প্রফেসর তোহুর আহমদ হিলালী

জাতীয় নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার পর স্বাভাবিকভাবে স্থানীয় সরকারের নির্বাচন জরুরি হয়ে উঠেছে। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে আগামী এক বছরের মধ্যে স্থানীয় সরকারের নির্বাচন সম্পন্ন হবে। বিগত ফ্যাসিবাদ আমলে সকল পর্যায়ে নির্বাচন সুষ্ঠু হয়নি এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রে আওয়ামী লীগের পক্ষ থেকে জনপ্রতিনিধি নির্বাচিত হয়েছে। আগস্ট বিপ্লবের পরে প্রায় ক্ষেত্রেই নির্বাচিত প্রতিনিধিরা আত্মগোপনে চলে যায়। ফলে জনগণ নাগরিক সুবিধা প্রাপ্তি থেকে বঞ্চিত হয়। স্থানীয় সরকার নির্বাচন বিষয়ক গঠিত কমিশনের সুপারিশ ও অন্যান্য দলের দাবি সত্ত্বেও বিএনপি জাতীয় সংসদ নির্বাচনের পূর্বে স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে জোরালো আপত্তি জানায়। ফলে সরকারের ইচ্ছা থাকা সত্ত্বেও নির্বাচন অনুষ্ঠানের ক্ষেত্রে সরকার পিছিয়ে আসে। বিকল্প হিসেবে সরকার পরিচালক নিয়োগ করেন। বিএনপি সরকার গঠনের পরে পূর্ববর্তী সরকারের নিয়োগ বাদ দিয়ে নিজেদের দলের লোকজনদের নিয়োগ দান করেন।

গণতান্ত্রিক শাসনব্যবস্থা সম্পর্কে প্রেসিডেন্ট আব্রাহাম লিংকনের দেয়া সংজ্ঞার সাথে Government of the people, by the people, for the people গণতন্ত্র হলো জনগণের, জনগণের দ্বারা, জনগণের জন্য সরকার) ইসলামের কোনো বিরোধ নেই। বিরোধ সার্বভৌমত্বের প্রশ্নে এবং পাশ্চাত্যের গণতন্ত্রে বলা হয় জনগণ সার্বভৌম পক্ষান্তরে ইসলামে বলা হয় মহান আল্লাহপাক হলেন সার্বভৌম। আল্লাহর দেয়া বিধানের বাইরে কোনকিছু করা ঈমানদারদের পক্ষে সম্ভব নয়। গণতন্ত্র হলো পরামর্শভিত্তিক শাসনব্যবস্থা। ইসলামে ডিকটেটরশিপ বা স্বৈরতন্ত্রের কোনো সুযোগ নেই। নবি মুহাম্মদ (সা.) আল্লাহপাক কর্তৃক মনোনীত। তারপরও আল্লাহ তায়ালা তাঁর নবিকে পরামর্শ করার জন্য তাগিদ দিয়েছেন। তাঁর বাণী, ‘এটা আল্লাহর এক দয়া যে, তুমি এদের জন্যে ছিলে কোমল প্রকৃতির, তুমি যদি নিষ্ঠুর ও পাষাণ হৃদয়ের হতে, তাহলে এসব লোক তোমার আশপাশ থেকে সরে যেত, অতএব তুমি এদের অপরাধসমূহ মাফ করে দাও, এদের জন্যে ক্ষমা প্রার্থনা করো এবং কাজকর্মের ব্যাপারে এদের সাথে পরামর্শ করো, অতঃপর (সে পরামর্শের ভিত্তিতে) যখন একবার তুমি সিদ্ধান্ত নেবে তখন তার সফলতার জন্যে আল্লাহর ওপর ভরসা করো; অবশ্যই আল্লাহপাক তাঁর ওপর নির্ভরশীল মানুষদের ভালোবাসেন’- সূরা আলে ইমরান ১৫৯।

রাজনীতিতে দুর্বৃত্তায়নের ফলে নির্বাচনে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে সৎ লোকদের মাঝে সৃষ্টি হয়েছে চরম অনীহা। নির্বাচনে পেশিশক্তি ও কালো টাকার আধিক্যের কারণে রাজনীতিতে দুর্নীতিবাজরা প্রধান্য পেয়েছে। অযোগ্য ও দুর্নীতিবাজদের কারণে স্থানীয় সরকারব্যবস্থা শক্তিশালী হতে পারেনি। এছাড়া এমপিদের খবরদারি এবং সরকারি দলের প্রতিনিধি না হলে এলাকার উন্নয়ন বাধাপ্রাপ্ত হওয়ায় নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা স্বচ্ছতার সাথে কাজ করতে পারে না। স্থানীয় সরকার নির্বাচনে সৎ লোকের এগিয়ে আসার পথে এটাও একটা বাধা। সংসদ সদস্যের ক্ষমতা ও কার্যক্রম সুনির্দিষ্ট করে স্থানীয় সরকারের কাজের ক্ষেত্রে অযাচিত হস্তক্ষেপ বন্ধ হওয়া দরকার।

