মাহবুবুল হক
শিক্ষা হলো মূলত জ্ঞান অর্জনের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। একটু সহজ করে বললে বলতে হয়, আমরা যদি রাজধানী ঢাকায় যেতে চাই, তাহলে কোন মাধ্যমে যাব? উড়োজাহাজে? হেলিকপ্টারে? ট্রেনে? বাসে? না প্রাইভেট কারে? কালে কালে যুগে যুগে বহুভাবে বহু ভঙ্গিমায় বলা হয়ে আসছে যে, ‘এডুকেশন ইজ এ কী টু সোসিও ইকোনমিক প্রগ্রেস’ আরো বলা হয়ে আসছে যে, ‘এডুকেশন ইজ এ হারমোনিয়াস ডেভেলপমেন্ট অব বডি, মাইন্ড এন্ড সোল। এসব কথা এখন আর বিক্রি হয় না। এসব অনেক যুগের অনেকটা বস্তাপঁচা কথা। এসব আর কেউ এখন খায় না। এসব হলো ব্যক্তিনির্ভর বা সমাজনির্ভর খুব সংক্ষিপ্ত মননের এবং সংক্ষিপ্ত এলাকার কথা। একবিংশ শতাব্দীতে বসবাস করে এসব কথা নিয়ে চিৎকার করে নিজেদেরকে শুধু ছোট করতে হয়। এসব ছোট মাপের কথা ছোট দিগন্তের কথা। যুগ জামানা অনেক দূর এগিয়ে গিয়েছে। ব্যক্তি পরিবার সমাজ দেশ জাতি রাষ্ট্র সবকিছুকে ছাড়িয়ে জ্ঞান ও শিক্ষার বিষয়টি এখন বহুমাত্রিক অবস্থানে পৌঁছে গেছে। ব্যক্তি বড় না পরিবার বড় পরিবার বড় না সমাজ বড় সমাজ বড় না দেশ বড় দেশ বড় না জাতি বড় জাতি বড় না রাষ্ট্র বড় রাষ্ট্র বড় না আন্তরাষ্ট্র বড় আন্তরাষ্ট্র বড় না আঞ্চলিক অবস্থান বড়? এসবের বাইরে রয়েছে বিশ্ব বড় না বিশ্বায়ন বড়?
মূল কথা হলো, ব্যক্তি থেকে শুধু বিশ্ব নয়, সমস্ত সৃষ্টিকে নিয়েই জ্ঞান ও শিক্ষার চক্রবাক। জ্ঞান হলো একটি টেকসই সভ্যতার মূল ভিত্তি। কিন্তু একবিংশ শতাব্দীর চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের এ যুগে আমাদের বিদ্যমান জ্ঞান ও তার বাহন শিক্ষা ব্যবস্থা এক গভীর সংকটের মুখোমুখি। আমরা আসলে বুঝেও না বুঝার ভান করছি। আমরা সবাইকে নিয়ে একভাবে চিন্তা করছি না। আমরা সৃষ্টির কল্যাণ ও মঙ্গলের চিন্তায় মগ্ন না। আমরা তথাকথিত সভ্যতা ও সংস্কৃতির চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছে গিয়ে এখন শুধু ভাবছি, সবাইকে নিয়ে চলার দরকার কি? চললাম তো আমরা অনেকটা কাল! অনেকটা সময়! লাভ তো কিছু হলো না! এককালের ব্রিটিশদের যে জ্ঞান ও তার বাহন শিক্ষা! যে জ্ঞান ও শিক্ষাকে সামনে নিয়ে তারা সারা পৃথিবী শাসন করেছিল, মাঝে কিছুটা ব্যত্যয় ঘটেছিল! সে জ্ঞান ও শিক্ষাই এখন পুনরায় সৃষ্টিকে ধ্বংস করতে উদ্যত হয়েছে! অর্থাৎ ডিভাইড অ্যান্ড রুল। ভাগ করো। বিভক্ত করো। বিভাজন করো। সেগ্রিগেট করো। বাইফার্কেট করো এবং আরামসে শোষণ করো। শাসন করো। আশেপাশের সবাইকে ধ্বংস করো এবং শুধু নিজের জন্য বেঁচে থাকো। যুক্তরাষ্ট্র ও ইজরাইল গত প্রায় একশো বছর ধরে এটাই তো করছে। কেউ কি তাদের থামাতে পারছে? ওরা একদিকে লক্ষ লক্ষ শিশুকে বোমার আঘাতে নিশ্চিহ্ন করছে! অপরদিকে শিশুদেরকে নিয়ে বিকৃত যৌনাচার উচ্চকিত করছে এবং জ্যান্ত শিশুদেরকে হত্যা করে তাদের রক্ত মাংস দিয়ে সুপেয় স্্ুযপ বানিয়ে আনন্দ উল্লাস করছে।
