আয়েশা সিদ্দিকা

শিক্ষা জাতির মেরুদণ্ড, আর শিক্ষক হলেন সে মেরুদণ্ডের নির্মাতা ও কারিগর। শিক্ষা মানুষের সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ ঘটায় এবং চরিত্র গঠনে সহায়ক ভূমিকা পালন করে। অন্যদিকে শিক্ষক কেবল পাঠ্যঅপুস্তকের জ্ঞান দান করেন না, তিনি শিক্ষার্থীদের মধ্যে নৈতিকতা, মানবতাবোধ ও জীবনের সঠিক পথ দেখান। মূলত, কুসংস্কার ও অন্ধকার দূর করে সমাজে আলো ছড়ায় শিক্ষা। দেশকে এগিয়ে নিতে এবং আত্মনির্ভরশীল হতে শিক্ষা অপরিহার্য। মনের সংকীর্ণতা দূর করে মানুষকে সত্য ও সুন্দরের পথে চালিত করে। শিক্ষক ছাত্রছাত্রীদের সঠিক দিকনির্দেশনা ও স্বপ্ন দেখাতে সাহায্য করেন। পুঁথিগত বিদ্যার বাইরেও একজন শিক্ষক নীতিবান মানুষ হিসেবে শিক্ষার্থীকে গড়ে তোলেন। শিক্ষকতা কেবল পেশা নয়, এটি একটি মহান ব্রত। শিক্ষক সমাজ পরিবর্তনের মূল চালিকাশক্তি। শিক্ষক ও শিক্ষার মানোন্নয়নের নানা তথ্য জানতে সরকারের শিক্ষক বাতায়ন দেখা যেতে পারে।

মূলত, শিক্ষক হলেন জাতির মেরুদণ্ড ও সমাজ গড়ার কারিগর। মনীষী হেনরি অ্যাডামসের মতে, ‘একজন শিক্ষক অনন্তকালকে প্রভাবিত করেন; তার প্রভাব কোথায় গিয়ে শেষ হয় তা তিনি নিজেও জানেন না’। ব্র্যাড হেনরির ভাষায়, ‘প্রকৃত শিক্ষক তাঁরাই, যাঁরা আমাদের নিজেদের মতো করে চিন্তা করতে সাহায্য করেন। ভারতের সাবেক রাষ্ট্রপতি মরহুম এ পি জে আবদুল কালামের অভিমত হলো, ভালো শিক্ষক মোমের মতো নিজে জ্বলে থেকে অন্যদের পথ দেখান। একজন সাধারণ শিক্ষক কেবল তথ্য জানান, কিন্তু একজন মহান শিক্ষক অনুপ্রাণিত করেন। শিক্ষকের প্রভাব কেবল শ্রেণিকক্ষে সীমাবদ্ধ থাকে না, তা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে ছড়িয়ে পড়ে।

বস্তুত, শিক্ষক হলেন যাঁরা শিক্ষাদানের মহান ব্রত পালন করেন। শিক্ষার্থীদের সুপ্ত প্রতিভার বিকাশে সহায়ক ভূমিকা পালন করে থাকেন। স্কুল, কলেজ এবং বিশ্ববিদ্যালয়সহ সকল ধরনের শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষাদানের কাজে নিয়োজিতদেরই শিক্ষক বলা হয়। মূলত, শিক্ষকরা জাতি গঠনের কারিগর। কেননা একজন আদর্শ শিক্ষকই পারেন তার অনুসারীদের জ্ঞান ও ন্যায় দীক্ষা দিতে। শিক্ষার্থীর মানবতাবোধকে জাগ্রত করে একজন শিক্ষক কেবল পাঠদান কে সার্থকই করে তোলেন না, পাশাপাশি দেশের উন্নয়নকে ত্বরাণ্বিত করেন। স্বীয় জ্ঞান ও অভিজ্ঞতা শিক্ষার্থীদের মাঝে বিতরণ করে তাদেরকে দেশের যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তোলেন।

