তৌহিদুর রহমান

‘গুপ্ত’ শব্দটি অনেক গভীর এবং তাৎপর্যপূর্ণ। এর শাব্দিক অর্থ লুকায়িত, অপ্রকাশ্য, অদৃশ্য ইত্যাদি। ‘গুপ্ত’ একটি সংস্কৃত শব্দ, যার মূল অর্থ হলো গোপন, লুকায়িত, আচ্ছাদিত, সংরক্ষিত বা রক্ষিত। এটি সাধারণত এমন কিছু বোঝাতে ব্যবহৃত হয় যা সবার সামনে প্রকাশ করা হয় না বা যা পর্দার আড়ালে থাকে। এছাড়া, ‘গুপ্ত’ ভারতীয় উপমহাদেশের একটি জনপ্রিয় পারিবারিক পদবি বা বংশগত উপাধি, যা রক্ষক বা অভিভাবক অর্থেও ব্যবহৃত হয়।

বিশেষণ পদ হিসাবে অর্থ- রক্ষিত, গূঢ়, অদৃশ্য, লুক্কায়িত, অলক্ষিত, সংবৃত, গোপন, লুকানো (যেমন- গুপ্তধন, গুপ্তচর) ইত্যাদি। বিশেষ্য পদ হিসাবে অর্থ- পদবি, বাঙালি বৈদ্য এবং উত্তর ভারতীয় বণিক (বানিয়া/জৈন) সম্প্রদায়ের ব্যবহৃত একটি সাধারণ বংশগত উপাধি গুপ্ত। স্ত্রীলিঙ্গ গুপ্তা। ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট: প্রাচীন ভারতের বিখ্যাত ‘গুপ্ত সাম্রাজ্য’ (Gupta Empire)। সহজ কথায়, গুপ্ত মানে যা গোপন বা আড়ালে রাখা হয়েছে। এ সম্পর্কিত শব্দ সমূহ গুপ্তকথা, গুপ্তচর, গুপ্তধন, গুপ্তবেশ, গুপ্তভোট, গুপ্তমত, গুপ্তমন্ত্র, গুপ্তরহস্য, গুপ্তহত্যা, গুপ্তঘাতক ইত্যাদি। সংস্কৃত শব্দ গোপতৃ (goptry) থেকে এসেছে। উত্তর ভারতীয় বংশোদ্ভূত একটি সাধারণ উপাধি, যার অর্থ অভিভাবক বা রক্ষক। ঐতিহাসিক আর সি মজুমদার এর মতে , উত্তর ও পূর্ব ভারতে বিভিন্ন সময়ে বেশ কয়েকটি ভিন্ন সম্প্রদায় গুপ্ত উপাধি গ্রহণ করেছিল। চন্দ্রবংশের শাসক শ্রীচন্দ্রের রামপাল লিপি থেকে জানা যায়, একদল ব্রাহ্মণের উপাধি ছিল গুপ্ত। যারা নিজেদেরকে আড়ালে রাখতো। বাংলা অঞ্চলে এই উপাধিটি বৈদ্যদের এবং কায়স্তদের মধ্যেও পাওয়া যায়।

