মৃত্যু মানবজীবনের এক অমোঘ সত্য, যা কাউকে এক মুহূর্তের জন্যও ছাড় দেয় না। রাজা থেকে প্রজা, ধনী থেকে গরীব, শিশু থেকে বৃদ্ধ- কারও সাধ্য নেই এই চূড়ান্ত পরিণতি এড়ানোর। প্রতিটি মানুষের আজীবন বুকভরা প্রার্থনা থাকে একটি স্বাভাবিক ও শান্তিময় মৃত্যুর। কিন্তু নির্মম নিষ্ঠুরতায় সবার ভাগ্যে সেই শান্তি জোটে না। যেমনটি কপালে জোটেনি বগুড়ার গাবতলীয় বাগবাড়ী বালিকা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষিকা রনজিলা পারভীনের। গত ২৯ আগস্ট সকাল সাড়ে ছয়টার দিকে সুদূর গ্রাম থেকে চিকিৎসার আশায় ঢাকায় এসে সংসদ ভবনের দক্ষিণ প্লাজার সামনে ছিনতাইকারীদের বেপরোয়া টানে রিকশা থেকে ছিটকে রাস্তায় পড়ে চিরতরে নীরব হয়ে যান এই শিক্ষিকা। খবরের কাগজের পাতায় যখন দেখলাম রনজিলা পারভীনের কফিনবন্দী দেহখানি তাঁর প্রিয় বিদ্যালয়ের আঙিনায় পৌঁছাল, তখন তাঁর অবুঝ, নিষ্পাপ শিশু-শিক্ষার্থীদের কান্নায় আকাশ- বাতাস ভারী হয়ে উঠেছিল। যে শিক্ষক সারাজীবন নিজের বুকের গভীরে পরম যত্নে তাদের সন্তানের মতো আগলে রেখেছিলেন, আজ তাঁকে ফিরতে হলো প্রাণহীন এক সাদা কাফনের কফিনে। একটি দেশের সর্বোচ্চ নিরাপত্তা বলয় হিসেবে পরিচিত জাতীয় সংসদ ভবনের কোলঘেঁষে ঘটা এই নৃশংস হত্যাকাণ্ড পুরো দেশকে এক গভীর শোক ও তীব্র আতঙ্কে স্তব্ধ করে দিয়েছে। যেখানে খোদ ভিআইপি জোনেই সাধারণ মানুষের প্রাণের নিরাপত্তা নেই, সেখানে রাজধানীর বাকি অলিগলির দশা কেমন, তা কল্পনা করতেই বুক কেঁপে ওঠে। অথচ দেশের সাধারণ মানুষ একটি নিরাপদ, মানবিক ও বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার সুমহান প্রত্যয়ে ফ্যাসিবাদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়িয়েছিল। কিন্তু আজও কাঙ্ক্ষিত সেই নিরাপদ বাংলাদেশ গড়ে ওঠেনি। সাম্প্রতিক সময়ে রাজধানীজুড়ে ছিনতাই, চুরি ডাকাতি ও চাঁদাবাজির ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় বিষয়টি জাতীয় সংসদের অধিবেশনেও জোরালোভাবে উঠে এসেছে। বিরোধীদলীয় সংসদ সদস্য সালাইউদ্দিন আইউবী বুধবার সংসদে কার্যপ্রণালী বিধির ৭১ ধারায় জরুরি জনগুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বক্তব দিতে গিয়ে অত্যন্ত ক্ষোভ ও উদ্বেগের সাথে বলেন সংসদ ভবনের সামনে ছিনতাইকারীর হামলায় শিক্ষিকার মৃত্যু, বিমানবন্দরে ছাত্রদল নেতা কর্তৃক স্বর্ণালংকার ছিনতাই, ধানমন্ডিতে প্রকাশ্য দিবালোকে ৩৯ লাখ টাকা ছিনতাই, মুগদা হাসপাতালে প্রকাশ্যে ছিনতাই এবং যাত্রাবাড়ীতে ছুরিকাঘাতে অপর এক ব্যক্তি নিহত হওয়ার ঘটনা প্রমাণ করে যে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চরম অবনতি ঘটেছে। তিনি আরও অভিযোগ করেন যে, পুলিশের নিষ্ক্রিয়তা, নির্লিপ্ততা এবং অক্ষমতার কারণে সাধারণ মানুষের মধ্যে আজ চরম আতঙ্ক বিরাজ করছে। অবিলম্বে জনগণের জানমালের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার স্বার্থে রাজধানীজুড়ে কঠোর যৌথ অভিযান পরিচালনার জোরালো দাবি জানান এই সংসদ সদস্য।

