তৌহিদুর রহমান
ঘটনাপ্রবাহের বাঁক পরির্তনের পরিপ্রেক্ষিতে অনেক সময় ইতিহাসেরও গতিপ্রকৃতি পাল্টে যায়। নদীর মতো মোড় নেয়। ইতিহাসবিদরা সে পরিবর্তিত স্রোতে গা ভাসিয়ে দেন। যে নদী সাগরে মিলিত হতে পারে না তার ইতিহাস হয়তো কখনো লিখিত হয় না। আর লিখিত হলেও তাতে উপাদেয় কিছু থাকে না। এটাই স্বাভাবিক। পরাজিত সিংহের রাজ্য ছেড়ে পালানো ছাড়া কোন গত্যন্তর থাকে না। ১৯৪৭-এর আগে হানাদার ইংরেজদের নিকট হাজার হাজার স্বাধীনতাকামী ছিলেন স্বাধীনতা বিরোধী, মানবতার শত্রু, যুদ্ধাপরাধীÑতাদের অনেককে তখনকার ইংরেজ সরকার দিয়েছিল ফাঁসি, অসংখ্য স্বাধীনতাকামী ভারতীয় নাগরিককে ফায়ারিং স্কোয়াডে গুলি করে হত্যা করা হয়েছিল, অনেককে জনমানবহীন নির্জন দ্বীপে বন্দী রাখা হয়েছিল আমৃত্যু, অনেক স্বাধীনতাকামী কারাগারেই তাদের শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করেছিলেন।
আজ ভারতবর্ষ যদি স্বাধীন না হতো তাহলে তাদের সে স্বর্ণালি ইতিহাস ভিন্নভাবে লেখা হতো। দেশ স্বাধীন হয়েছে তাই আজ তারা বীরমুক্তিযোদ্ধা। দেশ স্বাধীন না হলে এ মুক্তিযোদ্ধারাই হয়ে যেতেন দেশদ্রোহী, স্বাধীনতার শত্রু, মানবতার শত্রু। অতএব মনে রাখা দরকার ক্ষমতা যার ইতিহাসও তার।
সামান্য একটু ভুলের কারণেই আপনার ইতিহাস ভিন্নভাবে লেখা হতে পারে। জিন্নাহ ভারত উপমহাদেশ তথা সমগ্র বিশ্বে একজন সফল রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব। পাকিস্তান সৃষ্টিতে যার অসামান্য অবদান রয়েছে। বলা হয়ে থাকে পাকিস্তান সৃষ্টি না হলে আলাদা বাংলাদেশ কখনো সৃষ্টি হতো না। কারণ ১৯৪৭-এর পর ভারত থেকে বের হয়ে আলাদা আর কোন নতুন রাষ্ট্রের জন্ম হতে পারেনি। ভারতে খালিস্তান আন্দোলনসহ অনেক বড় বড় আন্দোলন হয়েছে, কিন্তু সফল হতে পারেনি একটিও। বরং হায়দরাবাদ, কাশ্মীর, সিকিমের মতো কয়েকটি স্বাধীন রাষ্ট্র আজ ভারতে বিলীন হয়ে গেছে। অতএব জীবনযুদ্ধের ময়দানে ভুল করার তিল পরিমাণও সুযোগ নেই। রাজা-বাদশাদের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যায় কোন একজন শাসকের সামান্য একটু ভুলের কারণে রাজপাট তো গেছেই, সাথে পুরো রাজবংশ, পাইক-পেয়াদা, সৈন্য-সামন্তসহ বিলীন হয়ে গেছে। একাত্তরে দেশে থেকে অনেকেই দেশের আপামর মানুষের জন্য কাজ করেছেন। এরপরে শুধু ক্ষমতাসীনদেরই ইতিহাস সোনার অক্ষরে লেখা হয়েছে, হচ্ছে। এটাই নিয়ম, এটাই স্বাভাবিক, এটাই বাস্তবতাÑ দুনিয়াতে যারা জয়ী হয় তাদের ইতিহাস দুনিয়াতে থেকে যায়, জোর করে যদি পরাজিতদের ইতিহাস লেখাও হয় তা কখনো স্থায়ী হয় না এবং টিকেও থাকে না। বরং বেশিরভাগ ক্ষেত্রে দেখা যায় উল্টোটা ঘটতে। পরাজিতের ভালো কাজও কালের পরিক্রমায় ঘৃণিত স্মারক হিসেবে উপস্থাপিত হয়। পক্ষান্তরে বিজয়ীদের সব ধরনের কাজই স্মৃতিফলক হয়ে জ্বল জ্বল করতে থাকে কালের আরশিতে, ইতিহাসের পাতায়।