এক হিন্দু বোনের একটি আলোচনা অনেক ভালো লেগেছে। তিনি বলেছেন, ‘একমাত্র আল্লাহই সঠিক বা সত্যি। আল্লাহ যদি দৃশ্যমান বা প্রকাশিত হতো তাহলে মানুষ আল্লাহর মূর্তি বানাতো, আল্লাহর ছবি দিয়ে পোস্টার বানাতো, আল্লাহকে নিয়ে কার্টুন বানাতো, গালগল্প বানাতো, সিনেমা বানাতোÑআরো কত কি যে বানাতো তার ইয়ত্তা নেই। হিন্দুসহ বিভিন্ন পৌত্তলিক ধর্মের মানুষ দেবতাদের কোটি কোটি মূর্তি বানায়, পূজা করেÑ তারপর পূজা-পার্বন শেষ হলেই তা ভাগাড়ে, নদী-নালায় বা খালে বিলে ফেলে দেয় এবং সে ফেলে দেয়া মূর্তির উপরে মানুষ, পশু-পাখি মল-মুত্র ত্যাগ করে, পদদলিত করে। একই অবস্থা দেবতাদের ছবি সম্বলিত লিফলেট, ব্যানার, পোস্টারের-পথে-ঘাটে, ড্রেনে যত্রতত্র ইশ্বরের পোস্টার বা ছবি পড়ে থাকে। যে ভক্তরা দুদিন আগে মহাসমারোহে তা পূত-পবিত্র জ্ঞানে পূজা করেছে-কি আশ্চর্যের বিষয় পূজা-পার্বন শেষ হওয়ার সাথে সাথে তা ধূলায় ভুলুন্ঠিত হয়। ভক্তরা তার উপর থুথু নিক্ষেপ করে, পদপিষ্ট করে, মল-মুত্র ত্যাগ করে। কিন্তু আল্লাহ যদি প্রকাশিত হতো, তাহলে কি যে হতো-এটা অনুমান করাও কষ্টকর।’

মহামহিম আল্লাহর হিকমত বা প্রজ্ঞা দেখলে অবাক হতে হয়। মহাবিশ্বে যা কিছু আছে তার বেশির ভাগই ‘গুপ্ত’ বা অপ্রকাশিত অবস্থায় আছে বা ছিল। যেমন মহান আল্লাহ নিজেই অদৃশ্য বা অপ্রকাশিত। মহান আল্লাহর সৃষ্টি সম্পর্কে আমরা অতি সামান্যই জানিÑ শুধুমাত্র আল্লাহ আমাদেরকে যতটুকু জানিয়েছেন তার বেশি কিছু নয়। বিজ্ঞান আমাদের সামনে যা উপস্থাপন করে তার সিংহভাগই কাল্পনিক। মহাবিশ্বে কোটি কোটি গ্রহ-নক্ষত্র রয়েছে, অসংখ্য সৌরজগত রয়েছেÑ জিন জাতি, ফেরেস্তা, বেহেস্ত, দোযখ, সাত আসমান, আল্লাহর আরশসহ রয়েছে আরো কত কিছু। সবই তো ‘গুপ্ত’ অবস্থায় আছে। মানুষ নিজ চোখে এগুলোর প্রায় কিছুই দেখতে পায় না। এমনকি আমাদের সাথে দুই কাঁধে মুনকির, নকির নামে যে দুজন সম্মানিত ফেরেস্তা রয়েছেন তাও আমরা দেখতে পাই না। দেখতে পায় না কবরের আযাব। যত প্রকারের মূল্যবান ধাতু তার প্রায় সব কিছুই গুপ্ত অবস্থায় থাকেÑ যেমন ঝিনুকের পেটে মুক্তা, কয়লার খনিতে হিরক, ইউরেনিয়াম, সোনা ইত্যাদি। ক্রুড অয়েলের মধ্যে লুকায়িত থাকে কেরোসিন, ডিজেল, অকটেন, পেট্রল, সিনথেটিক, ফার্নেস, প্লাস্টিক আরো অনেক কিছু।