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে রাজধানীর অপরাধের ধরনও আমূল বদলে গেছে। আগে যেখানে ছিনতাইকারীদের আনাগোনা মূলত রাতের আঁধারে বা নির্জন ও গলীর রাস্তায় সীমাবদ্ধ ছিল, বর্তমান সময়ে ভয়ের সেই পরিধি ছড়িয়ে পড়েছে সকল সময় সর্বত্র। এখন আর নির্দিষ্ট কোনো সময় বা স্থান নিরাপদ নয়। দিনদুপুরে প্রকাশ্য দিবালোকে ব্যস্ত সড়কে কিংবা তুলনামূলক নিরাপদ বলে পরিচিত এলাকায় অহরহ ছিনতাইয়ের ঘটনা ঘটছে। কখনো চলন্ত রিকশার গতিপথ রোধ করে ব্যাগ ছিনিয়ে নেওয়া হচ্ছে, কখনো অস্ত্র ঠেকিয়ে সর্বস্ব লুটে নেওয়া হচ্ছে, আবার কখনো ছিনতাইয়ের পরে ভুক্তভোগী পরিবারের কাছে মুক্তিপণ বা টাকা দাবি করার মতো ঘটনাও ঘটছে। ছিনতাইকারীরা সাধারণত মধ্যরাত থেকে সকাল পর্যন্ত ওত পেতে থাকতে শুরু করে। ভোরবেলা বাসস্ট্যান্ড, লঞ্চ টার্মিনাল ও রেলওয়ে স্টেশন থেকে ঢাকামুখী বা বহির্গামী যাত্রীদের তারা প্রধান টার্গেট করে, ফলে আতঙ্ক নিয়ে দিন কাটাতে হচ্ছে রাজধানীবাসীকে। ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রায় ৩০৬ থেকে ৩০৮ বর্গকিলোমিটার এলাকায় চিহ্নিত ছিনতাইকারীর সংখ্যা ১ হাজার ৩৮৭ জন। এর মধ্যে ওয়ারী বিভাগে ৩০৮ জন, তেজগাঁও ও উত্তরা বিভাগে ২৪০ জন, মতিঝিলে ১৬৮ জন, লালবাগে ১৫৯ জন, রমনায় ১৫০ জন, গুলশানে ৬৭ জন এবং মিরপুরে ৫৩ জন তালিকাভুক্ত ছিনতাইকারী রয়েছে। এছাড়া ভাটারা, শাহবাগ, শেরেবাংলা নগর, হাজারীবাগ, মোহাম্মদপুর, বিমানবন্দর, খিলক্ষেত, তেজগাঁও, রমনা, হাতিরঝিল ও উত্তরা এলাকায় ছিনতাইয়ের ঘটনা সবচেয়ে বেশি ঘটে। এসব এলাকার ছিনতায়ের সঙ্গে ভাসমান কিশোর, মাদকাসক্ত ও পথশিশুরা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। নেশার টাকা জোগাড় করতে ব্যর্থ হয়ে মাদকাসক্ত কিশোরেরা সুযোগ পেলেই ছিনতাইয়ের পথ বেছে নিচ্ছে। বাধা দিলেই তারা ধারালো অস্ত্র দিয়ে আঘাত করতে ন্যূনতম দ্বিধা করে না। অথচ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দৃশ্যমান কোনো কার্যকর ভূমিকা চোখে পড়ে না। পুলিশের চোখের সামনে নেশাগ্রস্ত শিশুরা ঘুরে বেড়ালেও কেউ তাদের দিকে নজর দেয় না।

ছিনতাইকারীদের বেপরোয়া দৌরাত্ম্যে মৃত্যুর মিছিল কেবল দীর্ঘই হচ্ছে। স্কুল শিক্ষিকা রনজিলা পারভীন ছাড়াও অতীতে বহু তাজা প্রাণ কেড়ে নিয়েছে এই ছিনতাইকারীরা। ঘটে যাওয়া কিছু মর্মস্পশী ঘটনার মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো- ২৬ জানুয়ারি ২০১৮ সালে ধানমন্ডির ৭ নম্বর সড়কে ভোরবেলায় রিকশায় যাওয়ার সময় হেলেনা বেগমের ভ্যানিটি ব্যাগ ধরে টান দেয় একটি প্রাইভেটকার থেকে ছিনতাইকারীরা। ব্যাগটি বাঁচাতে গিয়ে তিনি রাস্তায় পড়ে যান এবং ছিনতাইকারীদের গাড়িটি তাঁকে পিষে চলে গেলে ঘটনাস্থলেই তাঁর মৃত্যু হয়। ২২ মার্চ ২০২২ সালে নোয়াখালী যাওয়ার উদ্দেশ্যে ভোরে বাসা থেকে বের হয়ে মিরপুরের শেওড়াপাড়া বাসস্ট্যান্ডে যাওয়ার সময় ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে নিহত হন দন্ত চিকিৎসক আহমেদ মাহী বুলবুল। হত্যাকাণ্ডের পর নিহত চিকিৎসকের স্ত্রী শাম্মী আক্তার শান্তি বাদী হয়ে মিরপুর মডেল থানায় একটি মামলা দায়ের করেন। ২২ অক্টোবর ২০২২ সালে দিবাগত