আব্দুস সালাম
অফিসের ব্যাগখানি স্বভাবসিদ্ধ ভঙ্গিতেই সিফাতের হাতে তুলে দিয়ে অহনা যেন হঠাৎই হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। বারান্দার কোণ ঘেঁষে, গ্রিলের ফাঁকে, সে একদৃষ্টে তাকিয়ে রইল নিচের ফুটপাথেÑÑযেখানে দাঁড়িয়ে ছিলো এক তরুণী। মেয়েটির মুখে এক অদ্ভুত প্রশান্তি, অথচ তার চোখে অপেক্ষার ছায়া। সিফাতের দেখা মিলতেই মেয়েটি এক মিষ্টি হাসি দিয়ে এগিয়ে এলো, যেন বহুকাল পরে দেখা হয়েছে এমন কাউকে। দু’জনেই আর কথা না বাড়িয়ে রিকশায় চড়ে বসল। রিকশাটা যখন মোড় ঘুরে অদৃশ্য হয়ে গেল, তখন অহনার চোখে ঝাপসা হয়ে উঠলো দৃশ্যপট। বুকের ভিতরটা কেঁপে উঠল এক বিষাক্ত আশঙ্কায়। সে নিঃশব্দে ফিরে এসে খাটের ওপর লুটিয়ে পড়ল। তার বুকের বসন ভিজে গেলো নিরবধি স্রোতে ঝরা জলধারায়।
রাত্রে সিফাত যখন ঘরে ফিরল, তখন তার মুখে সেই চিরাচরিত ক্লান্তি নেই। বরং যেন এক অভিমানী আত্মবিশ্বাস ছড়িয়ে আছে মুখমণ্ডলে। অহনা কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বলল,
Ñ “সেই মেয়েটি... কে?”
সিফাত যেন প্রশ্নটা শুনেই বিস্ময়ে বিস্ফারিত হয়ে উঠল। চোখ রাঙিয়ে, দাঁত চেপে বলল,
Ñ“সে কে, তা জানবার অধিকার তোমার নেই। সংসার করতে হলে করো, নইলে দরজা খোলাÑÑ যেদিকে খুশি চলে যাও।”
অহনার ঠোঁট কাঁপল, কিন্তু মুখ ফুটে কোনো শব্দ বেরোল না। কেবল মনে মনে ভাবলÑ “কোথায় যাবো? এই দুনিয়ায় যে আমার জায়গা কেবল এই চার দেওয়ালের ভেতরেই।”
তার চোখের সামনে ভেসে উঠল সেই পুরোনো দিনের ক্ষতচিহ্নÑ যেদিন সড়ক দুর্ঘটনায় মা-বাবা দু’জনেই চলে গিয়েছিলেন। ভাইয়ের সংসারে আশ্রয় পাওয়া সত্ত্বেও, সে যেন ছিল এক অব্যবহার্য বোঝা। অকাজের বাড়তি মানুষ। ভাবীর প্রতিটি কটুকথা প্রতিদিন তার আত্মসম্মানকে ধূলিসাৎ করে দিত, যেন অস্তিত্বটুকুই অপ্রয়োজনীয়। ভিটেমাটি বলতে ছিল কেবল এক চিলতে জমি; কিন্তু এক নারীর পক্ষে সমাজের নির্মম চোখরাঙানি সামলে সেটি আঁকড়ে থাকা ছিল প্রায় অসম্ভব।
এরপরের দিনগুলো যেন ঘড়ির কাঁটা হয়ে চলতে লাগলÑ ঠক ঠক শব্দ করে। সিফাতের কণ্ঠে অহনার জন্য আর কোনো মমতা নেই, তার চোখে নেই কোনো উষ্ণতা। ফোনে, বারান্দায়, এমনকি খাওয়ার টেবিলেও সে নির্লজ্জভাবে কথা বলে সেই মেয়েটির সঙ্গেÑ নাজিয়া। অহনা এখন জানে, মেয়েটি শহরের এক প্রসিদ্ধ শোরুমে কাজ করে।
একদিন রান্নাঘরের কাজ শেষে পানি আনতে এসে সিফাতের ফোনে চোখ পড়তেই কেঁপে উঠল অহনার হৃদয়। স্ক্রিনে ভেসে আছে নাজিয়ার হাসিমুখ ছবি, আর পাশে লেখাÑ“তোমাকে ভীষণ মিস করছি”।
