বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের বর্তমান সংকটকে শুধু আজকের জ্বালানি সংকট কিংবা কয়েকটি বিদ্যুৎকেন্দ্রের সমস্যার মধ্য দিয়ে বোঝা যাবে না। এর পেছনে রয়েছে ফ্যাসিবাদী আমলে দেড় দশকের বিতর্কিত বিদ্যুৎনীতি, যার শুরু হয়েছিল জরুরি ভিত্তিতে বিদ্যুৎ উৎপাদন বাড়ানোর অজুহাতে এবং এর চূড়ান্ত পরিণতি এখন আমরা সহ্য করছি বিপুল পরিমাণ ক্যাপাসিটি পেমেন্ট, ব্যয়বহুল বিদ্যুৎ ক্রয়, ক্রমবর্ধমান জ্বালানি আমদানিনির্ভরতা ও অসহনীয় বিদ্যুৎ সংকটের মধ্য দিয়ে। আওয়ামী লীগ সরকার ২০০৯ সালে ক্ষমতায় এসে যে কুইক রেন্টাল ব্যবস্থাকে সাময়িক সমাধান হিসেবে গ্রহণ করেছিল, সেটিই ধীরে ধীরে বিদ্যুৎ খাতের একটি স্থায়ী কাঠামোতে পরিণত হয়। পরবর্তী সময়ে আদানির সঙ্গে ২৫ বছরের চুক্তি সেই একই নীতির আরও ব্যয়বহুল ও দীর্ঘমেয়াদি সংস্করণ এবং বহনের অযোগ্য বোঝা হিসেবে সামনে আসে।
২০০৯ সালে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ পরিস্থিতি নিঃসন্দেহে সংকটজনক ছিল। উৎপাদন সক্ষমতা কম ছিল, গ্যাসের সরবরাহ সীমিত ছিল এবং চাহিদার তুলনায় বিদ্যুৎ উৎপাদনও ছিল অপর্যাপ্ত। ফলে শিল্পকারখানা, সেচ, ব্যবসা-বাণিজ্য এবং সাধারণ মানুষের জীবন নিয়মিত লোডশেডিংয়ে বিপর্যস্ত হচ্ছিল। এ পরিস্থিতিতে সরকার দ্রুত বিদ্যুৎ পাওয়ার জন্য কুইক রেন্টাল ও রেন্টাল বিদ্যুৎকেন্দ্র স্থাপনের পথ বেছে নেয়। দীর্ঘমেয়াদি বড় বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে যেখানে কয়েক বছর সময় লাগে, সেখানে কয়েক মাসের মধ্যে বিদ্যুৎ উৎপাদনে যাওয়ার সুবিধাই ছিল এ ব্যবস্থার প্রধান আকর্ষণ। কিন্তু সমস্যা দেখা দিল যখন জরুরি ব্যবস্থা আর জরুরি থাকল না। কুইক রেন্টাল কেন্দ্রগুলো সাময়িকভাবে বিদ্যুৎ ঘাটতি মোকাবিলা করার বদলে দীর্ঘ সময় ধরে বিদ্যুৎ খাতের অংশ হয়ে রইল। ২০১০ সালের বিশেষ আইনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ ও জ্বালানি প্রকল্পে প্রচলিত প্রতিযোগিতামূলক টেন্ডারিং প্রক্রিয়ার বাইরে গিয়ে দ্রুত চুক্তি করার সুযোগ তৈরি হয়। অদক্ষ, অযোগ্য ও অসাধু ব্যবসায়ীদের শুধুমাত্র দলীয় বিবেচনায় বাছাই করে এই বিশেষ ব্যবস্থার অধীনে একের পর এক বিদ্যুৎ চুক্তি সম্পন্ন হয়। ফলে বিদ্যুৎ খাতে প্রতিযোগিতামূলক দরপত্রের বদলে সমঝোতামূলক দাম পরিশোধের সংস্কৃতি চালু হয়। সোজা কথায়, যার যা ইচ্ছে বিদ্যুতের দাম হাঁকে আর আওয়ামী লীগ সরকার দেশের আর্থিক সক্ষমতার দিকে না তাকিয়ে সেই অন্যায্য দাবিগুলো মেনেও নেয়।
এ ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য ছিল ক্যাপাসিটি পেমেন্টের প্রসঙ্গ। কোনো বিদ্যুৎকেন্দ্র কত মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করল, তার পাশাপাশি কেন্দ্রটি প্রস্তুত রাখার জন্যও নির্দিষ্ট অর্থ দেওয়ার ব্যবস্থা রাখা হয়। এ কারণে বিদ্যুৎকেন্দ্র বসে থাকলেও, চুক্তির শর্ত অনুযায়ী তার ক্যাপাসিটি চার্জ বাবদ সরকারকে অর্থ দিতে হয়েছে। ব্যবসায়িক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি