মুন্সী আবু আহনাফ

একটি স্বাধীন ও সার্বভৌম রাষ্ট্রের ন্যায়বিচার ব্যবস্থার ওপর নাগরিকদের আস্থা টিকিয়ে রাখা বিচার বিভাগের নৈতিক ও রাষ্ট্রীয় দায়িত্ব। কিন্তু যখন সেই বিচারব্যবস্থাকে রাজনৈতিক প্রতিশোধ, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ নির্মূল এবং একদলীয় ফ্যাসিবাদের ভিত্তি মজবুত করার রাজনৈতিক হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তখন বিচারিক কাঠামোর ভিত্তি ধসে পড়ে। বাংলাদেশের সাম্প্রতিক ইতিহাসে মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারের নামে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি)-এর কার্যক্রম নিয়ে শুরু থেকেই আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা, আইনি বিশেষজ্ঞ ও সচেতন নাগরিকদের মধ্যে গভীর সংশয় ও প্রশ্ন তৈরি হয়েছিল।

বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর তৎকালীন সেক্রেটারি জেনারেল এবং বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের সাবেক সমাজকল্যাণমন্ত্রী আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের ফাঁসির রায় ও তার বাস্তবায়ন সেই বিতর্কিত বিচারিক প্রক্রিয়ারই একটি মর্মান্তিক উদাহরণ। ২০১৫ সালের ২২ নভেম্বর মধ্যরাতে তাঁর ফাঁসি কার্যকর করা হয়। কিন্তু যে সাক্ষ্য এবং অভিযোগের ভিত্তিতে একজন সিনিয়র রাজনীতিবিদ ও সাবেক মন্ত্রীকে ফাঁসির কাষ্ঠে ঝোলানো হলো, সেই অভিযোগ এবং সাক্ষীর নির্ভরযোগ্যতা বিশ্লেষণ করলে একটি সত্যই সামনে আসে—তা হলো কেবল রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নে একজন সাজানো মিথ্যা সাক্ষীর ওপর ভর করে রায় কার্যকর করা হয়েছিল। সেই কথিত সাক্ষীর নাম ‘বিচ্ছু জালাল’। রাজনৈতিক দৃশ্যপটের পরিবর্তন এবং ফ্যাসিস্ট সরকারের পতনের পর আজ প্রশ্ন উঠেছে—আদালতে চরম মিথ্যাচার করা সেই বিচ্ছু জালাল এখন কোথায়? এবং এই বিচারিক হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে থাকা পরিকল্পনাকারীদের দায় কতখানি?

এক. মূল অভিযোগের বাস্তবতার সাথে কোনো মিল নাই; রুমী-জুয়েল-বদি হত্যা এবং মুজাহিদের কোনো সংশ্লিষ্টতা থাকার বিষয়ে আদালতে প্রমাণিত হয়নি। আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় অন্যতম প্রধান অভিযোগ (অভিযোগ নম্বর ৬) ছিল—১৯৭১ সালের ২৯ আগস্ট রাতে ক্র্যাক প্লাটুনের বীর মুক্তিযোদ্ধা শফী ইমাম রুমী, বিডিআর সাবের, আলতাফ মাহমুদ, জুয়েল এবং বদিকে অপহরণ, নির্যাতন এবং হত্যার সাথে তিনি জড়িত বা তার পরোক্ষ ইন্ধন ছিল। কিন্তু ১৯৭১ সালের এই ঐতিহাসিক ঘটনা এবং রুমীদের ধরা পড়ার পেছনের ঘটনা নিয়ে দীর্ঘ কয়েক দশকে বহু বই, স্মৃতিকথা এবং নথি প্রকাশিত হয়েছে। রুমীর মা শহীদ জননী জাহানারা ইমামের প্রখ্যাত বই ‘একাত্তরের দিনগুলি’-তে ক্র্যাক প্লাটুনের সদস্যদের গ্রেফতার ও নিখোঁজের ঘটনার অত্যন্ত সুনির্দিষ্ট এবং আবেগঘন বিবরণ রয়েছে। জাহানারা ইমাম তাঁর বইয়ে বা তাঁর জীবনের কোনো বিবৃতিতে কোথাও উল্লেখ করেননি যে তাঁর ছেলে রুমী বা তাঁর সহযোগীদের অপহরণ কিংবা পাকিস্তান সেনাবাহিনীর কাছে ধরা পড়ার পেছনে আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের কোনো ভূমিকা ছিল।

