ভাগিরথীর তীর ঘেঁষে গড়ে উঠেছিল ঐতিহাসিক হীরাঝিল প্রাসাদ। বাংলার নবাব আলীবর্দী খানের স্নেহের দৌহিত্র মীর্জা মোহাম্মদ প্রাসাদটি গড়েছিলেন দীর্ঘকালের পরিক্রমায়। বলা যায়, তিনি যখন যৌবরাজ্যে অভিষিক্ত হয়েছিলেন তখন থেকেই এ স্বপ্লিল প্রাসাদটি গড়ার কাজ শুরু করেছিলেন। ইচ্ছা ছিল তিনি যখন বাংলা বিহার উরিষ্যার নবারের দায়িত্বভার গ্রহণ করবেন, তখন এ প্রাসাদ থেকে প্রজাসাধারণের ভাগ্য নিয়ন্ত্রিত হবে। জনগণের সুখ-দুঃখ, আনন্দ-বেদনা ও হাসি-কান্নার সাথে একাকার হয়ে যাবেন তিনি। তাই এ সুরম্য অট্টালিকা নির্মাণের জন্য গৌড় হতে নানান ধরনের প্রস্তরাদি এবং মূল্যবান উপকরণও সংগ্রহ করেছিলেন বাংলার ভাবি নবাব। তিলেতিলে গড়ে তুলেছিলেন এই তিলোত্তমা সদৃশ প্রাসাদটি। কালের বিবর্তনে সে প্রাসাদটি এখন আর বাস্তবে নেই; কিন্তু রয়েছে আত্মসচেতন মানুষের হৃদয়ে অম্লান হয়ে।

১৭৫৬ সালে নবাব আলীবর্দী খানের মৃত্যু হলে প্রথাসিদ্ধ নিয়মে স্নেহের দৌহিত্র ও যুবরাজ মীর্জা মোহাম্মদ ‘মনসুরুল মুলক মীর্জা মোহাম্মদ সিরাজউদ্দৌলা’ উপাধী ধারণ করে বাংলার মসনদে আসীন হলেন। যদিও ইংরেজরা তার নাম উচ্চারণ করতে ব্যর্থ হয়ে বলতো ‘Sir Roger Dowlet’. যাহোক স্বপ্নের হিরাঝিল প্রাসাদেই নতুন নবাবের অভিষেক হয়েছিলো। অভিষেকের পরই তিনি প্রজা সাধারণের দুঃখ-দুর্দশা লাঘলে সচেষ্ট হয়েছিলেন। পূর্বসূরীর পরামর্শমত ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির যাবতীয় অন্যায় অনাচার ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ালেন। ফলশ্রুতিতে তাকে কাসিমবাজার কুঠি ও কোলকাতা দখল করতে যুদ্ধে অবতীর্ণ হতে হলো।

তিনি অসীম সাহসিকতা ও সৌর্যবীর্ষ প্রদর্শন করে কুঠিয়ালদের পরাভূত করতে সক্ষম হলেন। অতিঅল্প সময়ের মধ্যেই তিনি একজন প্রজাবৎসল, দেশপ্রেমী ও অকুতোভয় বীর হিসেবে সাধারণ মানুষের মনে মণিকোটায় স্থান করে নিলেন। কিন্তু তা সহ্য হলো না মীর জাফর, রাজা রাজবল্লভ, উমিচাঁদ, জগৎশেঠ, ইয়ার লতিফ ও ঘসেটি বেগম গংদের। তারা যেকোন মূল্যে বাংলার শেষ স্বাধীন নবাবকে ক্ষমতাচ্যুত করে নিজেরা ক্ষমতা কুক্ষিগত করার ষড়যন্ত্র করতে লাগলো। সে ষড়যন্ত্রের ফলশ্রুতিতেই হলো ঐতিহাসিক পলাশী প্রান্তরের যুদ্ধ নামের নির্মম প্রহসন। মূলত, পশালীর আম্রকাননে কোন যুদ্ধ হয়নি; বরং হয়েছিলো বিশ্বাসঘাতকদের যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা।

