মুসফিকা আন্জুম নাবা

মাদক ও মাদকাসক্তি আমাদের জাতীয় জীবনে বড় সমস্যা হয়ে দেখা দিয়েছে। দিন দিন এ প্রবণতা বাড়ছে বৈ কমছে না। ফলে দেশের যুব সমাজ ধ্বংসের মুখোমুখি এসে দাঁড়িয়েছে। দেশে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণের জন্য ‘মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তর’ থাকলেও সরকারি এ সংস্থাটি মাদক নিয়ন্ত্রণে খুব একটা সফল হতে পারছে না। এক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীরও নেই কার্যকর সফলতা। ফলে দেশ এখন মাদক ও মাদকসেবীদের জন্য রীতিমত অভয়ারণ্য বলা হয়। আসলে মাদকাসক্তি হলো মাদকদ্রব্যের প্রতি শারীরিক ও মানসিক তীব্র নির্ভরতা, যা বারবার ব্যবহারের ফলে মস্তিষ্কের স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা বদলে দেয়। এটি ব্যক্তির ব্যক্তিগত জীবন, পরিবার ও সমাজে মারাত্মক বিপর্যয় ডেকে আনে। তাই মাদকাসক্তির ভয়াবহ ছোবল থেকে জাতিকে না বাঁচাতে পারলে আমাদের গন্তব্যই অনিশ্চিত হয়ে পড়বে। যা কোনভাবেই কাক্সিক্ষত নয়।

নিকট অতীতেই পুরুষদের মধ্যে মাদক গ্রহণের প্রবণতা বেশি লক্ষ্য করা গেলেও সে অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। সম্প্রতি নারীদের মধ্যে মাদকাসক্তি আশঙ্কাজনকভাবে বেড়ে গেছে। যা এখন রীতিমত ভয়াবহ ও অনিয়ন্ত্রিত পর্যায়ে পৌঁছেছে। বস্তুত, নারীদের মাদকাসক্তি একটি গুরুতর ও সংবেদনশীল সামাজিক সমস্যা। সমাজে ট্যাবু বা লজ্জার ভয়ে নারীরা প্রায়ই বিষয়টি লুকিয়ে রাখেন। ফলে শারীরিক ও মানসিক ক্ষতির পাশাপাশি সঠিক চিকিৎসা পাওয়া কঠিন হয়ে পড়ে। বিষন্নতা, উদ্বেগ, ও একাকীত্ব নারীদের মাদকাসক্তির অন্যতম প্রধান কারণ। পারিবারিক কলহ বা অশান্তি এর উল্লেখযোগ্য একটি কারণ। স্বামী বা কাছের মানুষের মাদকাসক্তির কারণে আমাদের দেশের নারীরা মাদকাসক্ত হয়ে পড়ছেন। যা এখন রীতিমত উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে।

সাম্প্রতিক প্রাপ্ত তথ্যে জানা গেছে, দেশে দিন দিন নারীদের মধ্যে বাড়ছে মাদক গ্রহণের প্রবণতা। গাঁজা, ইয়াবা ও ই-সিগারেটের পাশাপাশি অনেক তরুণী ঝুঁকছেন মদ্যপানের দিকেও। বিশেষজ্ঞ ও সংশ্লিষ্টদের মতে, অসৎ সঙ্গ, ছেলে বন্ধু বা স্বামীর প্ররোচনা; পারিবারিক অশান্তি, হতাশা এবং পাশ্চাত্য সংস্কৃতির প্রভাবে নারীদের একটি অংশ মাদকে জড়িয়ে পড়ছেন। সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয়, শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে চিকিৎসক, গৃহিণী ও বিভিন্ন পেশার নারীরাও এখন মাদকাসক্তির শিকার হচ্ছেন। অথচ সামাজিক সংকোচ ও চিকিৎসার সীমিত সুযোগের কারণে তাদের বড় একটি অংশ যথাযথ চিকিৎসার আওতায় আসছেন না। ফলে দিনের পর দিন সার্বিক পরিস্থিতির অবনতিই হচ্ছে।

বিশেষ করে রাজধানীতে বসবাসকারী নারীদের অনেকে গাঁজা, ইয়াবা এবং ইলেকট্রিক সিগারেটে আসক্ত হয়ে পড়ছেন। এছাড়া বিপথগামী তরুণীদের কেউ কেউ রীতিমতো বারে গিয়ে নিয়মিত মদ পান করছেন। চলতি বছর মদ পানের পারমিট বা লাইসেন্স চেয়ে হাজারেরও বেশি তরুণী নারকোটিক্সে আবেদন করেছেন। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, নারীদের মাদকাসক্তি পুরুষের তুলনায় অনেক বেশি উদ্বেগের। কারণ নারী গর্ভধারণ করেন। ফলে মাদকাসক্তির প্রভাবে বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী বা বিকলাঙ্গ শিশু জন্ম নিতে পারে। এছাড়া নারীদের ক্ষেত্রে মাদকাসক্তির চিকিৎসা গ্রহণের সুযোগ বেশ কম। সামাজিক কারণেও নারীদের অনেকে মাদকাসক্তির চিকিৎসা নিতে রাজি হন না। যা রীতিমত উদ্বেগজনক।

নারকোটিক্সের সম্প্রতিক এক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০২০ থেকে চলতি বছরের ৩০ জুন পর্যন্ত ৬ বছরে শুধু সরকারি নিরাময়কেন্দ্রে ৩ হাজার ১০৬ জন নারী মাদকাসক্তির চিকিৎসা নিয়েছেন। তবে সাধারণত ছিন্নমূল এবং হতদরিদ্র নারীদের একটি বড় অংশ সরকারি নিরাময়কেন্দ্রে ভর্তি হন। উচ্চ এবং মধ্যবিত্ত নারীদের বেশির ভাগই ভর্তি হন বেসরকারি নিরাময়কেন্দ্রে। বেসরকারি সংস্থা আহ্ছানিয়া মিশন রাজধানীর শ্যামলীতে ৪০ শয্যাবিশিষ্ট একটি নারী মাদকাসক্ত নিরাময়কেন্দ্র পরিচালনা করে বলে জানা গেছে। বর্তমানে সেখানে চিকিৎসাধীন রয়েছেন ৩১ জন নারী। এদের মধ্যে ২০ জনই ইয়াবা আসক্ত। চিকিৎসাধীনদের ১২ জন বিভিন্ন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী, একজন এমবিবিএস ডিগ্রিধারী চিকিৎসক, চারজন গৃহিণী, দু’জন ব্যবসায়ী, একজন বেসরকারি চাকরিজীবী এবং ১১ জন বেকার।

সম্প্রতি সেখানে চিকিৎসাধীন ২৮ বছর বয়সি এক তরুণী গণমাধ্যমের কাছে তার মাদকে জড়িয়ে পড়ার প্রেক্ষাপট তুলে ধরেছেন। তিনি দাবি করেছেন, ‘ধনাঢ্য পরিবারে তার জন্ম। কিন্তু দাম্পত্য কলহের কারণে বাবা-মায়ের বিচ্ছেদের পর মাত্র ১৩ বছর বয়সে তার বিয়ে দেওয়া হয়। এর পরের বছরই তিনি সন্তান জন্ম দেন। তবে ৩ গুণ বেশি বয়সি স্বামীর সঙ্গে তিনি সেভাবে মানিয়ে উঠতে পারেননি। ফলে জীবনের প্রতি এক ধরনের হতাশা থেকে তিনি ধীরে ধীরে মাদকের দিকে হাত বাড়ান’।