রাত আড়াইটার দিকে ধানমন্ডির ৮ নম্বর সড়ক সংলগ্ন রবীন্দ্র সরোবর এলাকা দিয়ে হেঁটে যাওয়ার সময় ছিনতাইকারীর ছুরিকাঘাতে প্রাণ হারান মেরিন ইঞ্জিনিয়ার শাহদাত হোসেন মজুমদার। ৬ জুন ২০২৬ সাল ঈদের ছুটি কাটিয়ে দিনাজপুর থেকে ফিরে শহীদ সোহরাওয়ার্দী মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনের সড়কে ছিনতাইয়ের শিকার হন সোহেলি ইসলাম। বাস থেকে নেমে মেয়েকে নিয়ে রিকশায় বাসায় ফেরার পথে হেলমেট পরিহিত মোটরসাইকেল আরোহী পেশাদার ছিনতাইকারীরা ব্যাগ ধরে টান দিলে তিনি চলন্ত রিকশা থেকে ছিটকে পড়ে মাথায় গুরুতর আঘাত পান এবং পরবর্তীতে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা যান। এই ঘটনায় তাঁর স্বামী শেরেবালা নগর থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছিলেন। উপরোক্ত ঘটনাগুলোর খবর মোটেও স্বস্তিদায়ক নয়।

ছিনতাইয়ের শিকার হওয়া ব্যক্তিরা অনেকেই আইনি ঝামেলা এড়াতে পুলিশের দ্বারস্থ হন না। ফলে ছিনতাইয়ের আসল চিত্র ও সঠিক পরিসংখ্যান বরাবরই আড়ালে থেকে যায়। পুলিশের নিজস্ব হিসাব অনুযায়ী রাজধানী ঢাকায় ছয় হাজারেরও বেশি ব্যক্তি ছিনতাই ও ডাকাতির সঙ্গে জড়িত রয়েছে। যার মধ্যে ১ হাজার ৭৩৭ জন সরাসরি ছিনতাই এবং ৪ হাজার ৪৬১ জন ডাকাতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। ভুক্তভোগীদের অনেকেই বিপদে পড়েও পুলিশের ওপর ভরসা রাখতে পারেন না বলেই থানায় যেতে চান না। মানুষের মনে এই আস্থার ঘাটতি যতদিন বজায় থাকবে,ততদিন পুলিশের পক্ষে প্রকৃত অর্থে জনগণের বন্ধু হয়ে ওঠা সম্ভব হবে না।

অপরাধ বিশেষজ্ঞরা মনে করেন, জন্মগতভাবে কেউ অপরাধী হয়ে জন্ম নেয় না; এর নেপথ্যে লুকিয়ে থাকে কোনা না কোনো গভীর সামাজিক বা অর্থনৈতিক বঞ্চনার গল্প। তাই কেবল চুনোপুঁটি অপরাধীদের গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠালে ছিনতাইয়ের মতো ব্যাধি চিরতরে নির্মূল করা সম্ভব নয়; বরং এই অপরাধের মূল শিকড় ও রুটগুলো খুঁজে বের করে চিরতরে উপড়ে ফেলতে হবে। রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব হলো পুলিশ বাহিনীকে যেকোনো রাজনৈতিক প্রভাবের ঊর্ধ্বে রেখে একটি সত্যিকারের জনবান্ধব ও পেশাদার বাহিনীতে রূপান্তর করা, যাতে সাধারণ নাগরিকেরা যেকোনো বিপদে বিন্দুমাত্র কুন্ঠাবোধ না করেই তাদের দারস্থ হতে পারেন। আমাদের পুলিশ বাহিনীর দক্ষতা ও অভিজ্ঞতা আন্তর্জাতিক মানদণ্ডে অত্যন্ত সমৃদ্ধ। ফলে তারা আন্তরিক ও স্বাধীনভাবে উদ্যমী হলে ঢাকাকে ছিনতাইমুক্ত করা মোটেও অসম্ভব নয়। তবে দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, ক্ষমতা পালাবদের পরে প্রতিটি ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলই পুলিশ বাহিনীকে আজ্ঞাবাহী দলীয় বাহিনীতে পরিণত করে। ফলে জনআস্থার এই প্রতীকটি অনেক সময় ত্রাসের বস্তুতে পরিণত হয়। অপরাধের এই দুষ্টচক্র ভাঙতে হলে পুলিশকে রাজনৈতিক ব্যবহারের সংস্কৃতি থেকে চিরতরে মুক্ত করতে হবে। অন্যথায় কেবল বিচ্ছিন আইন প্রণয়ন বা দায়সারা মামলা দিয়ে পেশাদার ছিনতাইকারীদের লাগাম টেনে ধরা সম্ভব হবে না।