॥ সৈয়দ মাসুদ মোস্তফা ॥
রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ, লাগামহীন দুর্নীতি ও খেলাপি ঋণের কারণে ব্যাংকিং খাত এক নজিরবিহীন বিপর্যয় ও মূলধন সঙ্কটের মুখোমুখি হয়েছে। প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, দেশের ব্যাংক খাতে দুর্দশাগ্রস্ত বা খেলাপি ঋণের পরিমাণ ৬ লাখ ৭৫ হাজার কোটি টাকা ছাড়িয়েছে, যা দিয়ে একাধিক পদ্মা সেতু বা মেট্রোরেল নির্মাণ করা সম্ভব। অন্য বিশ্লেষণেও প্রায় ৬০ শতাংশ ঋণকে ঝুঁকিপূর্ণ বা বিপর্যস্ত হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। রেকর্ড পরিমাণ খেলাপি ঋণের কারণে অনেক ব্যাংক তীব্র তারল্য সঙ্কটে পড়েছে। একাধিক রাষ্ট্রমালিকানাধীন ও বেসরকারি ব্যাংক মিলে মূলধন ঘাটতির পরিমাণ দেড় লাখ কোটি টাকা ছাড়িয়েছে। নতুন বিনিয়োগের খরা এবং ব্যবসায়ীদের অনীহার কারণে বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি সর্বনি¤œ পর্যায়ে নেমে এসেছে। বিগত বছরগুলোতে রাজনৈতিক বিবেচনায় ও প্রভাবে বড় অঙ্কের ঋণ বিতরণ করা হয়েছিল, যার বিপরীতে পর্যাপ্ত জামানত বা সুশাসন ছিল না। দীর্ঘদিন আসল চিত্র গোপন রাখার পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পর ব্যাংক খাতের প্রকৃত ও ভয়াবহ চিত্র বেরিয়ে এসেছে। যা রীতিমত উদ্বেগজনক পর্যায়ে পৌঁছেছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন এমন এক সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে রয়েছে, যেখানে একদিকে বৈদেশিক মুদ্রার বাজারে স্বস্তির কিছু লক্ষণ দেখা যাচ্ছে, অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ অর্থনীতির প্রাণশক্তি ব্যাংকঋণ, বেসরকারি বিনিয়োগ, শিল্প সম্প্রসারণ ও কর্মসংস্থান বেশ দুর্বল। প্রবাসী আয়, কৃষি ও রফতানি বৈদেশিক খাতকে কিছুটা স্থিতি দিলেও ব্যাংকিং খাতের বিপুল খেলাপি ঋণ এবং বিনিয়োগের অনীহা অর্থনীতির ভবিষ্যৎ গতি নিয়ে বড় প্রশ্ন তৈরি করেছে। এমন বৈপরীত্যই বর্তমান অর্থনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য। বাইরে থেকে দেখলে রিজার্ভ বেড়েছে, রেমিট্যান্স রেকর্ড করেছে, রফতানি বাড়ছে এবং মূল্যস্ফীতিও আগের তুলনায় কিছুটা কমেছে। কিন্তু অর্থনীতিতে গতি সঞ্চার হচ্ছে না। নতুন কারখানা স্থাপন, যন্ত্রপাতি আমদানি, দীর্ঘমেয়াদি শিল্পঋণ, বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ প্রায় প্রতিটি সূচকেই সতর্ক সঙ্কেত।