সমাজের বিভিন্ন স্তরে মাদক ছড়িয়ে পড়েছে উল্লেখ করে তিনি বলেন, মাদকের জগতে জড়িয়ে পড়ার পর তিনি নিজেই দেখেছেন স্কুল পর্যায়ের অনেক শিক্ষার্থীও নেশায় আসক্ত। বিশেষ করে ইয়াবা। পাড়া-মহল্লায় অবাধে মাদক বিক্রি হচ্ছে। বিয়ে হয়ে যাওয়ার পর তিনি বনানী বিদ্যানিকেতন স্কুল ছেড়ে নতুন বাজার এলাকায় সান ফ্লাওয়ার নামের একটি স্কুলে ভর্তি হয়েছিলেন। সেখানে স্কুলগামী শিক্ষার্থীদের অনেককেই তিনি ইয়াবা সেবন করতে দেখেছেন। যা আমাদের সমাজের বাস্তবচিত্র। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, মাদকাসক্ত তরুণীদের একটি বড় অংশ ইয়াবা এবং গাঁজাসেবী। বিশেষ করে ইয়াবা সেবন নিয়ে নারীদের মধ্যে একটি মারাত্মক ভুল ধারণা ছড়িয়ে পড়েছে। স্বাস্থ্যবান কিংবা মোটা তরুণীদের অনেকে চিকন বা পাতলা হওয়ার জন্য ইয়াবা সেবন করে থাকেন। অথচ বাস্তবে ইয়াবা আসক্তির ফলে ক্ষুধামন্দা থেকে সাময়িক ওজন হ্রাস পেলেও দীর্ঘমেয়াদে বন্ধ্যাত্বসহ বড় ধরনের স্বাস্থ্যগত জটিলতা দেখা দেয়।

মাদকাসক্তির চিকিৎসায় আহ্ছানিয়া মিশনের নিরাময়কেন্দ্রে ভর্তি রয়েছেন এমবিবিএস ডিগ্রিধারী এক নারী চিকিৎসক। কয়েক বছর আগে সড়ক দুর্ঘটনায় আহত হয়ে দীর্ঘ সময় আইসিউতে চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি। এ সময় টানা কয়েক মাস ধরে তাকে ব্যথানাশক ইনজেকশন দেওয়া হয়। কিন্তু পরে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরলেও তিনি ব্যথানাশকের প্রতি নির্ভরশীল হয়ে পড়েন। এ বিষয়ে তার মন্তব্য হলো, ঘটনাক্রমে মাদকের প্রতি তার আসক্তি তৈরি হলেও বাস্তবে চিকিৎসকদের কেউ কেউ অনেক সময় প্রচণ্ড পেশাগত চাপের কারণে মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়েন। কেউবা পদোন্নতি সংক্রান্ত পরীক্ষায় অকৃতকার্য হওয়ার ভয়ে কিংবা হতাশা থেকেও মাদক নিয়ে থাকেন। তবে চিকিৎসকদের মধ্যে কেউ সাময়িকভাবে মাদকে জড়িয়ে পড়লেও শেষ পর্যন্ত পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে সক্ষম হন।

ইয়াবা ছাড়াও সম্প্রতি তরুণীদের অনেককে বারে গিয়ে মদ পান করতে দেখা যায়। চলতি বছর মদ পানের পারমিট বা লাইসেন্স পেতে হাজারেরও বেশি তরুণী নারকোটিক্সে আবেদন জমা দিয়েছেন। এদের মধ্যে ৩০ জুন পর্যন্ত প্রায় ৭ শতাধিক তরুণীর নামে পারমিট ইস্যু করা হয়েছে। বর্তমানে আরও কয়েকশ পারমিট হস্তান্তরের অপেক্ষায় চূড়ান্ত অবস্থায় রয়েছে।

