তিন ঘণ্টার অতি ভারি বর্ষণের সঙ্গে জোয়ারের পানি মিলিয়ে আবারও পানির নিচে তলিয়ে গেছে চট্টগ্রাম নগরীর বিভিন্ন এলাকা। গতকাল সোমবার সকাল ৬টা থেকে ৯টা পর্যন্ত মাত্র তিন ঘণ্টায় ১০৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। আর বেলা ১২টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় মোট বৃষ্টিপাত হয়েছে ২০১ মিলিমিটার। অতি ভারি বৃষ্টির সঙ্গে উচ্চ জোয়ারের কারণে নগরীর খাল-নালা উপচে সড়কে পানি উঠে যায়। কোথাও কোথাও খাল ও সড়ক একাকার হয়ে যাওয়ায় কোনটি খাল আর কোনটি সড়ক, তা বোঝারও উপায় ছিল না।
গতকাল সোমবার সকাল থেকে নগরীর কাতালগঞ্জ, পাঁচলাইশ, মুরাদপুর, বহদ্দারহাট, চকবাজার, বাদুরতলা, কাপাসগোলা, আগ্রাবাদ, উত্তর কাট্টলী, দক্ষিণ নালাপাড়া, জামালখান, জিইসি মোড়, প্রবর্তক মোড়, আইস ফ্যাক্টরি রোড, বাকলিয়ার বিভিন্ন অংশ, তিনপুলের মাথা ও মেহেদীবাগসহ বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়।
সড়কে পানি জমে যাওয়ায় চরম দুর্ভোগে পড়েন অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী ও সাধারণ পথচারীরা। অনেক এলাকায় রিকশা ও ছোট যানবাহন চলাচল ব্যাহত হয়। সুযোগ বুঝে কিছু যানবাহন অতিরিক্ত ভাড়া আদায় করেছে বলেও অভিযোগ করেছেন যাত্রীরা। নগরীর বিভিন্ন মার্কেট ও দোকানের নিচতলায়ও পানি ঢুকে পড়ে। ব্যবসায়ীরা দ্রুত মালামাল সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করেন।
পতেঙ্গা আবহাওয়া অফিসের পূর্বাভাস কর্মকর্তা মো. ইসমাইল ভূঁইয়া জানান, বেলা ১২টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় চট্টগ্রামে ২০১ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে। এর মধ্যে সোমবার সকাল ৬টা থেকে ৯টা পর্যন্ত তিন ঘণ্টায় ১০৯ মিলিমিটার এবং সকাল ৯টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত আরও ৩১ মিলিমিটার বৃষ্টি হয়েছে।
তিনি বলেন, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপ এবং মৌসুমি বায়ু সক্রিয় থাকার কারণে চট্টগ্রামে ভারি থেকে অতি ভারি বৃষ্টি হচ্ছে। গত মঙ্গলবার পর্যন্ত এ ধরনের বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। আবহাওয়া অফিসের তথ্য অনুযায়ী, সোমবার সকাল ১০টার দিকে জোয়ার শুরু হয়। পরবর্তী ভাটা শুরু হওয়ার কথা ছিল বিকেল ৩টা ৪০ মিনিটে। ফলে বৃষ্টির পানি দ্রুত নামার ক্ষেত্রে জোয়ার বড় বাধা তৈরি করে।
চকবাজার এলাকায় চক সুপার মার্কেটের নিচতলার প্রায় সব দোকানে পানি ঢুকে পড়ে। দোকানের মালিক ও কর্মচারীরা পানি থেকে মালামাল রক্ষায় ব্যস্ত হয়ে পড়েন। তেলিপট্টি মোড় এলাকাতেও সকালে হাঁটুসমান পানি জমে ছিল।
তেলিপট্টি মোড় থেকে কাপাসগোলার দিকে যাওয়ার পথে ওয়ার্ড কাউন্সিলর কার্যালয়ের সামনে গিয়ে দেখা যায়, খাল ও সড়কের পানির উচ্চতা প্রায় সমান। ফলে কোনটি খাল আর কোনটি সড়ক-তা আলাদা করে বোঝার উপায় ছিল না।
নগরীর জলাবদ্ধতা নিরসনে গত কয়েক বছর ধরে খাল পুনঃখনন, নালা সংস্কার, সড়ক উন্নয়নসহ বিভিন্ন প্রকল্পে বিপুল অর্থ ব্যয় করা হলেও সামান্য সময়ের অতি ভারি বৃষ্টিতেই একই ধরনের পরিস্থিতির সৃষ্টি হওয়ায় প্রশ্ন তুলেছেন নগরবাসী।
জামালখান এলাকার বাসিন্দা মো.হারুন বলেন, তিন ঘণ্টার ভারি বৃষ্টিতেই নালাগুলো উপচে মূল সড়কে প্রায় হাঁটুপানি জমে যায়। গত তিন-চার বছর ধরে খাল-নালায় নানা ধরনের কাজ চলছে। অথচ জলাবদ্ধতার ভোগান্তি কমছে না।
তিনি বলেন, “গত মাসে জলাবদ্ধতার সময় বলা হয়েছিল খালে বাঁধ থাকায় পানি উঠছে। এবার খালে বাঁধও নেই। এত কাজের পরও যদি নালা ও খালের সক্ষমতা না বাড়ে, তাহলে এত হাজার কোটি টাকা খরচ করার প্রয়োজন কী ছিল?”
