জাফর আহমাদ
ইসলাম কল্যাণধর্মী জীবন ব্যবস্থা। ইসলামের অনুসারী হিসাবে মানুষ কল্যাণকামী জীব। এ জীবন ব্যবস্থা বিশ্বজাহান ও মানব প্রকৃতির সাথে অধিকতর সামঞ্জস্যশীল বিধায় এর পরতে পরতে মানুষের জন্য কল্যাণ আর কল্যাণ নিহিত রয়েছে, কোথাও অশান্তি নেই, নেই কোন অকল্যাণ। কিন্তু মানুষ শুধু শুধুই মস্তিষ্ক প্রসূত জীবন ব্যবস্থার অন্ধকার গলিতে শান্তি ও কল্যাণের খোঁজে সমুদ্রসম পথ পাড়ি দিয়েছে, শান্তির দেখা তো মিলেই-নি, বরং উল্টো মানবতাকে শুধুই যন্ত্রনা পোহাতে হয়েছে, পৃথিবী বার বার প্রতারিত হয়েছে। সৃষ্টি যার আইনও তার। ইসলামী শরী’আতের যাবতীয় বিধি-বিধান বিশ্ব-মানবতার সাধারণ কল্যাণের উপর প্রতিষ্ঠিত। প্রতিটি বিধি-বিধান এমনভাবে প্রণীত হয়েছে যার প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে মানবতার কল্যাণ নিহিত রয়েছে। শরী’আতের আভিধানিক ও ব্যবহারিক অর্থ ও এর লক্ষ্য-উদ্দেশ্য থেকে কল্যাণের বার্তাই ভেসে আসে। ‘শরী’আত’ শব্দটির আভিধানিক অর্থে সেই পানি বোঝায়, যেখানে পিপাসার্তরা একত্রিত হয় এবং একত্রিত হয়ে তা পান করে। তার ব্যবহারিক অর্থ: ‘এক সূদৃঢ় ঋজুপথ, যদ্দারা তার অবলম্বনকারী লোকেরা হেদায়াত ও সামঞ্জস্যপূর্ণ কর্মপথ লাভ করতে পারে।’ এ দু’টি জিনিসই মানুষের পিপাসা নিবৃত্ত করে বলে এ দুয়ের পারস্পরিক সম্পর্ক ও সাদৃশ্য স্পষ্ট। লক্ষ্য-উদ্দেশ্য হল, ‘বিশ্ব-মানবতাকে যথেচ্ছাচার, ভুল-ভ্রান্তি ও কামনা-লালসার হাতছানি থেকে মুক্ত করে সত্য, সুবিচার ও ন্যায়পরতার দিকে নিয়ে আসা, যেন পৃথিবীতে আল্লাহর খেলাফত বা প্রতিনিধিত্বের দায়িত্বপূর্ণ কাজটি সঠিক ও সুষ্ঠু নিয়মে কার্যকর ও বাস্তবায়িত হতে পারে।’ (ইসলামী শরীয়তের উৎস, পৃ. ০৯)
পৃথিবীতে যখন আল্লাহর খেলাফত বান্তবায়িত হয়, তখন মানুষ সুখে-শান্তিতে বসবাস করতে পারে। এই ধরণের সমাজের সুখ-শান্তির জন্য আল্লাহ আকাশের দরজা খুলে দেন। ইসলামী শরী’আতের উপস্থাপক বিশ্বনবী মুহাম্মদ (স:)-কে লক্ষ্য করে আল্লাহ তা’আলা বলেছেন, “তোমাকে কেবলমাত্র বিশ্ববাসীর রহমতস্বরূপ প্রেরণ করেছি।” (সুরা আম্বিয়া : ১০৭) আয়াতের শব্দ ‘রহমত’ এর ভিত্তি হলো, কল্যাণ অর্জন ও ক্ষতির প্রতিরোধ। আর তা একটি বিশাল ক্ষেত্র। এ ক্ষেত্রটি ততই বিস্তীর্ণ, যতটা বিস্তীর্ণ মানুষের জীবন। আল কুরআনে একথাও বলে দেয়া হয়েছে যে, আল্লাহ তাঁর বান্দাহদেরকে কোন কষ্ট বা দুর্ভোগ পোহাতে বাধ্য করতে চান নি। তিনি সাধ্যাতীত কোন কাজ করতে নির্দেশ দেননি। সুরা মায়েদায় শরী’আতের বিভিন্ন বিধি-বিধান উল্লেখ করার পর সে সবের মূলে নিহিত আল্লাহর মানব কল্যাণ-উদ্দেশ্যের কথা বলা হয়েছে এ ভাষায়:“আল্লাহ শরী’আতের এসব বিধি-বিধান দিয়ে তোমাদের উপর কোন অসুবিধা চাপিয়ে দিতে চাননি; বরং তিনি চেয়েছেন তোমাদের পবিত্র করতে এবং তোমাদের প্রতি তাঁর নিয়ামতসমূহ সম্পূর্ণ করে দিতে-যেন তোমরা শোকর আদায় করতে পারো।” (সুরা মায়েদা : ০৬)
ইসলামী অর্থনীতি ও মানবতার কল্যাণ : মূলকথা, ইসলামের চরম লক্ষ্য-উদ্দেশ্য হচ্ছে মানবতার কল্যাণ। এমনকি ইসলামী আইনবেত্তারা বলেছেন, যেহেতু মানব কল্যাণ একটা পরিবর্তশীল ব্যাপার। তাই যেখানে কল্যাণের পরিবর্তন ঘটেছে, সেখানে আইনেও অনিবার্যভাবে সেই পরিবর্তনকে গ্রহণ করা হয়েছে। ইসলামী অর্থনীতি ইসলামী জীবন ব্যবস্থার অবিচ্ছেদ্য অংশ (Integrated part). একজন প্রখ্যাত ইসলামী চিন্তাবিদ ও ইসলামী অর্থনীতিবিদ বলেছেন, ‘ইসলামী অর্থনীতির বিঘোষিত দৃষ্টিভঙ্গি হলো, এ বিশ্বজগৎ এবং এর যাবতীয় সম্পদ মহান আল্লাহ গোটা মানব জাতির কল্যাণের জন্যে সৃষ্টি করেছেন। তাই পৃথিবীর বুক থেকে স্বীয় জীবিকা উপার্জনের চেষ্টা করার অধিকার প্রতিটি মানুষের জন্মগত অধিকার। এ অধিকারের ক্ষেত্রে সকল মানুষ সমান অংশীদার। কোন মানুষকে তার জন্মগত এ অধিকার থেকে বঞ্চিত করা যেতে পারে না।
মানুষের জীবিকা ও অর্থনীতি সম্পর্কে একেবারে প্রাথমিক ও মৌলিক কথা হলো যে, মহান আল্লাহই মানুষের জীবিকা ও অর্থনীতির সমুদয় উপায় উপকরণ সৃষ্টি করেছেন। তিনি সেগুলোকে এমনভাবে এমন প্রাকৃতিক বিধানের উপর সৃষ্টি করেছেন, যার ফলে সেগুলো মানুষের জন্যে উপকারী ও কল্যাণবহ হয়েছে। তিনিই মানুষকে এসব থেকে ফায়েদা লাভের সুযোগ করে দিয়েছেন। তিনিই মানুষকে সেগুলোর ব্যয় ব্যবহার করার ক্ষমতা দান করেছেন।
নবী (স:) মদীনা ইসলামী রাষ্ট্র কায়েম করার পাশপাশি মানবতার কল্যাণের জন্য শরী’আহভিত্তিক ইসলামী অর্থ ব্যবস্থা ও ইসলামী ব্যাংক ব্যবস্থাও কায়েম করেন। বর্তমান ইসলামী ব্যাংক ব্যবস্থা মূলত: মানবতার মহান বন্ধু মুহাম্মদ (স:) থেকে উৎসারিত। এ ব্যাংক নবীয়ে আকরাম (স:) প্রতিষ্ঠিত মদীনার ইসলামী রাষ্ট্রের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ব্যবস্থা ‘বাইতুল মাল’-এর আধুনিক উন্নয়ন। একজন আন্তর্জাতিক ইসলামী অর্থনীতিবিদ বলেন, ‘বাইতুল মালই ছিল ইসলামী রাষ্ট্রের রাষ্ট্রীয় ব্যাংক স্বরূপ। অবশ্য আধুনিক কালের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ন্যায় ব্যাপক ও বিস্তৃত ছিল না। সেকালে রাষ্ট্র ব্যবস্থা যেহেতু কেন্দ্রভিত্তিক ছিল, সেহেতু প্রাদেশীক ও কেন্দ্রীয় বাইতুলমালের দায়িত্ব যথাক্রমে স্ব-স্ব সরকারের কেন্দ্রীয় ব্যক্তির হাতেই ন্যস্ত থাকত। কেন্দ্রীয় বাইতুলমাল দেশের কেন্দ্রীয় রাজধানীতে থাকত এবং খলিফা স্বয়ং এর দায়িত্বে নিয়োজিত থাকতেন।’ (ডঃ এম.এ মান্নান, ইসলামী অর্থনীতি তত্ত্ব ও প্রয়োগ, ইসলামী ইকনমি´ রিসার্চ ব্যুরো, ঢাকা, ১ম বাংলা সংস্করণ-১৯৮৩, পৃ. ১৫৭।) বাইতুল মাল ছিল মদীনা নামক ইসলামী রাষ্ট্রের জনগণের এক দরদী প্রতিষ্ঠান। এই প্রতিষ্ঠানটির দরদী অংগীকার ছিল ‘মানবতার কল্যাণ’। সে যুগের বাইতুল মাল আজকের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ন্যায় কাজ করতো। কিন্তু নোট ইস্যু, ঋণ সরবরাহ এবং সুদের হার নিয়ন্ত্রণের কাজ করতো না। তাছাড়া আধুনিক অর্থে আজকের বাণিজ্যিক ব্যাংকের ন্যায় সুদে ঋণদান কর্মসূচিও ছিল না। তবে জনগণ ব্যক্তিগতভাবে অথবা পরস্পর অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা করতো।
পারস্পরিক কল্যাণ ইসলামের দাবি : কুরআন-হাদীস ও ইসলামী ইতিহাস এ কথা প্রমাণ করে যে, সমাজবদ্ধ মানুষগুলো পরস্পরের সাহায্যকারী হবে-এটাই ইসলামের দাবি। পারস্পরিক এ কল্যাণের জন্য মানুষের মধ্যে ভ্রাতৃত্বের বন্ধনকে অটুট করার জন্য বিভিন্ন কর্মসূিচর কথা তো আগেই বলা হয়েছে। ইসলামের প্রতিটি আনুষ্ঠানিক ইবাদাতের দিকে গভীর দৃষ্টি নিবদ্ধ করলে বুঝা যায় যে, মানবতার কল্যাণের জন্য দয়াময় সর্বশক্তিমান তা অবশ্য কর্তব্য হিসাবে প্রতিটি ইবাদাত মানুষের উপর ধার্য করেছেন। পারস্পরিক কল্যাণকে বাধাগ্রস্ত করতে পারে এমন কিছু ব্যক্তিগত বদগুণ রয়েছে। সেই সাথে এগুলো সামাজিক ভ্রাতৃত্বকেও নষ্ট করে। তাই এ গুলো আল্লাহ নিষেধ করেছেন এবং তা থেকে দূরে অবস্থান করার জন্য মানুষকে নির্দেশও দেয়া হয়েছে। মৌলিক অনিষ্টগুলো হলো, সুদ, ঘুষ, কৃপণতা বা ব্যয়কুণ্ঠতা, অপচয় ও ব্যবসায় অসাধুতা ইত্যাদি। যেমন সুদ সম্পর্কে আল্লাহ তা’আলা বলেন : “যারা সুদ খায় তাদের অবস্থা হয় ঠিক সেই লোকটির মত যাকে শয়তান স্পর্শ করে পাগল করে দিয়েছে।
