চিকিৎসা সেবা পাওয়া মানুষের মৌলিক অধিকার এবং রাষ্ট্রকর্তৃক স্বীকৃত একটি বিষয়। কিন্তু দেশের সব মানুষের ভাগ্যে সেই সেবা সমানভাবে জোটে না; বিশেষ করে মরণব্যাধি ক্যানসার চিকিৎসার ক্ষেত্রে এই সংকট আজ চরম আকার ধারণ করেছে। দেশে প্রতিবছর প্রায় ২ লাখ নতুন রোগী শনাক্ত হলেও সে তুলনায় রোগীদের কাঙ্ক্ষিত সেবা নিশ্চিত করা সম্ভব হচ্ছে না। এর পেছনে অন্যতম প্রধান কারণ সময়মতো রোগ নির্ণয় না হওয়া ও আধুনিক যন্ত্রপাতির তীব্র সংকট। ফলে একদিকে যেমন রোগীরা যথাযথ সেবা থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন, অন্যদিকে বহু পরিবার এই রোগের চিকিৎসা ব্যয় মেটাতে গিয়ে সর্বস্বান্ত হয়ে পড়ছেন। মধ্যবিত্ত থেকে শুরু করে নিম্নবিত্ত-সব শ্রেণি-পেশার মানুষই চিকিৎসার খরচ জোগাতে জমিজমা ও ভিটেমাটি পর্যন্ত বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন। মধ্যবিত্তরা ধীরে ধীরে দরিদ্র হচ্ছেন এবং দরিদ্র পরিবারগুলো আরও বেশি নিঃস্ব হয়ে পড়ছেন। এই ভয়াবহ রোগে প্রতিনিয়ত রোগীর সংখ্যা ও মৃত্যুর সংখ্যা বাড়ছে। যদিও দেশের বেসরকারি হাসপাতালে রোবোটিক সার্জারি, টার্গেটেড থেরাপির মতো আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থা চালু রয়েছে। তবে এর লাগামহীন ব্যয় সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে। প্রাথমিক পর্যায়ে ক্যানসার রোগটি যদি শনাক্ত হয় তাহলে এ রোগ থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। কিন্তু অধিকাংশ রোগীর ক্ষেত্রে দেখা যায় রোগটি একেবারে শেষ পর্যায়ে গিয়ে ধরা পড়ে। ফলে যাদের পর্যাপ্ত অর্থবিত্ত আছে কেবল তারাই এই ব্যয়বহুল চিকিৎসা চালিয়ে যেতে পারেন। আর যাদের দিন আনতে পান্তা ফুরায়, তাদের কপালে প্রহর গোনা ছাড়া আর কিছুই থাকে না। এককথায়, অন্যান্য যে কোন রোগের চিকিৎসার তুলনায় ক্যানসারের চিকিৎসা ব্যয় আজ আকাশচুম্বী। এক পরিসংখ্যানে দেখা গেছে দেশের প্রায় ৮০ শতাংশ রোগীই আর্থিক সংকটের কারণে প্রয়োজনীয় চিকিৎসাটুকু করাতে পারেন না। বাংলাদেশ ক্যানসার সোসাইটির তথ্য অনুযায়ী, দেশে বর্তমানে ১৩ থেকে ১৫ লাখ ক্যানসার রোগী রয়েছেন এবং এর ভেতর প্রতিবছর প্রায় দেড় লাখ মানুষ ক্যান্সারে মৃত্যুবরণ করেন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচও) মানদণ্ড অনুযায়ী প্রতি ১০ লাখ মানুষের জন্য একটি সমন্বিত ক্যানসার চিকিৎসাকেন্দ্র থাকা প্রয়োজন হলেও আমাদের দেশে সে তুলনায় পর্যাপ্ত চিকিৎসা অবকাঠামো নেই। সম্প্রতি বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ম্যানেজমেন্টে-বাংলাদেশ অ্যাক্রোডিটেশন বোর্ড (বিএবি) আয়োজিত এক নীতি নিধারণী সেমিনারে প্রধান অতিথি বক্তব্যে স্বাস্থ্য প্রতিমন্ত্রী ড. এ মহিত দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার নানামুখী চ্যালেঞ্জের কথা স্বীকার করে বলেন বর্তমান সরকার দায়িত্ব নেয়ার পর থেকেই হাসপাতাল ও ক্লিনিকগুলোর মান নিয়ন্ত্রণে নিয়মিত তদারকি চালানো হচ্ছে। তবে তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, শুধু হাসপাতাল বা চিকিৎসকের ওপর নির্ভর করে স্বাস্থ্যখাত এগিয়ে নেয়া সম্ভব নয়। খাদ্যে ভেজাল প্রতিরোধ, সঠিক সময়ে রোগ নির্ণয় এবং প্রতিরোধমূলক স্বাস্থ্যসেবার দিকে বিশেষ নজর না দিলে ক্যানসার, কিডনি কিংবা লিভারের মতো প্রাণঘাতী রোগগুলো কমানো প্রায় অসম্ভব।

বাংলাদেশের চিকিৎসা খাতের প্রকৃত চিত্রটি কভিড-১৯ মহামারি চলাকালীন অত্যন্ত স্পষ্টভাবে উন্মোচিত হয়েছিল। ধারণা করা হয়েছিল, মহামারির এই তিক্ত অভিজ্ঞতার পর দেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থার দৃশ্যমান উন্নয়ন ঘটবে। কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, করোনা-পরবর্তী সময়ে দেশের চিকিৎসাসেবার সার্বিক মান আশানুরূপ বাড়েনি। দেশে দিন দিন হাসপাতাল, ডায়াগনস্টিক সেন্টার এবং চিকিৎসকের সংখ্যা বাড়লেও আনুপাতিক হারে বাড়েনি ক্যানসার চিকিৎসার অত্যাধুনিক মেশিন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার গাইডলাইন অনুসারে প্রতি ১০ লাখ মানুষের জন্য অন্তত একটি ক্যানসার চিকিৎসাকেন্দ্র বা রেডিওথেরাপির মেশিন (লিনিয়ার এক্সিলারেটর) থাকা প্রয়োজন। সে হিসাবে দেশের ১৮ কোটি মানুষের জন্য প্রায় ১৮০ থেকে ২০০টি মেশিনের প্রয়োজন হলেও সরকারি ও বেসরকারি মিলে বর্তমানে কার্যকর মেশিন রয়েছে মাত্র ২০টির কাছাকাছি। কিন্তু অধিকাংশ মেশিনই সবসময় সচল থাকে না। রাজধানীর মহাখালীতে অবস্থিত জাতীয় ক্যানসার গবেষণা ইনস্টিটিউট ও হাসপাতাল (NICRH) এ দেশের ক্যানসার চিকিৎসার একমাত্র প্রধান সরকারি হাসপাতাল। ৫০ শয্যা নিয়ে যাত্রা শুরু করা এই প্রতিষ্ঠানটি বর্তমানে ৫০০ শয্যায় উন্নীত হলেও বিশাল জনসংখ্যার তুলনায় তা অত্যন্ত অপ্রতুল। মাত্র ১০ টাকার টিকিটে উন্নত চিকিৎসার আশায় দেশের প্রত্যান্ত প্রান্তর থেকে রোগীরা হাজারো ঝক্কি ঝামেলা সহ্য করে এখানে ছুটে আসেন। কিন্তু আসার পর কাঙ্খিত সেবা পেতে দীর্ঘ মাস অপেক্ষা করতে হয়। কেমোথেরাপি বা রেডিওথেরাপির সিরিয়াল পাওয়া যেন সোনার হরিণ। ফলে অনেকে বাধ্য হয়ে বেসরকারি হাসপাতালের স্মরণাপন্ন হন।