পৃথিবীতে এমন কোনো নবী-রাসুল আসেননি যারা জীবনের কোনো এক সময় ‘গুপ্ত’ অবস্থায় ছিলেন না। কখনো তারা মহান আল্লাহর আদেশে, কখনো প্রাণনাশের আশঙ্কায়, কখনো কৌশলে, আবার কখনো গভীর জ্ঞান অšে¦ষণের জন্য ‘গুপ্ত’ অবস্থায় ছিলেন। মুসা (আ.) ফেরাউনের ঘরে গুপ্ত অবস্থায় লালিত-পালিত হয়েছেন। ইউসুফ (আ.) জীবনের একপর্যায়ে গুপ্ত অবস্থায় ছিলেন। ঈসা (আ.)-কে মহান আল্লাহ গুপ্ত করে আসমানে উঠিয়ে নিয়েছেন। আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ সা. জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ে হিকমত অবলম্বন করেছেন। তিনি হেরা গুহায় নির্জনে গভীর জ্ঞান অর্জনের জন্য সাধনা করেছেন। তিনি ইসলাম প্রচারের শুরুতে অপ্রকাশ্যভাবে গোপনে দাওয়াতী কাজ করেছেন। প্রাণনাশের শঙ্কায় একপর্যায়ে মহান আল্লাহর আদেশে গোপনে হিজরত করেছেন মক্কা থেকে মদিনায়। তিনি মিরাজে গিয়েছেন গোপনে। এভাবে দেখলে দেখা যাবে বিভিন্ন জাতি-গোষ্ঠী নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার স্বার্থে বিপদের মুহূর্তে গুপ্ত অবস্থায় থাকতে বাধ্য হয়েছেন। এক সময় ইহুদিরা আত্মরক্ষার তাকিদে জার্মানি বা পৃথিবীর অন্যান্য অঞ্চল থেকে পালিয়ে এসে ফিলিস্তিনে গুপ্ত অবস্থায় ছিলেন। এখন ইসরাইলের জেরুজালেম বা এর আশেপাশে অনেক মুসলমান গুপ্ত অবস্থায় আছেন। স্পেনে মুসলিমদের পতনের পর খুব সামান্যই প্রাণে বাঁচতে পেরেছিল। এখনো স্পেনে মুসলিমদের অনেকে মরিস্কো হিসাবে গুপ্ত আছেন। এক সময় আফ্রিকা অঞ্চল, নিউজিল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়াসহ বিভিন্ন দেশের আদিবাসীরা পশ্চিমাদের আক্রমণ থেকে জীবন বাঁচানোর জন্য গুপ্ত অবস্থায় ছিল। গুপ্ত হামলা, গুপ্তহত্যা, গুপ্তচর, গুপ্তকৌশল ইত্যাদি যুদ্ধক্ষেত্রের একটি অতি সাধারণ ঘটনা। এভাবে মহান আল্লাহর সৃষ্টি জগৎ, নবী-রাসূল, মহাবিশ্ব, জাতি-গোষ্ঠী, রাজা-বাদশা, যুদ্ধ-বিগ্রোহ, খনিজসম্পদ ইত্যাদির ‘গুপ্ত’ অবস্থার বিবরণ নিয়ে আলোচনা করতে গেলে লক্ষ লক্ষ বই লিখতে হবে। পৃথিবীর ইতিহাস পর্যালোচনা করলে দেখা যাবে ‘গুপ্তঘটনা’ কখনো মানবজাতির জন্য কল্যাণ বয়ে এনেছে আবার কখনো অকল্যাণ বয়ে এনেছে। যাহোক, ভারতবর্ষে একসময় উগ্র হিন্দুদের হত্যাযজ্ঞ খেকে জীবন বাঁচাতে লক্ষ লক্ষ বৌদ্ধ ভারত উপমহাদেশ থেকে ‘গুপ্ত’ হয়ে যায়। আমরা এখন কেন কিভাবে ভারতবর্ষে বৌদ্ধরা ‘গুপ্ত’ হয়ে গেল তার সামান্য আলোচনা করবোÑতাহলে বাংলাদেশে হঠাৎ করে ‘গুপ্ত’ শব্দটা নিয়ে কেন এতো মাতামাতি তার কিছুটা হলেও অনুধাবন করতে পারবো।

মূলত শক্তিশালী গুপ্ত সাম্রাজ্যের আমল থেকেই রাষ্ট্রযন্ত্র ধীরে ধীরে হিন্দুদের প্রভাব বলয়ে ফিরে যায়। স্থানীয় রাজারা তখন থেকে বৌদ্ধ ধর্মের চেয়ে হিন্দু ধর্মের দিকে বেশি ঝুঁকে পড়ে। গুপ্ত রাজারা বৌদ্ধ ভিক্ষুদের চেয়ে হিন্দু ব্রাহ্মণদের সাথে সখ্যতা গড়ে তোলার দিকে বেশি মনোযোগী হতে থাকে। বিশেষ করে সাধারণ মানুষের মধ্যে থেকে দলিত ও নিম্নশ্রেণির লোকজন যারা আগে বৌদ্ধ ধর্মের জাতপ্রথার বিরুদ্ধবাণীতে আকৃষ্ট ছিলÑ তারাও পরিবর্তিত রাজনৈতিক নীপিড়নের কারণে সনাতন ধর্মে ফিরে যেতে শুরু করে। পঞ্চম শতাব্দিতে চীনা পরিব্রাজক ও তীর্থযাত্রী ফেক্সিয়ান ভারত সফরের সময় দেখতে পান যে, বৌদ্ধ ধর্মতত্ত্ব ও হিন্দু ধর্মতত্ত্ব এতটাই কাছাকাছি ছিল যে অনেকেই এই দু’ধর্মের মধ্যে তেমন কেনো পার্থক্য দেখতে পেতেন না।