অন্যদিকে আমাদের মত ক্ষুদ্র ও অধীন রাষ্ট্রগুলো যে শিক্ষা ব্যবস্থা শিক্ষার্থীদের উপহার দিচ্ছে, তা কেবল তথ্যের আধার হিসেবে গড়ে তোলে, কিন্তু স্বাধীন চিন্তাশক্তি, নৈতিকতা এবং বাস্তব জীবনের উপযোগী দক্ষতা অর্জনে ব্যর্থ হয়, তা মূলত একটি গতিহীন কাঠামো মাত্র। একটি যুগোপযোগী ও মেধাভিত্তিক সমাজ ও রাষ্ট্র গঠনের জন্য আমাদের সমগ্র শিক্ষাব্যবস্থায় আমূল সংস্কার জরুরি হয়ে পড়েছে। জ্ঞানের বাহন শিক্ষাসংস্কার কেবল কারিকুলাম বা পাঠ্যবই পরিবর্তনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকতে পারে না। এটি একটি বহুমুখী ও ধারাবাহিক প্রক্রিয়া, যার সঙ্গে জড়িত শিক্ষক, শিক্ষার্থী, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অবকাঠামো, মূল্যায়ন পদ্ধতি এবং জাতীয় নীতি। বিদ্যমান শিক্ষার সংকট ও সংস্কারের প্রয়োজনীয়তা তাই অতি জরুরী।
আমাদের বর্তমান শিক্ষাব্যবস্থার প্রধান দুর্বলতা হলো এটি অতিরিক্ত মাত্রায় মুখস্থনির্ভর এবং পরীক্ষাকেন্দ্রিক। শ্রেণি কক্ষে পাঠদানের মূল লক্ষ্য হয়ে দাঁড়িয়েছে জিপিএ-৫ অর্জন করা, জ্ঞান অর্জন নয়। ফলে একজন শিক্ষার্থী উচ্চ জিপিএ নিয়ে শিক্ষা শেষ করলেও বাস্তব জীবনে ও কর্মক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় সমস্যা সমাধানের দক্ষতা (Problem-solvingskills), সমালোচনামূলক চিন্তা (Critical
thinking), কিংবা যোগাযোগ দক্ষতা অর্জন করতে পারছে না। এর পাশাপাশি রয়েছে শিক্ষা ব্যবস্থায় চরম বৈষম্য। শহর ও গ্রামীণ শিক্ষার মধ্যে সুযোগ-সুবিধার বিপুল ফারাক রয়েছে। সুবিধাবঞ্চিত শ্রেণীর জন্য মানসম্মত শিক্ষার সুবাতাস পৌঁছানো এখনও একটি বড় চ্যালেঞ্জ। এছাড়াও আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে শিল্প ও কর্মক্ষেত্রের (IndustryAcademia Gap) কোনো শক্তিশালী সংযোগ নেই। ফলে প্রতিবছর লাখ লাখ ডিগ্রিধারী তৈরি হলেও দেশে বেকারত্বের হার বেড়েই চলেছে।
প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষায় রূপান্তর : একটি দালানের স্থায়িত্ব যেমন নির্ভর করে তার ভিতের ওপর, তেমনি জাতীয় শিক্ষার গুণগত মান নির্ভর করে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষার কাঠামোর ওপর। শিক্ষাকেন্দ্রিক পাঠ্যক্রমের পরিবর্তে শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক শিক্ষা: প্রাথমিক স্তরে শিশুদের ওপর অতিরিক্ত পাঠ্যবই ও পরীক্ষার চাপ কমানো দরকার। আনন্দের মাধ্যমে শেখা (Joyful Learning) এবং কার্যভিত্তিক (Activity-based) শিক্ষার ওপর জোর দিতে হবে।
পরীক্ষা পদ্ধতির সংস্কার: মুখস্থনির্ভর বার্ষিক পরীক্ষা পদ্ধতির পরিবর্তে ধারাবাহিক মূল্যায়ন (Continuous Assessment) ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে। এতে শিক্ষার্থীর সারা বছরের পারফরম্যান্স ও সৃজনশীলতার প্রতিফলন ঘটবে।
