ফরিদ সাইদ

জনপ্রিয় ছড়াকার মানসুর মুজাম্মিল ১৯৬৬ সালের ৩০ জুলাই চাঁদপুর জেলার শাহরাস্তি উপজেলার দশনাপাড়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। দীর্ঘদিন অসুস্থ থেকে ১২ এপ্রিল ২০২৬ রোববার সকাল সারে চারটায় হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৬০ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। মৃত্যুকালে তিনি স্ত্রী ১ ছেলে ১ কন্যা এবং অসংখ্য গুণগ্রাহী রেখে গেছেন। পোড়খাওয়া জীবন সংগ্রামী কবি ছড়াকার ও সংগঠক মানসুর মুজাম্মিল একজন নিবেদিত ছড়া সাহিত্যিক ও পরিচ্ছন্ন মনের মানুষ হিসেবে সাহিত্যের নানান শাখায় অবদান রেখে গেছেন। তিনি বাংলা একাডেমির সদস্য ও বাংলাদেশ লেখক সমিতি, নন্দিনী সাহিত্য ও পাঠচক্র, গানের কবি প্রাণের কবি নজরুলসহ বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সাথে জড়িত ছিলেন। তাঁর প্রকাশিত ১০টি ছড়াগ্রন্থ তাওয়ায় জ্বলা রুটি, সোনার বরণ মেয়ে, চাঁদের হাসি,তাজা খুন, এক ব্যাগ অফিসার, হারিয়ে যাবার দিন, সবার সাথে আছি, পা চালিয়ে যাও, দশ আকাশ, সুগন্ধি গাছের কাছে ছড়াগ্রন্থ প্রকাশ হয়েছে।

আমরা একসময় জিগাতলা টেনারী মোড় ছিলাম। সেই ১৯৮৫ সাল থেকে মানসুর মুজাম্মিল ভাইয়ের সাথে আমার পরিচয়। জিগাতলা কলোনি মসজিদের ইমাম ও খতিব আমার খালু মাওলানা কাজী জালাল উদ্দীন। আসর-মাগরিবের নামাজের সময় প্রায়ই মসজিদে মানসুর মুজাম্মিল ভাইয়ের সাথে দেখা হতো। কবি ও সংগঠক সায়েদ আতিক নকীব ভাইও তখন জিগাতলা ছিলেন। নকীব ভাই দৈনিক মিল্লাত পত্রিকার সাহিত্য সম্পাদক ছিলেন। কিশোর কাফেলা নামক সাহিত্য সংগঠন করতেন। একসাথে মতিঝিলে অনেক প্রোগ্রাম করেছি। নকীব ভায়ের ভাড়া বাসার বারান্দায় মাঝে-মাঝে কিছুদিন আড্ডা হয়েছে। কয়েক বছর পর মানসুর মুজাম্মিল ভাই টেনারী মোড় থেকে বাসা পরিবর্তন করেন। যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। পরবর্তীতে মগবাজার দেখা হয়। আমাকে বলেন চেনা চেনা লাগে। আমি ভাইয়ের একটি ছড়া মুখস্থ বলাতে আমাকে জড়িয়ে ধরেন। ছড়াটি লিখে ছিলেন তৎকালীন ডিসি পরবর্তী সচিব

ওয়াহিদুজ্জামান মোল্লাকে নিয়ে-

ছড়াটি যতোটা মনে পড়ে-

ওহিদ জামান মোল্লা

খাবো রে তোর কল্লা

ছেড়ে দিব বল্লা

করবি হল্লা-হল্লা।

এরপর থেকে আবার একসাথে পথ চলা। কতো কথা, কতো স্মৃতি, দীর্ঘদিনের পথের সাথী প্রিয় ছড়াকার মানসুর মুজাম্মিল ভাই।