‘কোমর পানি’ কাতালগঞ্জে : কাতালগঞ্জ আবাসিক এলাকার বাসিন্দা সাইফুল ইসলাম বলেন, “রাস্তায় কোমর পানি। বাড়ির নিচে হাঁটু পানি। সকালে হঠাৎ করে কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতে এভাবে পানি জমে গেল। আমরা কবে এই বিপদ থেকে মুক্তি পাব, জানি না।”
নগরীর বিভিন্ন এলাকায় পানি ঢুকে পড়ায় সকাল থেকেই যানবাহন চলাচল মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়। অনেক সড়কে পথচারীদের হাঁটু কিংবা কোমরসমান পানি মাড়িয়ে চলাচল করতে হয়েছে। নিচু এলাকার বাসাবাড়ি ও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানেও পানি প্রবেশ করে।
জোয়ারে পানি নামতে পারেনি : চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের উপ-প্রধান পরিচ্ছন্ন কর্মকর্তা প্রনব কুমার শর্মা বলেন, অতি ভারি বৃষ্টির সময় জোয়ার থাকায় নগরীর খালগুলোতে পানি ধারণের মতো জায়গা ছিল না। উচ্চ জোয়ারের কারণে খাল দিয়ে বৃষ্টির পানি দ্রুত কর্ণফুলী নদীতে নামতে পারেনি। এ কারণেই বিভিন্ন এলাকায় জলাবদ্ধতা তৈরি হয়েছে।
তিনি বলেন, কাতালগঞ্জ, আগ্রাবাদ, চকবাজার, মুরাদপুর ও বহদ্দারহাট এলাকায় পানি উঠেছিল। তবে পরে বৃষ্টির তীব্রতা কমে যাওয়ায় পানি নামতে শুরু করেছে। দুই নম্বর গেট এলাকায় অবশ্য উল্লেখযোগ্য জলাবদ্ধতা হয়নি।
বারবার ডুবছে নগরী : চট্টগ্রাম নগরীতে জলাবদ্ধতা নতুন কোনো সমস্যা নয়। বর্ষা মৌসুম এলেই ভারি বৃষ্টি ও জোয়ারের সমন্বিত প্রভাবে নগরীর বিভিন্ন এলাকা পানিতে তলিয়ে যায়। চলতি বছরের এপ্রিল থেকে আগস্ট পর্যন্ত কয়েক দফায় ভারি বর্ষণে নগরীর বিভিন্ন এলাকা প্লাবিত হয়েছে।
জলাবদ্ধতা নিরসনে দীর্ঘদিন ধরে খাল পুনঃখনন, নালা সম্প্রসারণ ও পরিষ্কার, জলপ্রবাহের প্রতিবন্ধকতা অপসারণ এবং বিভিন্ন অবকাঠামোগত উন্নয়নকাজ চললেও প্রত্যাশিত সুফল না পাওয়ায় নগরবাসীর মধ্যে হতাশা বাড়ছে। বিশেষ করে অল্প সময়ের অতি ভারি বৃষ্টিতে যদি পানি দ্রুত নিষ্কাশন না হয়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদি প্রকল্পগুলোর কার্যকারিতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।
নগরবাসীর প্রত্যাশা, শুধু খাল খনন বা নালা পরিষ্কার করলেই হবে না; বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশনের জন্য খাল-নালার ধারণক্ষমতা, সংযোগব্যবস্থা ও পানি প্রবাহের পথকে সমন্বিতভাবে পরিকল্পনার আওতায় আনতে হবে। একই সঙ্গে জোয়ারের সময় বৃষ্টির পানি যাতে নগরীতে আটকে না থাকে, সে বিষয়েও কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
নগরবাসীর প্রশ্ন একটাই-বছরের পর বছর হাজার কোটি টাকা ব্যয়ের পরও যদি তিন ঘণ্টার বৃষ্টিতে খাল-সড়ক একাকার হয়ে যায়, তাহলে জলাবদ্ধতা নিরসনের প্রকল্পগুলোর বাস্তব সুফল কোথায়?