মৌলিক দক্ষতার ওপর জোর: প্রাথমিক স্তরেই মাতৃভাষায় দক্ষতা, গাণিতিক প্রাথমিক ধারণা এবং জীবনমুখী নৈতিক শিক্ষার মূল ভিত্তি গড়ে তুলতে হবে।
শিক্ষকতার মানোন্নয়ন ও শিক্ষকদের ক্ষমতায়ন: শিক্ষা সংস্কারের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে হবে শিক্ষককে। পৃথিবীর কোনো শিক্ষাব্যবস্থাই তার শিক্ষকদের মানকে ছাড়িয়ে যেতে পারে না।
মর্যাদা ও উপযুক্ত বেতন কাঠামোর নিশ্চয়তা: মেধাবীদের শিক্ষকতা পেশায় আকৃষ্ট করতে হলে এই পেশার সামাজিক ও আর্থিক মর্যাদা বৃদ্ধি করতে হবে। আকর্ষণীয় বেতন স্কেল ও পদোন্নতির সুনির্দিষ্ট সুযোগ না থাকলে যোগ্য ব্যক্তিরা এ পেশায় আসবে না।
পেশাগত প্রশিক্ষণ ও মূল্যায়ন: শিক্ষকদের জন্য আধুনিক শিক্ষণপদ্ধতি, প্রযুক্তি ব্যবহার এবং শিশু মনস্তত্ত্বের ওপর নিয়মিত মানসম্মত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করতে হবে। কেবল শিক্ষক নিয়োগ দিলেই চলবে না, তাদের পারফরম্যান্স মূল্যায়নের জন্য একটি স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূল ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।
কারিগরি ও প্রযুক্তিভিত্তিক শিক্ষার বিস্তার : আমাদের শিক্ষাব্যবস্থা মূলত সাধারণ শিক্ষাকেন্দ্রিক, যা সবাইকে সরকারি বা বেসরকারি ডেস্ক জবের দিকে ঠেলে দেয়। কিন্তু উন্নত বিশ্বের অভিজ্ঞতা বলে, টেকসই অর্থনীতির মূল ভিত্তি হলো কারিগরি ও প্রযুক্তিগত শিক্ষা।
কারিগরি শিক্ষাকে মূলধারায় আনয়ন: ষষ্ঠ বা অষ্টম শ্রেণী থেকেই প্রতিটি শিক্ষার্থীকে ন্যূনতম একটি কারিগরি বা আইটি দক্ষতার সাথে পরিচিত করা বাধ্যতামূলক করা উচিত। কারিগরি শিক্ষাকে সামাজিকভাবে নিচু চোখে দেখার মানসিকতা বদলাতে হবে।
প্রযুক্তি ও এআই (AI)-এর সঠিক ব্যবহার: ডিজিটাল সাক্ষরতা (Digital Literacy) এখন আর বিলাসিতা নয়, এটি মৌলিক অধিকার। প্রাথমিক স্তর থেকেই তথ্যপ্রযুক্তি এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার ইতিবাচক ব্যবহার শেখানো প্রয়োজন, যাতে শিক্ষার্থীরা ডিজিটাল যুগের উপযোগী নাগরিক হতে পারে।
উচ্চশিক্ষা ও গবেষণাকেন্দ্রিক বিশ্ববিদ্যালয়: আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলো মূলত ডিগ্রী প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছে, যেখানে মৌলিক গবেষণা ও নতুন জ্ঞান সৃষ্টির সুযোগ অত্যন্ত সীমিত। গবেষণা ও উন্নয়নে জাতীয় বাজেটে বরাদ্দ অত্যন্ত কম। জিডিপির সুনির্দিষ্ট অংশ গবেষণায় বরাদ্দ করা এবং শিল্পক্ষেত্রের অর্থায়ন নিশ্চিত করা। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন দলীয় রাজনীতি ও প্রশাসনিক আমলাতন্ত্র বিশ্ববিদ্যালয়কে শতভাগ স্বায়ত্তশাসিত করা এবং মেধার ভিত্তিতে উপাচার্য ও শিক্ষক নিয়োগ।
