মুসফিকা আন্জুম নাবা

ইসলামের সূচনা লগ্ন থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত বিশ্বের বিভিন্ন দেশে মুসলিম জনগোষ্ঠী রাষ্ট্রীয় ও অরাষ্ট্রীয় শক্তির মাধ্যমে নানাভাবে নির্যাতিত হয়েছে বা এখনো হচ্ছে। সপ্তম শতাব্দীতে মক্কায় ইসলাম প্রচারের শুরুতে কুরাইশ বংশের মানুষেরা নতুন ধর্মান্তরিত মুসলিমদের সামাজিক বয়কট, শারীরিক নির্যাতন ও হত্যা পর্যন্ত করেছিল। স্পেনে মুসলিমদের জোরপূর্বক খ্রিস্ট ধর্মে ধর্মান্তরিত করা এবং ক্রুসেডের সময় ব্যাপক মুসলিম গণহত্যা চালানো হয়। রাজা আলাউংপায়া এবং বোদাপায়ার আমলে মুসলিম রীতিনীতি নিষিদ্ধ করা এবং মুসলিম ইমামদের হত্যার মতো ঘটনা ঘটেছিল।

মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা সামরিক বাহিনীর কঠোর দমন-পীড়ন ও গণহত্যার মুখে লাখ লাখ মুসলিম বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে মুসলিমদের ওপর গণপিটুনি (Mob Lynching), ধর্মীয় বিদ্বেষ ছড়ানো এবং বিনা নোটিশে ঘরবাড়ি ভেঙে দেওয়ার মতো ঘটনার খবর পাওয়া যায়। ২০০২ সালের গুজরাট দাঙ্গা এবং সাম্প্রতিক সময়ে পশ্চিমবঙ্গসহ বিভিন্ন এলাকার রাজনৈতিক বা সামাজিক সহিংসতা। অতীতে কসোভোর সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম জনগণ সার্বিয়ান বাহিনীর দ্বারা চরম নির্যাতন ও জাতিগত নিধনের শিকার হয়েছিল।

একথা কারো অজানা নয় যে, সাম্প্রতিক বিশ্বে মিয়ানমার, ভারত, চীন, ফিলিস্তিনসহ বিভিন্ন দেশে মুসলিম জনগোষ্ঠী পদ্ধতিগত বৈষম্য, সহিংসতা এবং মানবাধিকার লঙ্ঘনের শিকার হচ্ছেন। মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গা মুসলিমদের ওপর যুগের পর যুগ ধরে চলা রাষ্ট্রীয় নিপীড়ন ও সামরিক অভিযানের কারণে লাখ লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে বাধ্য হয়েছে। একে জাতিসংঘ ‘জাতিগত নিধন’ হিসেবে আখ্যায়িত করেছে। ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে মুসলিমদের নাগরিকত্ব প্রমাণে চাপ দেওয়া, বিনা নোটিশে ঘরবাড়ি বুলডোজার দিয়ে গুঁড়িয়ে দেওয়ার ঘটনা ঘটছে প্রতিনিয়ত। আসাম ও পশ্চিমবঙ্গে মুসলিমদের ‘অনুপ্রবেশকারী’ বা বহিরাগত হিসেবে চিহ্নিত করার রাজনৈতিক প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। ইসরাইলী দখলদারিত্ব, বসতি স্থাপন এবং চলমান সামরিক অভিযানের কারণে ফিলিস্তিনী মুসলিমরা চরম মানবিক সংকট ও জীবননাশের হুমকির মধ্যে। ইউএসসিআইআরএফ (USCIRF)-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, নাইজেরিয়া, মিশর, আলজেরিয়া এবং ইরিত্রিয়ার মতো দেশগুলোতে রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব ও চরমপন্থী গোষ্ঠীর পাশাপাশি কোনো কোনো ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয়ভাবেও মুসলিম ধর্মীয় স্বাধীনতার অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছে। ইউরোপের বেশ কয়েকটি দেশে মুসলিম নারীদের ধর্মীয় পোশাক এবং সাংস্কৃতিক রীতিনীতির ওপর আইনি নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয়েছে। মানবাধিকার সংস্থা ‘মেমোরিয়াল’-এর তথ্যমতে, রাশিয়ার রাজনৈতিক বন্দীদের একটি বিশাল অংশকে তাদের ধর্মীয় বিশ্বাসের কারণে নিপীড়নের মুখোমুখি হতে হয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে মুসলিমদের ওপর চলমান এ বৈষম্য ও নির্যাতনের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক স্তরে প্রায়শই প্রতিবাদ ও নিন্দা সমাবেশ অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে।

