রেজাউল করিম রাসেল কুমিল্লা অফিস : অপরাধ দমন, মাদক ও চোরাচালান প্রতিরোধ এবং মহাসড়কে যান চলাচলে শৃঙ্খলা ফেরাতে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক (এআই) ক্যামেরার নজরদারি জোরদার করা হয়েছে। সাইনবোর্ড থেকে চট্টগ্রাম সিটি গেট পর্যন্ত প্রায় ৫০০ কিলোমিটার মহাসড়কের গুরুত্বপূর্ণ ১৬টি পয়েন্টে স্থাপন করা হয়েছে অত্যাধুনিক এআই ক্যামেরা। পাশাপাশি পুরো মহাসড়কে রয়েছে ১ হাজার ৪২৭টি সিসিটিভি ক্যামেরা। কন্ট্রোল রুম থেকে ২৪ ঘণ্টা পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে মহাসড়কের পরিস্থিতি।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, আজ মঙ্গলবার (১৮ আগস্ট) থেকে এআই প্রযুক্তির মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয় মামলা কার্যক্রম শুরু হওয়ার কথা রয়েছে। কোনো যানবাহন ট্রাফিক আইন অমান্য করলে ক্যামেরায় তা শনাক্ত হওয়ার পর দ্রুত মামলা প্রক্রিয়া শুরু হবে। গাড়ির মালিকের মোবাইল ফোনে এসএমএস ও নোটিশ পাঠানোর ব্যবস্থাও থাকবে।
প্রতি ১০ থেকে ১৫ কিলোমিটার পরপর গুরুত্বপূর্ণ স্থানে স্থাপন করা এআই ক্যামেরার মাধ্যমে যানবাহনের গতিবিধি, অতিরিক্ত গতি এবং বিভিন্ন ধরনের আইনভঙ্গ শনাক্ত করা হচ্ছে। একই সঙ্গে সন্দেহভাজন যানবাহনের তথ্যও দ্রুত হাইওয়ে পুলিশের সংশ্লিষ্ট ইউনিটের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে।
অপরাধ দমনেও নজরদারি
হাইওয়ে পুলিশ সূত্র জানায়, এআই ক্যামেরার নজরদারি শুধু ট্রাফিক আইন বাস্তবায়নে সীমাবদ্ধ নয়। মাদক পরিবহন, চোরাচালান, ডাকাতিসহ মহাসড়ককেন্দ্রিক বিভিন্ন অপরাধ প্রতিরোধেও এসব ক্যামেরার তথ্য ব্যবহার করা হচ্ছে। সন্দেহভাজন কোনো যানবাহন শনাক্ত হলে তাৎক্ষণিকভাবে সংশ্লিষ্ট পুলিশ সদস্যদের জানানো হচ্ছে। প্রয়োজনে গাড়ি থামিয়ে তল্লাশি ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। কর্মকর্তাদের মধ্যে হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমেও তথ্য আদান-প্রদান করা হচ্ছে।
হাইওয়ে পুলিশের কুমিল্লা রিজিয়নের সার্জেন্ট মো. সবুজ মিয়া বলেন, “নতুন এই প্রযুক্তির মাধ্যমে যানবাহনের কাগজপত্রের মেয়াদসহ বিভিন্ন তথ্য যাচাই করা সম্ভব হবে। ফলে মহাসড়কে আইন অমান্যকারী যানবাহন শনাক্ত করে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া সহজ হবে।”
তিনি আরও বলেন, “প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়লে মাঠপর্যায়ে পুলিশের কাজ আরও সহজ ও দ্রুত হবে। একই সঙ্গে মহাসড়কে চলাচলকারী যানবাহনের ওপর কার্যকর নজরদারি রাখা সম্ভব হবে।”
বিআরটিএর ডাটাবেজের সঙ্গে সমন্বয়
সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, এআই ক্যামেরা ব্যবস্থাকে বিআরটিএর ডাটাবেজের সঙ্গে সমন্বয় করে যানবাহনের কাগজপত্রের বৈধতা যাচাই করা সম্ভব হবে। কোনো গাড়ির কাগজপত্রের মেয়াদ শেষ হয়ে গেলে তা শনাক্ত করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মামলা প্রক্রিয়া শুরু হতে পারে। পরে গাড়ির মালিকের মোবাইল ফোনে এসএমএস ও নোটিশ পাঠানোর ব্যবস্থা থাকবে।
জানাযায়, ১৮ আগস্ট থেকে স্বয়ংক্রিয় মামলা কার্যক্রম চালু হলে মহাসড়কে আইনভঙ্গের ঘটনায় দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগ তৈরি হবে। এতে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি মামলা প্রক্রিয়াতেও স্বচ্ছতা ও গতি আসবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
অপরাধ দমনে কার্যকর ভূমিকা
হাইওয়ে পুলিশের কুমিল্লা রিজিয়নের পুলিশ সুপার মোহাম্মদ শাহিনুর আলম খান বলেন, “আধুনিক এই নজরদারি ব্যবস্থা পুলিশের কার্যক্রমকে আরও দ্রুত ও কার্যকর করবে। বিশেষ করে ডাকাতি, মাদক পরিবহন, চোরাচালান ও অন্যান্য মহাসড়ককেন্দ্রিক অপরাধ প্রতিরোধে এআই ক্যামেরা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখবে।”