ষড়যন্ত্রের ধারাবাহিকতায় এসব ইতিহাসের খলনায়করা প্রজাবৎসল ও স্বাধীনচেনা নবাবের বিরুদ্ধে কুৎসা রটনা করতে শুরু করলো। সদ্য অভিষিক্ত নবাবের বিরুদ্ধে নিষ্ঠুরতা, অসৌজন্যতা ও ইন্দ্রিয়পরায়নতার অভিযোগ উত্থাপন করা হলো। কথিত নৃশংস অন্ধকুপ হত্যার অপবাদও দেয়া হলো তরুণ নবাবের চরিত্রে। যা ছিল কল্পনারও অতীত। মূলত এসব অভিযোগের সাথে নবাব সিরাজের দূরতম সম্পর্কও ছিল না বরং তিনি অন্যায় ও অসত্যের বিরুদ্ধে সব সময় ছিলেন আপসহীন, অকুতোভয় এবং দেশ-জাতির কল্যাণে আত্মোৎসর্গকারী। আর এসবই ছিল নবাব বিরোধীদের মাথাব্যথার প্রধান কারণ।

তাই এসব বিভীষণরা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সাথে যোগ দিয়ে নবাবের বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্রে লিপ্ত হলো। শেষ পর্যন্ত মোক্ষম সুযোগও এসে গেল। ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি এবং তাদের উপমহাদেশীয় এজেন্টদের সাজানো পলাশীর আম্রকাননের কথিত যুদ্ধে প্রধান সেনাপতি মীর জাফরের বিশ্বাসঘাতকতায় নবাব পরাজিত হলেন এবং পরে তাকে নির্মম ও নিষ্ঠুরভাবে শহীদ করা হলো। আর হীরাঝিল প্রাসাদের আর্তনাদ শুরু হলো তখন থেকেই। কিন্তু সে আর্তনাদ থামছে না শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে। থামার কোন সম্ভবনাও দেখা যাচ্ছে না। কারণ, মীর জাফর ও জগৎ শেঠের প্রেতাত্মারা আজও তৎপর।

যে আশায় বুক বেঁধে নবাবের বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র ও তাকে নির্মম এবং নিষ্ঠুরভাবে হত্যা করা হয়েছিল ষড়যন্ত্রকারীদের সে উদ্দেশ্যও সফল হয় নি। নবাব সিরাজের স্ত্রী-কন্যাসহ প্রাসাদ ত্যাগের পর হীরাঝিল প্রাসাদে লর্ড ক্লাইভ নিজে হাত ধরে মীর জাফরকে বাংলার সিংহাসনে বসিয়েছিলেন। কিন্তু এ বিশ্বাস ঘাতককে ইংরেজরা কখনো বিশ্বাস করে নি। ষড়যন্ত্রকারীরা ভেবেছিল যে, নবাব সিরাজের পতনের পর তারাই বাংলা বিহার উরিষ্যার ভাগ্য বিধাতা হিসেবে অবির্ভূত হবে। কিন্তু যারা ক্ষমতার লোভে দেশ ও জাতির সাথে বিশ্বাসঘাতকতা করেছিল ইংরেজরা তাদেরকে কোনভাবেই বিশ্বাস করতে পারে নি। তাই মীর জাফরকে পদচ্যুত করে তার জামাতা মীর কাসেম আলী খানকে ক্ষমতায় বসিয়েছিল।

মীর কাসেম ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টায় ১৭৬৩ সালে কাটোয়া, মুর্শিদাবাদ, গিরিয়া, সুতি, উদয়নালা ও মুঙ্গের যুদ্ধে ইংরেজদের সাথে পরাজিত হয়ে ক্ষমতাচ্যুত হন। আবার নিজেদের স্বার্থেই ইংরেজরা তাদের গর্দভ খ্যাত মীর জাফরকে ক্ষমতায় বসায়। ১৭৬৪ সালে বাংলার হৃত গৌরব পুনরুদ্ধারের জন্য মীর কাসেম আলী খান ইংরেজদের সাথে বক্সারের যুদ্ধে অবতীর্ণ হলে তাকে নির্মমভাবে পরাজয় বরণ করতে হয়। কিন্তু এরপরও মীর জাফরের পথচলা নিষ্কন্টক হয় নি বরং স্বার্থ ফুরালে মীর জাফরের পুত্র মিরনকে ইংরাজরাই হত্যা করেছিল বলে জানা যায়। আর পলাশীর ধারাবাহিকতায় এক সময় পুরো ভারতবর্ষই কোম্পানির শাসনের অন্তর্ভুক্ত হয়।

