শফিকুল আলম টিটন

সকাল থেকেই মনটা ভালো নেই তৃপ্তির। সেই কাক ডাকা ভোর থেকে ঝম ঝম করে বৃষ্টি পরেই চলেছে । থামার কোন লক্ষণ নেই। অবিরাম বৃষ্টি তৃপ্তিকে তেতিয়ে তুলল। একবার টিভি ছেড়ে কার্টুন দেখতে থাকে। গোপাল ভাঁড় ওর খুব পছন্দের কার্টুন। একবার মা’র পেছন পেছন ঘুর ঘুর করতে থাকে। বিষয়টা মায়ের চোখ এড়িয়ে যায়নি। ওর চঞ্চলতা দেখে মা বলেই বসলো,

-কিরে অমন পেছন পেছন ঘুরছিস কেন ?

-তৃপ্তি আনমনা ছিল। সম্বিত ফিরে পেয়ে মায়ের দিকে কোমল চাহনিতে ফিরে তাকায়।

-মা, ও মা। বাবা কখন গরু নিয়ে আসবে।বাবা রাতে কখন গেছে হাটে ?

-ও মা বল না ?

-আসবে মা। চলে আসার সময় হয়ে এসেছে।

- বাবা কি লাল গরু নিয়ে আসবে মা? - জানতে চায় তৃপ্তি। নাকি সাদা গরু ?

- জানি না মা ? সেই রাত ১২ টার পরে রওয়ানা দিয়েছে পশুর হাটে। কখন আসে ?

এই বলেই থেমে যায় মা। তৃপ্তির চোখে মুখে তৃপ্তির হাসি। অনাবিল হাসি ওর চোখে মুখে লুটোপুটি খায়। বলে, মা, জানো কি হয়েছে?

-কি হয়েছে মা ?

-কাল রাতে নাবিলাদের বাসায় গরু এনেছে? এত্ত বড় গরু। বলতে বলতে দুহাত দিয়ে ইশারায় দেখাতে থাকে তৃপ্তি। আনার পরে ও আমাকে বলে গেছে ?

-কি বলেছে মা।

-ওদের গরু নাকি হাটের সবচেয়ে বড় গরু। আর খুব চালাক।

-মা এবার হো হো করে হেসে ওঠে। নাবিলাদের গরু চালাক।

মায়ের হাসি দেখে তৃপ্তির মন খারাপ হয়ে যায়। বলে, জানো মা, ও আর কি বলেছে?

-কি বলেছে ? - আগ্রহ সহকারে জানতে চায় মা।

-বলেছে, বাবা যে গরুটা কিনবে সেটা হাবলা গরু হবে?

-হাবলা? -মা আবারো হেসে ওঠে তৃপ্তির কথা শুনে।

হঠাৎ বাবার কণ্ঠস্বর ভেসে আসলো মা আর তৃপ্তির কানে। শোনা মাত্রই ছুটে গেলো সদর দরজার দিকে। গ্যারেজের ভেতরে বাঁধা হয়েছে গরুটাকে। নিকষ কালো ষাঁড় গরু। আপাদমস্তক সমান ও মোটা তাজা। বেশ উঁচু গরুটা। কেউ কাছে গেলে ঘাড় বাঁকিয়ে শিং দুটোকে সামনে এগিয়ে নিয়ে যায়। খুব সুন্দর করে সাজানো হয়েছে গরুটাকে। গৃহস্থির গরু। খুব যত্ন সহকারে লালন পালন করা হয়েছে। মাথা থেকে মুখের ওপর অব্দি রঙিন পলিতে কারুকাজের আঁকিবুঁকি। গলায় মালা। শিং দুটোকে ফুল দিয়ে সাজানো হয়েছে।