নারকোটিক্সের তথ্য অনুযায়ী রাজধানীর গুলশান, তেজগাঁও এবং উত্তরা এলাকায় মদ পানকারী নারীর সংখ্যা সর্বোচ্চ। চলতি বছর এ তিন এলাকার মধ্যে গুলশানে ২৮৮, উত্তরায় ২০৭ এবং তেজগাঁওয়ে ৬২ জন নারী মদ পানের পারমিট নিয়েছেন। এছাড়া ধানমন্ডি, মতিঝিল, খিলগাঁও এবং রমনা এলাকা থেকেও নারীদের অনেকে মদ পানের পারমিটের আবেদন করেছেন। তবে এদের একটি বড় অংশ বিভিন্ন মদের বারে পেশাদার ‘বার গার্ল’ হিসাবে কাজ করেন।

প্রচলিত আইন অনুযায়ী বাংলাদেশে মুসলিমদের মদ পানের লাইসেন্স প্রাপ্তির কোনো সুযোগ নেই। তবে বিশেষ কিছু রোগ নিরাময়ের জন্য চিকিৎসকরা অনেক সময় সীমিত অ্যালকোহল পানের অনুমোদন দিয়ে থাকেন। আইনের এমন ফাঁক কাজে লাগিয়ে মদ পানের পারমিট নিচ্ছেন অনেকেই। এছাড়া নেপথ্যে থেকে সহযোগিতা করেন নারকোটিক্সের কতিপয় অসাধু সদস্য। এমনকি ভুয়া কিংবা নামসর্বস্ব চিকিৎসকের ব্যবস্থাপত্র ব্যবহার করেও প্রতিবছর প্রচুর পরিমাণে পারমিট ইস্যু করা হয়ে থাকে। এ বিষয়ে নারকোটিক্সের কর্মকর্তারা বলছেন, নারীদের ক্রমশ মাদকের দিকে ঝুঁকে পড়ার প্রবণতা যে কোনো সমাজের জন্য উদ্বেগের। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে নারীরা মূলত অসৎ সঙ্গ, ছেলে বন্ধু কিংবা স্বামীর দ্বারা মাদক গ্রহণে প্ররোচিত হন। এছাড়া কোনো পরিবারে যদি বাবা অথবা বড় ভাই সিগারেট কিংবা অ্যালকোহল পান করেন তাহলে নারী পুরুষ নির্বিশেষে পরিবারের অন্যরাও এতে আগ্রহী হয়ে ওঠেন। এ বিষয়ে আহ্ছানিয়া মিশনের নারী মাদকাসক্তি নিরাময়কেন্দ্রের বক্তব্য হলো, সম্প্রতি শিক্ষিত তরুণীদের মধ্যে মাদক সেবনের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে। বিশেষ করে মদ এবং ইয়াবা। এর মধ্যে ইংরেজি মাধ্যমের শিক্ষার্থীদের হার সর্বাধিক। তাদের প্রতিষ্ঠানে ১৭ বছরের কিশোরী থেকে ৪৮ বছর বয়সি নারীরাও মাদকাসক্তির চিকিৎসা নিতে ভর্তি হচ্ছেন।

আগের দিনে পুরুষদের মধ্যে মাদক গ্রহণের প্রবণতা বেশি লক্ষ্য করা গেলেও এখন নারীদের মধ্যেও মাদকগ্রহণের প্রবণতা আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। এমনকি তা এখন অনেকটা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। তাই মাদকের ভয়াল ছোবল থেকে দেশের নারী সমাজসহ যুব সমাজকে বাঁচাতে মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণে সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সংস্থাকে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। প্রয়োজনে বিদ্যমান আইন সংশোধন ও আইনের কঠোর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে রাখতে হবে কার্যকর ভূমিকা। একই সাথে প্রয়োজন গণসচেতনতার। অন্যথায় আগামী দিনে পরিস্থিতি আরো ভয়াবহ রূপ নিতে পারে।

লেখক : শিক্ষার্থী, ফুড এন্ড নিউট্রিশন, কলেজ অব হোম ইকোনমিকস।