কেবল জাহানারা ইমামই নন, ক্র্যাক প্লাটুনের জীবিত সহযোদ্ধারা—যাঁরা একাত্তরের স্মৃতি নিয়ে বহু গ্রন্থ ও সাক্ষাৎকার দিয়েছেন—তাঁদের কারোর লেখাতেই আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ কিংবা মতিউর রহমান নিজামীর নাম এই ঘটনার সাথে যুক্ত ছিল বলে দাবি করা হয়নি। দীর্ঘ চার দশক ধরে যে ঘটনার সাথে মুজাহিদের নাম বিন্দুমাত্র উচ্চারিত হয়নি, ২০০৯ সালে শেখ হাসিনার নেতৃত্বে আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পর হঠাৎ করেই সেটিতে নতুন মোড় দেওয়া হয়। একটি কাল্পনিক চিত্রনাট্য তৈরি করে মুজাহিদকে এই হত্যাকাণ্ডের সাথে যুক্ত করার রাজনৈতিক ছক আঁকা হয়।

দুই. বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর তৎকালীন সেক্রেটারি জেনারেল এবং বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের সাবেক সমাজকল্যাণমন্ত্রী আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ শুরু থেকেই নাকচ করে দিয়েছিল জামায়াতে ইসলামী। দলের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে সংবাদ সম্মেলন এবং বিবৃতিতে বলা হয়, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদ ১৯৭১ সালে ছাত্রসংঘের রাজনীতির সাথে যুক্ত থাকলেও কোনো ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড বা বীর মুক্তিযোদ্ধাদের ধরিয়ে দেওয়ার সাথে সম্পর্কিত ছিলেন না। জামায়াতের বক্তব্য ছিল স্পষ্ট—একটি নির্দিষ্ট রাজনৈতিক আদর্শকে ধ্বংস করা এবং দেশের শীর্ষ ইসলামী নেতৃত্বকে বিচারিক প্রক্রিয়ায় হত্যা করতেই আইসিটিকে রাজনৈতিক ট্রাইব্যুনালে পরিণত করা হয়েছিল।

মুজাহিদের পরিবারের সদস্যরা রায় ঘোষণার পর থেকে শুরু করে শেষ দিন পর্যন্ত গণমাধ্যমের কাছে তাদের ক্ষোভ ও আকুতি প্রকাশ করেছিলেন। পরিবারের পক্ষ থেকে বারবার বলা হয়েছিল, সম্পূর্ণ উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে কাল্পনিক ও ভুয়া সাক্ষী দাঁড় করিয়ে এই সাজা নিশ্চিত করা হয়েছে। যে অভিযোগের কথা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে কোথাও পাওয়া যায় না, সেই অভিযোগে ফাঁসি দেওয়া কেবল একজন ব্যক্তিকে হত্যা নয়, বরং পুরো পরিবারের ওপর এবং দেশের আইনি ব্যবস্থার ওপর একটি চরম অবিচার। পরিবারের সদস্যরা চ্যালেঞ্জ করেছিলেন যে, বিচ্ছু জালাল নামের যে সাক্ষীকে উপস্থাপন করা হয়েছে, তার সাথে ক্র্যাক প্লাটুনের প্রকৃত যোদ্ধাদের কোনো প্রাতিষ্ঠানিক বা আদর্শিক সম্পর্ক ছিল না।