মূলত, দেশের অর্থনৈতিক সঙ্কটের কেন্দ্রবিন্দুতে এখন ব্যাংকিং খাত। ২০২৪ সালের মার্চে মোট ঋণের ১১.১১ শতাংশ খেলাপি ছিল। ২০২৫ সালের জুনে তা ৩৪.৪০ শতাংশে উঠে যায় এবং পরবর্তী সময়ে সামান্য ওঠানামার পরও ৩২ শতাংশের ওপরে অবস্থান করে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অর্থনৈতিক সূচকে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বর শেষে খেলাপি ঋণ-এর অনুপাত ৩৫.৭৩ শতাংশ এবং ডিসেম্বর শেষে ৩০.৬০ শতাংশ দেখানো হলেও পরবর্তী মার্চে তা আবার ৩২.২৬ শতাংশে দাঁড়ায় বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বশেষ প্রতিবেদন অনুসারে। ফলে ব্যাংকের মূলধন দুর্বল হয়, নতুন ঋণ দেয়ার সক্ষমতা কমে এবং ঝুঁকি নিতে অনীহা তৈরি হয়। আরেকটি বড় সমস্যা হলো-খেলাপি ঋণ শুধু পুরনো ঋণের হিসাব নয়; এটি নতুন ঋণপ্রবাহকেও প্রভাবিত করে। ব্যাংক যখন আগের ঋণ আদায় করতে পারে না, তখন নতুন ঋণ দেয়ার ক্ষেত্রে আরো সতর্ক হয়ে ওঠে। এতে প্রকৃত উদ্যোক্তাও অর্থায়ন থেকে বঞ্চিত হন। ফলে উন্নয়ন ব্যহত হওয়ার শঙ্কা সৃষ্টি হয়।
আমাদের দেশের মতো শ্রমঘন অর্থনীতিতে এর প্রভাব আরো গুরুতর। কারণ নতুন কর্মসংস্থান মূলত বেসরকারি শিল্প, এসএমই, ব্যবসা ও সেবা খাতের মাধ্যমে তৈরি হয়। ব্যাংকঋণ না পেলে উদ্যোক্তা বিনিয়োগ করবেন না; বিনিয়োগ না হলে নতুন কর্মসংস্থানও তৈরি হবে না। অর্থাৎ ৪.৪৭ শতাংশ ঋণ প্রবৃদ্ধি শুধু ব্যাংকের পরিসংখ্যান নয় এটি ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থান, উৎপাদন ও মধ্যবিত্তের আয় বৃদ্ধির প্রশ্ন। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাম্প্রতিক উপাত্তেও এ দ্বৈত চিত্র স্পষ্ট। ব্যাংকটির নিয়মিত অর্থনৈতিক সূচকে ২০২৫-২৬ অর্থবছরে প্রবাসী আয় ৩৫.৫৯ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানোর তথ্য রয়েছে, যা আগের অর্থবছরের ৩০.৩৩ বিলিয়ন ডলারের তুলনায় ১৭.৩৪ শতাংশ বেশি। একই সময়ে আমদানিও বেড়েছে, তবে শিল্পের ভবিষ্যৎ সক্ষমতা তৈরির জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানিতে দুর্বলতা রয়ে গেছে।
বাংলাদেশের বৈদেশিক খাতে এখন সবচেয়ে বড় ভরসার নাম রেমিট্যান্স। ৩৫.৫৯ বিলিয়ন ডলারের প্রবাসী আয় নিঃসন্দেহে বড় সাফল্য। এটি বৈদেশিক মুদ্রার সরবরাহ বাড়িয়েছে, আমদানি পরিশোধের সক্ষমতা জোরদার করেছে এবং রিজার্ভের ওপর চাপ কমাতে সাহায্য করেছে। কিন্তু এখানে একটি মৌলিক প্রশ্ন রয়েছে- রেমিট্যান্সের অর্থনীতিতে প্রবাহ বাড়লেও তা কি উৎপাদনশীল বিনিয়োগে রূপান্তরিত হচ্ছে? উত্তরটি এখনো আশাব্যঞ্জক নয়।
প্রবাসী আয় মূলত পরিবারভিত্তিক ভোগ, আবাসন, শিক্ষা, চিকিৎসা ও দৈনন্দিন ব্যয়ে ব্যবহৃত হয়। ফলে রেমিট্যান্স বৈদেশিক মুদ্রার বাজারকে স্বস্তি দিলেও তার বড় অংশ যদি উৎপাদনশীল বিনিয়োগে না যায়, তাহলে এটি দীর্ঘমেয়াদি প্রবৃদ্ধির ইঞ্জিন হতে পারে না। বরং রেমিট্যান্স অর্থনীতির ওপর একটি ‘কুশন’ তৈরি করে যা সঙ্কটের অভিঘাত কমায়, কিন্তু অর্থনীতির কাঠামোগত দুর্বলতা দূর করে না। এই পার্থক্যটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একটি অর্থনীতি তখনই টেকসইভাবে শক্তিশালী হয়, যখন বৈদেশিক মুদ্রা আসে রফতানি, বিনিয়োগ, উৎপাদনশীল সেবা ও প্রতিযোগিতামূলক শিল্পের মাধ্যমে। শুধু শ্রম রফতানি থেকে পাওয়া অর্থ দিয়ে দীর্ঘমেয়াদে উচ্চ প্রবৃদ্ধি ধরে রাখা কঠিন। মোট রিজার্ভ ৩৬.৫০ বিলিয়ন ডলারে ওঠা ইতিবাচক।