যারা আত্মস্বার্থ, ব্যক্তিস্বার্থ ও ক্ষুদ্রস্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য বাংলা-বিহার-উরিষ্যার স্বাধীনতা ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির হাতে তুলে দিয়েছিল তাদের জীবনটাও খুব সুখকর হয় নি বলেই ইতিহাস থেকে জানা যায়। ইংরেজরা তো এদেরকে কোনভাবেই মূল্যায়ন করে নি বরং ১৭৬০ সালে ইংরেজরা মীর জাফরকে পদচ্যুত ও তার জামাতা মীর কাসেম আলী খান নবাব হওয়ার পর ইংরেজদের সাথে ষড়যন্ত্র করার অভিযোগে আজিমাবাদের নায়েবে নাজিম রামনারায়ণ, গোয়েন্দা কর্মকর্তা রাজা মুরলী ধর, পলাশীর অন্যতম ষড়যন্ত্রকারী জগৎ শেঠ, উমেদ রায় ও রাজ বল্লভকে গ্রেফতার এবং সকলকেই প্রাণদণ্ডে দণ্ডিত করা হয়। ফলে এসব বিভীষণরা কোন পক্ষের কাছেই মূল্যায়িত হয় নি বরং তাদেরকে লাঞ্ছনা ও জিল্লতির জীবনই যাপন করতে হয়েছে। আর তা থেকে মুক্ত নন তাদের নিরাপরাধ বংশধররাও। ইতিহাসের এ কালিমা তাদেরকেও এখন তাড়া করে ফিরছে। কোনভাবেই তারা কলঙ্কমুক্ত হতে পারছেন না।

পলাশী ট্রাজেডির পর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির ক্ষমতার দৃশ্যপটে আগমনকে ভারত বর্ষের বিশেষ একটি শ্রেণি ঈশ্বরের আশির্বাদ হিসেবেই গ্রহণ করেছিলেন এবং ইংরেজ শাসন দীর্ঘায়িত করার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকাও রেখেছিলেন। নবাব সিরাজের পতনের পর ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি তাদের একটা উচ্ছিষ্টভোগী শ্রেণি তৈরি করতে সক্ষম হয়েছিল। বিদেশী শাসকগোষ্ঠী তাদেরকে নানাভাবে পৃষ্ঠপোষকতা ও রাষ্ট্রীয় সুযোগ-সুবিধা দিয়েছিল। কারণ, বিদেশী শাসকরা ‘Divide & Rule’ থিওরীতে বিশ্বাসী ছিলেন। তাই তারা বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা দিয়ে একটি সুবিধাভোগী শ্রেণি তৈরি করে অন্যদের ওপর অত্যাচারের স্টিম রোলার চালাতো। এসব সুবিধাভোগী শ্রেণি ও ইংরেজদের তল্পিবাহকদের দেয়া হয়েছিল ‘স্যার’ ও ‘নাইট’সহ বিভিন্ন ধরনের রাষ্ট্রীয় খেতাব। তারা মনে করেছিলেন এসব সুবিধাপ্রাপ্ত শ্রেণি সব সময়ই পায়ের কাছে সারমেয় সাবকের মত লেজ নাড়বে। কিন্তু ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির সে আশা পূরণ হয়নি বরং ১৮৫৭ সালে যখন সিপাহী বিদ্রোহ শুরু হয়েছিল তখন সুবিধাপ্রাপ্তরা ও সুবিধাবঞ্চিতদের মধ্যে কোন ভেদাভেদ ছিল না। যদিও এ বিদ্রোহের ক্ষেত্রে বিশেষ শ্রেণির প্রাধান্য ছিল এবং সে বিদ্রোহ সফল হয় নি।

বিংশ শতাব্দীর মাঝামাঝি সময়ে ইংরেজদের বিরুদ্ধে যখন ভারত ছাড় আন্দোলন শুরু হয়েছিল তখন কিন্তু ইংরেজদের কাছ থেকে সুবিধাভোগী শ্রেণি এ আন্দোলনকে উপেক্ষা করতে পারেন নি বরং তারাই এ আন্দোলনের সামনের কাতারে অবস্থান নিয়েছিল। ইংরেজরাও বিষয়টি নিয়ে বিস্ময় প্রকাশ করেছিল। কারণ, তারা মনে করেছিল এসব আত্মসম্মানহীন খয়ের খাঁরা আমৃত্যু তাদেরকে প্রভূভক্তিতে সিক্ত করবে। কিন্তু সে আশায় গুড়ে বালি পড়েছিল ইংরেজদের। মূলত যে অপশক্তি ইংরেজদেরকে ভারতে প্রভাব বিস্তারের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য ভূমিকা রেখেছিল, সে শক্তিই আবার তাদেরকে বিতাড়নের ক্ষেত্রে বলিষ্ঠভূমিকা রেখেছিল। ফলে ভারতবাসীর ইস্পাতকঠিন ঐক্যের কারণে ১৯৪৭ সালে তারা ভারত ছাড়তে বাধ্য হয়েছিল বিদেশী শাসকচক্র।