তিনি বলেন, “প্রযুক্তির মাধ্যমে অপরাধ বা আইনভঙ্গের ঘটনা দ্রুত শনাক্ত করা গেলে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হবে। এতে মহাসড়কে নিরাপত্তা ও শৃঙ্খলা আরও জোরদার হবে।”
মহাসড়কে চলাচলকারী চালকরাও এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছেন। তাদের মতে, সার্বক্ষণিক প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি থাকলে বেপরোয়া গতি, অবৈধ পার্কিংসহ বিভিন্ন ধরনের আইনভঙ্গ কমবে। একই সঙ্গে মাদক কারবারি ও চোরাচালানকারীদের তৎপরতা নিয়ন্ত্রণ করাও সহজ হবে।
সংশ্লিষ্টদের আশা, এআই ক্যামেরা, সিসিটিভি ও পুলিশের সমন্বিত কার্যক্রমের মাধ্যমে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে অপরাধ ও আইনভঙ্গের ঘটনা উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব হবে। পর্যায়ক্রমে দেশের অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ মহাসড়কেও এ ধরনের প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি ব্যবস্থা সম্প্রসারণ করা হলে সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিতের পাশাপাশি মাদক ও চোরাচালান প্রতিরোধেও তা কার্যকর ভূমিকা রাখবে।
চালু হচ্ছে “অটো ফাইন সিস্টেম”
আমাদের সোনারগাঁ (নারায়ণগঞ্জ) সংবাদদাতা জানায় : দেশের মহাসড়কে যানবাহনের গতিবিধি পর্যবেক্ষণের জন্য প্রথমবারের মতো ব্যবহার করা হচ্ছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) নির্ভর অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ‘অটো ফাইন সিস্টেম’।
ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে এ প্রযুক্তি সবার আগে ব্যবহার করা হবে। আজ ১৮ আগস্ট থেকে হাইওয়ে পুলিশ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তিনির্ভর ‘অটো ফাইন সিস্টেম’ চালু করতে যাচ্ছে ।
গাজীপুর হাইওয়ে রিজিয়নের পুলিশ সুপার মুহাম্মদ রহমত উল্লাহ দৈনিক সংগ্রাম কে জানিয়েছেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কের মেঘনা টোল প্লাজা এলাকায় আজ মঙ্গলবার এই কার্যক্রম উদ্বোধন করবেন।
হাইওয়ে পুলিশ জানিয়েছে, সড়ক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা, মহাসড়কে ট্রাফিক শৃঙ্খলা জোরদার এবং ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনকারী যানবাহনের বিরুদ্ধে দ্রুত, স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর ব্যবস্থা নিতে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এই প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নির্ধারিত গতিসীমার বেশি গতিতে গাড়ি চালানো (ওভারস্পিড), অবৈধ পার্কিং, উল্টোপথে যানবাহন চালানোসহ বিভিন্ন ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের ঘটনা এআই ক্যামেরার মাধ্যমে শনাক্ত করা হবে।
আইন লঙ্ঘনের ঘটনা শনাক্ত হওয়ার পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংশ্লিষ্ট যানবাহনের নিবন্ধিত মালিকের মোবাইল ফোনে এসএমএসের মাধ্যমে মামলার তথ্য পাঠানো হবে।
মামলার তথ্য পাওয়ার পর নির্ধারিত পদ্ধতিতে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস—বিকাশ, নগদসহ অন্যান্য সেবার মাধ্যমে জরিমানার টাকা পরিশোধ করা যাবে।
প্রযুক্তিনির্ভর এ ব্যবস্থার ফলে মহাসড়কে ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের ঘটনা দ্রুত শনাক্ত করার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় তথ্য সংরক্ষণ এবং বিধি অনুযায়ী জরিমানা আদায়ের প্রক্রিয়া আরও দ্রুত, স্বচ্ছ ও নির্ভুল হবে।
এ ছাড়া মহাসড়কে ট্রাফিক আইন মেনে চলার বিষয়ে জনসচেতনতা বাড়ানো, যান চলাচলে শৃঙ্খলা প্রতিষ্ঠা এবং সড়ক দুর্ঘটনা কমাতেও এ ব্যবস্থা কার্যকর ভূমিকা রাখবে বলে আশা করছে হাইওয়ে পুলিশ।
হাইওয়ে পুলিশ এ বিষয়ে যাত্রী সাধারণ, পরিবহন মালিক ও শ্রমিক নেতৃবৃন্দসহ সংশ্লিষ্ট সব অংশীজনের সহযোগিতা চেয়েছে।