মুসফিকা আন্জুম নাবা
একথা কারো অজানা নয় যে, নারী-পুরুষ নির্বিশেষে শিক্ষা মানুষের মৌলিক অধিকার। আমাদের সংবিধানেও এর স্বীকৃতি রয়েছে। জাতিসংঘ সনদেও শিক্ষাকে ব্যক্তির মৌলিক অধিকার হিসাবে গণ্য করা হয়েছে। আল্লাহ তা’য়ালার পক্ষ থেকে প্রথম ওহী হলো ‘পড় তোমার প্রভূর নামে’। তাই শিক্ষা ব্যক্তি জীবনের একটি অতিগুরুত্বপূর্ণ অনুষঙ্গ; চাই তিনি পুরুষ বা নারী হোন না কেন।
নারী-পুরুষের অধিকার বিষয়ক জটিলতা ও বিতর্ক সে সৃষ্টির আদিকাল থেকেই। উভয়ই কর্মক্ষেত্রসহ জীবনচলার পথে সমান্তরাল কি না-তা নিয়েও রয়েছে বিস্তর মতপার্থক্য। কথা রয়েছে সমঅধিকার নিয়েও। বিশেষ করে নারীরা পুরুষের সাথে যুগপৎভাবে শিক্ষা গ্রহণ করতে পারবে কি না তা নিয়েও রয়েছে নানা মত ও নানা পথ। কেউ কেউ আবার উভয়ের মধ্যে সমতা এবং শিক্ষার সুযোগের ক্ষেত্রগুলো অন্তর্ভুক্ত করেন। কিন্তু এ ধরনের চিন্তা মোটেই বাস্তবসম্মত নয়। কারণ, নারী-পুরুষ আলাদা সত্তা। তাই উভয়ের মধ্যে সৃষ্টিগত যে পার্থক্য রয়েছে তা কোনভাবেই সমান্তরাল করার সুযোগ নেই। কেউ কেউ আবার সমান অধিকারের কথা বলতে পুলকবোধ করেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো অধিকার কখনো কারো সমান হয় না। তাই সমান অধিকারের কথা না বলে নায্য অধিকারের কথা বলাই অধিক যুক্তিযুক্ত। আর এটিই বাস্তব ও গ্রহণযোগ্য।
নারী শিক্ষা নিয়ে বাজারে নানা কথাই প্রচলিত রয়েছে। এর ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিক নিয়েও রয়েছে বিস্তর মতপার্থক্য। কেউ কেউ আবার দারিদ্র্য বিমোচনের জন্য নারী ও মেয়েদের শিক্ষা গুরুত্ব দিয়েছেন। আসলে এ ধরনের চিন্তাও যৌক্তিক ও বাস্তবসম্মত নয়। কারণ, শিক্ষা নারী-পুরুষ নির্বিশেষে সকলের জন্যই মৌলিক অধিকার। তাই এর সাথে অন্যকিছুকে সম্পৃক্ত করার সুযোগ নেই। বস্তুত, শিক্ষা মানুষের সুপ্ত প্রতিভা বিকাশের ক্ষেত্রে অপরিহার্য অনুষঙ্গ।
ইসলামে নারীর অধিকার সাম্প্রতিক সময়ে বিশ্বে বহুল আলোচিত বিষয়। একটি পক্ষ বিশেষ দাবি করে যে, ইসলাম ও নারী অধিকার পরষ্পর সাংঘর্ষিক। একটার সাথে আরেকটা যায় না। অথচ এ ধারণা শুধু অমূলক নয় বরং অবান্তরও। কারণ, ইসলামই নারী জাতিকে সর্বোচ্চ মর্যাদা দিয়েছে। অবারিত করেছে শিক্ষার অধিকার। বস্তুত, ইসলামে জ্ঞানার্জন নারী ও পুরুষ উভয়ের জন্যই সমানভাবেই অপরিহার্য তথা বাধ্যতামূলক। ইসলাম ও ইসলামী মূল্যবোধ অনুযায়ী শিক্ষালাভের ক্ষেত্রে নারী-পুরুষের কোনো ভেদাভেদ নেই, যা ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজ গঠনে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। মানবজীবনে শিক্ষার গুরুত্ব সম্পর্কে মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘জ্ঞান অর্জন করা প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর ওপর ফরজ বা অত্যাবশ্যক’। পবিত্র কালামে পাকে প্রথম ওহি ‘ইকরা’ বা ‘পড়’ নির্দেশটি নারী ও পুরুষ উভয়ের চিন্তাশীলতা ও বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশের জন্য প্রযোজ্য। বিশ্বনবী (সা.) নিজ পরিবার এবং নারী সাহাবীদের শিক্ষার ওপর বিশেষ জোর দিতেন এবং তাদের জন্য আলাদা সময় নির্ধারণ করেছিলেন। একটি সুশিক্ষিত পরিবার ও সুন্দর সমাজ গঠনে মায়েদের ভূমিকা প্রধান, আর তাই নারীর শিক্ষা একটি জাতির মেরুদণ্ড মজবুত করে। সঠিক দ্বীনি ও নৈতিক জ্ঞান অর্জন করে নারীরা নিজের জীবন পরিচালনা এবং পরবর্তী প্রজন্মকে সঠিক পথে পরিচালিত করতে পারে। ইসলামের প্রাথমিক যুগ থেকেই আয়েশা (রা.)সহ অনেক নারী হাদিস বর্ণনা ও শিক্ষাদানে অনন্য ভূমিকা রেখে গেছেন। যা ইসলামের ইতিহাসের স্মরণীয় দিক।
মূলত, আল্লাহ তা’য়ালা মানুষকে শুধুমাত্র তাঁর ইবাদতের জন্যই সৃষ্টি করেছেন। মহাগ্রন্থ আল কুরআনের ঘোষণা, ‘আমি সৃষ্টি করেছি জিন ও মানুষকে এ জন্য যে, তারা একমাত্র আমারই ইবাদত করবে’ (সূরা জারিয়াত, আয়াত-৫৬)। একমাত্র আল্লাহর ইবাদত করার নির্দেশ দিয়ে মহান আল্লাহপাক ইরশাদ করেন-‘হে মানুষ! তোমরা তোমাদের সে প্রতিপালকের ইবাদত কর যিনি তোমাদেরকে ও তোমাদের পূর্ববর্তীদেরকে সৃষ্টি করেছেন যাতে তোমরা মুত্তাকী হতে পার’ (সূরা বাকারা: আয়াত-২১)। সে ইবাদত কবুল হওয়ার জন্য আল্লাহপাক একটি শর্ত যুক্ত করেছেন। সে শর্তটি হচ্ছে ইলম বা জ্ঞান। ইলম বা জ্ঞান ব্যতীত কোন ইবাদত আল্লাহর দরবারে কবুল হবে না। এজন্য ইবাদত করার পূর্বে এ সম্পর্কে শিক্ষা অর্জন করা সকলের ওপর ফরজ। শিক্ষা লাভ করা থেকে নর-নারী কাউকে বাদ দেয়া যাবে না। কেউ বিরত থাকতে পারবে না। আল্লাহপাক পুরুষকে যেমন শিক্ষা অর্জনের নির্দেশ দিয়েছেন তেমন নারীকেও শিক্ষা অর্জনের নির্দেশ দিয়েছেন। আল্লাহর বিধানে শিক্ষা অর্জন করা নর-নারীর সমান অধিকার। শিক্ষা ক্ষেত্রে সমান অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য পবিত্র কুরআন নাজিল করে মহান আল্লাহপাক সর্ব প্রথম যে নির্দেশ দিয়েছেন সে নির্দেশটাই হচ্ছে নর-নারীর জন্য শিক্ষা বিষয়ক। ইরশাদ হচ্ছে-‘পড় তোমার প্রভুর নামে” (সূরা আলাক: আয়াত-১)। শিক্ষা ছাড়া আল্লাহকে জানা-বুঝা যাবে না বিধায় শিক্ষা অর্জন করা প্রথম ও প্রধান ফরজ। এ ফরজ কাজ থেকে বিরত থাকা মানেই সকল ক্ষেত্রে ধ্বংস ডেকে আনা। মানবতার ইহ-পরকালীন শান্তির একমাত্র পথ হচ্ছে শিক্ষা। আর এই শিক্ষা নর-নারী উভয়কেই অর্জন করতে হবে। ইলম অর্জন করা সকল নর-নারীর ওপর ফরজ ঘোষণা করে হযরত আনাস রা. বর্ণিত হাদীসে রাসূল সা. ইরশাদ করেন- ‘ইলম অর্জন করা প্রত্যেক মুসলমান নর-নারীর ওপর ফরজ’ (ইবনে মাজাহ, বায়হাকী)।
ইসলামে নারী শিক্ষাকে খুবই গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। ব্যক্তি, পরিবার, সমাজ ও রাষ্ট্রের উন্নয়নে নারীশিক্ষার বিকল্প নেই। বিশেষ করে একটি পরিবারকে সুশিক্ষিত করে তুলতে হলে শিক্ষাক্ষেত্রে নারীকে অবশ্যই অগ্রাধিকার দিতে হবে। কুরআন-সুন্নাহ পর্যালোচনা করে দেখা যায়, বিশ্বনবী (সা.) সর্ব প্রথম নারীদেরকে শিক্ষার প্রতি উৎসাহিত করেছেন এবং এ শিক্ষার বিধান সর্ব প্রথম বাস্তবায়ন করার সুবর্ণ সুযোগ পান রাসুলে পাক (সা.)-এর প্রিয় সহধর্মিণী হযরত খাদীজাতুল কুবরা (রা.)। কাজেই নারী শিক্ষার বিষয়টাকে খাটো করে দেখার কোনো সুযোগ নেই। অগণিত হাদীস দ্বারা এটাও সুস্পষ্ট প্রমাণিত- নবী (সা.) নিজেই নারীদেরকে শিক্ষাদান করতেন, নারীদেরকে শিক্ষার প্রতি উৎসাহিত করতেন। সাহাবায়ে কেরামের নিকট থেকে নারীরা শিক্ষা গ্রহণ করতেন এমনকি বড় বড় সাহবীগণও নারীদের নিকট থেকে শিক্ষা গ্রহণ করতেন। হযরত জুবায়ের ইবনে মুতইম (রা.) বর্ণিত হাদীসে আছে- ‘একবার এক মহিলা রাসূল (সা.)-এর দরবারে এসে কিছু বিষয় শিক্ষা গ্রহণ করলো। বিদায় নিয়ে যাবার সময় রাসূল (সা.) তাকে বললেন আর জানার মত কিছু থাকলে অন্য সময় জেনে নিও। মহিলাটি আরজ করলো-ইয়া রাসূলাল্লাহ! যদি আপনাকে না পাই অর্থাৎ যদি আপনি দুনিয়াতে না থাকেন তখন কি হবে? রাসূল (সা.) বললেন- আবু বকর (রা.)-এর নিকট তখন শিক্ষা গ্রহণ করিও’ (বুখারী ও মুসলিম, তিরমিজী)।
বর্ণিত হাদিসের দ্বারা প্রমাণিত হয়ে যে, বিশ্বনবী (সা.) স্বয়ং নিজে নারীদেরকে শিক্ষা দিতেন এবং তার অনুপস্থিতিতে অন্য জনের নিকট গিয়ে শিক্ষা গ্রহণ করার জন্য নারীদেরকে উৎসাহিত করতেন। রাসূল (সা.) এর যুগে এবং পরবর্তী সময়ে অগণিত মহিয়সী মুসলিম নারী শিক্ষাদান করেছেন এবং তারা শিক্ষকতা করে নিরক্ষরতা দূর করেছেন। মহিলা সাহাবীদের মধ্যে অনেকে ছিলেন অগাধ পাণ্ডিত্যের অধিকারী। হযরত আয়শা (রা) ছিলেন হাদীস ও ফিকাহ শাস্ত্রের এক মহান পণ্ডিত। চার খলিফাসহ বড় বড় সাহাবীরা তার নিকট থেকে বিভিন্ন বিষয়ে শিক্ষা গ্রহণ করেছেন।