গুপ্ত সাম্রাজ্যের রাজা নরেন্দ্র গুপ্ত মানে শশাঙ্কের চরম অত্যাচারের ফলেই বৌদ্ধরা সেই সময় থেকে নিজেরাই গুপ্ত হয়ে পড়ে এবং অনেকেই আবার কৌশলে সনাতন ধর্মে ফিরে যেতে বাধ্য হয় এবং বেশির ভাগ বৌদ্ধরা জীবন বাঁচানোর জন্য দেশ থেকে পালিয়ে অন্যত্র চলে যায়। নরেন্দ্র গুপ্ত অর্থাৎ শশাঙ্কের রাজত্বকালে রাষ্ট্রের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির এমন বেহাল দশা হয়েছিল যে অনেক ঐতিহাসিক তাকে মাৎস্যন্যায় দুঃশাসনের সাথে তুলনা করেছেন। প্রখ্যাত ইতিহাসবিদ নীহার রঞ্জন রায় শশাঙ্কের সৃষ্ট মাৎস্যন্যায় বা নৈরাজ্যের কাল সম্পর্কে বলেন, “রাষ্ট্র ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন-ক্ষত্রিয়, বণিক, ব্রাহ্মণ, নাগরিক স্ব স্ব গৃহে সকলেই রাজা। আজ একজন রাজা হইতেছেন, রাষ্ট্রীয় প্রভূত্ব দাবি করিতেছেন, কাল তার ছিন্নমস্তক ধুলায় লুটাইতেছে। ইহার চেয়ে নৈরাজ্যের বাস্তব চিত্র আর কি হইতে পারে?” (নীহার রঞ্জন রায়, ‘বাঙালির ইতিহাস’, আদিপর্ব, পৃ: ৩৮০।)

হিন্দুরাজা শশাঙ্কের জাতি বিদ্বেষ সম্পর্কে ড. আহমদ শরীফ লিখেছেন, ‘সাত শতকের প্রথম দশকেই কনৌজ বা বিহার থেকে আগত গুপ্তদের মহাসামন্ত শশাঙ্ক নরেন্দ্র গুপ্ত নামে এক প্রবল প্রতাপ স্বাধীন গৌড়াধিপতির (শশাঙ্ক রাজত্ব কাল ৫৯০-৬২৫ খ্রিস্টাব্দ, মতান্তরে থেকে ৬০৬ খ্রিস্টাব্দ) সাক্ষাৎ মেলে। তিনি উত্তর ও পশ্চিমবাংলা এবং উড়িষ্যা বিহারের কিয়দংশে আপন আধিপত্য বিস্তার করে সম্ভবত বিহারী হয়েও বাঙালির গৌরব পর্বের অবলম্বন হয়ে রয়েছেন। তিনি ছিলেন ব্রাহ্মণ্যবাদী ও বৌদ্ধ পীড়ক। গুপ্তদের ও শশাঙ্কের শাসনকালে বঙ্গে ব্রাহ্মণ্যবাদ বৃদ্ধি পেতে থাকে। তিনি ২০ বছর প্রতিপত্তির সঙ্গে রাজত্ব করেন। তার রাজধানী ছিল কর্ণসুবর্ণে- বর্তমান মুর্শিদাবাদ জেলার রাঙ্গামাটিতে। পূর্ববঙ্গেরও কিছু অংশ হয়তো তার শাসনে ছিল।...’ শশাঙ্কের বৌদ্ধবিদ্বেষ নিয়ে নিহাররঞ্জনের পাশাপাশি ড. আহমদ শরীফও প্রায় একই মন্তব্য করেছেন। হিন্দুরাজা শশাঙ্কের বৌদ্ধ বিদ্বেষ এত নিদারুণ ছিল যে, তিনি এই মর্মে তার সৈন্যদের লিখিত আদেশ প্রদান করেছিলেন যে, বৌদ্ধ বৃদ্ধ ও বালকসহ (সমস্ত পুরুষ) হত্যা না করে যে ফিরে আসবে, তাকে প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত করা হবে। তিনি শশাঙ্কের বৌদ্ধ বিদ্বেষ সম্বন্ধে রাজ-আদেশের অনুলিপির উপস্থাপন করে গেছেন এভাবে: (আদেশ অনুলিপির বাংলা অর্থ এখানে দেওয়া হল): “সেতুবন্ধ থেকে হিমালয় অবধি যেখানে যত বৌদ্ধ রয়েছে তাদের বৃদ্ধ ও বালকসহ যে ভৃত্য হত্যা করবে না, সে প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত হবে। রাজ ভৃত্যদের প্রতি রাজার এই আদেশ।” (বাঙালি ও বাংলা সাহিত্য’ : ড. আহমদ শরীফ, নিউ এজ পাবলিকেশন, পৃষ্ঠা ২৩, ৪৭।)

ঐতিহাসিক নরেশ কুমার বলেন, “বুদ্ধের নাম কলুষিত করার পাশাপাশি এহেন ব্রাহ্মণ্য পুনর্জাগরণবাদীরা নিরপরাধ বৌদ্ধদের নিপীড়ন কিংবা এমনকি মেরে ফেলার তাগিদ হিন্দু রাজাদের দিতে থাকেন। বাংলার শৈব ব্রাহ্মণ রাজা শশাঙ্ক শেষ বৌদ্ধ সম্রাট হর্ষবর্ধনের বড় ভাই রাজ্যবর্ধনকে ৬০৫ খ্রিষ্টাব্দে হত্যা করেন। এরপরে শশাঙ্ক বোধি গয়াতে গিয়ে বোধি বৃক্ষকে উপড়ে ফেলেনÑ যার নিচে বসে ধ্যান করে গৌতম বোধিপ্রাপ্ত হন। পাশের বৌদ্ধ বিহারে থাকা বৌদ্ধের প্রতিকৃতি তিনি সরিয়ে ফেলে তার জায়গাতে শিবের প্রতিকৃতি ঝুলিয়ে দেন। এরপরে শশাঙ্ক কুশিনগরের সব বৌদ্ধ ভিক্ষুদের নির্বিচারে হত্যা করেন। আরেক শৈব হিন্দু রাজা মিহিরকুল ১৫০০ বৌদ্ধ তীর্থস্থান সম্পূর্ণরূপে ধ্বংস করেন। শৈব রাজা তরামন কৌসম্বিতে থাকা বৌদ্ধ মঠ ঘষিতরাম ধ্বংস করেন বলে জানা যায়।”

প্রাচীন চীনা পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙ-এর ভ্রমণকাহিনী (সি-ইউ-কি) এবং বাণভট্টের হর্ষচরিত থেকে জানা যায় যে, শশাঙ্ক ছিলেন একজন কট্টর শৈব (শিব উপাসক) এবং বৌদ্ধধর্মের প্রবল বিরোধী। হিউয়েন সাঙের মতে, শশাঙ্ক অসংখ্য বৌদ্ধ মন্দির ধ্বংস করেন, মগধের বোধিবৃক্ষ কেটে ফেলেন এবং পাটলিপুত্রে বুদ্ধের পদচিহ্ন সম্বলিত পাথর গঙ্গায় নিক্ষেপ করেন। কিছু বর্ণনায় উল্লেখ রয়েছে যে, তিনি বৌদ্ধ ভিক্ষুদের ওপর ব্যাপক গণহত্যা চালিয়েছিলেন। পাল রাজবংশের উত্থানের আগে বৌদ্ধ ও হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে রাজনৈতিক আধিপত্য নিয়ে দীর্ঘস্থায়ী দ্বন্দ্ব চলছিল।

