেসনাল রিসার্চ সার্ভিস’ (সিআরএস)। মার্কিন প্রতিরক্ষা দপ্তর ও সেন্ট্রাল কমান্ডের বিভিন্ন বিবৃতি এবং সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন বিশ্লেষণ করে এই তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে। তবে চূড়ান্ত ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়তে পারে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।

পেন্টাগনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, অপারেশন এপিক ফিউরি নামের এই সামরিক অভিযানে এ পর্যন্ত ওয়াশিংটনের প্রায় ২ হাজার ৯০০ কোটি মার্কিন ডলার ব্যয় হয়েছে। গত ১২ মে মার্কিন প্রতিনিধি পরিষদের এক শুনানিতে পেন্টাগনের অর্থ বিভাগের প্রধান জুলস হার্স্ট জানান, ক্ষতিগ্রস্ত যুদ্ধ সরঞ্জাম মেরামত এবং নতুন করে প্রতিস্থাপনের খরচের কারণেই যুদ্ধের ব্যয় এতটা বৃদ্ধি পেয়েছে।

কংগ্রেসনাল রিসার্চ সার্ভিসের প্রতিবেদন অনুযায়ী, ক্ষতিগ্রস্ত ও ধ্বংস হওয়া বিমানের তালিকায় রয়েছে অত্যাধুনিক এফ-৩৫এ লাইটনিং, ৪টি এফ-১৫ই স্ট্রাইক ইগল যুদ্ধবিমান, ১টি এ-১০ থান্ডারবোল্ট গ্রাউন্ড-অ্যাটাক বিমান, ৭টি কেসি-১৩৫ স্ট্রাটোট্যাঙ্কার রিফুয়েলিং বিমান, ১টি ই-৩ সেন্ট্রি এয়ারবর্ন আর্লি ওয়ার্নিং সিস্টেম (অ্যাওয়াক্স) বিমান, ২টি এমসি-১৩০জে স্পেশাল অপারেশন বিমান এবং ১টি এইচএইচ-৬০ডাব্লিউ জলি গ্রিন উদ্ধারকারী হেলিকপ্টার। এছাড়া মার্কিন বহরে সবচেয়ে বড় ধাক্কা লেগেছে ড্রোনের ক্ষেত্রে, যেখানে সর্বোচ্চ ২৪টি এমকিউ-৯ রিপার ড্রোন এবং ১টি এমকিউ-৪সি ট্রাইটন ড্রোন খোয়া গেছে।

চলতি বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ বিমান হামলার মাধ্যমে এই ইরান যুদ্ধ শুরু হয়। যুদ্ধের শুরুর দিকেই বিমান হামলায় ইরানের সর্বোচ্চ নেতা আলী খামেনিসহ বেশ কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তা নিহত হন। পরবর্তীতে এপ্রিল মাসে যুদ্ধ কিছুটা স্তিমিত হলেও দুই পক্ষের উত্তেজনা ও সংঘাত এখনো চলছে।

এদিকে মার্কিন এই প্রতিবেদন প্রকাশের পর তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন ইরানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আব্বাস আরাঘচি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম এক্স-এ দেওয়া এক পোস্টে তিনি দাবি করেন, ইরানের সশস্ত্র বাহিনীই বিশ্বের প্রথম শক্তি হিসেবে যুক্তরাষ্ট্রের গর্বের এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান ভূপাতিত করতে সক্ষম হয়েছে। একই সাথে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, গত দুই মাসের যুদ্ধ থেকে ইরান যে সামরিক অভিজ্ঞতা অর্জন করেছে, ডোনাল্ড ট্রাম্প যদি পুনরায় যুদ্ধ শুরু করেন তবে মার্কিন বাহিনীকে এর চেয়েও বড় ‘সারপ্রাইজ’ বা চমকের মুখোমুখি হতে হবে।