তিন. আদালতে আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের আইনজীবীরা বিচ্ছু জালালের সাক্ষ্যের চরম অসঙ্গতি ও মিথ্যাচার উন্মোচন করেছিলেন। মিথ্যা বানোয়াট আইনি যুক্তিগুলো নিম্নরূপ ছিল; দৈনিক সংগ্রামের কথিত খবরের অসত্যতা প্রমাণিত হয়েছিল, বিচ্ছু জালাল আদালতে দাবি করে যে, সে ১৯৭১ সালের ২৯ আগস্টের দৈনিক সংগ্রাম পত্রিকায় পড়েছিল যে আল-বদর বাহিনী রুমী, জুয়েল ও বদিকে আটকে রেখে পুলিশের কাছে সোপর্দ করেছে এবং এরপর সে নাকি থানায় গিয়ে তাদের দেখেছে। আইনজীবীরা আদালতে প্রমাণ উপস্থাপন করে দেখান যে, ১৯৭১ সালের ২৯ আগস্টের দৈনিক সংগ্রামে এমন কোনো সংবাদ কখনোই প্রকাশিত হয়নি। এটি সম্পূর্ণভাবে সাক্ষীর মনগড়া এবং ভিত্তিহীন এক কল্পকাহিনী। সাক্ষীর পরিচয় ও উপস্থিতির অভাব ছিল ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের সাজানো আদালতে। ক্র্যাক প্লাটুনের মুক্তিযোদ্ধা বা সেই সময়ের নথিপত্রে ‘বিচ্ছু জালাল’ নামে কেউ গ্রেফতার হয়েছিল বা তাদের সাথে ছিল—এমন কোনো নির্ভরযোগ্য ঐতিহাসিক প্রমাণ ছিল না। তদন্তকারী কর্মকর্তা ও আদালতের সাক্ষ্যের গড়মিল ছিল প্রশ্নবিদ্ধ ও পক্ষপাতমূলত আচরণ, ফ্যাসিস্ট আওয়ামী লীগের আদালত যেন ঠিক করেই রেখেছিল বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর তৎকালীন সেক্রেটারি জেনারেল এবং বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের সাবেক সমাজকল্যাণমন্ত্রী আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদকে যেকোনোভাবে ফাঁসি দিবে; আর তা দেশবাসী প্রত্যক্ষও করেছে; কিভাবে একজন নিরাপরাধ মানুষকে সাজানো মিথ্যা মামলা ফাঁসি দিয়েছে। তদন্তকারী কর্মকর্তার (আইও) কাছে বিচ্ছু জালাল যে বক্তব্য দিয়েছিল, আদালতে এসে সে সম্পূর্ণ ভিন্ন বক্তব্য প্রদান করে। কোনো একটি ঘটনার তারিখ, সময় এবং বিবরণ সম্পর্কে সে একেক জায়গায় একেক ধরনের তথ্য দেয়। কিন্তু ট্রাইব্যুনাল এবং পরবর্তীতে আপিল বিভাগ আইনজীবীদের এই সুনির্দিষ্ট যুক্তি ও বৈপরীত্যগুলোকে অলৌকিক কৌশলে বাতিল করে দেয়। ট্রাইব্যুনালের রায়ে এক নজিরবিহীন পর্যবেক্ষণ দেওয়া হয়; “It is now settled that earlier statement made to Investigation officer is not evidence and any nonsignificant omission in stating any

fact to the IO which does not necessarily affect witnessÕs sworn testimony is not fatal and cannot be treated as glaring contradiction. Additionally, failure to describe

precise detail about an event that took place four decades back rather makes witness testimony more reliable.

অর্থাৎ, আদালত এমন এক যৌক্তিকতার আশ্রয় নেয় যেখানে বলা হয়—৪০ বছর আগের ঘটনার পুঙ্খানুপুঙ্খ বিবরণ না দিতে পারা বা একেক জায়গায় একেক ভুলভাল কথা বলা বরং এটিই প্রমাণ করে যে সাক্ষী সত্য বলছে! অসঙ্গতিকে সত্যের মাপকাঠি বানানোর এই বিচারিক ধারা আইনি ইতিহাসের একটি বিরল ও বিতর্কিত অধ্যায় হিসেবে চিহ্নিত হয়ে থাকবে। এই একজন অবিশ্বস্ত ও বিভ্রান্তিকর সাক্ষীর মনগড়া কথার ওপর ভিত্তি করেই আদালত সিদ্ধান্ত নেয় যে মুজাহিদ রুমী-বদিদের অপহরণের বিষয়ে জানতেন বা পরোক্ষভাবে জড়িত ছিলেন।