উল্লেখ্য, রফতানি আয় ৪৩.৯৭ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছানো এবং ৭.৭৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি নিঃসন্দেহে ইতিবাচক। কিন্তু আমদানি ব্যয় ৬৪.৩৬ বিলিয়ন ডলার। ফলে বাণিজ্য ঘাটতি এখনো বড়। তবে আরো গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো কী আমদানি হচ্ছে? অর্থনীতির ভবিষ্যৎ উৎপাদন সক্ষমতার অন্যতম প্রধান সূচক হলো মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানি। কারখানায় নতুন মেশিন বসছে কি না, বিদ্যমান শিল্পে প্রযুক্তি আপগ্রেড হচ্ছে কি না, নতুন শিল্প স্থাপনের প্রস্তুতি হচ্ছে কি না এসবের ইঙ্গিত পাওয়া যায় এই খাতের এলসি খোলা ও নিষ্পত্তির মাধ্যমে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পরিসংখ্যানে ২০২৪-২৫ অর্থবছরে মূলধনী যন্ত্রপাতির এলসি নিষ্পত্তি ২৫.৪২ শতাংশ কমেছে। ব্যাংকটির মাসিক অর্থনৈতিক প্রতিবেদনে মূলধনী যন্ত্রপাতির এলসি নিষ্পত্তি ১.৯৮৫ বিলিয়ন ডলারে নেমে আসার তথ্য রয়েছে, আগের অর্থবছরে যা ছিল ২.৬৬২ বিলিয়ন ডলার। একটি শিল্পপ্রতিষ্ঠান যখন নতুন মেশিন আমদানি করে না, তখন তার অর্থ হতে পারে নতুন উৎপাদন লাইন স্থাপন হচ্ছে না, উৎপাদন ক্ষমতা বাড়ছে না কিংবা উদ্যোক্তা ভবিষ্যৎ চাহিদা ও নীতিগত পরিবেশ নিয়ে অনিশ্চিত। অন্য দিকে শিল্পের কাঁচামালের এলসি নিষ্পত্তি ৮.৩৭ শতাংশ বাড়ার অর্থ হলো বিদ্যমান শিল্পের একটি অংশ উৎপাদন চালিয়ে যাচ্ছে। অর্থনীতির সমস্যাটি তাই পুরোপুরি ‘উৎপাদন বন্ধ’ নয়; বরং ‘নতুন উৎপাদন সক্ষমতা তৈরি না হওয়া’।
একথা অস্বীকার করা যাবে না যে, মূল্যস্ফীতি ৯ শতাংশের ওপরে অবস্থানের পর জুলাইয়ে ৮.৩২ শতাংশে নামা কিছুটা স্বস্তির খবর। কিন্তু মূল্যস্ফীতি কমার অর্থ দাম কমে যাওয়া নয়; দাম বৃদ্ধির গতি কিছুটা হ্রাস। গত কয়েক বছরের উচ্চ মূল্যস্ফীতিতে খাদ্য, বাসাভাড়া, পরিবহন, শিক্ষা ও চিকিৎসার ব্যয় বেড়েছে। ফলে সাম্প্রতিক মূল্যস্ফীতি কমলেও পরিবারের প্রকৃত ক্রয়ক্ষমতা আগের অবস্থায় ফেরে নি। এখানে মজুরি ও মূল্যস্ফীতির সম্পর্কটি গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণ মানুষের আয় যদি মূল্যস্ফীতির তুলনায় দ্রুত না বাড়ে, তাহলে কাগজে মূল্যস্ফীতি কমলেও বাস্তবে জীবনযাত্রার চাপ কমে না। এ কারণেই সামষ্টিক অর্থনীতির স্থিতিশীলতার পাশাপাশি ‘বাস্তব আয়’কে অর্থনৈতিক নীতির কেন্দ্রে আনতে হবে। এনবিআরের রাজস্ব আয় ৩,৭০,৮৭৫ কোটি টাকার মতো হলেও প্রবৃদ্ধি মাত্র ২.২৩ শতাংশ- এই চিত্র অর্থনীতির আরেকটি মৌলিক দুর্বলতা প্রকাশ করে। রাজস্ব কম বাড়ার অর্থ শুধু সরকারের আয় কম হওয়া নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে বাজেট ঘাটতি, ঋণনির্ভরতা, উন্নয়ন ব্যয়ের সক্ষমতা এবং সামাজিক সুরক্ষায় সরকারের জায়গা সঙ্কুচিত হওয়ার ঝুঁকি। এনবিআরের প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী ২০২৫-২৬ অর্থবছরের রাজস্ব সংগ্রহের মাসভিত্তিক প্রতিবেদন নিয়মিত প্রকাশ করা হয়েছে; জুন ২০২৬ পর্যন্ত পূর্ণ অর্থবছরের সাময়িক হিসাবও ২০২৬ সালের আগস্টে প্রকাশিত হয়েছে।
