॥ আর্শিনা ফেরদৌস ॥

ডাক্তারদের মানসিকতা নিয়ে কথা বলতে গেলে প্রথমেই একটি বিষয় মনে রাখা দরকার—একজন চিকিৎসক প্রতিদিন এমন কিছু দৃশ্য দেখেন, যা একজন সাধারণ মানুষ হয়তো জীবনে কয়েকবারও দেখেন না। রক্ত, ব্যথা, দুর্ঘটনা, অপারেশন, ক্যান্সার, জন্ম, মৃত্যু, স্বজনের কান্না, অসহায়ত্ব, ভয়—এসব তাঁর কর্মজীবনের প্রতিদিনের বাস্তবতা। একজন সাধারণ মানুষ যখন হাসপাতালে গিয়ে প্রিয়জনকে অসুস্থ অবস্থায় দেখেন, তখন তাঁর কাছে সেটি একটি ভয়াবহ অভিজ্ঞতা। কিন্তু একজন চিকিৎসক প্রতিদিন অসংখ্য মানুষের সে ভয়াবহতার মধ্যে কাজ করেন। তাই একজন চিকিৎসককে অনেক সময় বাইরে থেকে খুব নির্লিপ্ত, কঠিন বা আবেগহীন মনে হতে পারে। কিন্তু সব নির্লিপ্ততা নিষ্ঠুরতা নয়। অনেক সময় সেটি পেশাগত আত্মরক্ষা। একজন সার্জন যদি প্রতিটি অপারেশনের আগে রোগীর ভয়, পরিবারের কান্না এবং সম্ভাব্য মৃত্যুর কথা ভেবে আবেগে ভেঙে পড়েন, তাহলে তিনি হয়তো সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে পারবেন না। তাই চিকিৎসককে নিজের আবেগকে নিয়ন্ত্রণ করতে শেখানো হয়। মাথায় বিজ্ঞান, হাতে দক্ষতা, আর হৃদয়ে মানুষ—একজন ভালো চিকিৎসকের আসল সমন্বয় এখানেই। কিন্তু সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন পেশাগত দূরত্ব ধীরে ধীরে মানবিক দূরত্বে পরিণত হয়। রোগী তখন আর মানুষ থাকে না—হয়ে যায় “একটি কেস”। বৃদ্ধ মানুষটি হয়ে যায় “বেড নম্বর ১২”। কান্নারত মা হয়ে যান “অতিরিক্ত প্রশ্ন করা আত্মীয়”। অসহায় দরিদ্র রোগী হয়ে যায় “কম গুরুত্বপূর্ণ রোগী”। সেখানেই চিকিৎসাবিজ্ঞানের সঙ্গে মানবিকতার বিচ্ছেদ শুরু হয়।

বাংলাদেশে সমস্যাটি আরও জটিল বাংলাদেশের বাস্তবতা আবার একটু ভিন্ন। এখানে রোগী ও চিকিৎসকের মধ্যকার দূরত্বের জন্য শুধু চিকিৎসককে দায়ী করলে পুরো সত্য বলা হয় না। কারণ অনেক হাসপাতালেই রোগীর তুলনায় চিকিৎসক কম, নার্স কম, বেড কম, পরীক্ষা-নিরীক্ষার সুযোগ সীমিত, জরুরি বিভাগে চাপ বেশি এবং অপেক্ষার সময় দীর্ঘ। WHO-এর বাংলাদেশ-সংক্রান্ত মূল্যায়নে স্বাস্থ্যকর্মীর ঘাটতি এবং তাদের অসম বণ্টনকে বড় সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। ২০২০ সালে বাংলাদেশে চিকিৎসক, নার্স ও মিডওয়াইফ মিলিয়ে প্রতি ১০,০০০ মানুষের বিপরীতে স্বাস্থ্যকর্মীর ঘনত্ব ছিল ৯.৯—বিশ্বের ৪৮.৬-এর মধ্যম মানের তুলনায় অনেক কম। অর্থাৎ একজন চিকিৎসকের সামনে যখন একসঙ্গে অনেক রোগী থাকে, প্রত্যেক রোগীকে দীর্ঘ সময় দেওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। রোগী ভাবেন— “ডাক্তার আমাকে সময় দিচ্ছেন না।” চিকিৎসক ভাবেন— “আমার সামনে আরও ৫০ জন রোগী অপেক্ষা করছে।” এখান থেকেই তৈরি হয় একটি ভয়ঙ্কর communication gap। রোগীর মনে হয় ডাক্তার অহংকারী। ডাক্তারের মনে হয় রোগী অযৌক্তিক দাবি করছেন। রোগীর স্বজন মনে করেন হাসপাতাল টাকা নিচ্ছে কিন্তু সেবা দিচ্ছে না। চিকিৎসক মনে করেন সীমিত জনবল ও সুবিধার মধ্যেও তাঁকে অসম্ভব প্রত্যাশা পূরণ করতে বলা হচ্ছে। এই পারস্পরিক অবিশ্বাস একসময় চিকিৎসা-সম্পর্ককে বিষাক্ত করে তোলে। কিন্তু হাসপাতালের সীমাবদ্ধতার দায় রোগীর নয়, চিকিৎসকেরও নয় এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ কথা বলা দরকার।

