॥ মাহবুবউদ্দিন চৌধুরী ॥

সরকার জুন মাস থেকে অস্বাভাবিকভাবে বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধি করায় সারাদেশের মানুষ ক্ষুব্ধ। ভুতুড়ে বিদ্যুৎ বিল বা অস্বাভাবিক বিদ্যুৎ বিলের সমস্যা নিয়ে বিদ্যুৎ ব্যবহারকারীদের মধ্যে তীব্র অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। ব্যবহার করা বিদ্যুতের তুলনায় অস্বাভাবিক বেশি বিল আসায় সাধারণ মানুষ ও নগরবাসী দিশেহারা হয়ে পড়েছেন। রাজধানীর পুরোনো ঢাকাসহ বসুন্ধরা, বারিধারা, ওল্ড ডিওএইচএস, বনানী, গুলশান, মহাখালী, ধানমন্ডিসহ গোটা রাজধানীতে এবার নতুন করে যে হারে সরকার অস্বাভাবিকভাবে বাসা-বাড়িতে ভুতুড়ে বিদ্যুৎ বিল দিয়েছে তাতে নগরবাসী ভীষণ ক্ষুব্ধ। অন্যদিকে দরিদ্র ও মধ্যবিত্ত পরিবার কেন, বিত্তবানদের ক্ষেত্রেও অতিরিক্ত ভুতুরে বিদ্যুৎ বিল প্রদান করা হয়েছে। যা কোনভাবেই মেনে নেয়া যায় না। বিদ্যুৎ বিভাগে হাজার হাজার কোটি টাকার লুটপাট, দুর্নীতি, অপচয়, চুরি ইত্যাদি রোধ না করে ডেসা-ডেসকো ও পল্লীবিদ্যুৎ কর্তৃক অস্বাভাবিকভাবে জুন-২০২৬ থেকে বিদ্যুতের বিল বাড়িয়েছে যা কোনভাবেই বিদ্যুৎ গ্রাহকরা এই দুর্দিনে মেনে নিতে পারছে না। সরকারকে জনগণের বর্তমান অর্থনেতিক অবস্থা অনুধাবন করতে হবে। তারপর ডিমান্ড ও মিটার চার্জ ও ভ্যাট ইত্যাদির একটি বড় অংশ বিদ্যুৎ গ্রাহকদের বিলের সাথে প্রতিমাসে সংযোজন করা হয়। মিটার নষ্ট, মিটার অপরিষ্কারের নামে কত না প্রতারণার মাধ্যমে মিটার রিডারদের দৌরাত্ম্য বা হয়রানির অন্ত নেই। বিদ্যুৎ গ্রাহকরা খুবই নিরুপায় এবং অসহায়। তাদের দেখার কেউ নেই। উল্লেখ্য যে হারে বিদ্যুতের মূল্য বাড়ানো হয়েছে সেই বিলের টাকা জোগাড় করতে গিয়ে গরিব ও মধ্যবিত্ত গ্রাহকরা আজ দিশেহারা-সর্বস্বান্ত। এ কী ধরনের অমানবিকতা যা কোনভাবেই সহ্য করা যায় না।