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশ এই রোগের চিকিৎসা ব্যয় কমাতে এবং সাধারণ মানুষের নাগালে নিয়ে আসতে নানা কার্যকর কৌশল ও পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। যেমন- ভারত ও তুরস্ক স্থানীয়ভাবে সাশ্রয়ী মূল্যে জেনেরিক ওষুধ (যেসব ওষুধের পেটেন্ট মেয়াদ শেষ হয়েছে) তৈরির মাধ্যমে চিকিৎসা ব্যয় বহুলাংশে কমিয়ে এনেছে। এর ফলে পশ্চিমা দেশগুলোর তুলনায় অনেক কম খরচে কেমোথেরাপি বা টার্গেটেড থেরাপি দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্রসহ উন্নত দেশগুলোর কিছু স্বাস্থ্যবীমা প্রতিষ্ঠান ভ্যালুভিত্তিক প্রাইসিং চালু করেছে। অর্থাৎ ওষুধ বা থেরাপি কতটা কার্যকর হচ্ছে তার ওপর ভিত্তি করে দাম পরিশোধ করা হয় এবং কাজ না করলে প্রস্তুতকারক কোম্পানিকে পুরো মূল্য ফেরত দিতে হয়। এছাড়া অনেক দেশ প্রাখমিক পর্যায়ে রোগ শনাক্তকরণের জন্য জাতীয় স্ক্রিনিং কর্মসূচি (যেমন স্তন ও জরায়ুমুখের ক্যানসার স্ক্রিনিং) জোরদার করেছে যা সামগ্রিক চিকিৎসা ব্যয় অনেকাংশে কমিয়ে দেয়। আমাদের দেশেও আন্তর্জাতিক এসব মডেল অনুসরণ করার পাশপাশি কিছু সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। যেমন-ক্যানসার চিকিৎসার ওষুধের ওপর থেকে ভ্যাট ও শুল্ক মওকুফ করা, দেশের প্রতিটি সরকারি হাসপাতালে আধুনিক রেডিওথেরাপি ও ডায়াগনস্টিক সুবিধা নিশ্চিত করা এবং দরিদ্র রোগীদের জন্য বিশেষ স্বাস্থ্যবীমা ও সহায়তা তহবিল চালু করা। পাশাপাশি সামাজিকভাবে বিত্তবান ব্যক্তি, করপোরেট প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতা (CSR) তহবিলের মাধ্যমে এবং বিভিন্ন এনজিও বা দাতব্য সংস্থাকে ক্যানসার হাসপাতাল গড়ে তোলার ব্যাপারে উদ্যোগী করে তোলা, গরিব রোগীদের ওষুধ ক্রয়ে আর্থিক সহযোগিতার জন্য বিত্তবানদের উদ্বুদ্ধ করা। সারাদেশে জেলা ও থানাভিত্তিক ক্যানসার রোগীদের একটি সুনির্দিষ্ট ডাটাবেজ তৈরি করা। এই ডাটাবেজের মাধ্যমে রোগীদের অর্থনৈতিক সক্ষমতা অনুযায়ী শ্রেণিভেদ করা সম্ভব। যারা মোটামুটি স্বচ্ছল কিন্তু ক্যানসার চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে গিয়ে সর্বস্বান্ত হয়েছেন, তাদের জন্য রাষ্ট্রীয়ভাবে করজে হাসানা (সুদমুক্ত ঋণ) এর ব্যবস্থা করা। একেবারে সামর্থ্য নেই এমন রোগীদের চিকিৎসা ব্যয় রাষ্ট্রীয় তহবিল থেকে প্রদান করা।