একজন শিক্ষকের ভূমিকা সংস্কৃতির মধ্যে পরিবর্তিত হতে পারে। শিক্ষকরা সাক্ষরতা এবং সংখ্যা, কারুশিল্প বা বৃত্তিমূলক প্রশিক্ষণ, কলা, ধর্ম ও ধর্মীয় মূল্যবোধ, নাগরিক বিজ্ঞান, সম্প্রদায়ের ভূমিকা বা জীবন দক্ষতার নির্দেশনা প্রদান করতে পারেন। শিক্ষকদের আনুষ্ঠানিক শিক্ষাদানের কাজগুলির মধ্যে রয়েছে সম্মত পাঠ্যক্রম অনুসারে পাঠ প্রস্তুত করা, পাঠ প্রদান করা এবং শিক্ষার্থীদের অগ্রগতি মূল্যায়ন করা। যা শিক্ষার্থীদের প্রতিভা বিকাশে অপরিহার্য অনুষঙ্গ।

একজন শিক্ষকের পেশাগত দায়িত্ব আনুষ্ঠানিক শিক্ষার বাইরেও প্রসারিত হতে পারে। মূলত, শিক্ষকদের কর্মপরিধি ও দায়িত্ব খুবই বিস্তৃত। শ্রেণিকক্ষের বাইরে শিক্ষকরা মাঠ ভ্রমণে শিক্ষার্থীদের সাথে যেতে পারেন, স্টাডি হলের তত্ত্বাবধান করতে পারেন, একাডেমিক কার্যক্রম পরিচালনায় সহায়তা করতে পারেন এবং পাঠ্যক্রম বহির্ভূত কার্যকলাপের জন্য সুপারভাইজার হিসেবে কাজ করতে পারেন। ছাত্রদের ক্ষতি থেকে রক্ষা করার আইনগত দায়িত্বও রয়েছে। যেমন যেগুলি হয়রানি, যৌন হয়রানি, বর্ণবাদ বা অপব্যবহারের ফলে হতে পারে। কিছু শিক্ষাব্যবস্থায়, শিক্ষকরা শিক্ষার্থীদের শৃঙ্খলার জন্য দায়ী হতে পারে।

শিক্ষণ একটি অত্যন্ত জটিল ও দায়িত্বপূর্ণ কাজ। কারণ, শিক্ষা একটি সামাজিক অনুশীলন, যা একটি নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপটে সঞ্চালিত হয় এবং সে কারণে সে নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপটের মূল্যবোধ দ্বারা গঠিত হয়। শিক্ষকদের কাছ থেকে প্রত্যাশিত যা প্রভাবিত করে তার মধ্যে রয়েছে ইতিহাস এবং ঐতিহ্য, শিক্ষার উদ্দেশ্য সম্পর্কে সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি, শেখার বিষয়ে গৃহীত তত্ত্ব ইত্যাদি। তাই শিক্ষকের মর্যাদা ও গুরুত্ব সমধিক।

ইসলামে শিক্ষকের মর্যাদা অত্যন্ত উঁচু ও সর্বোচ্চ পর্যায়ের। মহানবী (সা.) নিজেকে শ্রেষ্ঠ শিক্ষক হিসেবে ঘোষণা করেছেন। শিক্ষকদের মর্যাদার মূল ভিত্তি হলো নবীদের উত্তরাধিকার, জ্ঞানের আলো ছড়ানো এবং সমাজের মানুষকে অন্ধত্ব থেকে মুক্ত করা। শিক্ষকরা নবীদের পবিত্র মিশন ও জ্ঞান প্রচারের কাজ পৃথিবীতে চালিয়ে যান। রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘নিশ্চয়ই আমি শিক্ষক হিসেবে প্রেরিত হয়েছি’। চতুর্থ খলিফা হযরত আলী (রা.) বলেছেন, ‘যিনি আমাকে একটি মাত্র হরফ শিক্ষা দিয়েছেন, আমি তার গোলাম’। ভালো শিক্ষা বা জ্ঞান দানের কারণে শিক্ষক মৃত্যুর পরেও সদকায়ে জারিয়ার সওয়াব পেতে থাকেন। যা ইসলামে শিক্ষকদের বিশেষ মর্যাদার কথায় স্মরণ করিয়ে দেয়। তাই শিক্ষার্থীর দায়িত্ব হলো শিক্ষকদের সঙ্গে সবসময় বিনয়ী ও শ্রদ্ধাশীল আচরণ করা। শিক্ষকের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা ও আদেশ মেনে চলা। ভুলত্রুটির জন্য ক্ষমা চাওয়া এবং শিক্ষকের সেবা ও অধিকার রক্ষা করা।