পলাশীর কথিত মহানায়ক লর্ড ক্লাইভকেও তার দেশের মানুষ কাঙ্ক্ষিত সম্মানটুকু করে নি। স্বদেশীরা তাকে খুনী ও অত্যাচারী হিসেবে চিত্রিত করেছিল। তাই লর্ড ক্লাইভ এখন ইতিহাসের আস্তাকুঁড়ে। তার সমাধি চিহ্নিত করাও এখন কষ্টসাধ্য। সঙ্গত কারণেই নবাব সিরাজ প্রজন্ম আজও বুক ফুলিয়ে কথা বলেন, আর মীর জাফর, রাজা রাজবল্লভ, উমিচাঁদ ও জগৎ শেঠের মত বিশ্বাসঘাতকদের বংশধররা থাকেন পর্দার অন্তরালে। গ্লানীর বোঝা মাথায় নিয়ে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে। কারণ, হীরাঝিলের আর্তনাদ ইংরেজ ও তাদের দোসরদের কোনভাবেই ছেড়ে কথা বলে নি বরং ইতিহাসের নির্মম প্রতিশোধের মাধ্যমেই সবকিছুর যবনিকাপাত ঘটেছে। আর ইতিহাসের প্রতিশোধ বড়ই নির্মম ও নিষ্ঠুর।

হীরাঝিলের কান্না আমাদেরকেও ছেড়ে কথা বলে নি। কারণ, পশালীর যুদ্ধে আমরা যারা নীরব দর্শকের ভূমিকা পালন করেছিলাম তাদের অপরাধটাও একেবারে গৌণ নয়। কারণ, সে সময় যদি আমরা শত্রু পক্ষের ওপর সম্মিলিতভাবে একটা করে ঢিলও ছুঁড়তে পারতাম তাহলে হয়তো পলাশীর ইতিহাস ভিন্নভাবে লেখা হতো। নবাব সিরাজসহ মোহনলাল আর মীরমদনরা বিজয়ীর বেশে মুর্শিদাবাদ ফিরতে পারতেন। আমরা সে কাজটা করতে পারি নি। সে জন্যই আমাদের প্রায়শ্চিত্যটা দীর্ঘ হতে দীর্ঘতরই হচ্ছে।

মনে করা হয়েছিল যে, ইংরেজরা অবোধ বালকের মতই ভারত ছেড়ে স্বদেশে চলে যাবে। কিন্তু তা আর হয়ে ওঠে নি। ববং ভারতীয় উপমহাদেশের জনগণ যাতে ঐক্যবদ্ধ হতে না পারে তার পাকাপোক্ত ব্যবস্থাটা ইংরেজরাই করে গিয়েছিল। দ্বিজাতি তত্ত্বের ভিত্তিতে ভারত বিভাজনের দাবি ভারতীয়দের হলেও সে মানদণ্ডে যেভাবে ভারত বিভাজিত হওয়ার কথা ইংরেজরা সেভাবে তা করে নি বরং যেভাবে করা হয়েছে তাতে ভারতীয়দের মধ্যে অন্তর্কলহ স্থায়ী রূপ নিয়েছে। যা এখনও অব্যাহত আছে এবং আগামী দিনেও থাকবে বলেই মনে হচ্ছে।

সঙ্গত কারণেই ভারত বিভাজিত হওয়ার পর পাকিস্তান রাষ্ট্র অখণ্ড থাকে নি। এক রক্তক্ষয়ী সংগ্রামের মাধ্যমে আজকের বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটেছে। কাশ্মীর ইস্যুটা তারাই সৃষ্টি করে গেছে। এসব বিষয় নিয়ে ভারত-পাকিস্তান-বাংলাদেশের মধ্যে বারবার যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছে। ফলে ভারত উপমহাদেশীয় রাষ্ট্রগুলো জাতি গঠনে খুব একটা সময় দেয়ার পরিবর্তে নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষায় সময়, শ্রমও ব্যয় করতে হয়েছে। আর সে সুযোগে বৈশ্বিক রাজনীতিতে রীতিমত ছড়ি ঘুরিয়েছে আধিপত্যবাদি ও সম্রাজ্যবাদি অপশক্তিরা।