মূলত, রাজস্ব কাঠামোর সবচেয়ে বড় সমস্যা হলো বাংলাদেশে কর-জিডিপি অনুপাত এখনো উন্নত অর্থনীতির তুলনায় অত্যন্ত কম। ফলে রাষ্ট্রকে একই সাথে অবকাঠামো, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, সামাজিক নিরাপত্তা এবং ঋণ পরিশোধের ব্যয় সামলাতে হয় সীমিত রাজস্ব দিয়ে। এ কঠিন পরিস্থিতিতে কৃষিখাত তুলনামূলকভাবে আশার জায়গা তৈরি করেছে। কৃষি ও পল্লীঋণ বিতরণ ৪২,৮৩৪ কোটি টাকায় পৌঁছে লক্ষ্যমাত্রার ১০৯.৮৩ শতাংশ বাস্তবায়ন এবং ১৪.৭৬ শতাংশ প্রবৃদ্ধি দেখিয়েছে। কৃষিঋণের আদায়ও বেড়েছে। এটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ কৃষি শুধু খাদ্যসরবরাহ নিশ্চিত করে না; এটি গ্রামীণ আয়, কর্মসংস্থান এবং খাদ্য মূল্যস্ফীতির ওপরও সরাসরি প্রভাব ফেলে। প্রকাশিত প্রাক্কলন অনুযায়ী ২০২৫-২৬ সালে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৪.১৪ শতাংশ এবং মাথাপিছু আয় ৩,০২০ মার্কিন ডলার হতে পারে। ৪.১৪ শতাংশ অবশ্যই ৩ শতাংশের কাছাকাছি প্রবৃদ্ধির তুলনায় উন্নতি। কিন্তু এটিকে অর্থনীতির পূর্ণ পুনরুদ্ধার বলা যাবে না। তাই এ জন্য প্রয়োজন ইতিবাচক ও কার্যকরী পদক্ষেপ।
সব সূচক একসাথে দেখলে একটি বিষয় পরিষ্কার হয় বাংলাদেশের অর্থনীতির সবচেয়ে বড় সঙ্কট এখন শুধু ডলার বা মূল্যস্ফীতি নয়; এটি আস্থার সঙ্কট। উদ্যোক্তা বিনিয়োগ করছেন না কারণ ভবিষ্যৎ চাহিদা নিয়ে অনিশ্চয়তা রয়েছে। ব্যাংকঋণ দিতে চাইছে না কারণ পুরনো ঋণ আদায় হচ্ছে না। ব্যাংকে টাকা থাকলেও বেসরকারি ঋণ বাড়ছে না। সরকারকে বেশি ঋণ নিতে হচ্ছে কারণ রাজস্ব বাড়ছে না। আর পরিবারগুলো সঞ্চয় ভেঙে ব্যয় সামলাচ্ছে। ফলে সার্বিক পরিস্থিতি কিছুটা হলেও নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে গেছে। যা অনাকাক্সিক্ষত ও অনভিপ্রেত।
এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য প্রথমত, ব্যাংকিং খাতে সংস্কারকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া সময়ের সবচেয়ে বড় দাবি। খেলাপি ঋণ পুনঃতফসিল করে সমস্যাকে আড়াল না করে প্রকৃত সম্পদের মান নির্ধারণ, দুর্বল ব্যাংকের পুনর্গঠন, প্রয়োজনীয় মূলধন সংস্থান এবং ইচ্ছাকৃত ঋণখেলাপিদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা জরুরি। এ ব্যাপারে বিদ্যমান আইনের যথাযথ প্রয়োগ এবং প্রয়োজনের নতুন আইন তৈরি করার আবশ্যকতাও অস্বীকার করার সুযোগ নেই। দ্বিতীয়ত, সরকারের ব্যাংকনির্ভর ঋণ গ্রহণের