দেশ স্বাধীনের ৫০ বছর পরে যুদ্ধাপরাধের দায়ে যাদের হত্যা করা হলো তারা ১৯৭১ সালে বা দেশ স্বাধীনের আগে পরে সামান্যতম অন্যায় কাজ করেছেন এমন একটি প্রমাণ কেউ দিতে পারেনি। মনে রাখা দরকার, যে ব্যক্তি প্রকৃতপক্ষেই একজন ভালো মানুষ, যে আল্লাহকে ভয় করে চলে, সে কখনো খারাপ কাজ করতে পারে না। কোনো সুদিন বা প্রতিকুলতাই তাকে টলাতে পারে না। একজন প্রকৃত মুসলমান আল্লাহকে এতোটাই ভয় করে যে, সে কখনো কোনো অবস্থাতেই কারো সাথে প্রতারণা করে না। এমনকি একটা পশু-পাখির সাথেও না। আবার সে দুনিয়া সম্পর্কে এতোটাই সজাগ থাকে যে, সেও সহজে কখনো প্রতারিত হয় না। ১৯৭১ সালে জামায়াত ইসলামী একটা খুবই ক্ষুদ্র এবং দুর্বল দল ছিল। সম্ভবত সারাদেশে মাত্র ৮৭জন সদস্য ছিল। এ সদ্যস্যদের নামে যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে সামান্যতম অন্যায় অপরাধের কারণে কোনো থানায় বা আদালতে একটি মামলাও হয়নি। যদি এরা যুদ্ধের সময় কোনো অন্যায় করতেন তাহলে তো দেশ স্বাধীনের পর রক্ষিবাহিনী বা মুক্তিযোদ্ধারা তাদেরকে পিষে মেরে ফেলতেন। তারা তো তখন দেশেই ছিল।
যেহেতু তারা ছিলেন চরম ভারতবিরোধী অতএব তাদের ভারতে পালিয়ে যাওয়ারও কোনো সুযোগ ছিল না। তারা দেশেই ছিলেন এবং তারা যেহেতু জানতো তারা কোনো অপরাধ করেনি, অতএব তাদের কোনো কিছু হারানোরও ভয় ছিল না। যার চরিত্র খারাপ সে ১৯৭১ সালেও খারাপ ছিল এবং ২০২৬ সালে এসেও সে খারাপ। যুদ্ধের সময় যারা নারী নির্যাতন করেছে, যুদ্ধ পরবর্তী সময়ে তারা আরো বেপরোয়া হয়েছে। যে বাঘ একবার নরমাংশের স্বাদ পায় সে নাকি আর অন্য মাংশ খায় না। একাত্তরে যারা নরমাংশ খেয়েছে যুদ্ধের পরে তারাই নারী নির্যাতন করেছে। সে জন্যই খান আতা ‘আবার তোরা মানুষ হ’ সিনেমা তৈরি করেছিলেন। যুদ্ধের সময় যারা নারী লোলুপ ছিল হুট করে তারা ভালো মানুষ হয়ে যায়নি। ৭১-এ জামায়াতে ইসলামীর শীর্ষ নেতৃবৃন্দ বা জনশক্তি অনেকে অনেক ভালো কাজ করেছেন। কিন্তু ক্ষমতা যার হাতে থাকে ইতিহাসও তার হয়ে যায়। তাই তখনকার অনেক ভালো মানুষের ভালো কাজ কালের পরিক্রমায় আজ কালের গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে। এটা চলমান প্রক্রিয়ারই একটা অংশ। এতে হতাশ হওয়ার কিছু নেই।
আমাদের মনে রাখা দরকার আসল বিচার একদিন হবে, সে বিচারের দিন আমার ভালো কাজগুলো যেন জ্বল জ্বল করতে থাকে। সেদিন আখেরাতের আদালতে যেন আমার মুখটা মলিন না হয়। আমরা মনে করি আমাদের সেসব মহান ব্যক্তিত্ব তাঁরা দুনিয়াতে যে সমস্ত ভালো কাজ করে গেছেন শেষ বিচারের দিন মহান মালিকের সন্তুষ্টি লাভের আশায়। তারা তার প্রতিদান পাবেন ইনশাআল্লাহ। দুনিয়াতে কে তাঁদেরকে ভালো বা মন্দ বললো তা তারা পরোয়া করেননি কখনো। দুনিয়ার সব কিছু ধ্বংস হয়ে যাক, যদি আল্লাহকে আপনি খুশি করতে পারেন তাহলে তার থেকে বড় আর কিছু হতে পারে না। এখন তো প্রমাণিত হয়ে গেছে যে, পাকিস্তান ভাঙার প্লান ছিল এককভাবে ভারতের।
লেখক : কবি ও কথাসাহিত্যিক।