মূলত, বিশ্বের বিভিন্ন জনপদে মুসলমানরা এখন নানাবিধ নির্যাতন ও নিপীড়নের শিকার। কোন কোন ক্ষেত্রে মুসলমানদের মানবিক অধিকারেরও স্বীকৃতি দেওয়া হচ্ছে না। পৃথিবীর বুকে ইসলাম নামের বৃক্ষটি তার শাখা-প্রশাখা ছড়িয়ে জীবন্ত থাকাকে আদৌ তারা মেনে নিতে পারছে না। ফলে জায়নবাদী ও কুফরী ঐক্যবদ্ধ শক্তি মুসলিম নিধনে উদ্ধত হয়ে উঠেছে। এ হীন স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য তারা নানাবিধ ষড়যন্ত্রের আশ্রয় নিয়েছে যুগের পর যুগ ধরে। ফলে কয়েক শতক ধরে বিশ্বজুড়ে মুসলমানদের ওপর নির্যাতন-নিষ্পেষণ চলছে সমান তালে। সাম্প্রতি সময়ে এ প্রবণতা আগের তুলনায় বেড়েছে। সে ধারাবাহিকতায় মিয়ানমারে মুসলিম নিধন চলছে দীর্ঘদিন ধরে। প্রাণ বাঁচাতে ১২ লাখেরও বেশি মুসলমান বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশে আশ্রয় নিয়েছে। শ্রীলংকায় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় অনেক মুসলমানের জানমালের ক্ষতি হয়েছে। রাশিয়ার চেচনিয়া ও দাগিস্থানে মুসলিম নির্যাতন চলছে দীর্ঘকাল ধরে। আর ফিলিস্তিনীরা তো নিজ আবাসভূমিতেই পরবাসী হয়ে চরম নির্যাতনের শিকার হচ্ছে। ইউরোপ-আমেরিকায়ও ইসলাম বিদ্বেষ চলছে বহুদিন ধরে। পুরো ইউরোপই এখন ইসলাম ও মুসলিমদের জন্য অনিরাপদ হয়ে উঠেছে।

ভারতের জম্মু-কাশ্মীরে মুসলিম ও নিধন চলছে প্রায় শতাব্দীকাল ধরে। পৃথিবীর কোথাও মাথাপিছু হারে এত অধিক সংখ্যক দখলদার সৈন্য নেই, যা রয়েছে কাশ্মীরে। কাশ্মীরের জনসংখ্যা মাত্র ১ কোটি এবং আয়তন ৮৫, ৮৬৬ বর্গমাইল। অধিকৃত সে কাশ্মীরে ভারতীয় দখলদার বাহিনীর সেনা সংখ্যা ৫ লাখ। অর্থাৎ গড়ে প্রতি ১০০০ কাশ্মীরির জন্য রয়েছে ২০ জন ভারতীয় সৈন্য। প্রতিটি কাশ্মীরি পরিবারের সদস্য সংখ্যা যদি গড়ে ৫ জন ধরা হয়, তবে অর্থ দাঁড়ায়, যে গ্রামে ২০০ ঘর মানুষের বাস, সেখানে অবস্থান নিয়েছে ২০ জন ভারতীয় সৈন্য। কাশ্মীরে ভারতীয় বাহিনীর বিশাল অবস্থান আজ থেকে নয়, ১৯৪৭ সাল থেকেই। তবে সে সংখ্যা ব্যাপকভাবে বেড়েছে ১৯৮৯ সালে। কারণ, তখন থেকেই কাশ্মীরে ভারতপন্থী শেখ আবদুল্লাহ পরিবারের প্রভাব ব্যাপকভাবে লোপ পায়। তীব্রতর হয় স্বাধীনতার দাবি। সে দাবি এখন প্রতিদিন তীব্রতর হচ্ছে। সে সঙ্গে দিনদিন বাড়ছে দখলদারদের সৈন্যসংখ্যা। সেদিন হয়তো বেশি দূরে নয়, যখন এ সৈন্যসংখ্যা ১০ লাখে গিয়ে পৌঁছাবে। অথচ ভারতীয় কর্তৃপক্ষ বরাবরই দাবি করে আসছে ভারত উদারপন্থী, অসাম্প্রদায়িক, গণতান্ত্রিক দেশ। বাস্তবে দেশটি উগ্র সাম্প্রদায়িক রাষ্ট্র। গণতান্ত্রিক দেশের নাগরিকগণ তো সে দেশের নাগরিকত্ব স্বেচ্ছায় বরণ করে নেবে, আইন মেনে চলবে; কিন্তু তাদের মাথার ওপর এত সৈন্য কেন? বিশ্বের কোনো গণতান্ত্রিক দেশে এর কোন নজীর নেই। ভারত এ কথাও বলে বেড়ায়, কাশ্মীরি জনগণ ভারতের সঙ্গে স্বেচ্ছায় যোগ দিয়েছে। তারা ভারতীয় নাগরিকরূপেই থাকতে চায়। কিন্তু ভারতীয় কর্তৃপক্ষের এমন দাবি মোটেই বাস্তবসম্মত নয়।