তাই এ কথা ভাববার কোনো কারণ নেই যে, হঠাৎ করেই বাংলাদেশে ‘গুপ্ত’ শব্দের আবির্ভাব ঘটেছে। মূলত ‘গুপ্ত’ শব্দটি ভারত থেকে পাঠানো একটি সাংস্কৃতিক পারমানবিক বোমা। বর্তমানে ভারতে ক্ষমতায় আছেন ভয়ঙ্কর উগ্রবাদী, রক্তপিপাষু, মাতাল, সাম্প্রদায়িক, জঙ্গি আরএসএস-এর প্রোডাক্ট গুজরাটের কসাই চরম মুসলিম বিদ্বেষী শাসক নরেন্দ্র মোদী। ইতিহাসের সে মাৎস্যন্যায় রাজা নরেন্দ্র গুপ্ত যার ভয়ঙ্কর নৃশংতায় বৌদ্ধরা ভারতবর্ষ থেকে নির্মূল হয়েছিল আর আজ তারই ধারাবাহিকতায় চরম মুসলিম বিদ্বেষী গুজরাটের কসাইখ্যাত এই নরেন্দ্র মোদী মুসলমানদের হত্যাযোগ্য বানানোর জন্য বাংলাদেশে ‘গুপ্ত’ শব্দটি মুসলিম নিধন ট্যাগিং হিসেবে প্রেরণ করেছে। নরেন্দ্র গুপ্ত যেভাবে ভারত থেকে বৌদ্ধদের নির্মূল করেছিল একইভাবে নরেন্দ্র মোদী সেভাবে ভারত উপমহাদেশ থেকে মুসলমানদের নির্মূল করতে সচেষ্ট। গুজরাটে মুসলিম হত্যাকাণ্ডের মধ্য দিয়েই মূলত নরেন্দ্র মোদী ভারতের রাষ্ট্রক্ষতাই অধিষ্ঠিত হয়। সম্প্রতি ভারতের পশ্বিমবঙ্গে ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিং করে কট্টর হিন্দুত্ববাদী দল বিজেপি ক্ষমতায় আসার সাথে সাথে মুসলিমদের উপর যে নির্যাতন চলছে এবং বাংলাদেশ নিয়ে চরম মুসলিম বিদ্বেষী নতুন মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী যে তর্জন-গর্জন করছেন তা অবশ্যই একটি অশনি সংকেত।

তাই বলতে চাই, হঠাৎ করেই মির্জা ফখরুল সাহেবের মতো একজন নিরেট ভদ্রলোক বাংলাদেশ জামায়াত ইসলামীর মতো একটি মডারেট ইসলামী দলকে নির্মূল করে দেওয়ার ঘোষণা কোনো কাকতালীয় বিষয় নয়। এটা বাংলাদেশের মুসলিমদের হত্যাযোগ্য হিসাবে চিহ্নিত করার একটা কৌশল মাত্র। বলাবাহুল্য, এই মির্জা ফখরুল সাহেব দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশ জামায়াত ইসলামীর সাথে একান্ত ঘনিষ্ঠভাবে রাজনীতি করেছেন। রাজা নরেন্দ্র গুপ্ত যেভাবে নিজেই গুপ্ত থেকে বৌদ্ধদের ভারতবর্ষ থেকে নির্মূল করে দিয়েছেন আজকের ক্ষমতাসীনরা নিজেরা ১৭ বছর ধরে গুপ্ত থেকে গুজরাটের কসাই চরম মুসলিম বিদ্বেষী নরেন্দ্র মোদীর এজেন্দা বাস্তবায়নে বাংলাদেশের মুসলিমদের নির্মূল করার জন্য ‘গুপ্ত ট্যাগিং’ দিচ্ছে কিনা তা আমাদের ভেবে দেখা দরকার।

লেখক : কবি ও প্রাবন্ধিক।