সূরা আর রাহমান আমাদের খুবই প্রিয় সূরা। এর শব্দ ও ছন্দমাধুর্য, ভাবসম্পদ ও তত্ত্বকথা আমাদের মুগ্ধ করে, মোহিত করে, করে বিস্মিত। এ কারণেই হয়তো এ সূরায় বার বার বলা হয়েছে-‘অতএব, তোমরা উভয়ে তোমাদের পালনকর্তার কোন্ কোন্ অনুগ্রহকে অস্বীকার করবে?’ (ফাবে আইয়্যে আলা এ রাব্বেকুমা তুকাজ্জেবান) ধর্ম মনস্ক ও বিজ্ঞানমনস্ক মানুষ সহজেই মহান স্রষ্টার অনুগ্রহ উপলব্ধি করতে পারে। আমাদের চার পাশে ছড়িয়ে রয়েছে আল্লাহর অসংখ্য নেয়ামত। এ নেয়ামত সম্পর্কে প্রাথমিক ধারণা থাকলেও মাথা সেজদায় অবনত হবে যে কোন মানুষের। আর বিজ্ঞানমনস্ক মানুষতো স্পষ্টকণ্ঠেই উচ্চারণ করেন, মহান আল্লাহ মানববান্ধব করে এই পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন। কিন্তু প্রশ্ন হলো, মানুষ কি প্রকৃতি ও পৃথিবীর সাথে বন্ধুরমতো আচরণ করছে? বন্ধুরমতো আচরণ করলে তো জলেস্থলে এত বিপর্যয় ঘটনার কথা নয়। নেপাল-বিপর্যয় সম্পর্কে আমরা কি বলবো?

হিমালয়ের দুর্গম পাহাড়ে ঘটে যাওয়া ভয়াবহ দুর্যোগটি আবারও চোখে আঙ্গুল দিয়ে দেখিয়ে দিল যে, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত কোনো ভৌগোলিক সীমানার মধ্যে আটকে থাকে না। গত ২৬ আগস্ট নেপাল-চীন সীমান্তের রাসুয়া এলাকায় হিমবাহের একটি বিশাল অংশ ধসে পড়ে। প্রায় ৫ হাজার ২০০ মিটার উচ্চতা থেকে বরফ, পাথর, কাদা ও পানির প্রবল স্রোত ধেয়ে আসে লহেন্দেখোলা ও ভোতে কোশি নদীতে। মুহূর্তের মধ্যে তা প্রলয়ংকারী আকস্মিক বন্যার রূপ ধারণা করে ভাসিয়ে নিয়ে যায় ঘরবাড়ি, সড়ক, ঝুলন্ত সেতু, সীমান্ত অবকাঠামো এবং নির্মাণাধীন জলবিদ্যুৎ প্রকল্প। জলবায়ু ও পরিবেশ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, এ ঘটনাটি কেবল নেপালের পাহাড়ি সীমান্তের একটি বিচ্ছিন্ন প্রাকৃতিক দুর্যোগ নয়; এটি গোটা দক্ষিণ এশিয়ার জন্য, বিশেষ করে ভাটির দেশ বাংলাদেশের জন্য একটি মারাত্মক সতর্ক সংকেত। হিমালয় অঞ্চলের পাহাড়ি ঢল ও অতিরিক্ত পানি ভাটির দেশ বাংলাদেশের দিকে এসে নদীর নাব্য কমিয়ে দেবে। ফলে আকস্মিক বন্যায় ধান ও ফসল তলিয়ে যেতে পারে। এতে দেশের জাতীয় খাদ্যনিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়তে পারে। এমন প্রেক্ষাপটে জলবায়ু কূটনীতির মাধ্যমে তথ্যের আদান-প্রদান বাড়াতে হবে নেপাল ও বাংলাদেশের মধ্যে। উল্লেখ্য, বর্তমান বৈশ্বিক গ্রিনহাউস গ্যাস নিঃসরণের উচ্চহার অব্যাহত থাকলে এ শতাব্দীর শেষ নাগাদ (২১০০ সাল) হিমালয়ের বর্তমান হিমবাহের ৮০ শতাংশ পর্যন্ত বিলুপ্ত হয়ে যেতে পারে। দীর্ঘদিন ধরে জমাটবদ্ধ মাটির স্তর বা পারমাফ্রস্ট গলে যাওয়ার কারণে হিমালয়ের খাড়া পাহাড়ি ঢাল ও পাথর মারাত্মক অস্থিতিশীল হয়ে পড়ছে, যা ঘন ঘন তুষার ধস ও নদী অবরুদ্ধকরণের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। হিমালয় বরফ-শিলার অস্থিতিশীলতায়, হিমবাহের দ্রুত পরিবর্তন ও চরম আবহাওয়ার ঝুঁকি বাড়ছে— এসবের মোকাবিলায় ভাটির দেশ বাংলাদেশ কতটা প্রস্তুত? রয়টার্স ও এপি’র তথ্য অনুযায়ী, এবার কয়েক মিনিটের ব্যবধানে নদীর পানি কয়েক মিটার উঁচুতে উঠে অববাহিকায় ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। নেপালের