একটি হাসপাতালে পর্যাপ্ত বেড নেই—এটি চিকিৎসকের ব্যক্তিগত অপরাধ নয়। পর্যাপ্ত নার্স নেই—এটি চিকিৎসকের অপরাধ নয়। আইসিইউ বেড খালি নেই—এটিও চিকিৎসকের ব্যক্তিগত ব্যর্থতা নয়। ওষুধ বা পরীক্ষার সুযোগ সীমিত—সেটিও সবসময় চিকিৎসকের হাতে থাকে না। কিন্তু রোগী যখন কষ্টে থাকেন, তখন তিনি রাষ্ট্রের স্বাস্থ্যনীতি, বাজেট, জনবল পরিকল্পনা বা হাসপাতাল প্রশাসন দেখেন না। তিনি সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ডাক্তারটিকেই দেখেন। ফলে সিস্টেমের ব্যর্থতার ক্ষোভ অনেক সময় গিয়ে পড়ে চিকিৎসকের ওপর।

অন্যদিকে চিকিৎসকও যখন প্রতিদিন সীমিত সম্পদ দিয়ে অসম্ভবকে সম্ভব করার চেষ্টা করেন, তখন তাঁর মধ্যে হতাশা জমে। এ জায়গাটিই সবচেয়ে বিপজ্জনক। কারণ রোগী ও চিকিৎসক আসলে একই সমস্যার দু’প্রান্তে দাঁড়িয়ে থাকা মানুষ। একজন চিকিৎসা চান। অন্যজন চিকিৎসা দিতে চান। কিন্তু মাঝখানে যদি পর্যাপ্ত হাসপাতাল, জনবল, সরঞ্জাম, ব্যবস্থাপনা ও যোগাযোগ না থাকে, তাহলে দুজনের মধ্যেই সংঘাত তৈরি হয়। বাংলাদেশে চিকিৎসকদের ওপর সহিংসতা—এটি বাস্তব সমস্যা চিকিৎসকদের প্রতি দুর্ব্যবহার বা সহিংসতাকে কোনোভাবেই সমর্থন করা যায় না।

বাংলাদেশের একটি সরকারি tertiary-care হাসপাতালে ৪৪১ জন চিকিৎসককে নিয়ে করা একটি গবেষণায় ৬৭.৩% চিকিৎসক কর্মক্ষেত্রে কোনো না কোনো ধরনের সহিংসতার অভিজ্ঞতার কথা জানিয়েছেন; এর মধ্যে মানসিক সহিংসতা ছিল সবচেয়ে বেশি, পাশাপাশি শারীরিক ও যৌন সহিংসতার ঘটনাও রিপোর্ট হয়েছে।