মানসুর মুজাম্মিল ভাইয়ের কয়েকটি ছড়ার কথা না বললেই নয়-

১।

পাখিরে

তোর জীবন বড়ো সোজা

আমার জীবন

আমার কাছে

পাহাড় সমান বোঝা।

২।

হেঁটে যায়

হেঁটে যায় হাঁটে রমারায়

এর কাছে ওর কাছে শুধু ক্ষমা চায়।

কী যে দোষ

কী যে দোষ কে জানে।

যার সাথে রেগেছিলো সে জানে।

৩।

আজকে আমার

হারিয়ে যাবার দিন

গাঁয়ের কাছে মায়ের কাছে আমার অনেক ঋণ।

৩।

মল্লিকা

মিথ্যা কথা বল্লি কা

না বলে তুই পরের জিনিস ধল্লি কা।

৪।

সৎ লোক দিতে পারে

গোলাপের গন্ধ

দিতে পারে ভালোবাসা, কবিতার ছন্দ।

৫।

সুগন্ধি গাছের কাছে

চলো ছুটে যাই

তুমি তো রানি-ই হবে

আমি তো রাজাই।

৬।

বন্ধু হয়ে থাকিস ওরে

বন্ধু হয়ে থাকিস

আমার যখন আঁধার জীবন একটু কাছে রাখিস

আদর-সোহাগ দিয়ে আমায়

একটু কাছে ডাকিস

আমি যখন থাকবো না রে আমার ছবি আঁকিস।

নিজস্ব ঢঙে এমন অসংখ্য ছড়া নির্মাণ করেছেন।

ভ্রমণপিয়াসী মানুষ ছিলেন মানসুর মুজাম্মিল ভাই। মনের ভেতর জমাটবদ্ধ কষ্ট নিয়ে ঢাকা শহর চষে বেড়িয়েছেন। প্রায়ই একসাথে যোহর আদায় করে খাবার খেতাম। অর্থ কষ্টে মানসুর মুজাম্মিল ভাই সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। অর্থ কষ্ট পারিবারিক সুখ নষ্ট করে দেয়। মনের ভেতর কষ্ট চেপে হাসিখুশি থাকার চেষ্টা করতেন। বাংলাদেশ শিশু কল্যাণ পরিষদে চাকরি করতেন। চাকরি ছেড়ে দেওয়ার পর ভাইয়ের জীবন কঠিন হয়ে ওঠে। এরপর কোর্টে কিছুদিন যাতায়াত করেছেন। জীবনকে এগিয়ে নেওয়ার জন্য আমেরিকান লাইফ ইন্সুইরেন্স কোম্পানীর সাথে কিছুদিন কাজ করেছেন। অর্থ কষ্ট তথাপি তাঁর পিছ ছাড়েনি! বাসায় তাঁর ভালো লাগতো না। সকাল হলেই কাজ থাক না থাক বাইরে বেরিয়ে আসতেন। আমাকে কয়েকবার বলেছেন- ভাই আমাকে একটা বাসা ঠিক করে দিন। আমি একা থাকতে চাই। ভাইয়ের পরিবারতো ঢাকা থাকেন, তাই আমি ভাইকে বুঝিয়ে নিরুৎসাহিত করেছি। দুঃখ ভুলে থাকার জন্য এদিক-সেদিক ছুটেছেন। মানসুর ভাইকে নিয়ে অনেক জায়গায় ঘোরাঘুরি করেছি। আমার কয়েক বন্ধু সেলিম, মনির, কাশেমসহ মানসুর ভাইকে নিয়ে রাজশাহী সফর করেছি। রাজশাহী পদ্মার চরে নন্দিনী সাহিত্য পাঠচক্রের লেখক কবিদের নিয়ে ভ্রমণ ও কবিতা পাঠ করেছি। আবার বরিশাল হয়ে বাগেরহাট, মংলা পশুর নদীতে মংলার লেখক কবিদের নিয়ে ট্রলারে কবিতা পাঠ করেছি। এরপর সুন্দরবন ভ্রমণ। গাজীপুর সাফারি পার্কে ভ্রমণ। সুন্দরবনের ভেতর গান কবিতা সাহিত্য আড্ডা করেছি। টইটই সম্পাদক ও প্রকাশক কবি সাহেদ বিপ্লব’র বাড়ি ও এলাকা ফরিদপুর ভ্রমণ করেছি। ফরিদপুরের মধুখালি এলাকায় গানের কবি প্রাণের কবি নজরুল সংগঠনের পক্ষ থেকে শীতবস্ত্র বিতরণ ও মধুখালি প্রেসক্লাবে সাহিত্য সভা করেছি। ঢাকা ও ঢাকার আশেপাশে নানান জায়গায় নানান সাহিত্য সংগঠনের সাহিত্য সভায় একত্রে অংশগ্রহণ করেছি।