এবারের বিপর্যয়ে প্রায় ৫ হাজার ২০০ মিটার উঁচুতে বরফ ও বিশাল শিলাখণ্ড এক সঙ্গে ধসে লহেন্দেখোলা ও ভোতে কোশি নদী অববাহিকায় তীব্র আছাড় খায়। হিন্দুকুশ-হিমালয় অঞ্চলের পানি, বরফ, সমাজ ও প্রতিবেশব্যবস্থা-ICIMOD-এর গবেষণা প্রতিবেদন অনুযায়ী ২০১১ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে হিমালয়ের হিমবাহগুলো তার আগের দশকের তুলনায় ৬৫ শতাংশ দ্রুত হারে গলে হারিয়ে গেছে। বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থার ২০২৫-এর এশিয়া বিষয়ক প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে যে, এশিয়াজুড়ে নজিরবিহীন তাপপ্রবাহ, চরম বর্ষণ ও পাহাড়ি আকস্মিক বন্যা অর্থনীতি ও জীবনযাত্রাকে বিপর্যস্ত করছে, যার জন্য শক্তিশালী আগাম সতর্কতা-ব্যবস্থা গড়ে তোলা অত্যন্ত জরুরি। উল্লেখ্য, বাংলাদেশ ও নেপাল সরাসরি ভৌগোলিক সীমান্ত শেয়ার না করলেও উভয় দেশই অভিন্ন পরিবেশগত ব্যবস্থার অংশ। হিমালয় পর্বতমালা থেকেই উৎপন্ন হয়েছে এশিয়ার প্রাণসংহারী ও জীবনদায়ী নদী গঙ্গা ও ব্রহ্মপুত্র। হিমালয়ের উচ্চ পার্বত্য অঞ্চলে বরফ গলন, নদীর তলদেশে বিপুল কাদা-পাথর জমে যাওয়া কিংবা মৌসুমি বৃষ্টিপাতের ধরন বদলে গেলে তার সরাসরি অভিঘাত এসে পড়ে ভাটির দেশ বাংলাদেশে।

শুধু বাংলাদেশ নয়, অভিঘাতের দুশ্চিন্তায় আছে ভারতও। নেপালের সাম্প্রতিক বিধ্বংসী ভূমিধস ও বন্যা এমন এক পরিবেশগত ঝুঁকিকে সামনে এনেছে, যা শুধু ওই দেশের সীমানায় আবদ্ধ নয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, মূলত হিমালয় থেকে উৎপন্ন নদীগুলোর সমান অংশীদার নেপাল ও ভারত। তাই নেপালের বন্যা এবং ভারতের দুর্যোগের মধ্যে সম্পর্কটি কেবল স্রোতের সঙ্গে বয়ে যাওয়া পানির সম্পর্ক নয়; বরং এটি আরো জটিল। এক দেশের প্রাকৃতিক বিপর্যয় অন্য দেশকেও প্রভাবিত করবে। বন্যা পাহাড় থেকে প্রবল বেগে নেমে এসে বিপুল পরিমাণ কাদা, পাথর এবং ধ্বংসাবশেষ বয়ে আনে। আবার কিছু বন্যা নেপালের সমভূমিতে পৌঁছানোর সঙ্গে সঙ্গে শক্তি হারিয়ে সাধারণ বন্যায় পরিণত হয়। তবে এই বন্যার পানি ভারতে দুর্যোগে পরিণত হবে কিনা, তা শুধু নেপালে কি পরিমাণ বৃষ্টি হয়েছে তার ওপরই নির্ভর করে না; বরং ভারতের বৃষ্টিপাত, নদীর পানির স্তর, বাঁধ এবং পানি নিষ্কাশনব্যবস্থার ওপরও নির্ভর করে। নেপালের বন্যা ভারতের জন্য একটি সতর্কবার্তা। কারণ, দু’দেশই হিমালয়ের নদীর পানি ভাগ করে নেয়। নেপালের ছয় হাজারেরও বেশি নদী ও জলধারা রয়েছে, যার বেশির ভাগই দক্ষিণে ভারত ও গঙ্গায় গিয়ে মিশেছে। তিনটি প্রধান নদীব্যবস্থা প্রাধান্য বিস্তার করে এখানে। পূর্বে কোসি, কেন্দ্রে গন্ডকী (ভারতে গন্ডক) এবং পশ্চিমে কর্ণালী (ভারতে ঘাঘরা) এবং পশ্চিম সীমান্তে রয়েছে মহাকালী (শারদা)। আন্তর্জাতিক সমন্বিত পার্বত্য উন্নয়ন কেন্দ্রের জলবিজ্ঞানী মনীশ শ্রেষ্ঠার মতে, নেপাল হতে সাত থেকে নয়টি প্রধান নদী ভারতীয় সমভূমিতে প্রবাহিত হয় এবং ভারতে বন্যার জন্য এগুলো দায়ী।