আরেক গবেষণায় বাংলাদেশে চিকিৎসকদের ওপর কর্মক্ষেত্রের সহিংসতার সঙ্গে পর্যাপ্ত জনবল ও অন্যান্য সম্পদের ঘাটতির সম্পর্কের কথা উঠে এসেছে। এখানে প্রশ্নটি খুব সহজ: একজন চিকিৎসক কি ভুলের ঊর্ধ্বে? না। চিকিৎসকও মানুষ। তিনি ভুল করতে পারেন, অবহেলা করতে পারেন, পেশাগত ব্যর্থতা ঘটতে পারে। কোনো চিকিৎসকের ভুল হলে তদন্ত, জবাবদিহি, ক্ষতিপূরণ এবং প্রয়োজন হলে আইনগত ব্যবস্থা থাকা উচিত। কিন্তু তার প্রতিকার হতে পারে না— হাসপাতালে ভাঙচুর, চিকিৎসককে মারধর, হুমকি, গালাগালি, পরিবারকে ভয় দেখানো, অথবা রোগীর মৃত্যুর জন্য তাৎক্ষণিকভাবে চিকিৎসককে অপরাধী ধরে নেয়া। ভুলের বিচার চাই—কিন্তু সহিংসতা নয়। কারণ একজন চিকিৎসককে নিরাপত্তাহীন করে দিলে শেষ পর্যন্ত নিরাপদ চিকিৎসা ব্যবস্থাই দুর্বল হয়। WHO-ও স্বাস্থ্যসেবার ওপর মৌখিক বা শারীরিক সহিংসতা, হুমকি ও বাধাকে স্বাস্থ্যসেবার ওপর “attack” হিসেবে বিবেচনা করে এবং স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরাপদ পরিবেশে কাজ করার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দেয়। তাহলে প্রতিকার কী? প্রতিকার শুধু “ডাক্তার ভালো ব্যবহার করুন” বললে হবে না। আবার শুধু “রোগীরা ডাক্তারকে সম্মান করুন” বললেও হবে না। প্রয়োজন সিস্টেমের সংস্কার।

১. রোগীর অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। রোগীকে চিকিৎসার ধরন, ঝুঁকি, সম্ভাব্য ফলাফল এবং বিকল্প সম্পর্কে বোঝানোর ব্যবস্থা থাকতে হবে।

২. চিকিৎসকের অধিকারও নিশ্চিত করতে হবে। নিরাপদ কর্মপরিবেশ, শারীরিক নিরাপত্তা, পর্যাপ্ত বিশ্রাম, যুক্তিসংগত কর্মঘণ্টা এবং আইনি সুরক্ষা প্রয়োজন।

৩. রোগীর অভিযোগের স্বাধীন ব্যবস্থা থাকতে হবে। অভিযোগ করার জন্য রোগীকে চিকিৎসককে আক্রমণ করতে হবে না। হাসপাতালে স্বাধীন grievance বা complaint mechanism থাকা উচিত।

৪. চিকিৎসকের ভুল হলে তদন্ত হতে হবে। “ডাক্তার মানেই সঠিক”—এই ধারণা যেমন ভুল, তেমনি “রোগী মারা গেছে মানেই ডাক্তার মেরেছেন”—এই ধারণাটিও ভয়ঙ্কর। প্রমাণভিত্তিক তদন্ত প্রয়োজন।

৫. হাসপাতালের জনবল বাড়াতে হবে। একজন চিকিৎসকের ওপর অস্বাভাবিক রোগীর চাপ দিলে মানবিক আচরণের প্রত্যাশা করাও কঠিন হয়ে যায়।

৬. চিকিৎসকদের communication training প্রয়োজন। শুধু চিকিৎসাবিজ্ঞান নয়—কীভাবে খারাপ খবর দিতে হয়, কীভাবে মৃত্যুপথযাত্রী রোগীর পরিবারের সঙ্গে কথা বলতে হয়, কীভাবে রাগান্বিত স্বজনকে সামলাতে হয়—এসবও চিকিৎসাশিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অংশ হওয়া উচিত।

৭. রোগীকেও স্বাস্থ্যব্যবস্থার বাস্তবতা বোঝাতে হবে। প্রত্যেক চিকিৎসক সর্বশক্তিমান নন। তিনি রোগীকে চিকিৎসা দিতে পারেন, কিন্তু মৃত্যুকে সবসময় ঠেকাতে পারেন না। তিনি চিকিৎসা করতে পারেন, কিন্তু হাসপাতালের সব সীমাবদ্ধতা একা দূর করতে পারেন না।