প্রবণতা নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। রাজস্ব সংস্কার ছাড়া এটি সম্ভব নয়। তাই রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর জন্য নিতে হবে ইতিবাচক ও সময়োযোগী পদক্ষেপ। তৃতীয়ত, মূলধনী যন্ত্রপাতি আমদানির পতনকে বিশেষ সতর্কসঙ্কেত হিসেবে দেখতে হবে। নতুন শিল্প, প্রযুক্তি আপগ্রেডেশন এবং রফতানি বৈচিত্র্যকরণে দ্রুত নীতি সহায়তা প্রয়োজন। চতুর্থত, রেমিট্যান্সকে শুধু ভোগের অর্থ না রেখে বিনিয়োগের অর্থে পরিণত করতে হবে। প্রবাসীদের জন্য বিনিয়োগ বন্ড, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তা তহবিল, নিরাপদ রিয়েল এস্টেট ও উৎপাদনশীল বিনিয়োগ প্ল্যাটফর্ম তৈরি করা যেতে পারে। পঞ্চমত, রাজস্ব প্রশাসনের ডিজিটালাইজেশন, করজাল সম্প্রসারণ এবং কর ফাঁকি বন্ধ করা ছাড়া রাষ্ট্রের আর্থিক সক্ষমতা বাড়বে না। সবশেষে, অর্থনৈতিক নীতিতে একটি মৌলিক পরিবর্তন প্রয়োজন, সঙ্কট সামলানোর নীতি থেকে উৎপাদনশীলতা বাড়ানোর নীতিতে যাওয়া।
বাংলাদেশের অর্থনীতির সামনে এখন এক অদ্ভুত দ্বৈত বাস্তবতা। রেমিট্যান্স শক্তিশালী, রফতানি বাড়ছে, রিজার্ভ কিছুটা ঘুরে দাঁড়িয়েছে এবং কৃষিখাতে স্থিতিশীলতা আসছে। কিন্তু একই সময়ে ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পাহাড়, বেসরকারি ঋণের স্থবিরতা, মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানির পতন, সঞ্চয়পত্রে নেতিবাচক বিক্রি এবং দুর্বল রাজস্ব প্রবৃদ্ধি অর্থনীতি গভীর উদ্বেগের সৃষ্টি করেছে।
উদ্ভূত পরিস্থিতিতে বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন ‘সঙ্কট থেকে বেরিয়ে এসেছে’-এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যাবে না। মূলত, বৈদেশিক মুদ্রার সঙ্কটের সবচেয়ে তীব্র পর্যায় কিছুটা সামলানো গেলেও অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ও বিনিয়োগের সঙ্কট এখনো কাটে নি। তাই এ বিষয়ে সরকারকে অতিসন্তর্পণেই এগুতে হবে।
টেকসই প্রবৃদ্ধি ফিরিয়ে আনতে হলে সবার আগে ব্যাংকিং খাতে ইতিবাচক সংস্কার দরকার। একই সাথে বিনিয়োগের আস্থা ফিরিয়ে আনা জরুরি। সর্বোপরি মূলধনী যন্ত্রপাতির আমদানি ও শিল্প সম্প্রসারণের গতি বাড়াতেও মনোযোগী হতে হবে। বস্তুত কোনো অর্থনীতি শুধু রিজার্ভ দিয়ে বাঁচে না; অর্থনীতি বাঁচে উৎপাদন, বিনিয়োগ, কর্মসংস্থান ও মানুষের আয় বাড়ার মধ্য দিয়ে। বাংলাদেশের পরবর্তী অর্থনৈতিক অধ্যায়ের সাফল্য নির্ভর করবে, দেশ রেমিট্যান্সনির্ভর স্থিতিশীলতা থেকে বিনিয়োগনির্ভর প্রবৃদ্ধিতে কত দ্রুত যেতে পারে, তার ওপর। সার্বিক দিক বিবেচনায় জাতীয় অর্থনীতিকে গতিশীল করা ও স্থিতিশীলতা ফিরে আনতে ব্যাংকিং খাত সংস্কার এখন সময়ের দাবি। অন্যথায় অর্থনীতির আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা করা সম্ভব হবে না।
www.syedmasud.com