নেপালে ভয়াবহ হিমবাহ ধস ও বন্যার পর অভিঘাত ও দায় নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। ভাটির দেশ বাংলাদেশ ও ভারতের দুশ্চিন্তার কারণ রয়েছে। আসলে শুধু এই কয়েকটি দেশ নয়, হুমকির মুখে আছে পুরো দক্ষিণ এশিয়া। আর এর দায় বহন করতে হবে বিশ্বের বৃহৎ গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনকারী দেশগুলোকে। নেপালে ভয়াবহ বিপর্যয়ের পর দেশটির পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল এ ব্যাপারে আওয়াজ তুলেছেন। কান্তিপুর টিভিকে তিনি বলেছেন, চীন, আমেরিকা ও ভারত জলবায়ু পরিবর্তনে বড় ধরনের ভূমিকা রেখেছে এবং ছোট দেশগুলোকে এর দুর্ভোগ পোহাতে বাধ্য করেছে। এছাড়া দুর্যোগ পরবর্তী আন্তর্জাতিক সহায়তাকে কোনো ‘অনুদান’ হিসেবে নয়, বরং ‘নৈতিক দায়বদ্ধতা’ হিসেবে দেখা উচিত বলে জানিয়েছেন নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিশির খানাল। কান্তিপুর টিভিকে নেপালি ভাষায় প্রদত্ত সাক্ষাৎকারটি প্রকাশ করেছে কাঠমান্ডু পোস্ট। সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, আন্তর্জাতিক মঞ্চে বিষয়টি স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হবে। কারণ, আন্তর্জাতিকভাবে নেপালকে মাথা উঁচু করে চলতে হবে এবং এটিকে ন্যায়বিচারের বিষয় করে তুলতে হবে। সাক্ষাৎকারে তিনি আরো বলেন, গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনে নেপাল কার্যত নগন্য অবদান রাখে; তা সত্ত্বেও দেশটি বৈশ্বিক উষ্ণায়নের অসম পরিণতি ভোগ করছে, যার মধ্যে রয়েছে দ্রুত হিমবাহ গলে যাওয়া এবং চরম পার্বত্য-দুর্যোগ। নেপালের পররাষ্ট্রমন্ত্রী আরো বলেন, ‘আমরা এমন একটি বৈশ্বিক সংকটের চরম মূল্য দিচ্ছি, যা আমরা তৈরি করি নি। হিমবাহের দ্রুত গলে যাওযা এবং পাহাড়ি অঞ্চলের এই প্রলয়ংকারী সুনামিগুলো বৈশ্বিক জলবায়ু পরিবর্তনের সরাসরি পরিণতি।’ শিশির খানাল বলেন, শিল্পোন্নত এবং কার্বন নির্গমনকারী দেশগুলো, যেমন- গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমনে বিশ্বের শীর্ষে থাকা চীন, দ্বিতীয় স্থানে থাকা আমেরিকা এবং তৃতীয় স্থানে থাকা ভারতের মতো দেশগুলোর নেপালের মতো ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোকে ক্ষতিপূরণ দেয়ার একটি ঐতিহাসিক দায়িত্ব রয়েছে। শিশির খানাল বলেন, নেপালের অর্থ মন্ত্রণালয় আনুষ্ঠানিকভাবে তার আন্তর্জাতিক অংশীদারদের কাছে জলবায়ু ক্ষতিপূরণের দাবি জানিয়ে একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি পাঠিয়েছে। তিনি বলেন, যদি আমাদের হিমালয়ের হিমবাহগুলো বিলীন হয়ে যায়, তাহলে গঙ্গা ও ত্রিশুলীর মতো নদীর ওপর নির্ভরশীল দক্ষিণ এশিয়ার দুই বিলিয়নেরও বেশি মানুষের জল-নিরাপত্তা স্থায়ীভাবে বিঘ্নিত হবে। আমরা শুধু নেপালের জন্য নয়, বরং দক্ষিণ এশীয় সভ্যতার অস্তিত্ব রক্ষার জন্য কথা বলছি। কথাতো বলতেই হবে, বিষয়টা যে অস্তিত্ব রক্ষার। শিল্পোন্নত বড় বড় দেশগুলো শুধু গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমণের অপরাধ করে নি। জলবায়ু সংকট ছাড়াও ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক অঙ্গনেও রয়েছে তাদের বড় মাপের অপরাধ। মানববান্ধব করে যে পৃথিবীটা মহান স্রষ্টা সৃষ্টি করেছিলেন, তাতে বিপর্যয় সৃষ্টি করেছেন সভ্যতার শাসকরা। সে দায়তো পরিশোধ করতে হবে তাঁদের।