আনোয়ারুল ইসলাম
গ্রামের নাম হাটখোলা। এই গ্রামে দুই ভাই-বোন থাকে - ভাইয়ের নাম বর্ষ আর বোনের নাম বরণ। দু’জনের নামই যেন একসাথে মিলে নতুন কিছুর শুরু বোঝায় - ‘ বর্ষবরণ।’ বর্ষ মিশুক ও শান্ত স্বভাবের। সে আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতে খুব ভালোবাসে, আকাশের দিকে চেয়ে চেয়ে মেঘ দেখে, বৃষ্টি নামলে খুশিতে ভিজে। অন্যদিকে বরণ প্রাণবন্ত- সবসময় নতুন কিছু করতে চায়, সবাইকে একসাথে নিয়ে আনন্দ করতে ভালোবাসে।
একদিন বছরের শেষ দিনে বরণ বলল, ‘দেখো বর্ষ ভাই, কাল কিন্তু নতুন বছর শুরু। আমরা বিশেষ কিছু করব না?’
বর্ষ একটু হেসে বলল, ‘ আমরা তো প্রতিদিনই নতুন কিছুর স্বপ্ন দেখি। আবার আলাদা করে কী করব?’
বরণ মাথা নেড়ে বলল, ‘ না না, নতুন বছর মানে নতুন রূপে শুরু। সবাইকে নিয়ে আনন্দ করতে হবে। নাচতে হবে। গাইতে হবে। আরও কত্তো কী!’
তাই বরণ পুরো গ্রামে খবর দিল - পরদিন সকালে সবাই একসাথে জড়ো হবে। কেউ ফুল আনবে, কেউ গান গাইবে, কেউ গানের তালে তালে নাচবে।
পরদিন সকালে সূর্য ওঠার সাথে সাথে বরণ সবাইকে ডাকতে লাগল। গ্রাম জুড়ে উৎসবের আবহ। কিন্তু বর্ষ কোথাও নেই। যার জন্য এত আয়োজন, তাকেই খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। পাখির কণ্ঠে গান নেই, বাতাস শনশন করে না, নদীর স্রোতে ঢেউ খেলে না, মৌমাছিরা গুণগুণিয়ে গান গায় না, ফুলেরা সুবাস ছড়ায় না, প্রজাপতিরা ফুলে বসে না, কালবৈশাখী ঝড় ধরার বুকে আনাগোনা করে না, কারণ বর্ষ নেই। বরণ চিন্তায় পড়ে গেল। সে বর্ষকে খুঁজতে খুঁজতে সবুজ মাঠের দিকে গেল। বৈশাখ বরণকে দেখে বলল, ‘ বরণ তুমি এখানে ?’
‘ তুমি আমাকে কীভাবে চিনলে? ‘ বলল বরণ।
‘ আমি বৈশাখ, আমাকে সবাই চেনে। নতুন বছরের শুরুতে দেশবাসী নানা আয়োজনে আমাকে রাঙিয়ে দেয়।’ বলল বৈশাখ।
‘ ও বৈশাখ ভাই, আমি তোমাকে চিনতে পারিনি। এখন মনে পড়েছে, কত আয়োজনে একসাথে থেকেছি ‘-- বলল বরণ।
দু’জন একসাথে গল্প করতে করতে সোজা পূর্বদিকে গেল। তারা দেখতে পেল, বর্ষ একা বসে আকাশের দিকে তাকিয়ে আছে। তারা কাছে গিয়ে জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি এখানে? সবাই তোমার জন্য অপেক্ষা করছে।’
বর্ষ মৃদু স্বরে বলল, ‘ আমি ভাবছিলাম, নতুন বছর আসা মানে শুধু আনন্দ না, পুরনো ভুলগুলোও ঠিক করার সময়। আমরা কি সেটা ভাবছি।’
তারা একটু চুপ করে রইল। তারপর হাসল।
বরণ হেসে বলল, ‘তাই তো! তাহলে আমরা দুটোই করব- আনন্দ আর নতুনভাবে ভালো কিছু করার প্রতিজ্ঞাও।’
তারপর তারা একসঙ্গে গ্রামে ফিরে গেল। বরণ সবাইকে আনন্দে মাতালো আর বর্ষ সবাইকে বলল, ‘এই নতুন বছরে আমরা সবাই ভালো কাজ করব, একে অপরকে সাহায্য করব। সবাই সুখে-শান্তিতে থাকার চেষ্টা করব।’
সেই দিন থেকে গ্রামে বর্ষবরণ শুধু উৎসব নয়, একটি প্রতিজ্ঞার দিন হয়ে গেল। আনন্দের সাথে সাথে নতুন করে ভালো মানুষ হওয়ার অঙ্গীকারও।
আর বর্ষ, বরণ ও বৈশাখ রয়ে গেল সবার হৃদয়ে - নতুন বছর শুরুর তিন রঙ হয়ে।