বিনিয়োগকারীর জন্য আকর্ষণীয় ব্যবস্থা, কারণ তার আয়ের একটি অংশ উৎপাদনের ওপর নির্ভর করে না। কিন্তু রাষ্ট্রের জন্য এটি তৈরি করে একটি স্থায়ী আর্থিক দায়। এর ফলাফল সময়ের সঙ্গে স্পষ্ট হয়ে ওঠে। ২০২৪ সালের White Paper on the State of Bangladesh Economy-এর হিসাবে, ২০১০-১১ থেকে ২০২৩-২৪ অর্থবছর পর্যন্ত বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোকে শুধুমাত্র ক্যাপাসিটি ও রেন্টাল চার্জ বাবদ প্রায় ১ লাখ ১৫ হাজার কোটি টাকা দেওয়া হয়েছে। একই প্রতিবেদনে বলা হয়, বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর কম ব্যবহার বিবেচনায় অন্তত ৩৬ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত ক্যাপাসিটি চার্জ দেয়া হয়েছে। প্রশ্ন হলো, আওয়ামী লীগ কেন এমন একটি ব্যবস্থা তৈরি করল যেখানে বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা না ব্যবহার করেও বিপুল অর্থ পরিশোধ করতে হয়? এর উত্তর সহজ। ফ্যাসিবাদী আওয়ামী সরকার এই ভুয়া কুইক রেন্টাল ব্যবস্থার মাধ্যমে মূলত দলীয় লোকদের দুর্নীতির সুযোগ দিয়েছে ।
এ ব্যবস্থার সবচেয়ে বড় প্রশ্নটি অর্থ সংক্রান্ত ছিল না; বরং নীতি সংক্রান্তে। আওয়ামী লীগ সরকার এমন একটি বিদ্যুৎ কাঠামো তৈরি করেছিল যেখানে বেসরকারি বিদ্যুৎকেন্দ্রের মালিকদের জন্য নির্দিষ্ট আয়ের নিশ্চয়তা তৈরি হয়, কিন্তু বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো প্রয়োজনের তুলনায় কম ব্যবহার হলেও সে আর্থিক দায় বহন করতে হয় সরকারকে এবং শেষ পর্যন্ত জনগণকে। এরপরও কথা থেকে যায়। একটি সরকার যখন এমন চুক্তি করে যার ফলে দীর্ঘমেয়াদে জনগণের অর্থে বেসরকারি বিনিয়োগকারীর আয় নিশ্চিত হয়, অথচ বিদ্যুৎ উৎপাদনের প্রকৃত প্রয়োজন ও ব্যবহারযোগ্যতার সঙ্গে ব্যয়ের যথেষ্ট সামঞ্জস্য থাকে না, তখন তাকে নিছক প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখার সুযোগ থাকে না। এটি একটি রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত এবং সেই সিদ্ধান্তের রাজনৈতিক দায় তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকারেরই।
২০০৯ থেকে ২০২৪ পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারই বিদ্যুৎ খাতের এই নীতি নির্ধারণ করেছে, বিশেষ আইন করেছে, বিদ্যুৎকেন্দ্র অনুমোদন করেছে এবং একের পর এক দীর্ঘমেয়াদি বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি করেছে। ফলশ্রুতিতে, এক্সেস ক্যাপাসিটি, ক্যাপাসিটি পেমেন্ট এবং ব্যয়বহুল বিদ্যুৎ ক্রয়ের যে কাঠামো আজ বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতকে চাপে ফেলেছে, এর একক দায় ফ্যাসিবাদী শাসক গোষ্ঠীর। এখানেই নৈতিকতার প্রশ্নটি সামনে আসে। জনগণের অর্থে পরিচালিত একটি রাষ্ট্রে কোনো সরকার যদি এমন ব্যবস্থা তৈরি করে যেখানে বিনিয়োগকারীর ঝুঁকি হয়তো হ্রাস পায়, অথচ বাজারের চাহিদা, বিদ্যুৎ উৎপাদনের বাস্তব ব্যবহার কিংবা জ্বালানি সরবরাহের ঝুঁকির বড় অংশের লোড জনগণের ওপর গিয়ে পড়ে, তাহলে সেই সিদ্ধান্তের ন্যায্যতা নিয়ে প্রশ্ন তোলা স্বাভাবিক।