হযরত আবু মুসা আশআরী (রা.) বর্ণিত হাদীসে তিনি বলেন- ‘আমরা রাসূল (সা.)-এর সাহাবীরা যখনই কোন মাসআলার ব্যাপারে সন্দেহ বা সমস্যায় পড়তাম তখনই আমরা হযরত আয়শা (রা.)-এর নিকট গিয়ে জিজ্ঞেস করতাম এবং সঠিক সমাধান পেয়ে যেতাম (তিরমিজী, মিশকাত শরীফ: পৃষ্ঠা-৫৭৪)। পুরুষ সাহাবীগণ মহিলা সাহাবীদের নিকট মাসআলা শিক্ষার জন্য যেতেন যা উক্ত হাদীসে উল্লেখ আছে। এর দ্বারা প্রমাণ হলো-মহিলাদের জন্য শিক্ষকতা করা বা মহিলাদের নিকট গিয়ে শিক্ষা গ্রহণ করার ব্যাপারে ইসলামের কোনো বাধা নেই। তবে শর্ত হলো সব সময় পর্দা রক্ষা করতে হবে। কেউ যদি পর্দাহীন হয় তাহলে সে তার চরিত্র ও নৈতিকতা হারিয়ে ফেলবে। আর চরিত্র নষ্ট হলে তো শিক্ষা লাভ করেও লাভ নেই। সাহাবায়ে কেরামগণ (নারী-পুরুষ) শিক্ষার জন্য পরস্পর সাক্ষাৎ করতেন, ইলম ব্যাপারে পরস্পর আলোচনা করতেন সত্য কিন্তু এতে পর্দার কোন ব্যাঘাত ঘটতো না। তারা সর্বদা পর্দা রক্ষা করেই চলতেন।
নারীদের জন্য শুধু প্রাথমিক শিক্ষা নয়, বরং উচ্চ শিক্ষা লাভ করতেও ইসলামে কোনো বাধা নেই বরং উৎসাহিত করা হয়েছে। কিন্তু তা অবশ্যই শালীনতা ও পর্দা মেনেই করতে হবে। কারণ জ্ঞানার্জন একটি ফরজ কাজ এবং এর চেয়ে বড় ফরজ হল পর্দা রক্ষা করা। পুরুষের মত নারীরাও উচ্চ শিক্ষা গ্রহণ করবে, শিক্ষকতা করবে এবং শিক্ষার প্রসার করবে এ সম্পর্কিত নির্দেশ পবিত্র কুরআনেই রয়েছে। ইরশাদ হচ্ছে- ‘হে নবী পরিবার! তোমাদের গৃহে যে আল্লাহর বাণী পাঠ করা হয় এবং হিকমত পরিবেশন করা হয় তা তোমরা স্মরণ কর এবং প্রচার কর’ (সূরা আহযাব: আয়াত-৩৪)।
আগেই উল্লেখ করা হয়েছে যে, শিক্ষা মানুষের মৌলিক অধিকার। তাই শিক্ষা গ্রহণের অধিকার থেকে নারী-পুরুষ কাউকেই বঞ্চিত করার কোন সুযোগ নেই। ইসলাম নারী-পুরুষ উভয়ের জন্যই শিক্ষা গ্রহণকে অত্যাবশ্যকীয় করে দিয়েছে। যারা দাবি করেন ইসলাম নারী শিক্ষা বা প্রগতির অন্তরায় তারা মোটেই সঠিক কথা বলেন না। তারা ইসলাম সম্পর্কে যথাযথ জ্ঞান অর্জন না করেই বিদ্বেষবশত এসব কথা প্রচার করেন। যা মোটেই বাস্তবসম্মত নয়। মূলত, ইসলাম একটি ভারসাম্যপূর্ণ ও সর্বজনীন জীবন বিধান। তাই বাস্তবজীবনে ইসলামের পরিপূর্ণ অনুসরণের মধ্যেই রয়েছে ইহকালীন কল্যাণ ও পরকালীন মুক্তি।
লেখক : শিক্ষার্থী, ফুড এন্ড নিউট্রিশন, কলেজ অব হোম ইকনোমিকস।