বস্তুত, মানবজীবনের চালিকা শক্তি হলো প্রজ্ঞা বা জ্ঞান। প্রজ্ঞা মানুষের একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য এবং আল্লাহ তাআলা প্রদত্ত শ্রেষ্ঠ নিয়ামত। আল্লাহ রাব্বুল আলামিন প্রথম মানব হযরত আদম (আ.)-কে শিক্ষা প্রদান করেন। পবিত্র কালামে পাকের ভাষায় বলা হয়েছে, ‘আর তিনি (আল্লাহ) আদম (আ.)-কে সকল কিছুর নাম, পরিচয়, গুণাগুণ, বিকাশ ও পরিণতি সম্পর্কে শিক্ষাদান করলেন।’ (সুরা-২ বাকারা, আয়াত: ৩১) আল্লাহ রাব্বুল আলামীন সব নবী-রাসুলগণকে তাঁদের নিজ নিজ জাতির জন্য শিক্ষক হিসেবে প্রেরণ করেছেন। সর্বশেষ নবী ও রাসুল হযরত মুহাম্মদ (সা.) ছিলেন সমগ্র মানবজাতির জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষক। তাই তিনি তাঁর শত পরিচয়ের মধ্যে শ্রেষ্ঠ পরিচয় হিসেবে শিক্ষক পরিচয়কেই তুলে ধরে বলেন, ‘আমি শিক্ষক হিসেবেই প্রেরিত হয়েছি।’ (ইবনে মাজাহ্: ২২৯)

শিক্ষার পরম্পরার সূচনা মানবসভ্যতার আদিলগ্ন তথা প্রাগৈতিহাসিক কাল থেকেই। শিক্ষকদের মর্যাদা সম্পর্কে বিশ্বশিক্ষক মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) বলেন, ‘আল্লাহ তায়ালাই হলেন সবচেয়ে বড় দাতা; অতঃপর আমি (রাসূল সা.), তারপর সে ব্যক্তি, যিনি শিক্ষা অর্জন করেন এবং তা প্রচার ও প্রসারে নিয়োজিত থাকেন।’ (বায়হাকি: ২৫০) রাসুলুল্লাহ (সা.) আরও বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম সে ব্যক্তি, যে নিজে কুরআনুল কারীম শিক্ষা করেন এবং শিক্ষা দেন।’ (বুখারি: ৪৬৬১ / ৫০২৭, তিরমিজি: ২৯০৭, আবু দাউদ: ১৪৫২)

বিশ্বনবী (সা.) ছিলেন সমগ্র মানবজাতির জন্য সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষক। তাই তিনি তাঁর শত পরিচয়ের মধ্যে শ্রেষ্ঠ পরিচয় হিসেবে শিক্ষক পরিচয়কেই তুলে ধরতে গিয়ে বলেন, ‘আমি শিক্ষক হিসেবেই প্রেরিত হয়েছি’। জ্ঞানার্জনের জন্য প্রয়োজন পঠন-পাঠন তথা অধ্যয়ন ও অধ্যাপনা। আল্লাহ তাআলা ওহির প্রথম আদেশেই বলেন, ‘পড়ো তোমার রবের নামে, যিনি সৃষ্টি করেছেন; সৃষ্টি করেছেন মানুষকে আলাক থেকে। পড়ো, আর তোমার রব মহাসম্মানিত যিনি কলমের মাধ্যমে শিক্ষা দিয়েছেন; তিনি মানুষকে শিক্ষা দিয়েছেন, যা তারা জানত না।’ (সুরা-৯৬ আলাক, আয়াত: ১-৫)

শিক্ষা আদান-প্রদান একটি উচ্চ পর্যায়ের ইবাদত। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘জ্ঞান অন্বেষণ করা প্রত্যেক মুসলিম নর-নারীর জন্য ফরজ।’ (ইবনে মাজাহ: ২২৪, বায়হাকি: ১৬৬৭) পবিত্র কালামে হাকীমে জ্ঞান ও জ্ঞানের প্রচারকদের মর্যাদা সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন, ‘তোমাদের মধ্যে যারা ইমান এনেছে এবং যাদের জ্ঞানদান করা হয়েছে, আল্লাহ তাদের মর্যাদা উন্নত করবেন।’ (সুরা-৫৮ মুজাদালা, আয়াত: ১১) আরও বলা হয়েছে, ‘বলো, যারা জানে আর যারা জানে না—তারা কি সমান?’ (সুরা-৩৯ জুমার, আয়াত: ৯)

রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ তার মুখ উজ্জ্বল করুন, যে ব্যক্তি আমার কাছ থেকে একটি কথা শুনে তা শেখে এবং অন্যকে শিক্ষা দেয়।’ (তিরমিজি)। তিনি আরও বলেছেন, ‘তিন শ্রেণির মানুষের জন্য আল্লাহ রহমত বর্ষণ করেন এবং ফেরেশতারা তাদের জন্য রহমত কামনা করেন। তারা হলো জ্ঞান অর্জনকারী, জ্ঞান প্রচারকারী এবং যারা এ কাজে সহযোগিতা করে।’ (তিরমিজি) হযরত আলী (রা.) বলেন, ‘যিনি আমাকে একটি বর্ণ শিক্ষা দিয়েছেন, আমি তাঁর ক্রীতদাস হয়ে গেলাম। তিনি আমার মনিব। তিনি চাইলে আমাকে দাস হিসেবে রেখে দিতে পারেন, বিক্রি করতে পারেন অথবা মুক্ত করেও দিতে পারেন।’ (নাহজুল বালাগা, বায়হাকি: ২০২৩)

রাসূলূল্লাহ (সা.) প্রথমে মক্কাতুল মুকাররমায় দারুল আরকামে একটি শিক্ষাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন, যেখানে তিনি নিজেই শিক্ষক ছিলেন এবং সাহাবায়ে কিরাম ছিলেন শিক্ষার্থী। মদিনা মুনাওয়ারায় হিজরতের পর রাসুলুল্লাহ (সা.) মসজিদে নববির আঙিনার সুফফায় ‘আসহাবে সুফফা’ নামে আরেকটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান স্থাপন করেন। এ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ছিলেন নবী করিম (সা.) ও সাহাবায়ে কিরাম আর এর শিক্ষার্থী ছিলেন সাহাবায়ে কিরামসহ দেশি-বিদেশি বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ।

ইসলামের প্রথম যুদ্ধ বদরের পর বিশ্বনবী (সা.) একটি ভাষাশিক্ষা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন। এখানে শিক্ষকের দায়িত্ব পালন করেন বদরের যুদ্ধে বন্দী কুরাইশরা এবং শিক্ষার্থী ছিল সাহাবিদের শিশুরা। এ ছাড়া রাসূল (সা.) বিদেশি ভাষা শিক্ষার জন্য একটি আন্তর্জাতিক ভাষাশিক্ষা কেন্দ্র প্রতিষ্ঠা করেন, যেখানে বিভিন্ন সাহাবিকে বিভিন্ন দেশের ভাষাশিক্ষা দেওয়া হতো। এ প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক ও শিক্ষার্থী উভয়ই ছিলেন সাহাবায়ে কিরাম।

মূলত, শিক্ষা মানুষের মৌলিক অধিকার। শিক্ষাহীন মানুষ পশুর সমান। আর শিক্ষকরা হলেও শিক্ষার্থীদের জন্য আলোকবর্তিকা স্বরূপ। একজন আদর্শ শিক্ষকের যেমন দায়িত্ব কর্তব্য রয়েছে; ঠিক তেমনিভাবে শিক্ষকরা সর্বোচ্চ সম্মানের অধিকারী। কিন্তু আমাদের দেশের শিক্ষক সমাজ আজও অবহেলিত ও অধিকার বঞ্চিত। শিক্ষক সমাজ আজও সৈয়দ মুজতবা আলীর পণ্ডিত মশায়েই বৃত্তেই রয়ে গেছেন। সরকারি-বেসরকারি দু’ভাগে বিভাজিত করে রাখা হয়েছে শিক্ষকদের। একই যোগ্যতার, একই মানের শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও একই পাঠ্য হওয়ার পরেও শিক্ষকদের এমন বিভাজন একবিংশ শতাব্দীর নির্মম পরিহাস বলা ছাড়া উপায় নেই।

তাই সরকার সহ সংশ্লিষ্টদের উচিত শিক্ষকদের যথাযথ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করে অবিলম্বে বৈষম্য নিরসন করা। অন্যথায় আমাদের শিক্ষা নতুন শতাব্দীর চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করতে পারবে না।

লেখক : শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক।