আফসার নিজাম
বাংলা সাহিত্যের জমিনে ছড়া কেবল শিশুদের মনে রঙ লাগানোর মাধ্যম হিসেবে সীমাবদ্ধ নাই; বরং এটি সমকালীন সমাজব্যবস্থা, রাজনীতি এবং মানুষের জীবনসংগ্রামের এক শক্তিশালী আয়না হিসেবে নিজেকে হাজির করেছে। খোকা ঘুমালো পাড়া জুড়ালোর মতো ছড়া দিয়া আমাদের সাহিত্যে শিশু ও সমকালীন রাজনীতিতে হাজির থেকেছে। বাংলায় কথা কওয়ার শুরু থেইকা এই পর্যন্ত যতো কবি আসছে সবাই এই ছড়ার মধ্য দিয়া তার সমকাল ও সমাজজীবনকে দেখেছে। এই দেশে রাজনৈতিক সামাজিক ও জীবনচিন্তার ছড়া লিখিয়েদের মধ্যে মানসুর মুজাম্মিল (১৯৬৬-২০২৬) অন্যতম প্রভাবশালী ছড়াকার। তাঁর ছড়াসাহিত্যের মধ্য অত্যন্ত সচেতনভাবে সমকালীন সংকট, অর্থনৈতিক অস্থিরতা, সামাজিক অবক্ষয় এবং আধ্যাত্মিক জীবনবোধকে গাঁইথা দিছে। এই কারণে তার লেখার জমিন ছিলো সাধারণ মানুষের প্রাত্যহিক যন্ত্রণার ওপর।
ছড়াকার মানসুর মুজাম্মিলের কথা কওয়ার আগে আপনাদের সাথে আরেক কথা কই। বাংলা সাহিত্যে মুজাম্মিল নামে দুইজন কবি আছে। শুধু মুজাম্মিল বইলা আলাপ তুললে আওলাইয়া যাইতে পারে। আমাদের মুজাম্মিল ছাড়াও ‘মুজাম্মিল’ নামে আরও একজন প্রাচীন কবির তালাশ পাওয়া যায়, যিনি পঞ্চদশ শতাব্দীর মধ্যবর্তী সময়ে হাজির ছিলেন। সেই প্রাচীন কবি মুজাম্মিল প্রধানত ‘নীতিশাস্ত্রবার্তা’, ‘সায়াৎনামা’ এবং ‘খঞ্জনচরিত’ নামক তিনটি কবিতার কিতাবের জন্য বিখ্যাত ছিলেন। তাঁর রচনায় সুফিবাদ এবং নৈতিক শিক্ষার প্রাধান্য ছিলো। তিনি গৌড় সুলতান ইউসুফ শাহের সভাকবিও ছিলেন। এর বিপরীতে, আমাগো জামানার ছড়াকার মানসুর মুজাম্মিল হইলেন চাঁদপুর জেলার শাহরাস্তি উপজেলার দশনাপাড়ার ছেলে। ঢাকায় চাকুরী বাকুরি করে এইখানেই বসত গড়ছেন। তিনি দীর্ঘদিন অসুস্থ থাকার পর ১২ এপ্রিল ২০২৬ রাজধানীর হলি ফ্যামিলি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় ইন্তেকাল করেন, ইন্নালিল্লাহি ওয়াইন্নাইলাহি রাজিউন। হালজামানার মানসুর মুজাম্মিলের ছড়ায় প্রাচীন মুজাম্মিলের মতো নীতিশিক্ষা থাকলেও, তাঁর প্রেক্ষাপট সম্পূর্ণ সমসায়িক ও নাগরিক। তিনি সমকালীন বাংলাদেশের বাজার সিন্ডিকেট, নারীর মর্যাদা এবং রাজনৈতিক আন্দোলনের মতো বিষয়গুলোকে অত্যন্ত নিপুণভাবে ছড়ার ছন্দে কাঁথা সেলাই করেছেন। এই দুই কবির নামের সাদৃশ্য থাকলেও তাঁদের চিন্তা ও যুগের ব্যবধান কয়েকশ বছরের।