এর মাঝে ২১ সালের সেপ্টেম্বর মাসে একদিন রাতে ফোন পেলাম মানসুর মুজাম্মিল ভাই অসুস্থ হয়েছেন। হাসপাতালে আছেন। সকালে ছুটে গেলাম ঢাকাস্থ পান্থপথ সমরিতা হাসপাতালে। যেয়ে দেখি মস্তিষ্কে রক্তক্ষরণ জনিত কারণে ভাইয়ের একপাশে প্যারালাইজড হয়ে গেছে। চোখের পানি ধরে রাখতে পরিনি। সাথে ছিলেন কবি মুহাম্মদ ইসমাঈল ভাই। মানসুর ভাইয়ের ছেলেসহ আমরা ৩ জন আল্লাহর দরবারে হাত উঠিয়ে ভাইয়ের সুস্থতা কামনায় দোয়া কেরে বিদায় নিলাম। এরপর বাংলাদেশ লেখক সমিতির পক্ষ থেকে কবি নূর আল ইসলাম ভাইয়ের আরামবাগের অফিসে সিএনসি’র মাহবুবুল হক ভাইকে আহবায়ক ও আমাকে সদস্যসচিব করে ২৫ সদস্য বিশিষ্ট মানসুর মুজাম্মিল চিকিৎসা সহায়তা কমিটি করা হয়। এতে যতটুকু মনে পড়ে কবি রানা জামান, কথাসাহিত্যিক রুহুল আমিন বাচ্চু, কবি ও সাংবাদিক আলম হোসেন, লেখক গবেষক এমদাদুল হক চৌধুরী, ছড়াকার আতিক হেলাল, কবি রবিউল মাশরাফী, কবি ওয়াহিদ আল হাসান, কবি মুহাম্মদ ইসমাঈল, কবি জাফর পাঠান, কবি গিয়াস হায়দার, কবি তাসনীম মাহমুদ, কবি খান কাওসার কবিরসহ আরও অনেকেই ছিলেন। এতে আমাদের লেখক কবি বন্ধুরা যথাসম্ভব এগিয়ে আসেন। তখন মানসুর ভাই অনেক দিন হাসপাতালে ছিলেন। পরে বাসায় আনা হয়। এরপর সিএনসির মাহবুবুল হক ভাইসহ অনেকেই মানসুর ভাইকে সহযোগিতা করেছেন। ভাইকে বাসায় মাঝেমাঝে দেখে এসেছি। আমার মতো অনেকে মাঝে-মাঝে ভাইকে দেখতে এসেছেন। অসুস্থ অবস্থায় কয়েকটি বছর কষ্ট করেছেন। গত ১১ এপ্রিল শনিবার সকালে কথাসাহিত্যিক পার্থ কায়সার ভাই আমাকে কল করে জানান মানসুর মুজাম্মিল ভাই হাসপাতালে চিকিৎসাধীন আছেন। আমি মানসুর ভাইয়ের নাম্বারে কল করি। ভাবি রিসিভ করেন। কোথায় কীভাবে আছেন বিস্তারিত বলতে পারেন না। ভাইয়ের ছেলে মাশরুরকে কল করে জানতে পারি ১০ এপ্রিল শুক্রবার মানসুর ভাইয়ের ডায়বেটিস বেড়ে যায়, প্রেসার কমে যায় সেইসাথে হাতপা ঠান্ডা হয়ে যায়। তখন বাসার নিকটস্থ চিকিৎসকের পরামর্শ নিয়ে রাতে হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়।

শারীরিক অবস্থার অবনতি দেখে দ্রুত আইসিইউতে নেওয়ায় হয়। এখানেই ১২ এপ্রিল রোববার সকাল সারে চারটায় আমাদের প্রিয় ছড়াকার দুনিয়ার সফর শেষ করেন। দ্রুত হাসপাতালে প্রয়োজনীয় কাজ শেষ করে ১২ এপ্রিল রোববার সকাল সারে নয়টায় ঢাকাস্থ গোড়ান ছাপড়া মসজিদের প্রথম জানাজা এবং গ্রামের বাড়ি চাঁদপুর জেলার শাহরাস্তি উপজেলার দশনাপাড়া গ্রামে দ্বিতীয় জানাজা ও দাফনের মাধ্যমে পোড়খাওয়া জনপ্রিয় ছড়াকার মানসুর মুজাম্মিল ভাইয়ের দুনিয়ার অধ্যায়ের সমাপ্তি হলো। দুনিয়ার কষ্ট শেষে আল্লাহ মানসুর মুজাম্মিল ভাইয়ের পরকালীন জীবন শান্তিময় করে দিন।