কারিকুলাম সেকেলে ও তাত্ত্বিক: ২-৩ বছর পর পর ইন্ডাস্ট্রির চাহিদার সাথে মিলিয়ে পাঠ্যক্রম আধুনিকীকরণ। বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে জ্ঞান সৃষ্টির কেন্দ্রে পরিণত করতে হবে। শিল্প প্রতিষ্ঠানের চাহিদা অনুযায়ী কোর্স ও সিলেবাস তৈরি করতে হবে, যাতে স্নাতক শেষ করেই শিক্ষার্থীরা সরাসরি কর্মক্ষেত্রে প্রবেশ করতে পারে।
সমতা, বৈষম্যহীনতা ও অন্তর্ভুক্তিমূলক শিক্ষা: শিক্ষা হতে হবে সর্বজনীন। একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠী বা শ্রেণীর জন্য মানসম্মত শিক্ষা আর বাকিদের জন্য দুর্বল শিক্ষা ব্যবস্থা কখনোই একটি সুষম সমাজ বা রাষ্ট্র তৈরি করতে পারে না।
বাজেট বরাদ্দ বৃদ্ধি: শিক্ষায় জিডিপির অন্তত ৪ থেকে ৬ শতাংশ অথবা মোট বাজেটের ১৫-২০ শতাংশ বরাদ্দ করা অপরিহার্য। এই বাজেটের একটি বড় অংশ খরচ হতে হবে গ্রামীণ অবকাঠামো উন্নত করা এবং ঝরেপড়া শিক্ষার্থীদের ধরে রাখার কাজে।
আর্থ-সামাজিক সুরক্ষা: সুবিধাবঞ্চিত, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী এবং বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের জন্য শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বিশেষ সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। সরকারি প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্কুলগুলোর মান এমন পর্যায়ে উন্নীত করতে হবে যেন ধনী-দরিদ্র নির্বিশেষে সবাই একই মানের শিক্ষা পায়।
সুশাসন ও রাজনীতিমুক্ত শিক্ষাঙ্গন: শিক্ষাঙ্গনে দলীয় রাজনীতির অপ্রয়োজনীয় প্রভাব শিক্ষার পরিবেশকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করে। শিক্ষক নিয়োগ থেকে শুরু করে শিক্ষার্থীবছর, ভর্তি পরীক্ষা ও হল দখল,সব জায়গাতেই দুর্নীতির ছাপ দেখা যায়। শিক্ষা সংস্কার সফল করতে হলে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোকে সব ধরনের নেতিবাচক দলীয় রাজনীতি ও লেজুড়বৃত্তি থেকে মুক্ত করতে হবে। মেধা ও যোগ্যতাই হবে শিক্ষক নিয়োগ ও শিক্ষার্থী মূল্যায়নের একমাত্র মাপকাঠি। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সুস্থ গণতান্ত্রিক চর্চা ও ছাত্র সংসদ নির্বাচনের মাধ্যমে নেতৃত্ব বিকাশের সুযোগ রাখা উচিত, কিন্তু তা যেন শিক্ষা প্রক্রিয়ার স্বাভাবিক গতিকে ব্যাহত না করে।
শিক্ষা সংস্কার বাস্তবায়নে মূল পদক্ষেপসমূহ
১. জাতীয় শিক্ষা কমিশন গঠন: রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত একটি স্বাধীন ও স্থায়ী শিক্ষাবিদদের কমিশন গঠন করা, যারা ধারাবাহিক শিক্ষা নীতি প্রণয়ন ও তদারকি করবেন।
২. গুণগত মূল্যায়নের সংস্কৃতি: গ্রেডিং ব্যবস্থার মেকি প্রতিযোগিতা থেকে বের হয়ে এসে যোগ্যতাভিত্তিক মূল্যায়ন চালু করা।
৩. ইন্ডাস্ট্রি-একাডেমিয়া কোলাবোরেশন: তৈরি পোশাক, আইটি, কৃষি ও প্রকৌশল শিল্পের সাথে উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিয়মিত সমন্বয় সভা ও ইন্টার্নশিপ বাধ্যতামূলক করা।