যোগ্য লোককে এগিয়ে আনার লক্ষ্যে স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধিদের সম্মানী বাড়াতে হবে। তারা জনগণকে সার্বক্ষণিক সেবা প্রদান করেন এবং ব্যক্তিগত জীবন বলে তাদের কিছু নেই। অথচ একজন ইউনিয়ন পরিষদ চেয়ারম্যানের সম্মানী মাত্র দশ হাজার টাকা (এর মধ্যে সরকারি অংশ ৪,৫০০ ও ইউপি অংশ ৫,৫০০ টাকা) এবং সদস্য আট হাজার টাকা (সরকারি অংশ ৩,৬০০ ও ইউপি অংশ ৪,৪০০ টাকা)। এটা ভারি লজ্জার। পক্ষান্তরে একজন এমপির সম্মানী ৫৫ হাজার টাকা এবং মূল বেতনসহ প্রায় ৮টি ভাতা পান। নির্বাচনী এলাকা ভাতা ১২,৫০০, অফিস পরিচালনা ১৫,০০০, টেলিফোন ভাতা ৭,৮০০, চিকিৎসা ভাতা ৭০০০, ধোলাই ভাতা ১,৫০০, নিয়ামক ভাতা ৫,০০০, মোটরযান রক্ষণাবেক্ষণ ভাতা ৭০ হাজার এবং অন্যান্য ভাতাসহ মাসে ১৭৩,৫০০ টাকা পেয়ে থাকেন। কারো বেতন ও ভাতাদি কমানো নয় কিন্তু জনপ্রতিনিধি হিসেবে ইউনিয়ন পরিষদ, পৌরসভা, উপজেলা পরিষদ ও জেলা পরিষদের চেয়ারম্যান ও সদস্যদের অবশ্যই সম্মানজনক বেতন ও ভাতাদি হওয়া দরকার। তা নাহলে তৃণমূল পর্যায়ে জনগণ সেবা থেকে বঞ্চিতই থেকে যাবে। সংসদ সদস্যদের অযাচিত হস্তক্ষেপ বন্ধ করে জবাবদিহিতা স্থানীয় সরকার পর্যায়ে এবং ইউনিয়ন পরিষদকে উপজেলা ও উপজেলাকে জেলা পরিষদের অধীনে আনা যেতে পারে। এসব বিষয়ে আরো গবেষণা ও চিন্তা-ভাবনার সুযোগ রয়েছে।

আমাদের মতো উন্নয়নশীল দেশে সীমাহীন দুর্নীতির পেছনে প্রধান কারণ রাজনীতিতে চরম অসাধুতা। কালো টাকা ও পেশিশক্তির যারা অধিকারী তারাই জোরজবরদস্তি করে নির্বাচনের রায় নিজেদের পক্ষে নেয়ার চেষ্টা করে। অধিকাংশ বড়ো দলগুলোর মাঝে বিভিন্ন গ্রুপ রয়েছে এবং রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে দলীয় কর্মীর ছদ্মাবরণে গুণ্ডাবাহিনী পালতে হয়। চাঁদাবাজি-দখলবাজি নিজেদের করায়ত্তে নেয়ার জন্য অধিকাংশ মারামারি হানাহানি নিজেদের মধ্যে ঘটে থেকে। আর যেখানে প্রতিপক্ষ দল শক্তিশালী এবং চাঁদাবাজি করার ক্ষেত্রে বাধা মনে করে সেখানে নিজেদের মাঝে বিরোধ মিটিয়ে প্রতিপক্ষের সাথে সর্বক্ষণ বিরোধ জিইয়ে রাখে। আমাদের রাজনীতির অঙ্গনে অধিকাংশ দলের মাঝে গণতন্ত্রের চর্চা নেই এবং নিজেদের কর্তৃত্ব বজায় রাখার জন্য সর্বক্ষণ কর্মীবাহিনী রেডি রাখতে হয়। ফলে রাজনীতিতে অসাধুতা সাধারণ বিষয় হয়ে পড়েছে। গণতন্ত্রে রাজনৈতিক দল অপরিহার্য এবং দলের জন্য কর্মীও অপরিহার্য তাই আমার প্রস্তাব হলো দল পরিচালনার জন্য রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে আর্থিক বরাদ্দ থাকা দরকার এবং সেটি হবে জাতীয় নির্বাচনে প্রাপ্ত ভোটের অনুপাতে। জাতীয় সংসদে কোনো দলের আদৌ প্রতিনিধি না থাকলে তার জন্য কোনো বরাদ্দ থাকবে না। এতে রাজনৈতিক দল বৃদ্ধির প্রবণতা কমবে এবং চাঁদাবাজিও কমতে পারে।