বিশ্বের অন্য দেশে চিকিৎসকদের অবস্থান : বিশ্বের উন্নত স্বাস্থ্যব্যবস্থাগুলোতেও চিকিৎসকের জীবন সহজ নয়। সেখানেও burnout, অতিরিক্ত কাজ, মানসিক চাপ ও পেশাগত অসন্তোষ আছে। তবে অনেক উচ্চ-আয়ের দেশে চিকিৎসকদের জন্য তুলনামূলকভাবে উন্নত কর্মপরিবেশ, সামাজিক নিরাপত্তা, প্রাতিষ্ঠানিক সুরক্ষা ও পারিশ্রমিকের কাঠামো রয়েছে। OECD-এর ২০২৫ সালের তথ্য অনুযায়ী, OECD দেশগুলোতে সাধারণ চিকিৎসকদের আয় সাধারণ শ্রমজীবী কর্মীদের গড় মজুরির তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি; ২০২৩ সালে salaried specialists অধিকাংশ দেশে জাতীয় গড় মজুরির প্রায় ১.৫-২.৫ গুণ এবং self-employed GPs অনেক দেশে প্রায় ২-৪ গুণ আয় করেছেন। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের ক্ষেত্রেও পারিশ্রমিক সাধারণ শ্রমিকের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি; OECD-এর ২০২৫ বিশ্লেষণে salaried specialists সাধারণত গড় কর্মীর ২-৫ গুণ এবং self-employed specialists প্রায় ৩-৫ গুণ আয় করেন বলে উল্লেখ করা হয়েছে, যদিও দেশ ও specialty অনুযায়ী পার্থক্য বড়। ইউরোপের ক্ষেত্রেও ২০২২ সালের তথ্য অনুযায়ী অধিকাংশ দেশে এচং জাতীয় গড় মজুরির প্রায় ২-৪ গুণ এবং specialists প্রায় ২-৫ গুণ আয় করেছেন।

তবে বাংলাদেশকে এসব দেশের সঙ্গে সরাসরি শুধু বেতনের অঙ্ক দিয়ে তুলনা করা ঠিক হবে না। জীবনযাত্রার ব্যয়, সরকারি-বেসরকারি কাঠামো, কাজের ধরন, ব্যক্তিগত প্র্যাকটিস, করব্যবস্থা ও সামাজিক নিরাপত্তা ভিন্ন। কিন্তু একটি মৌলিক পার্থক্য গুরুত্বপূর্ণ: উন্নত স্বাস্থ্যব্যবস্থায় চিকিৎসককে শুধু একজন সেবা প্রদানকারী হিসেবে নয়, স্বাস্থ্যব্যবস্থার একটি মূল্যবান মানবসম্পদ হিসেবেও দেখার প্রবণতা বেশি।

বাংলাদেশে চিকিৎসকদের সংখ্যা ও বণ্টন—দুটিই এখনও বড় চ্যালেঞ্জ। WHO-এর তথ্য অনুযায়ী ২০২২ সালে বাংলাদেশে প্রতি ১০,০০০ মানুষের বিপরীতে চিকিৎসকের ঘনত্ব ছিল ৭.২।

আর স্বাস্থ্যকর্মীদের শহর ও গ্রামভিত্তিক বণ্টনেও বড় বৈষম্য রয়েছে। WHO-র ২০২১ সালের বিশ্লেষণে স্বীকৃত স্বাস্থ্যকর্মীর ঘনত্ব শহরে ৭৩.৭২ এবং গ্রামীণ এলাকায় ১১.৪৮ প্রতি ১০,০০০ মানুষের মতো বড় পার্থক্য দেখানো হয়েছিল। অতএব বাংলাদেশে সমস্যাটি শুধু “ডাক্তার কম”—এতটুকু নয়। সমস্যা হলো— ডাক্তার কম + নার্স কম + অবকাঠামোর চাপ + রোগীর সংখ্যা বেশি + ভৌগোলিক বৈষম্য + ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা + পারস্পরিক অবিশ্বাস। কোভিড আমাদের কী শিখিয়েছে?