হাটে যখন প্রবেশ করেছে তৃপ্তির বাবা তখন রাত দুইটা ছুঁই ছুঁই। যেন আলো আধারির খেলা। টানা বৃষ্টিতে পায়ে হাঁটা পথ যেন পিচ্ছিল হয়ে উঠেছে। গরুর মালিকদের কেউ কেউ খুব আয়েশ করে ঘুমচ্ছে। মাঠের ওপর ছাউনি দিয়ে বাঁশ দিয়ে ভাগ ভাগ করে দিয়েছে ইজারাদার। আর সেই সুবাদে গরুর রশি দালালদের হাতে ছেড়ে দিয়ে একটু খানি ঘুমিয়ে নেয়া। এই গরু, সেই গরু, লাল গরু কালো গরু, ছোট গরু, বড় গরু- সব ধরনের গরু এবার হাটে উঠেছে। পর্যাপ্ত গরু হাটে উঠলেও দাম খুব চড়া। দু একটা গরু দেখে দাম যাচাই করে নিয়েই বুঝতে পেরেছে তৃপ্তির বাবা। তবু হাল ছাড়লে তো চলবে না। সারারাত গরু আর দাম পরখ করে দেখতে দেখতে অবশেষে তৃপ্তির হাসি ফুটল তৃপ্তির বাবার মুখে।

কালো ষাঁড় গরু। প্রথম দেখাতেই পছন্দ হয়ে যায়। বেশ তরতাজা লাগছে। দেখেও সুস্থ মনে হচ্ছে। কিছুক্ষণ পর পর গরুটা মাথা ঝাঁকিয়ে মশা মাছি তাড়াচ্ছে। আনমনে হেসে উঠলো তৃপ্তির বাবা। ফরমালিন মুক্ত নিখুঁত গরু। একগাল হেসে এগিয়ে গেলেন তিনি বিক্রেতার কাছে।

তৃপ্তির মা’কে দেখে বাবা বললেন, কই গো। একটু চায়ের পানি চাপাও।

-চাপিয়েছি। বলতে বলতে ফ্যানের সুইচটা অন করে দেয়। তুমি এখন এই চেয়ারে বসে জিরিয়ে নাও। আমি দেখছি। তৃপ্তির বাবা টাকা দিয়ে বিদায় করে দেয় রাখালকে। রাখাল সালাম দিয়ে বের হয়ে যায় গ্যারেজ থেকে। মা হঠাৎ তৃপ্তিকে ডেকে ওঠে-

- রান্নাঘরে রাখা ভাতের ফেনটুকু নিয়ে আয় তো মা?

-আনছি মা।

-মাকে ভাতের মাড় দিয়ে বাবার কাছে গিয়ে দাঁড়ায় তৃপ্তি।

-কিছু বলবি মা?

-এতো দেরি হল কেন বাবা ? গরুগুলো তোমাকে আসতে দিচ্ছিল না ?

-একগাল হেসে ওঠে বাবা। তৃপ্তি কাছে ডেকে নিয়ে কপাল আর কপোল জুড়ে চুমু দেয়।

-হ্যারে মা। হাটে গরু আর ছাগলের সমাগম ঘটেছে। হাটার জায়গাটি পর্যন্ত কম। তারপর কোরবানি দেওয়ার জন্যে প্রয়োজন সুস্থ আর নিখুঁত গরু। তাই সব কিছু দেখে শুনেই কিনতে হয় ।

রাতে ঘুমোতে গিয়ে ঘুম আসে না তৃপ্তির চোখে। বার বার চোখের ওপর ভাসে ওদের ঈদের গরুটাকে। কালো ষাঁড় গরু।

মাকে জড়িয়ে ধরে শুয়ে আছে তৃপ্তি। মাকে বলে,

-ও মা। নাবিলাদের থেকে আমাদের গরুটা অনেক ভালো। তাই না মা ? খুব দামি।

-ছি মা। এভাবে বলতে নেই। আমরা সবাই কোরবানি দেই আল্লাহ পাক রাব্বুল আলাআমিনকে রাজি খুশী করার জন্যে। আমরা আমাদের মনের পশুকে কোরবানি দেই। কোরবানি দিলে কখনো গরুর দাম নিয়ে, কথা বলতে নেই। ভালো মন্দ বলতে নেই।

তাতে আল্লাহ পাক নারাজ হতে পারে তাই। আমরা কেন কোরবানি দেই, তাই নিয়ে একটা গল্প আছে। মন দিয়ে শোন।

মা বলতে শুরু করলেন কোরবানির গল্প। তৃপ্তি শুনতে শুনতে ঘুমের কোলে ঢলে পড়লো। তৃপ্তি ঘুমিয়ে গেলে ঠিক করে শোয়ায় দেয় মা। ততোক্ষণে তৃপ্তি সুখ নিদ্রায় স্বপ্ন দেখছে কালো ষাঁড় গরুটাকে নিয়ে।।