৪. অবকাঠামোগত উন্নয়ন: প্রতিটি স্কুলে ডিজিটাল ক্লাসরুম, ল্যাবরেটরি, লাইব্রেরি ও সুপেয় পানির ব্যবস্থা করা।
একটি জাতির ভবিষ্যৎ নির্ধারিত হয় তার শ্রেণীকক্ষে। আমরা যদি তরুণ প্রজন্মকে কেবল সার্টিফিকেটধারী বেকার হিসেবে গড়ে তুলতে না চাই, তবে শিক্ষা সংস্কারকে জাতীয় অগ্রাধিকার হিসেবে গ্রহণ করতে হবে। সংস্কার কেবল কাগজে-কলমে নীতিমালা তৈরি নয়, বরং এর সঠিক ও ধাপে ধাপে বাস্তবায়নই আসল চ্যালেঞ্জ। রাজনৈতিক সদিচ্ছা, পর্যাপ্ত অর্থায়ন এবং সর্বস্তরের মানুষের ইতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গিই পারে আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে এক নতুন আলোয় আলোকিত করতে। একটি সমৃদ্ধ ও সমতাভিত্তিক বাংলাদেশ গড়ার যাত্রা শুরু হতে হবে শিক্ষা সংস্কারের পথ ধরেই। শিক্ষা তো মূল উদ্দেশ্য নয়। জ্ঞান অর্জন করাই হলো মূল উদ্দেশ্য। আমরা জ্ঞান অর্জন করার চেয়ে শিক্ষা নিয়ে অর্থাৎ পদ্ধতি নিয়ে বেশি ভাবছি এবং জটিলতার মধ্যে জড়িয়ে পড়ছি। আমরা শুধু অপরকে নকল করার চেষ্টা করছি। অন্যরা যেটা পরিত্যাগ করছে, বাতিল করছে, আমরা অর্থকষ্টের কারণে সে বাতিলকৃত শিক্ষা কাঠামো নতুন করে আঁকড়ে ধরার প্রচেষ্টা অব্যাহত রেখেছি। আমরা নিজেরা এভাবে একটা সান্তনার গণ্ডি তৈরি করেছি যে এসব তো অনেক বড় বড় সভ্যতা ও সংস্কৃতির বিষয়। উন্নত দেশ যা করতে পারবে আমরা তো তা করতে পারবো না। আমরা তো অনুন্নত দেশ। উন্নয়নশীল দেশ। গরিব দেশ। আমাদেরকে উন্নত দেশের পিছু পিছু চলতে হবে। আগ বাড়িয়ে সামনে চলা যাবে না। আমরা তো বাস্তব ক্ষেত্রে তা পারবো না। একটা বড় ধরনের হীনম্মন্যতায় আমরা ভুগছি। এ হীনম্মন্যতা দূর করতে না পারলে আমরা আমাদের শিক্ষা ব্যবস্থাকে যুগোপযোগী ও উন্নত করতে পারবো না। গোড়ায় আমাদের বড় ধরনের গলদ রয়েছে। এসব গলদ কোন অবস্থাতেই ছোট নয়। অনেক বড়। এ গলদগুলো অবশ্যই আগে আমাদেরকে দূর করতে হবে। আমাদেরকে ভাবতে হবে আমরা গরীব হলেও ছোট নই।
আমাদের সভ্যতা ও সংস্কৃতি ছোট নয়। বরঞ্চ সভ্যতা ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রে পাশ্চাত্যের তুলনায় মধ্যযুগে আমরাই অনেক বড় ছিলাম। আমরাই অনেক উন্নত ছিলাম। আমাদের কাছ থেকেই পাশ্চাত্য জগত, অর্থাৎ তথাকথিত সভ্যতা ও সংস্কৃতির জগত সবকিছু শিখেছে। জেনেছে। এখন তারা বিশ্বজগতকে বোঝাচ্ছে তারা শ্রেষ্ঠ তারা উন্নত। কিন্তু সত্য ও বাস্তব হলো প্রাচ্য থেকেই পাশ্চাত্য সকল জ্ঞানের উৎস কেড়ে নিয়ে আমাদেরকে আজ মূর্খ ও স্বল্প শিক্ষিত জাতিতে পরিণত করার সর্বাত্মক চেষ্টায় অবিরাম কাজ করছে। বিষয়গুলো খোলামনে ও উন্মুক্ত মস্তিষ্কে বোঝার চেষ্টা করতে হবে। অবশ্যই এ বিষয়ে রাষ্ট্র ও সরকারের ভূমিকা থাকতে হবে।
লেখক: সাহিত্যিক সাংবাদিক ও সংগঠক