সেই রাতে সিফাত যখন পাশ ফিরে ঘুমিয়ে পড়ে, অহনা নিঃশব্দে পাশের ঘরে চলে আসে। তার বুকের ভিতর এক অদ্ভুত তৃষ্ণা, এক ধরনের নিঃসঙ্গ ক্ষরণ। নিজেকে আয়নার সামনে দাঁড় করিয়ে দেখেÑ চুলে পাক ধরেছে, চোখের নিচে কালি। কিন্তু সে জানে, সময় ও বয়সের দায় শুধু নারীর ওপর চাপানো হয়। পুরুষের কখনও নিজের মুখ আয়নায় দেখতে হয় না।
পরদিন সকালে, বুকের ভিতর সব সাহস সঞ্চয় করে অহনা বলল,
Ñ“শোনো সিফাত, এতদিন চুপ থেকেছি বলে ভেবো না আমি ভাঙা আয়নার মতো পড়ে থাকব। সংসার যদি শুধু তোমার সুবিধার জন্য হয়, তবে আমি কেন থাকব এখানে? আমি মানুষ, তোমার দাসী নই। সংসার যদি শুধু তোমার খেয়ালে চলে, তবে সেটা সংসার নয়। আমার জন্য সেটা এক কারাগার। আমি কি কেবল রান্নাঘরের ধোঁয়া আর নিঃশব্দ কান্নার মধ্যে হারিয়ে যাবো?”
সিফাত দাঁত চেপে বলল,
Ñ“অহনা, তোমার এই অভিযোগ শোনার মতো সময় আমার নেই। সংসার যদি চালাতে চাও, চুপ করে থেকো। নইলে দরজা খোলাÑ যেদিকে খুশি চলে যাও।”
অহনার গলা এবার কাঁপল না, বরং নীরব অথচ দৃঢ় সুরে বলল,
Ñ“শুধু অভিযোগ নয় সিফাত। সংসার মানে দুইজন মানুষের একসঙ্গে পথচলা। তুমি যদি বারবার আমার কণ্ঠ বন্ধ করে দাও, তবে এ ঘর শুধু চার দেওয়াল হয়ে দাঁড়ায়Ñ কাচের দেয়াল, যার ভেতর থেকে আমি তোমায় দেখি, কিন্তু তুমি আমায় দেখ না। আমি শুধু ছায়া হয়ে আছি, মানুষ নই।”
সিফাত কিছুক্ষণ চুপ করে থাকল। তার চোখে বিরক্তি, অবহেলা। অথচ অহনার চোখে এবার কোনো ভয় নেই। অপমানের ভারে নুয়ে পড়া নারী আর নেইÑ বরং এক দাঁড়িয়ে ওঠা মানুষ।
কয়েক দিন পর, এক সন্ধ্যায় সিফাত অফিস থেকে ফিরে দেখে ডাইনিং টেবিলের ওপর রাখা একখানা খোলা চিঠি। কাগজের গায়ে অহনার চেনা হাতের লেখাÑ
“আমি যাচ্ছি। কোথায় যাচ্ছি, তা আমি জানি না।
কিন্তু আর থাকবো না এমন ঘরে, যেখানে আমার শুধু উপস্থিতি আছেÑ অস্তিত্ব নেই।
তুমি নাজিয়ার সঙ্গে সুখী থেকোÑ তাতে আমার কিছু এসে যায় না।
আমি এবার নিজেকে আবার গড়বো, নিজের মতো করে। Ñঅহনা”
সিফাত প্রথমে একরকম হাসলÑ হয়তো অবিশ্বাসে, হয়তো অভ্যেসে। কিন্তু সেই হাসি মিলিয়ে গেল এক দীর্ঘশ্বাসে। অহনার নীরব সংসার, দিনের পর দিন ধরে গিলে ফেলা অপমান আর না বলা কথাগুলো যেন চারদিকে প্রতিধ্বনি হয়ে উঠল। তখনই হয়তো সে বুঝলÑ নারীর নীরবতা চিরস্থায়ী নয়, অবহেলার বোঝা বইতে বইতে যখন সে সত্যিই বিদায় নেয়, তখন আর তাকে ফিরিয়ে আনা যায় না।