নতুন সরকার ক্ষমতায় আসার পর পরই দেশের গরিব জনগণের বর্তমান দুরবস্থা এবং সাধারণ মানুষের পরিস্থিতি ও জীবনমান বিবেচনায় না রেখেই গ্রাহকপর্যায়ে বিদ্যুতের দাম গড়ে ১৬ দশমিক ৬৮ শতাংশ ও সঞ্চালন চার্জ ২৩ দশমিক ৯৬ শতাংশ বৃদ্ধি করেছে। আর পাইকারি পর্যায়ে বিদ্যুতের দাম ১৯ দশমিক ৮৫ শতাংশ হারে বাড়িয়েছে। এতে উৎপাদন ব্যয় ও মূল্যস্ফীতির চাপ বেড়েছে। কোন রকম চিন্তা-ভাবনা না করেই তেলের মূল্য বৃদ্ধির পর পরই আবারও তাড়াহুড়া করে বিদ্যুতের দাম বাড়ানো হয়েছে যা কোনভাবেই কল্যাণকর হবে না বরং দুঃখ-কষ্ট ও দুর্ভোগ আরো বাড়বে। বলা যেতে পারে ইহা বিদ্যুৎ বিভাগের এক ধরনের জুলুম-নির্যাতন। বাংলাদেশ এনার্জি রেগুলেটরি কমিশন বিদ্যুতের মূল্য বৃদ্ধির ব্যাপারে জনগণের মতামতকে কখনই গুরুত্ব না দিয়ে বরং একের পর এক বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে জনজীবনে দুর্ভোগ সৃষ্টি করে থাকে এ প্রতিষ্ঠানটি। তারা দেশের ও জনগণের কষ্টের কথা বিবেচনা না করে বরং তারা লুটেরাদের স্বার্থ রক্ষা করে চলছে। মূলতঃ সরকার জনগণের দুরবস্থা উপেক্ষা করে আবারও বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে জনগণকে অসহনীয় দুঃখ-কষ্ট দিচ্ছে। বলে রাখা ভাল বিদ্যুৎ খাত থেকে ক্যাপাসিটি চার্জের নামে কোটি কোটি টাকা লুটপাট হচ্ছে যা দেখার কেউ নেই। এখনও অনেক বিদ্যুৎকেন্দ্র বসিয়ে রেখে সরকার তাদের টাকা দিচ্ছে ইহা কি অপচয় নয়?