চার. মিথ্যা সাক্ষী দিয়ে বিচ্ছু জালাল পলাতক ফ্যাসিবাদের কাছে কী সুবিধা পেয়েছিল? সেটা মিলিয়ন ডলারের প্রশ্ন? বিচার প্রক্রিয়ায় মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া কেবল একটি নৈতিক অপরাধ নয়, এটি রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে একটি চরম ফৌজদারি অপরাধ। কিন্তু শেখ হাসিনার সাড়ে ১৫ বছরের ফ্যাসিবাদী শাসনামলে যেসব ব্যক্তি বা মহল বিরোধী রাজনৈতিক নেতাদের ফাঁসাতে ট্রাইব্যুনালে মিথ্যা সাক্ষী হিসেবে হাজির হয়েছিল, তাদের জন্য তৎকালীন সরকার রাজকীয় সুবিধা ও নিরাপত্তার বন্দোবস্ত করেছিল। বিচ্ছু জালালও এর ব্যতিক্রম ছিল না। তৎকালীন সরকারের কাছ থেকে সে কী কী অন্যায্য সুবিধা ভোগ করেছিল, তা অনুসন্ধান করলে নিচের বিষয়গুলো ফুটে ওঠে। যেমন: ১. আর্থিক সুবিধা ও পুনর্বাসনের সুবিধা পেয়েছিল? মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়ার পুরস্কার হিসেবে সরকারি তহবিল ও বিশেষ উৎস থেকে তাকে মোটা অঙ্কের অনুদান ও আর্থিক সুবিধা প্রদান করা হয়েছিল। ২. প্লট ও সরকারি সুযোগ-সুবিধা পেয়েছিল; রাজধানী ও তার আশপাশে রাষ্ট্রীয় কোটায় জায়গা-জমি বা সরকারি সুযোগ-সুবিধা বাগিয়ে নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে তার বিরুদ্ধে। ৩. রাজনৈতিক ও সামাজিক প্রভাব বিস্তার করেছিল মিথ্যা সাক্ষীগণ। আওয়ামী লীগের দলীয় বলয়ে তাকে ‘রাজসাক্ষী’ ও ‘মুক্তিযুদ্ধের গবেষক/সাক্ষী’ হিসেবে উপস্থাপন করে বিভিন্ন টকশো, সামাজিক ও রাজনৈতিক মঞ্চে বিশেষ ভিআইপি মর্যাদা দেওয়া হতো। ৪. প্রশাসনিক ও রাষ্ট্রীয় বিশেষ নিরাপত্তা ভোগ করতো মিথ্যা সাক্ষীগণ; সাধারণ নাগরিক হিসেবে নয়, বরং ফ্যাসিবাদী ক্যাডারদের মতো তাকে বিশেষ রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা দেওয়া হয়েছিল যাতে তার ভুয়া পরিচয় ও মিথ্যাচারের ভিত্তি নিয়ে কেউ প্রশ্ন তুলতে না পারে। স্বৈরাচারী শাসনের টিকে থাকার মূল শক্তিই ছিল এমন কিছু সুবিধাভোগী ও মিথ্যাচারী উপাদান, যারা ব্যক্তিস্বার্থ ও সরকারি ক্ষমতার মোহে বিচারব্যবস্থাকে কলঙ্কিত করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করেনি।

পাঁচ. আদালতে মিথ্যা সাক্ষ্যদানকারী বিচ্ছু জালাল এখন কোথায়? এই প্রশ্ন এখন দেশের সাধারণ মানুষের? কেন তাকে আইনের আওতায় আনা হচ্ছে না এই প্রশ্নও করছে তারা? ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ছাত্র-জনতার ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে শেখ হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনের পতন ঘটেছে। স্বৈরাচারের পতনের পর থেকে যেসব অপশক্তি ও সাজানো অপরাধীরা ক্ষমতার ছায়াতলে থেকে অপকর্ম চালিয়েছিল, তারা আজ আত্মগোপনে। তাহলে প্রশ্ন জাগে—আদালতে দাঁড়িয়ে চরম মিথ্যাচার করে একজন নির্দোষ মানুষকে ফাঁসির কাষ্ঠে পাঠানোর কারিগর সেই বিচ্ছু জালাল এখন কোথায়? গণঅভ্যুত্থানের পর থেকেই বিচ্ছু জালাল জনরোষের ভয়ে আত্মগোপনে চলে গেছে। তার কোনো হদিস এখন সাধারণ মানুষ বা গণমাধ্যমের কাছে নেই। সে কি দেশ ছেড়ে পালিয়েছে, নাকি দেশের ভেতরেই কোনো গোপন আস্তানায় আত্মগোপন করে আছে—তা নিয়ে সুশীল সমাজ ও আইনজীবী মহল প্রশ্ন তুলছেন।