পাশাপাশি, সমস্যা তৈরি হয়ে যায় উৎপাদন সক্ষমতার পরিকল্পনায়। আওয়ামী লীগ সরকারের সময় বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা দ্রুত বাড়ানো হয়। সরকারের পক্ষ থেকে এটিকে বড় অর্জন হিসেবে দেখানো হয়েছে এবং একসময়কার তীব্র বিদ্যুৎ ঘাটতির তুলনায় এটি নিঃসন্দেহে দৃশ্যমান পরিবর্তন। কিন্তু বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের সঙ্গে বিদ্যুৎ চাহিদা, জ্বালানি সরবরাহ এবং অর্থনৈতিক সক্ষমতার সমন্বয় যথেষ্ট শক্তিশালী ছিল না। ফলে দেশের installed capacity প্রকৃত চাহিদার তুলনায় অনেক বড়ো হয়ে ওঠে। এখানে বাংলাদেশের বিদ্যুৎনীতির একটি মৌলিক দুর্বলতা ধরা পড়ে। বিদ্যুৎকেন্দ্র তৈরি করলেই বিদ্যুৎ নিরাপত্তা নিশ্চিত হয় না। কেন্দ্র চালানোর জন্য গ্যাস, কয়লা, তেল কিংবা এলএনজি প্রয়োজন। প্রয়োজন হয় বৈদেশিক মুদ্রা। প্রয়োজন হয় ট্রান্সমিশন এন্ড ডিস্ট্রিবিউশন কাঠামোতে আমূল পরিবর্তন। আরও প্রয়োজন হয় এমন একটি কর কাঠামো- রাষ্ট্র ও জনগণ উভয়ের জন্যই সহনীয় বা বহনযোগ্য। বাংলাদেশের বিদ্যুৎনীতিতে ক্যাপাসিটি বৃদ্ধির ওপর যতটা জোর দেওয়া হয়েছে, এ সমন্বিত জ্বালানি নিরাপত্তার ওপর ততটা জোর দেওয়া হয়নি।
এ কাঠামোর সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ হয়ে আসে ভারতের মোদি সরকার ঘনিষ্ঠ আদানি পাওয়ারের সঙ্গে চুক্তি। ২০১৭ সালে বাংলাদেশ বিদ্যুৎ উন্নয়ন বোর্ড ভারতের আদানি পাওয়ার নামক প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে ২৫ বছরের বিদ্যুৎ ক্রয় চুক্তি করে। ভারতের ঝাড়খণ্ডের গোড্ডায় ১,৬০০ মেগাওয়াটের কয়লাভিত্তিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে বাংলাদেশে বিদ্যুৎ সরবরাহের ব্যবস্থা করা হয়। চুক্তিটি এমন সময়ে করা হয়েছিল যখন বাংলাদেশ ইতোমধ্যেই দ্রুত বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা বাড়াচ্ছিল। আদানি চুক্তির সবচেয়ে বড় সমস্যা হয়ে ওঠে এর মূল্য কাঠামো। ২০২৩ সালে বাংলাদেশ আদানির বিদ্যুতের জন্য গড়ে প্রতি ইউনিট প্রায় ১৪.০২ টাকা পরিশোধ করে। একই সময়ে ভারতীয় বিদ্যুৎ বাজার থেকে কেনা বিদ্যুতের গড় মূল্য ছিল প্রায় ৭.৮৩ টাকা। অর্থাৎ ভারতের বাজারে বিদ্যুতের যে মূল্য পাওয়া যাচ্ছিল, আদানির বিদ্যুতের মূল্য সে তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি ছিল। এ পার্থক্য শুধু বাংলাদেশের সাধারণ ক্রেতাদেরকেই চাপের মধ্যে ফেলেনি বরং রাষ্ট্রীয় বিদ্যুৎ ব্যবস্থার আর্থিক সংকটও বাড়িয়েছে।