কোভিড-১৯ মহামারি চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের সম্পর্কে আমাদের একটি নির্মম সত্য দেখিয়েছে। আমরা যখন ঘরে ছিলাম, তারা হাসপাতালে ছিল। আমরা যখন সংক্রমণের ভয় করছিলাম, তারা সংক্রমিত মানুষের কাছে যাচ্ছিল। আমরা যখন নিজের পরিবারের নিরাপত্তা নিয়ে চিন্তিত ছিলাম, তারা অন্য পরিবারের মানুষকে বাঁচানোর চেষ্টা করছিল। কখনো PPE পরে ঘণ্টার পর ঘণ্টা কাজ করেছেন। কখনো নিজের পরিবার থেকে দূরে থেকেছেন।

কখনো নিজেরাই আক্রান্ত হয়েছেন। কখনো সহকর্মীকে হারিয়েছেন। WHO বাংলাদেশও কোভিডের সময় স্বাস্থ্যকর্মীদের সংক্রমণের ঝুঁকি, মানসিক চাপ, সামাজিক stigma, সহিংসতা এমনকি মৃত্যুর ঝুঁকির কথা উল্লেখ করেছে এবং তাদের স্বীকৃতি, সম্মান ও সহায়তার প্রয়োজনীয়তার ওপর জোর দিয়েছে।

বাংলাদেশের স্বাস্থ্যকর্মীদের নিয়ে গবেষণাতেও কোভিডের সময় অতিরিক্ত কাজ, পর্যাপ্ত প্রণোদনার অভাব এবং সহায়তার সীমাবদ্ধতার কথা উঠে এসেছে। অর্থাৎ কোভিডের সময় চিকিৎসক শুধু রোগীর চিকিৎসা করেননি। তাঁরা নিজেদের জীবনকেও ঝুঁকির মধ্যে রেখেছেন। কিন্তু কোভিড শেষ হওয়ার পর আমরা কি তাঁদের কথা মনে রেখেছি? এখানেই সবচেয়ে অস্বস্তিকর প্রশ্ন। মহামারির সময় চিকিৎসকদের বলা হয়েছিল— “আপনারাই frontline hero।” হাসপাতালের বাইরে তাঁদের জন্য কৃতজ্ঞতার কথা বলা হয়েছিল। তাঁদের ছবি সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছিল। কিন্তু সংকট কমে যাওয়ার পর সেই সম্মানের কতটা স্থায়ী হয়েছে? যে চিকিৎসক মহামারির সময় আমাদের জীবন বাঁচানোর জন্য নিজের জীবন ঝুঁকিতে রেখেছিলেন, আজ তাঁর সঙ্গে কি আমরা এমন আচরণ করতে পারি যেন তিনি কেবল একজন “সার্ভিস প্রোভাইডার”? না। একইভাবে এটাও বলা যাবে না যে কোভিডে আত্মত্যাগ করেছেন বলে প্রত্যেক চিকিৎসকের ভুল ক্ষমাযোগ্য। সম্মান ও জবাবদিহি—দুটোই পাশাপাশি থাকতে হবে।

মানবাধিকার শুধু রোগীর জন্য নয়- আমরা যখন মানবাধিকারের কথা বলি, তখন রোগীর অধিকার নিয়ে কথা বলা অত্যন্ত জরুরি। রোগীর জীবন মূল্যবান। রোগীর সম্মান মূল্যবান। রোগীর চিকিৎসা পাওয়ার অধিকার আছে। কিন্তু স্বাস্থ্যকর্মীও মানুষ। তাঁরও জীবন আছে। তাঁরও পরিবার আছে। তাঁরও সন্তান আছে। তাঁরও ভয় আছে। তাঁরও ক্লান্তি আছে। তাঁরও অসুস্থ হওয়ার অধিকার আছে। তাঁরও নিরাপদ কর্মপরিবেশ পাওয়ার অধিকার আছে। তাঁকেও অপমান, হুমকি ও শারীরিক আক্রমণ থেকে সুরক্ষা দেয়ার অধিকার আছে। রোগীর মানবাধিকার রক্ষা করতে গিয়ে চিকিৎসকের মানবাধিকারকে অস্বীকার করা যায় না। বরং দুটো অধিকারকে একসঙ্গে রক্ষা করতে হবে।