আমাদের দেশের চলমান রাজনীতিও ইতিহাসের সে নির্মম ধারাবাহিকতা থেকে মোটেই আলাদা নয় বরং দেশীয় রাজনীতি ও ক্ষমতার হাত বদল নিয়ন্ত্রিণ হয় স্বার্থান্বেষীমহলের অঙ্গুলি হেলনে। আর এরাই আমাদের ভাগ্যবিধাতা হিসেবে সক্রিয় রয়েছে। সঙ্গত কারণেই অপ্রীতিকর ও দুঃখজনক ঘটনাও ঘটেছে আমাদের দেশের রাজনীতিতে। এজন্য দেশের শীর্ষ ব্যক্তিত্বসহ অসংখ্য মানুষকে দুষ্কৃতকারীদের হাতে প্রাণ দিতে হয়েছে। ফলে জাতীয় জীবনে যে দুষ্ট ক্ষতের সৃষ্টি হয়েছে, তা আর পুষিয়ে নেয়া সম্ভব হয় নি। কিন্তু এসব হত্যাকাণ্ডের নেপথ্যে যারা ছিল তারা কিন্তু ইতিহাসের সেই মীর জাফর, জগৎ শেঠ ও ঘসেটি বেগমদেরই ভাবশিষ্য। কিন্তু এসব দুর্বিনীতরা যে উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে এসব ঘৃণ্য অপকর্মে লিপ্ত হয়েছিলো তারাও কিন্তু ইতিহাসের আস্তাকুঁড়েই নিক্ষিপ্ত হয়েছে।

আমাদের দেশের ভূরাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে দেশের চলমান রাজনীতি গণমুখী হয়ে ওঠে নি। আত্মস্বার্থ, সংকীর্ণ দলীয় স্বার্থ, গোষ্ঠী স্বার্থেই নিয়ন্ত্রিত হচ্ছে সবকিছু। আর ক্ষমতার নিয়ন্ত্রণও হচ্ছে অদৃশ্য শক্তির ইশারায়। প্রচলিত রাজনীতি এখন জনগণের কল্যাণের পরিবর্তে শ্রেণি বিশেষের ভোগবিলাসের অনুষঙ্গে পরিণত হয়েছে। আর ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় এসব নিয়ন্ত্রণ করছে এক অশুভ নেপথ্যের শক্তি। কিন্তু এ শক্তির সহায়তায় যারা ক্ষমতার মসনদের অধিকারী হন তাদেরকে স্থায়ী মিত্র মনে করার কোন সুযোগ আছে বলে মনে করা যায় না। বরং স্বার্থ ফুরালে যে এই মিত্র শক্তি যেকোন সময় যে কাউকে অর্ধচন্দ্র দিতে পারে তা সাম্প্রতিক সময়ে চলমান রাজনীতিই সবচেয়ে বড় প্রমাণ। কারণ, ক্ষমতাকেন্দ্রিক রাজনীতিতে কেউই স্থায়ী শত্রু-মিত্র নয়।

যে রাজনীতিতে ক্ষমতাই মুখ্য সেখানে দেশ, জনস্বার্থ ও জনগণ গৌণ হতে বাধ্য। তাই এক সময়ে যারা ক্ষমতার প্রতিভূ হয়ে কাজ করে, সময়ের প্রয়োজনে সে শক্তিই আবার প্রতিপক্ষ হয়ে দাঁড়ায়। কিন্তু ইতিহাস কাউকে ক্ষমা করে না। তাই রাজনীতিকে আত্মস্বার্থ চরিতার্থ করার হাতিয়ার না বানিয়ে গণমুখী করার তাগিদ এসেছে আত্মসচেতন মানুষের পক্ষ থেকে। রাজনীতির চলমান ঘটনা প্রবাহ সেদিকেই অঙ্গুলি নির্দেশ করে। এ কঠিন বাস্তবতাকে উপেক্ষা না করলে হীরাঝিলের আর্তনাদ-আহাজারী কাউকে ক্ষমা করবে না বরং তা সব সময়ই প্রতিধ্বনিত হতেই থাকবে। আর দেশের স্বাধীনতা-সার্বভৌমত্ব রক্ষায় নবাব সিরাজের আত্মত্যাগে বলীয়ান ও পলাশীর শিক্ষাকেই যথাযথভাবে কাজে লাগাতে হবে। অন্যথায় পলাশীর ট্রাজিক পরিণতি আর হীরাঝিলের কান্না আমাদের পিছু ছাড়বে না।

www.syedmasud.com