ঈদে মিলাদুন্নবী বা মহানবী হজরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জন্মদিন পালন নিয়ে বিশেষ বার্তা দিয়েছেন মসজিদুল হারামের ইমাম ও খতিব শায়খ ড. আবদুর রহমান আস-সুদাইস। মহানবীর (সা.) জন্মদিন পালনে সাহাবি ও পূর্বসূরী আলেমদের অনুসরণের আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। তিনি বলেছেন, নবীজি (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের প্রকৃত উপায় হলো তার সুন্নাহ অনুসরণ করা।
তিনি বলেন, কোরআন ও সুন্নাহতে মাওলিদ উদযাপনের কোনো ভিত্তি নেই। মহানবী (সা.), তার সাহাবি কিংবা খুলাফায়ে রাশেদিন কেউই তা পালন করেননি। তার ভাষায়, এটি একটি বিদআত। বর্তমানে মাওলিদ উপলক্ষে আয়োজিত বিভিন্ন অনুষ্ঠানে নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা, অপচয় ও গান-বাজনার মতো বিষয়ও দেখা যায়। নবীজি (সা.)-এর প্রতি সত্যিকারের ভালোবাসা তার সুন্নাহ অনুসরণের মাধ্যমে প্রকাশ করতে হবে, নতুন কোনো রীতি চালুর মাধ্যমে নয়।
শায়খ সুদাইস যা বলেছেন
‘মাওলিদ উদযাপনের বিধান সম্পর্কে একটি ব্যাখ্যা’ শিরোনামে এক বক্তব্যে শায়খ সুদাইস বলেন, নবীজি (সা.)-এর অনুসরণ এবং দ্বীনের মধ্যে নতুন কিছু সংযোজন থেকে বিরত থাকার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে মুসলমানদের। এ প্রসঙ্গে তিনি কোরআনের আয়াত উদ্ধৃত করেন, ‘হে মুমিনগণ, তোমরা আল্লাহর আনুগত্য করো, রাসুলের আনুগত্য করো এবং তোমাদের মধ্যে যারা দায়িত্বশীল তাদের আনুগত্য করো। কোনো বিষয়ে তোমাদের মধ্যে মতবিরোধ হলে তা আল্লাহ ও রাসুলের দিকে ফিরিয়ে দাও।’
মহানবী (সা.)-এর একটি হাদিস উদ্ধৃত করে তিনি আরও বলেন, ‘ ‘সাবধান! তোমরা নতুন আবিষ্কৃত বিষয়গুলো হতে বেঁচে থাকো; কারণ, প্রতিটি নতুন আবিষ্কৃত বিষয় বিদ‘আত। আর প্রত্যেক বিদআত গোমরাহী, আর প্রত্যেক গোমরাহীর গন্তব্য জাহান্নাম’। আরেক হাদিসের কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে যে আমার পর জীবিত থাকবে, সে অনেক মতভেদ বা অনৈক্য দেখবে। সুতরাং তোমরা আমার সুন্নত ও সুপথপ্রাপ্ত খুলাফায়ে রাশেদীনের রীতিকে আঁকড়ে ধরবে এবং তা দাঁত দিয়ে মজবূত করে ধরে থাকবে। আর তোমরা দ্বীনে নব উদ্ভাবিত কর্মসমূহ (বিদআত) থেকে বেঁচে থাকবে। কারণ, প্রত্যেক বিদআতই ভ্রষ্টতা।’
আস-সুদাইস ধর্মীয় বিষয়ে নতুন কিছু সংযোজনের ব্যাপারে সতর্ক করে সাহাবিদের দেওয়া বক্তব্যও উল্লেখ করেন। আবদুল্লাহ ইবনে মাসউদ (রা.) বলেন, ‘অনুসরণ করো, নতুন কিছু উদ্ভাবন করো না। তোমাদের জন্য যথেষ্ট করে দেওয়া হয়েছে। পূর্বের পথ দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরো, সেটিই তোমাদের জন্য যথেষ্ট।’
ওমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর একটি বক্তব্যও তিনি উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ‘প্রত্যেক বিদআতই ভ্রষ্টতা, মানুষ সেটিকে ভালো মনে করলেও।’
এ ছাড়া ইমাম ইবনে তাইমিয়্যার বক্তব্যও তুলে ধরেন আস-সুদাইস। ইবনে তাইমিয়্যা বলেন, ‘শরিয়তে ভিত্তি নেই, এমন কোনো সময়কে যদি ধর্মীয় উপলক্ষ হিসেবে গ্রহণ করা হয়—যেমন রবিউল আউয়াল মাসের এমন রাতগুলো উদযাপন করা, যেগুলোকে তারা নবীর জন্মদিন বলে—তাহলে তা বিদআত। নেককার পূর্বসূরিরা তা পালন করেননি। মাওলিদের জন্য সমবেত হওয়ার মধ্যে কোনো ধর্মীয় কল্যাণ নেই; বরং এতে খ্রিস্টানদের রীতির সাদৃশ্য রয়েছে।’
শায়খ সুদাইস বলেন, রবিউল আউয়াল মাসে আয়োজিত মাওলিদ উদযাপনগুলোতে নাচ-গান, খাওয়া-দাওয়া এবং মাহরাম নন—এমন নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশার মতো বিষয় যুক্ত হয়েছে। এসব অনুষ্ঠানে অংশ নেওয়া ব্যক্তিরা মনে করেন, তারা নবীজি (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করছেন। কিন্তু বাস্তবে তারা এমন কিছু রীতি অনুসরণ করছেন,নবীজি (সা.) যার নির্দেশ দেননি।
তিনি বলেন, নবীজি (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশের প্রকৃত পথ হলো তার সুন্নাহ অনুসরণ করা। এ প্রসঙ্গে তিনি কোরআনের আয়াত উদ্ধৃত করেন, ‘বলুন, তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবাসো, তাহলে আমার অনুসরণ করো। আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন এবং তোমাদের পাপ ক্ষমা করবেন।’
মুসলমানদের প্রতি বার্তা
বক্তব্যের শেষ দিকে মুসলমানদের উদ্দেশে সরাসরি বার্তা দেন আস-সুদাইস। তিনি বলেন, ‘তোমাদের নিজেদের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো। এসব বিদআত ও ভ্রষ্টতা পরিত্যাগ করো। তোমাদের নবীর সুন্নাহ দৃঢ়ভাবে আঁকড়ে ধরো। ইসলাম অপরিচিত অবস্থায় শুরু হয়েছিল এবং আবারও অপরিচিত হয়ে ফিরে আসবে। তাই অপরিচিতদের জন্য সুসংবাদ।’
সূত্র : দ্য ইসলামিক ইনফরমেশন