চিকিৎসক বনাম রোগী নয়—চিকিৎসক ও রোগী আমাদের সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি এখানেই দরকার। আমরা যেন ভাবা বন্ধ করি—“ডাক্তার আর রোগী দুই পক্ষ।” আসলে তাঁরা দুই পক্ষ নন। তাঁরা একই স্বাস্থ্যব্যবস্থার দুই অংশ। রোগী ছাড়া চিকিৎসক অপ্রয়োজনীয়। আর চিকিৎসক ছাড়া আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থায় রোগী অসহায়। তাই সম্পর্কটি হওয়া উচিত—বিশ্বাসের। ডাক্তার রোগীকে সম্মান করবেন। রোগী ডাক্তারকে সম্মান করবেন। হাসপাতাল রোগীর অধিকার রক্ষা করবে। রাষ্ট্র চিকিৎসকের অধিকার রক্ষা করবে। চিকিৎসায় ভুল হলে তদন্ত হবে। অপরাধ হলে শাস্তি হবে। কিন্তু অভিযোগের জায়গা কখনো সহিংসতার জায়গা হবে না।

একজন চিকিৎসক প্রতিদিন মানুষের শরীরের অসুস্থতা দেখেন। কিন্তু তাঁরও একটি মন আছে। তিনি প্রতিদিন মৃত্যু দেখেন—তবু বাঁচানোর চেষ্টা করেন। তিনি জানেন সবাইকে বাঁচানো সম্ভব নয়—তবু পরবর্তী রোগীর দিকে এগিয়ে যান। তিনি জানেন কোনো কোনো রোগ তাঁর সাধ্যের বাইরে—তবু চেষ্টা থামান না। এ চেষ্টাটির মূল্য আছে। আবার একজন রোগীও যখন হাসপাতালে আসেন, তিনি কোনো বিরক্তিকর সংখ্যা নন। তিনি একজন মানুষ—যিনি ভয় নিয়ে এসেছেন, আশা নিয়ে এসেছেন, হয়তো তাঁর পরিবার তাঁর ওপর নির্ভর করছে।

তাই চিকিৎসকের মানবিকতা যেমন প্রয়োজন, রোগীরও প্রয়োজন চিকিৎসকের মানবিক অবস্থানটি বোঝা। একজন ভালো ডাক্তারকে দেবতা বানানোর প্রয়োজন নেই। তাঁকে মানুষ হিসেবেই সম্মান করা যথেষ্ট। কারণ দেবতার ভুল হয় না—মানুষের ভুল হতে পারে। কিন্তু একজন মানুষের ভুলের বিচারও মানুষ হিসেবেই হতে হবে—আইন, প্রমাণ, ন্যায় ও জবাবদিহির মাধ্যমে; রাগ, গুজব, অপমান বা সহিংসতার মাধ্যমে নয়। আর একজন চিকিৎসককে পাথর বানিয়ে ফেলাও ঠিক নয়। কারণ যে মানুষটি সারাদিন অন্যের কষ্ট সামলান, তাঁর নিজের ক্লান্তি, ভয় ও মানবিকতাকেও স্বীকার করতে হয়। শেষ পর্যন্ত চিকিৎসাবিজ্ঞানের সবচেয়ে বড় সত্য হয়তো এই— রোগীর শরীরের চিকিৎসা বিজ্ঞান করতে পারে; কিন্তু অসুস্থ মানুষের ভয় কমানোর জন্য প্রয়োজন একজন মানুষের আরেকজন মানুষের পাশে দাঁড়ানো। আর স্বাস্থ্যব্যবস্থার সবচেয়ে সুন্দর সম্পর্কটি “ডাক্তার বনাম রোগী” নয়— “একজন মানুষ আরেকজন মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে”—এটাই।

লেখক : কবি, সাংবাদিক ও প্রাবন্ধিক।