ছয়. আইনজীবী ও সচেতন সামাজিক বিশ্লেষকদের দাবি এখন অত্যন্ত স্পষ্ট ও আরও জোরালো হয়ে উঠছে। ১. মিথ্যা সাক্ষ্যদানের ফৌজদারি বিচারের দাবি? বাংলাদেশ দণ্ডবিধির (Penal Code) ১৯১, ১৯২ এবং ১৯৩ ধারা অনুযায়ী আদালতে মিথ্যা সাক্ষ্য দেওয়া (Perjury) এবং মিথ্যা সাক্ষ্যের মাধ্যমে কারো মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করার ব্যবস্থা করা চরম অপরাধ। আইনজীবী ও মানবাধিকার কর্মীদের মতে, বিচ্ছু জালালের বিরুদ্ধে মিথ্যা সাক্ষ্য দিয়ে জুডিশিয়াল মার্ডার (Judicial Murder) বা বিচারিক হত্যাকাণ্ডে সহায়তা করার অপরাধে অবিলম্বে মামলা দায়ের ও গ্রেপ্তার করতে হবে। ২. মিথ্যা সাক্ষী দিয়ে অন্যায় সুবিধার বাজেয়াপ্তির দাবি দেশের সাধারণ মানুষের। ফ্যাসিবাদী সরকারের আমলে মিথ্যা সাক্ষী দিয়ে সে যে সমস্ত রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা, অন্যায্য অর্থ বা সম্পত্তি লাভ করেছিল, সেগুলো বাজেয়াপ্ত করতে হবে। ৩. আইসিটির প্রহসনমূলক মামলাগুলো পুনর্মূল্যায়ন করার দাবি দেশের আইন বিশেষজ্ঞদের। আইসিটিতে রাজনৈতিক স্বার্থে যেসব মিথ্যা সাক্ষ্য ব্যবহার করে রায় দেওয়া হয়েছিল, সেগুলোর বিচারিক পুনর্মূল্যায়ন ও সত্য উন্মোচনের জন্য একটি স্বাধীন জুডিশিয়াল কমিশন গঠন করা দরকার।

পরিশেষে; ইতিহাসের শিক্ষা ও বিচারিক ন্যায়বিচারের প্রয়োজনীয়তা রয়েছে। একটি মিথ্যা সাক্ষ্য কত বড় সর্বনাশের কারণ হতে পারে, আলী আহসান মোহাম্মদ মুজাহিদের মামলা তার জ্বলন্ত প্রমাণ। বিচ্ছু জালালের মতো অসত্য ও সুবিধাবাদী চরিত্রগুলোকে তৈরি করে রাজনৈতিক ফায়দা লোটার ফল কখনো শুভ হতে পারে না। আজ যখন সময়ের চাকা ঘুরেছে এবং একটি ফ্যাসিবাদী শাসনের পতন ঘটেছে, তখন মানুষের মনে গভীর প্রশ্ন উঠছে—যদি কাল কোনো রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ বা অসাধু গোষ্ঠী আইন ও আদালতকে ব্যবহার করে সামিনা বা মল্লারের মতো স্বাধীন চিন্তার মানুষদের বিরুদ্ধে শাপলা চত্বর বা কোনো রাজনৈতিক হত্যাকাণ্ডের মিথ্যা অভিযোগ এনে এক বা একাধিক মিথ্যা সাক্ষী দাঁড় করিয়ে দেয়, তখন কী হবে? আইনের শাসন প্রতিষ্ঠা করতে হলে বিচারিক প্রক্রিয়াকে চিরতরে রাজনীতিমুক্ত করতে হবে। কোনো অসত্য সাক্ষীর মনগড়া কথার ভিত্তিতে রাষ্ট্র যেন আর কখনো কোনো নাগরিকের জীবন কেড়ে নিতে না পারে। বিচ্ছু জালালের মতো পলাতক ও ভুয়া সাক্ষীদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি কার্যকর করাই হতে পারে বিচারিক ব্যবস্থার কলঙ্ক মোচনের প্রথম পদক্ষেপ। ইতিহাস কাউকেই ক্ষমা করে না—মিথ্যা দিয়ে অর্জিত সুবিধা ও সাময়িক জয় শেষ পর্যন্ত সত্যের কাছে পরাজিত হতে বাধ্য।