মিয়ানমারে চলছে শতাব্দীর ভয়াবহতম মুসলিম নির্যাতন। সরকারের কড়াকড়ির কারণে রাখাইন রাজ্যের প্রকৃত অবস্থা জানা বেশ কষ্টসাধ্য। বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে দেখা গেছে, শুধু আগুন আর কালো ধোঁয়া। সে সঙ্গে পালিয়ে আসা লাখ লাখ মানুষের ভিড়; আহাজারী ও আর্তনাদ। এভাবেই সৃষ্টি হয়েছে বিশ্বের সবচেয়ে ভয়াবহ মানবিক সঙ্কটের অন্যতম দৃষ্টান্ত। যা হলো রোহিঙ্গাসঙ্কট। মূলত, মিয়ানমার বৌদ্ধ অধ্যুষিত দেশ। দেশটির মুসলিম জনগোষ্ঠীর প্রধান অংশ রোহিঙ্গা। রাজা বায়িন্নাউং (১৫৫০-১৫৮৯)-এর আমলে ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা বৃদ্ধি পায়। বৌদ্ধরা মুসলিমদের হত্যা করে। ১৫৫৯ সালে ব্যাগো দখলের পর বৌদ্ধ রাজা হালাল মাংস খাওয়া নিষিদ্ধ করে। ধর্মের নামে প্রাণী হত্যাকে বর্বোরচিত ঘোষণা করে। ঈদুল আযহা পালন নিষিদ্ধ করে। তার প্রজাদের জোরপূর্বক বৌদ্ধধর্মের বাণী শুনতে বাধ্য করে। জোরপূর্বক ধর্মান্তরিত করে। ১৮ শতকে রাজা আলাউঙ্গাপায়া মুসলমানদের জন্য হালাল খাবার নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। ১৯৬২ সালে জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের মাধ্যমে সেনাপতি নে উইন ক্ষমতায় গেলে মিয়ানমারে মুসলমানদের অবস্থা করুণ হয়ে পড়ে। মুসলমানদের সেনাবাহিনী থেকে বিতাড়িত করা হয়। সামাজিকভাবে বিভিন্ন সুযোগ থেকে বঞ্চিত করা হয়।

ফিলিস্তিনে মুসলমানরা নির্যাতিত হচ্ছে প্রতিনিয়ত। নিজ দেশেই পরাধীনের মতো জীবন চলছে তাদের। ইসরাইলের ইহুদি শাসক ও সেনাবাহিনী দ্বারা চরম অত্যাচারিত ও নির্যাতিত হচ্ছে মুসলমানরা। ফিলিস্তিনীরা হতভাগ্যই বটে। তারা নিজেদের ভূখণ্ডে দখলদার ইহুদিদের হাতে মার খাচ্ছে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্ম ঝরছে রক্ত। লাশের স্তূপ আকাশ ছুঁয়েছে। প্রতিনিয়ত মুসলিমদের রক্তে রঞ্জিত হচ্ছে ফিলিস্তিনের পবিত্র জনপদ।

১৯৪০ দশকে অবৈধ ইহুদি রাষ্ট্র ইসরাইলের প্রতিষ্ঠালগ্নে বিপুলসংখ্যক ফিলিস্তিনী পরিবারকে তাদের বসতভিটা থেকে তাড়িয়ে দেয়া হয়েছিল। এ ছাড়া গাজায় গত এক দশকের ইসরাইলী অবরোধের কারণে ২০ লাখ লোকের বসতি গাজায় মানবিক বিপর্যয় ঘটেছে। প্রতিনিয়ত ইসরাইলী সেনাদের দ্বারা ফিলিস্তিনীরা নিহত হচ্ছেন। যা হালকুখানের বাগদাদ ধ্বংসের কথায় স্মরণ করিয়ে দেয়।

মূলত, মুসলিম নির্যাতন শুরু হয়েছিলো ইসলামের সূচনালগ্নেই। কুফরী শক্তি ইসলামের অগ্রযাত্রা রোধ করার জন্যই বিশ্বনবী (সা.) সহ তার আসহাবগণের ওপর নির্মম ও নিষ্ঠুর নির্যাতন চালাতে মোটেই কুন্ঠাবোধ করেনি। সে ধারাবাহিকতায় আজও মুসলিম নির্যাতন চলছে বিশ্বের বিভিন্ন জনপদে।

এমতাবস্থায় মুসলমানদের নির্যাতনের হাত থেকে বাঁচতে বিশ্ব মুসলিমকে এক প্লাটফর্মে ঐক্যবদ্ধ হতে হবে। ওআইসিসহ আন্তর্জাতিক মুসলিম সংস্থাগুলোকে নিতে হবে জোরালো ও কার্যকর পদক্ষেপ।

লেখক : শিক্ষার্থী, ফুড এন্ড নিউট্রিশন, কলেজ অব হোম ইকনোমিকস।