চুক্তির ব্যয় শুধু বিদ্যুতের ইউনিট মূল্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ক্যাপাসিটি চার্জ, তেলের দাম এবং কয়লার মূল্য নির্ধারণের পদ্ধতিও এর অংশ। পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ সরকারের জাতীয় পর্যালোচনা বিষয়ক কমিটি আদানি চুক্তি পর্যালোচনা করে দেখতে পায়, চুক্তিতে একাধিক গুরুতর অসঙ্গতি রয়েছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে প্রকাশিত কমিটির প্রতিবেদনে বলা হয়, আদানির বিদ্যুতের দাম নিকটতম প্রাইভেট সেক্টরের প্রতিদ্বন্দ্বীর তুলনায় ৩৯.৭ শতাংশ বেশি। চুক্তি প্রদানের প্রক্রিয়ায় গুরুতর প্রক্রিয়াগত অসঙ্গতির কথাও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়। ভারতীয় কর্পোরেট ট্যাক্সের কিছু ব্যয় বাংলাদেশের বিদ্যুতের মূল্যের মধ্যে চলে এসেছে বলেও কমিটি চিহ্নিত করে। এখানে বিষয়টি আরও তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে কারণ আদানি চুক্তি কোনো স্বল্পমেয়াদি বিদ্যুৎ কেনার ব্যবস্থা নয়। এটি ২৫ বছরের একটি চুক্তি। অর্থাৎ একটি সরকারের নেওয়া সিদ্ধান্তের আর্থিক দায় বহন করতে হবে পরবর্তী সরকারগুলোকেও। বিদ্যুৎ খাতের দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনায় এমন চুক্তি করার আগে সম্ভাব্য চাহিদা নির্নয়, বিকল্প উৎস নির্ধারন, কর কাঠামোর বিন্যাস ও তেলের ক্রমবর্ধমান মূল্যকে অত্যন্ত সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন ছিল যা আওয়ামী সরকার করেনি।
আদানি চুক্তির সঙ্গে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ আমদানিনির্ভরতার প্রশ্নটিও জড়িয়ে আছে। একটি দেশের নিজস্ব জ্বালানি উৎপাদন ব্যবস্থার পরিবর্তে বাইরের উৎসের ওপর নির্ভরতা যখন বাড়তে থাকে, তখন সার্বিকভাবে জ্বালানি নিরাপত্তা ও জ্বালানি সার্বভৌমত্বের প্রশ্নই সামনে চলে আসে। বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতি এ দুর্বলতার দিকটিই সবচেয়ে স্পষ্টভাবে দেখাচ্ছে। দেশে বিদ্যুৎকেন্দ্রের নামমাত্র সক্ষমতা অনেক, কিন্তু সব কেন্দ্র চালানোর মতো জ্বালানি সবসময় পাওয়া যাচ্ছে না। গ্যাসের ঘাটতি, এলএনজি সরবরাহে ঘাটতি, কয়লা ও তরলকৃত তেল আমদানির ব্যয়, ডলার সংকট এবং বিদ্যুৎকেন্দ্রের প্রযুক্তিগত সমস্যার কারণে উৎপাদন সক্ষমতার বড় অংশই সময়ে সময়ে ব্যবহার করা যাচ্ছে না। গত জুলাই মাসে এলএনজি সরবরাহে ব্যাঘাত ঘটার প্রেক্ষিতে গ্যাস সংকট বেড়ে গেলে গ্যাস চালিত বিদ্যুৎ উৎপাদনের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমে যায় এবং লোডশেডিং বেড়ে যায়। সর্বশেষ আগস্ট মাসেও একাধিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে তেলের ঘাটতি ও কারিগরি ত্রুটির কারণে উৎপাদন ব্যাহত হওয়ার খবর এসেছে।
এ সংকটের সঙ্গে আওয়ামী লীগ সরকারের আরেকটি বড় নীতিগত সিদ্ধান্ত জড়িয়ে আছে। দেশের নিজস্ব গ্যাস অনুসন্ধান ও উৎপাদন বাড়ানোর বদলে তারা আমদানিকৃত জ্বালানির ওপর নির্ভরতা বৃদ্ধি করেছে। তরল তেল ও কয়লার ওপর নির্ভরতা বিদ্যুৎ উৎপাদনকে আন্তর্জাতিক বাজার ও বৈদেশিক মুদ্রার ওপর বেশি সংবেদনশীল করে তুলেছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানির দাম বাড়লে বাংলাদেশের বিদ্যুৎ উৎপাদন ব্যয় বেড়ে যায়। আবার ডলারের বিপরীতে টাকার মূল্য কমলে আমদানি খরচ বৃদ্ধি পায়। বৈদেশিক মুদ্রার সংকটে জ্বালানি আমদানি ব্যহত হলে বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ থাকে। আর বিদ্যুৎকেন্দ্র বন্ধ থাকলেও কিছু কেন্দ্রের জন্য চুক্তি রক্ষায় সরকারকে ঠিকই ক্যাপাসিটি চার্জ দিয়ে যেতে হয়। এটি যেন একটি অশুভ চক্র যার খেসারত জনগণ ও পুরো রাষ্ট্রযন্ত্রকে এখন দিয়ে যেতে হচ্ছে।