দু’ দু’বার তেলের মূল্যবৃদ্ধির পরপরই সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ার পাশাপাশি বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধি বড়ই দুঃখজনক বরং বিদ্যুৎ বিভাগের প্রতি দেশের জনগণের দীর্ঘদিনের অভিযোগ, অপচয়, দুর্নীতি, অব্যবস্থাপনা, ভুল পরিকল্পনা, ক্রয়-বিক্রয়ের প্রকল্পে অর্থ লোপাটের দায় সাধারণ মানুষ বা গ্রাহকদের ওপর চাপানো হয়ে থাকে। একটি দেশের আর্থ সামাজিক উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি হচ্ছে বিদ্যুৎ পরিস্থিতির উন্নয়নের উপর। মানুষ কখনোই সরকারের নিকট পদে পদে দুর্ভোগ আশা করে না। এতে দেশ ও জনগণের স্বার্থরক্ষার পরিবর্তে সেই পুরোনো কায়দায় লুটেরাদের স্বার্থ রক্ষার পথে সরকার হাটতে শুরু করছেন। ইতোমধ্যে বিইআরসি একটি গণবিরোধী সংস্থায় পরিণত হয়েছে। বিদ্যুতের দাম বাড়ালে দেশের শিল্প খাত আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতা হারানোর সম্ভাবনা থাকে। এমনিতে দেশের মানুষ দ্রব্যমূল্যসহ সর্বক্ষেত্রে জিনিসপত্রের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধিতে জর্জরিত ঠিক তখনই বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধির পথে সরকার উদ্যোগ নিয়েছেন যা কোনভাবেই কাম্য নয়। সরকারের কাছে মানুষের আবেদন এই আপদকালীন সময়ে বাঁচার সুযোগ দিন। সরকার সব সময় ভর্তুকির দোহাই দিয়ে বিদ্যুতের দাম বাড়ানোর অজুহাত খুঁজে থাকে। বিদ্যুতের গ্রাহকরা মনে করে শুধু ঘন ঘন বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে কোন লাভ নেই বরং এক্ষেত্রে চুরি, দুর্নীতি, অপচয়, লুটপাট, সিস্টেম লস, অতিরিক্ত ব্যয় কমিয়ে উৎপাদন, সঞ্চালন ও বিতরণ ব্যবস্থায় দক্ষতা বৃদ্ধির পাশাপাশি উচ্চ ব্যয়ের বিদ্যুৎ কেন্দ্রের ওপর নির্ভরতা কমাতে হবে। বলে রাখা ভাল বিদ্যুৎ বিভাগে এক বড় সিন্ডিকেট কাজ করে যা ধরা ছোঁয়ার বাহিরে। তারা সরকারকে যা বোঝায় সরকার বা মন্ত্রীরা যেহেতু টেকনিক্যাল লোক না হওয়াতে সিন্ডিকেটের কবলে পরে তারাও হিমশিম খাচ্ছেন। সরকারকে অনুধাবন করতে হবে এভাবে বার বার বিদ্যুতের দাম বাড়িয়ে দেশের গরিব-মধ্যবিত্ত পরিবারের অবস্থা শোচনীয় হতে আর বেশি সময় লাগবে না। স্বাধীনতার ৫৪ বছর পর এখনও বাংলাদেশে বিদ্যুতের সংকট যাচ্ছে না এবং যাবেও না। তারপর গ্যাস নেই, তেল সংকট। বিদ্যুতের মূল্যবৃদ্ধিতে সবচেয়ে বেশি প্রভাব সাধারণ মানুষের ওপর পরে। কল-কারখানার উৎপাদন খরচ বেড়ে যাবে, ফলে সামগ্রিকভাবে শিল্পজাত পণ্যের দাম বাড়ার ঝুঁকি রয়েছে। কৃষি উৎপাদন ব্যয় বাড়বে। সামগ্রিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকবে। এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, আমাদের দৈন্দদিন জীবনে বিদ্যুৎ অত্যন্ত প্রয়োজনীয় ঠিকই আবার এটি ছাড়া দৈনন্দিন জীবন শুধু নয়, শিল্প কল-কারখানা, ব্যবসা এমনকি অর্থনীতি অচল। লোডশেডিং এবং অতিরিক্ত বিলের কারণে মানুষের ভোগান্তির অন্ত নেই। এমনিতে বিদ্যুৎ ছাড়া কোন উন্নয়ন বা দৈনন্দিন কার্যক্রম চালানো দুস্কর। মানুষের নিত্য দিনের ঘরোয়া ব্যবহার থেকে শুরু করে কল-কারখানা, হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, অফিস-আদালতসহ সকল গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানসমূহ বিদ্যুতের ওপর পুরোপুরি নির্ভরশীল। ক্রমবর্ধমান জনসংখ্যার পাশাপাশি বিদ্যুৎ সমস্যা দিন দিন আরো প্রকট আকার ধারণ করছে। সম্পদের অভাব, আর্থিক অসঙ্গতি, প্রয়োজনীয় প্রযুক্তি জ্ঞানের অভাব প্রভৃতির কারণে বাংলাদেশে চাহিদামত বিদ্যুৎ উৎপাদন হতে পারছে না। আমলাতান্ত্রিক জটিলতা, পরিকল্পনা বাস্তবায়নে দীর্ঘসূত্রতা প্রভৃতির জন্য বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনা মোটেও সন্তোষজনক নয়। বিদ্যুৎ সংকট এবং অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল থেকে দেশের মানুষ পরিত্রাণ পেতে চায়।

সরকারকে দেশব্যাপী লোডশেডিং এবং অতিরিক্ত বিদ্যুৎ বিল কমিয়ে সৌরবিদ্যুৎ ও নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার বাড়ানোর উদ্যোগ নিতে হবে। বিদ্যুৎ সংকট নিরসন করে সাশ্রয়ী মূল্যে মানসম্মত বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার মধ্যে মানুষের জীবনযাত্রার মান বাড়ানোর পাশাপাশি দেশের অর্থনৈতিক উন্নয়নকে জোরদার করা যেতে পারে।

লেখক : গণমাধ্যমকর্মী ও কলামিস্ট