তাদের এ অবস্থায় উপনীত হওয়ার কারণ হচ্ছে এই যে, তারা বলে: ’ব্যবসা তো সুদের মতই’। অথচ আল্লাহ ব্যবসাকে হালাল করে দিয়েছেন এবং সুদকে করেছেন হারাম।” (সুরা বাকারা-২৭৫) কৃপণতা সম্পর্কে আল্লাহ তা’আলা বলেন, “যারা আল্লাহর দেয়া ধন-সম্পদের বেলায় কৃপণতা প্রদর্শন করে তারা যেন এ ভুলের মধ্যে নিমজ্জিত না থাকে যে, তা তাদের জন্য কল্যাণকর বরং তা তাদের জন্য অকল্যাণকর। যে সম্পদের বেলায় তারা কৃপণতা প্রদর্শন করেছে সে সম্পদ কিয়ামতের দিন তাদের গলায় হার রূপে পরিয়ে দেয়া হবে।” (সুরা আল ইমরান : ১৮০), অপচয় সম্পর্কে আল্লাহ তা’আলা বলেন,“সম্পদ ব্যয়ে সীমা অতিক্রম করো না। আল্লাহ তা’আলা অপব্যয়কারীদেরকে পছন্দ করেন না। (আনয়াম : ৪১) “অপব্যয় করো না। অপব্যয়কারী শয়তানের ভাই, আর শয়তান হচ্ছে তার প্রভুর প্রতি অকৃতজ্ঞ।” (সুরা বণী ইসরাঈলঃ২৬-২৭) এবং ব্যবসা সম্পর্কে আল্লাহ তা’আলা বলেন, “হে ঈমানদারগণ ! তোমরা পরস্পরের ধন-সম্পদ অন্যায়ভাবে গ্রাস করোনা। (হাঁ) ব্যবসা-বাণিজ্য যা করবে তা পারস্পরিক সম্মতির ভিত্তিতে করবে এবং কখনো (স্বার্থের কারণে) একে অপরকে হত্যা করো না। অবশ্যই আল্লাহ তায়ালা তোমাদের প্রতি অত্যন্ত মেহেরবান।” (সুরা আন্ নিসা : ২৯)
মানবতার কল্যাণে ইসলামী সমাজ : মানবতার কলাণের জন্য সামজিক পবিবেশ মুখ্য ভূমিকা পালন করে। তাই একটি সুন্দর সমাজ প্রতিষ্ঠার জন্যও বিশেষভাবে তাগিদ প্রদান করা হয়েছে। পাশাপাশি সমাজ ব্যবস্থাকে সুস্থ সবল করে সে গুলোর প্রচলন (আমরে বিল মারুফ) এবং সমাজ ব্যবস্থাকে কুলুষিত করে এবং সমাজকে অস্থির করে তুলে সেগুলোর নিষিদ্ধ করণের (নাহি আনিল মুনকার) জন্য নির্দেশ প্রদান করা হয়েছে। এ ধরনের সমাজ প্রতিষ্ঠা করা সালাত ও সওমের মতোই বাধ্যতামূলক। কেউ যদি শুধু সালাত ও সাওম পালনকেই যথেষ্ট মনে করেন তবে অবশ্যই তিনি মহাক্ষতির মধ্যে নিমজ্জিত আছেন। আল্লাহ তা’আলা বলেন, “তোমরাই দুনিয়ার সর্বোত্তম দল। তোমাদের কর্মক্ষেত্রে আনা হয়েছে মানুষের কল্যাণের জন্য। তোমরা ভালো কাজের হুকুম দিবে এবং দুস্কৃতি থেকে বিরত রাখবে এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে।” (সুরা আলে ইমরান : ১১০)
লেখক : ব্যাংকার ও প্রাবন্ধিক।