বাংলাদেশের বিদ্যুৎ খাতের বর্তমান সংকট থেকে বেরিয়ে আসতে হলে প্রথমেই স্বীকার করতে হবে যে সমস্যাটি শুধু বিদ্যুৎ উৎপাদনের নয়, বরং বিদ্যুৎ খাতের পরিকল্পনা, চুক্তি, জ্বালানি সরবরাহ ও আর্থিক ব্যবস্থাপনার সঙ্গে গভীরভাবে যুক্ত। তাই সমাধানও হতে হবে সামগ্রিক। নতুন করে আরও কয়েক হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রীডে যুক্ত করার পরিকল্পনা গ্রহণ করার আগে তাই বিদ্যমান ব্যবস্থাকে কার্যকর, সাশ্রয়ী ও জবাবদিহিমূলক করা জরুরি। প্রথমত, বিদ্যুৎ খাতের সবগুলো চুক্তি স্বাধীনভাবে পর্যালোচনা করতে হবে। বিশেষ করে গত দেড় দশকে করা চুক্তিগুলোর বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন। রহস্যময় কারণে বিএনপি সরকারকে এ বিষয়ে খুব বেশি সক্রিয় দেখা যাচ্ছে না। তারা বিগত ফ্যাসিবাদী আমলের চুক্তিগুলো নিয়ে সংসদে আলোচনা করতেও আগ্রহী নয়। এমনকি বর্ডার কিলিং বা পুশ-ইনের মতো স্পর্শকাতর বিষয় নিয়েও তারা সংসদে আলোচনা করতে চায় না। আওয়ামী সরকারের ভয়াবহ এসব অনিয়মের ব্যাপারে বিএনপির নীরবতা ও অনাগ্রহ নিঃসন্দেহে রহস্যজনক। দ্বিতীয়ত ভবিষ্যতে যে কোনো চুক্তি করার বেলায় ompetitive bidding-কে বাধ্যতামূলক করতে হবে। তৃতীয়ত, ক্যাপাসিটি পেমেন্ট ব্যবস্থায় মৌলিক সংস্কার নিয়ে আসতে হবে।
চতুর্থত, নতুন বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণের আগে বাস্তবভিত্তিক চাহিদা নিরুপণ করতে হবে। আগামী ৫, ১০ ও ২০ বছরের বিদ্যুৎ চাহিদার নির্ভরযোগ্য চাহিদা নির্নয় ছাড়া নতুন প্রকল্প অনুমোদন করা উচিত নয়। পঞ্চমত বিদ্যুৎ উৎপাদন পরিকল্পনাকে তেলের সহজলভ্যতা ও প্রাপ্যতার আলোকে নিরুপণ করতে হবে। ষষ্ঠত, দেশীয় জ্বালানি অনুসন্ধানকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। বিশেষ করে গ্যাসের ক্ষেত্রে নতুন ক্ষেত্র অনুসন্ধান এবং বিদ্যমান গ্যাসকূপগুলোর সক্ষমতা বৃদ্ধিতে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে। দেশীয় গ্যাসের সম্ভাবনা যথাযথভাবে কাজে না লাগিয়ে আমদানিকৃত গ্যাসের ওপর মাত্রাতিরিক্ত নির্ভরতা তৈরি করলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভের ওপর অযাচিত চাপ পড়বে। আমদানিনির্ভর জ্বালানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে জ্বালানি খাতে বৈচিত্র্যকরণ নিশ্চিত করতে হবে। সর্বোপরি, বিকল্প জ্বালানির দিকে আমাদের মনোনিবেশ করতে হবে। অষ্টমত, বিদ্যুৎ খাতের তথ্য জনগণের জন্য উন্মুক্ত করা জরুরি। সর্বোপরি যদি সরকার সিদ্ধান্তহীনতা থেকে বেরিয়ে এসে চটজলদি কিছু কার্যকর পদক্ষেপ না নিতে পারে তাহলে আগামী দিনগুলোতে বিদ্যুৎ সংকট জনগণের ভোগান্তি আরো বাড়াবে আর সরকারের জন্য সবচেয়ে বেশি মাথাব্যথার কারণ হবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।