জাতীয় নির্বাচনের ক্ষেত্রে লক্ষ্য করা যায় অনেক বড়ো দল নিজেদের দক্ষ জনশক্তির অভাবে প্রত্যাশিত ফল পায় না। ঘরোয়া প্রশিক্ষণ বাস্তবে অনেক সময় কাজে আসে না। স্থানীয় নির্বাচনে (ইউনিয়ন পরিষদ ও মসজিদ-মাদ্রাসা, হাট-বাজার, স্কুল-কলেজ সর্বক্ষেত্রে) অংশগ্রহণের মধ্য দিয়ে কর্মীরা হাতেকলমে শিক্ষালাভ করে। নির্বাচন সুষ্ঠু করার লক্ষ্যে নির্বাচন কমিশনের বিধি-বিধানের ঘাটতি নেই। ঘাটতি রয়েছে দলীয় সরকার এবং রাজনৈতিক দলসমূহের সদিচ্ছার। সর্বোপরি সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে বড়ো বাধা নৈতিক মূল্যবোধের অভাব। বিশ্বে সভ্য ও উন্নত দেশে নির্বাচনে কারচুপি বা অনিয়মের ঘটনা নেই বললেই চলে। পার্শ্ববর্তী ভারতেও নেই। আমার মনে হয় একটি দেশ গণতান্ত্রিক ও সভ্যতার একটি মাপকাঠি সেই দেশের নির্বাচনব্যবস্থা। নির্বাচন সুষ্ঠু হলেই বোঝা যায় দেশটি ভদ্র এবং সেখানে গণতন্ত্র কার্যকর।

দেশের নাগরিকরা চায় সুশাসন ও বৈষম্যহীন ব্যবস্থাপনার মধ্যদিয়ে নিজেদের মতামত পেশ করার অধিকার এবং স্বাধীনভাবে প্রতিনিধি বাছাই করার। সুশাসন প্রতিষ্ঠা করতে চাইলে তৃণমূল থেকে সৎ লোককে বাছাই করতে হবে। স্থানীয় সরকারের নির্বাচনে সক্রিয় অংশগ্রহণের মাধ্যমে কর্মীদের অভিজ্ঞতার পাশাপাশি সাহস-যোগ্যতা ও তৃণমূলে নেতৃত্ব সৃষ্টি হয়। সাথে সাথে এটাও দেখতে হবে নির্বাচনে পাঁচজন প্রার্থীর মাঝে তার অবস্থান যদি ৪র্থ বা ৫ম হয় তাহলে হিতে বিপরীত হবে। নির্বাচনে বিজয়ী হতে হবে কিংবা তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে এমন মানসিকতা থাকতে হবে। স্থানীয় নির্বাচন দলীয় না হওয়ায় প্রার্থীর ব্যক্তিগত ইমেজ, তার বংশ, আত্মীয়-স্বজন, শিক্ষা-দীক্ষা নানা বিষয় বিবেচনা করা হয়। গ্লোবাল এইড ইউ.কে-এর প্রাক্তন চেয়ারম্যান ড. আখতারুজ্জামান একদিন আমাদের কয়েকজনের সাথে নির্বাচন প্রসঙ্গে আলাপে লন্ডনের স্থানীয় নির্বাচন সম্পর্কে বলেন, সেখানে চেষ্টা হয় কম্যুনিটির সবাইকে নিয়ে প্রার্থী বাছাইয়ের। ইহুদিরা সংখ্যালঘিষ্ট হওয়ায় তাদের কোনো প্রার্থী থাকে না। সকল প্রার্থীর মধ্যে যার সম্ভাবনা বেশি থাকে তারা তাকে সমর্থন দিয়ে তার পেছনে খরচ করে। শেষে নির্বাচিত হলে সে তাদের হয়ে যায়। রাজনীতি বড়ো কুটিল। এটা কোনো সরল রেখায় চলে না। নানা জটিল অবস্থার মোকাবেলা করে দীর্ঘ পথ পরিক্রমার মাধ্যমে এক অভিজ্ঞতালব্ধ জ্ঞান হলো রাজনীতি। এটা চর্চার বিষয়। তাই যেখানে নির্বাচনের সুযোগ আছে সেখানেই অংশগ্রহণ করা দরকার।

লেখক: সাবেক উপাধ্যক্ষ, কুষ্টিয়া সরকারি কলেজ।