ক্যানসার চিকিৎসার এই বিশাল ব্যয় একা সরকারের পক্ষে বহন করা হয়তো সম্ভব নয়, তাই এই ক্ষেত্রে সামষ্টিক উদ্যোগ ও সবার অংশগ্রহণ প্রয়োজন। তবে মূল কাজটি সরকারকে নেতৃত্ব দিয়ে করতে হবে। সরকার চাইলে দেশের উপজেলাভিত্তিক ক্যানসার রোগীদের জন্য একটি নির্দিষ্ট ডাটাবেজ তৈরি করে থানাভিত্তিক রোগীর সংখ্যা ও সম্ভাব্য চিকিৎসা ব্যয়ের বাজেট নিরূপণ করতে পারে। বাজেট করার পর অর্থ কিভাবে সংগ্রহ করা হবে সে ব্যাপারে চিন্তাভাবনা করে অর্থ সংগ্রহ করা। এই অর্থ সংগ্রহ করার জন্য সরকার সংশ্লিষ্ট এলাকায় যারা ধনাঢ্য হিসেবে বসবাস করেন তাদের তালিকা প্রস্তুত করে তাদের কাছ থেকে একটি অর্থ আদায় করার ব্যবস্থা গ্রহণ করা। এটা সরাসরি প্রধানমন্ত্রীর তত্ত্বাবধান করবেন। প্রধানমন্ত্রী দেশের স্বার্থে সহযোগীতার হাত প্রসারিত করার জন্য নাগরিকদের উদ্বুদ্ধ করতে পারেন। এক্ষেতে সরকারের পক্ষ থেকেও দাতাদের জন্য বিশেষ কর সুবিধা বা রেয়াত (Tax Rebate) এর ব্যবস্থা করা যেতে পারে।

তারপর ওই এলাকায় যত সরকারি, আধাসরকারি চাকরিজীবী আছেন তাদের কাছ থেকে চাহিদা অনুসারে ১ দিনের বেতন কর্তন করে রাখা যেতে পারে। পাশাপাশি যারা মোবাইল ফোন ব্যবহার করেন সকলের কাছ থেকে প্রতি ৬ মাসে একবার ১০০ টাকা কর্তন করে রাখা যেতে পারে। ওই এলাকায় যত বাজার আছে সকল বাজারের দোকান থেকে এককালীন একটি অর্থ আদায় করা যেতে পারে। যারা ব্যাংকে লেনদেন করেন তাদের কাছ থেকেও এককালীন একটি অর্থ কেটে রাখা যেতে পারে। যারা সহযোগীতার হাত প্রসারিত করবেন তাদের অবদানের কথা ডাটাবেজে সংরক্ষণের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। ভবিষ্যতে যদি ওই পরিবার থেকে কেউ অসুস্থ হন তাহলে তাদেরকেও এভাবে সহযোগীতা প্রদান করা হবে। সর্বোপরি স্থানীয় উপজেলা প্রতিনিধি ও উপজেলা সরকারি কর্মকর্তা, উপজেলা মসজিদের খতিব, উপজেলা মাধ্যমিক উচ্চবিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের সমন্বয়ে একটি কমিটি গঠন করা যেতে পারে। যারা স্বচ্ছতার সাথে ক্যানসার ফান্ডের হিসাব-নিকাশ রাখবেন। তারা প্রতি তিন মাস অন্তর অন্তর তা জনসম্মুখে আয় ব্যয় প্রকাশ করবেন এবং অসুস্থ রোগী কাদের কাদের ডোনেশন প্রদান করা হয়েছে তার সঠিক হিসাব পেশ করবেন প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে। কেউ দুর্নীতির সাথে জড়িয়ে পড়লে তাৎক্ষণিক শাস্তির ব্যবস্থা স্থানীয় প্রশাসন গ্রহণ করবেন। এমন একটি সুপরিকল্পিত ও সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা বাস্তবায়ন করা গেলে সাধারণ মানুষ ক্যানসারসহ অন্যান্য জটিল রোগের চিকিৎসা ব্যয়ের চরম আর্থিক চাপ থেকে রক্ষা পেতে পারে। বিষয়টি সংশ্লিষ্ট নীতিনির্ধারক ও কর্তৃপক্ষ গুরুত্বের সাথে বিবেচনা করবেন- এমনটিই দেশবাসীর প্রত্যাশা।