মানসুর মুজাম্মিলের ছড়াসাহিত্যের অন্যতম প্রধান খিলান হইলো সমকালীন অর্থনৈতিক বাস্তবতার নির্মোহ প্রকাশ। তাঁর ছড়ায় বারবার ফিরে আসছে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি এবং বাজারের অব্যবস্থাপনা। বিশেষ কইরা ‘সিন্ডিকেটের ভূত’ শিরোনামের ছড়াটি সমকালীন বাংলাদেশের বাজার পরিস্থিতির এক জ্বলন্ত দলিল। তিনি লিখেছেন, ‘অল্প কিছু রুজি করি-/বাজারে যায় সব/ঘরের ভেতর আমার কেবল- অভাব কলরব।’ এই অর্থনৈতিক সংকটের মূলে তিনি ‘সিন্ডিকেট’ নামক এক অদৃশ্য দানবকে হাজির করেছেন। তাঁর ভাষায়, “আমার পেটে হাত দিয়েছে/সিন্ডিকেটের ভূত/আমি কী আর করতে পারি- গরীব মায়ের পুত!” এখানে ‘পেটে হাত দেওয়া’ বচনটি অত্যন্ত প্রতীকী। এইটা কেবল ক্ষুধা না, বরং একজন মানুষের জীবনধারণের মৌলিক অধিকার কেড়ে নেওয়ার ইঙ্গিত দেয়। সমকালীন বাংলাদেশের রাজনীতি ও অর্থনীতিতে ‘সিন্ডিকেট’ শব্দটি সন্ত্রাসীর মতো আলোচিত। যার লগে অসৎ ব্যবসায়ীদের মতো অসৎ রাজীনিতর লোকও জড়িত থাকে। মানসুর মুজাম্মিল তাঁর ছড়ার মাধ্যমে এই জটিল অর্থনৈতিক পরিভাষাকে সাধারণ মানুষের জেহেনে স্পষ্ট কইরা তুলছেন। তাঁর ‘তাওয়ায় জ্বলা রুটি’ ছড়ার কিতাবটি এই ধরনের জীবনসংগ্রামের চিত্রায়ন হরহামেশায় দেখা যায়, যেইখানে রুটি কেবল খাদ্য নয়, বরং শ্রমিকের তপ্ত অস্তিত্বের প্রতীক হিসেবে নাজিল হইছে।
মানব সমাজে নারী একটি সংবেদনশীল বিষয়। নারীকে নিয়ে সমকালীন সমাজে কেউ পণ্য, কেউ সম্মানিত সঙ্গী হিসেবে হাজির করে। দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন বৈচিত্র্য মানসুর মুজাম্মিল ছড়ায় অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে হাজির করেছে। ‘নারী-নেয়ামত’ ছড়াটিতে তিনি নারীর বহুমুখী রূপকে অত্যন্ত সম্মানের সাথে বয়ান করেছেন। ছড়াকার সমাজকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন যে নারী কেবল মা বা বোন নন, তিনি একজন শিক্ষক এবং সমাজের অবিচ্ছেদ্য অংশ। ‘নারীর আছে মান/মহান আল্লাহর দান/দেখাও তারে সম্মান।’ সমকালীন সমাজে যখন নারীর প্রতি সহিংসতা এবং অসম্মান বৃদ্ধি পাচ্ছে, তখন তাঁর এই ছড়াটি একটি সামাজিক সতর্কবাণী হিসেবে কাজ করে। মানসুর মুজাম্মিল কঠোর ভাষায় উচ্চারণ করেছেন যে নারীর প্রতি অমর্যাদা করলে ‘হবে কঠিন বিচার’ এবং তা সমাজে ‘কেয়ামত’ বা চরম বিপর্যয় ডাইকা আনতে পারে। তাঁর এই দৃষ্টিভঙ্গিটি সমকালীন নারীবাদী আন্দোলনের একমুখি ভোগবাদীর প্রতিফলন না হয়ে, এটি বাঙালি মুসলিম সমাজের চিরায়ত নৈতিক মূল্যবোধের ওপর ভিত্তি করে গইড়া উঠেছে। তিনি নারীর সম্মানকে ‘আল্লাহর দান’ হিসেবে অভিহিত করেছেন ‘নারী- নেয়ামত/উল্টাপাল্টা কিছু করে/আনবে কেয়ামত?’
মানসুর মুজাম্মিল ছড়ায় জীবনের ক্ষণস্থায়ী রূপকে অত্যন্ত সহজ কিন্তু গভীর ভাষায় ফুটায়া তুলছেন। তাঁর ‘ফিরে পাবে না’ ছড়াটি মানুষের পার্থিব সম্পদের অসারতাকে চোখে আঙুল দিয়া দেখাইয়া দিছে। তিনি এক দীর্ঘ তালিকায় বাড়ি, গাড়ি, টাকা, চাকরি, পদ-পদবি, এমনকি আত্মীয়-স্বজনকেও ফিরে পাওয়ার সম্ভাবনা থাকলেও জীবনের ‘শেষ শ্বাস’ ফিরে পাওয়ার কোনো উপায় নাই- এই ধ্রুব সত্যটি প্রকাশ করছেন। ‘বাড়ি ফিরে পাবে/গাড়ি ফিরে পাবে’। ‘ছেলে ফিরে পাবে/মেয়ে ফিরে পাবে’। ‘নদী ফিরে পাবে/গদি ফিরে পাবে’। ‘ফিরে পাবে না/শ্বাস/যখন তুমি/লাশ।’ এই জীবনদর্শন তাঁকে সমকালীন ভোগবাদী সমাজের ভিড়ে একজন ভিন্নধর্মী চিন্তক হিসেবে হাজির করছে। মানুষ যখন ক্ষমতার লোভে অন্ধ হইয়া সম্পদ লুটতে ব্যস্ত, তখন মানসুর মুজাম্মিল মনে করিয়ে দেয়, মৃত্যুর পরে মানুষ কেবল একটি ‘লাশ’। এই আধ্যাত্মিক চেতনা তাঁর ‘দুখের শানে-নযুল’ ছড়াতেও বিরাজমান দেখি। অন্য এক ছড়ায় তিনি দুঃখকে অভিশাপ হিসেবে
না দেখে জীবনের এক অবিচ্ছেদ্য শিক্ষা হিসেবে দেখেছেন। তাঁর মতে, ‘আরো দুঃখ পেতে/আশা করা ভালো/তাহলে/আরো সুন্দর জীবনের আসবে আলো’। এই ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি সমকালীন হাতাশাগ্রস্ত মানুষের জন্য এক নতুন আশার আলো। তিনি বিশ্বাস করতেন যে জীবনের প্রতিটি ভুল-ভ্রান্তিই আসলে শান্তির মূল উৎস হতে পারে যদি তা সঠিকভাবে উপলব্ধি করা যায়। শুধু চিন্তায় না ছড়ার গাঁথুনিতে তার ছড়ার বৈশিষ্ট্য হলো নদীর স্রোতের মতো সাবলীল এবং অন্ত্যমিলে বৈচিত্র। ভাষা ক্ষেতের আইলের মতো সরল, যা সাধারণ পাঠককে মুহূর্তেই আকর্ষণ করে। তিনি জানতেন কীভাবে জটিল সময়কে সরল ছন্দে রূপ দিতে হয়। ‘যে মানুষ আপনাকে দিয়েছে কষ্ট/বুঝে নিন ওকে ধন্যবাদ দিন/ও আপনাকে দিয়েছে শিক্ষা পষ্ট’। এই সরলতাই তাঁর ছড়াকে গণমানুষের কাছে পৌঁছে দিয়েছে। মানসুর মুজাম্মিলের ছড়াসাহিত্য সমকালীন বাংলাদেশের সমাজ ও মানুষের ইতিহাস ছাপ। তাঁর ছড়ায় আমরা খুঁইজা পাই আমাদের চেনা জগতের সমস্যা এবং তার সমাধানমুখী ভাবনা। ছড়া কেবল ছন্দ মেলানোর খেলা না, বরং এটি সমাজকে পরিবর্তনের এক শক্তিশালী মাধ্যম। এই চিন্তার কারণেই তাঁর জীবনদর্শনে ছিলো ঐতিহ্যের প্রতি অকৃত্রিম শ্রদ্ধা, ধর্মের প্রতি অবিচল আস্থা।