খোঁপেলা বিবির সাথে পরিচয় ইন্টারেই। সহপাঠি হিসাবে বেশ সখ্যও ছিলো আমার সাথে। কলেজে পা দেওয়ার আগে মাদরাসায় ‘কায়দা-ছিপারা’ ও ‘উর্দু কী পহেলী কিতাব’ নিয়ে ঘোরাফেরা করতাম বলে সে আমার নাম বিকৃত করে ‘মোল্লা’ বানিয়েছিলো। বুদ্ধিশুদ্ধি ও দুষ্টুমী কোনটাতেই জুরি ছিলো না তার। উর্দুর প্রথম পাঠেই জেনেছিলাম, ‘কালেজ কী লারকিয়াঁ বড়ি চালাক হুতি হাঁয়’। এ চালাক বলতে ইতিবাচক অর্থে ‘বুদ্ধিমতি’, না নেতিবাচক অর্থে ‘ধূতর্’ বুঝানো হয়েছে তা আমার আজও অজানা রয়ে গেছে। তবে খোঁপেলা বিবির মধ্যে কোনটারই কমতি ছিলো না। যাহোক আমার নাম বিকৃত করার জন্য আমি বিরক্ত বা বিব্রত হতাম না বরং পুলকিতই হতাম। কারণ, যৌবনের অভিষেকেই ‘মোল্লা’ খেতাব পাওয়া অগৌরবের কিছু ছিলো না। এক সময় মোল্লারাই তো সারাবিশ্বেই দণ্ডমুণ্ডের কর্তা ছিলেন।
ছাত্রাবস্থায় যে ক’জন দুরন্ত প্রকৃতির সহপাঠি পেয়েছিলাম খোঁপেলা বিবি এদের অন্যতম। মাধ্যমিকে নূরুন্নাহার নুন্না ও ফরিদা নামে দু’জন ডানপিটে বান্ধবী কপালে জুটেছিলো। নুন্না ছিলো বেশ লম্বাচওড়া-দীর্ঘাঙ্গীনি। চিকন-চাকন গড়নের শ্যামলা এক দুরন্ত মানবী। নুন্নার চাচাতো ভাই এমদাদও আমাদের সাথে পড়তো। দুষ্টোমীতে তারও কোন জুড়ি ছিলো না। এ দু’জন একই দিনে ক্লাসে আসলে সেদিন ক্লাস থাকলো উত্তাল। ক্লাসে রীতিমত কুরুক্ষেত্র মহাসমর চলতো দু’জন এবং এদের সমর্থকদের মধ্যে। কথা কাটাকাটি, ঝগড়া-ঝাটি দিয়ে শুরু হলেও কোনদিন হাতাহাতি এড়ানো সম্ভব হয়েছে বলে আমার মনে পড়ে না। কাহিনী, চিত্রনাট্য, সঙ্গীত পরিচালনা ও সংলাপ সবই থাকতো ফরিদার নিয়ন্ত্রণে। নুন্না আর এমদাদ ক্লাসে এসে নানা ধরনের কলহ-বিবাদে জড়িয়ে পড়লেও স্কুলে আসতো একই সাথে; আবার ফিরতোও যুগলবন্দীর মত।
সিক্সেই বিয়ে হয়েছিলো নুন্নার। খবরটা সহপাঠিদের কাছে স্বাভাবিক ছিলো না। আবেগে কেউ কেউ কেঁদে ফেলেছিলাম আমরা। আর ক্লাসে আসা হয়নি তার। শুনেছি বছরান্তে মা হয়েছিলো। এমদাদও কম যায়নি। বিয়ে করেছিলো পরের বছর কৈশরের সূচনা পর্বেই। লেখাপড়ার ইতি ঘটেছিলো সেখানেই।
একবার রাস্তায় দেখা হয়েছিলো নুন্নার সাথে। সে আমাকে চিনতে না পারলেও আমি চিনেছিলাম ঠিকই। লম্বা-চওড়া হালকা-পাতলা গড়নের নুন্নার অস্থির ওপর বিবর্ণ চামড়ার প্রলেপ ছাড়া কিছু লক্ষ্য করিনি। পোশাক-আশাকে আগের মত পরিপাট্য না থাকলে গ্রাম্য বধুর অবগুণ্ঠনে অবগুন্ঠিত। দারিদ্র্যতার ছাপও লক্ষ্য করেছিলাম তার দেহাবয়বে। তাকে রোগ ও জরাগ্রস্ত মনে হয়েছিলো আমার।
সালাম দিয়ে বললাম, ‘নুন্না’! মাথা নেড়ে জবাব দিলো ইতিবাচক ভঙ্গীতে। মুখে কোন কথা ছিলো না। ফেলফেল করে তাকিয়ে রইলো আমার মুখের দিকে। আমিও দৃষ্টি ফেরাতে পারলাম না। এবার বললো, ‘ কে আপনি’? প্রত্যুত্তরে বললাম, ‘আমি...। একই সাথে পড়তাম, মনে পড়ে না’? তার নিরুত্তর অভিব্যক্তিই বলে দিলো এবার সে আমাকে চিনতে ভুল করেনি। অপলকে চেয়ে ছিলো আমার দিকে।
বললাম, ‘তুমি তো বুড়ি হয়ে গেছো’। মৃদু হেসে জবাব দিলো, ‘তাতো অনেক আগেই। তুমি তো আগের মতোই আছো’! না হেসে পারলাম না আমি। ক্লাস সিক্সের সহপাঠি। হাফ সেঞ্চুরী করে ফেলেছি বেশ আগেই। যৌবনের উত্তাল দিনগুলো পেরিয়ে পৌঢ়ত্বকে অলিঙ্গন করেছি। সে অনেক আগেই বুড়ি হয়েছে। আর আমি নাকি আছি আগের মতই! ততক্ষণে সে আবেগ তাড়িত হয়ে পড়েছে। চোখটা ভেজা ভেজা মনে হলো। আমিও নিজেকে হারিয়ে ফেললাম স্মৃতি কাতরতায়।
আমার পিতৃপ্রদত্ত নাম বিকৃত করে ‘মোল্লা’ বানানোর শাস্তিটা খোঁপেলা বিবি নগদেই পেয়েছিলো। কারণ, খোঁপেলা বিবি তার আসল নাম ছিলো না। ‘ই’ আদ্যক্ষরের পারিবারিক নাম ছিলো এ মানবীর। মাথায় মেঘবরণ, ঘন, লম্বা কোঁকড়ানো চুল ও বৃহদাকার খোঁপার কারণে সহপাঠিরা তার নাম বিকৃত করে খোঁপেলা বিবি বলে ডাকতো। এ নামে সে হয়তো পুুলকিতই ছিলো। তাই মাঝে মাঝে খোঁপাটা আরো বিশালকায় করার জন্য পরচুলা ব্যবহারের অভিযোগ ছিলো বান্ধবীদের মধ্যে। কোন কোন দিন খোঁপা না বেধে পেতনির মত চুল ছেড়ে দিতো প্রদর্শনীর জন্য। অত্যন্ত দুরন্তপনার কারণে কেউ কেউ তাকে বৈতালী বা ঘোড়াঘাটি বলেও সম্বোধন করতো। কিন্তু এভাবে নাম বিকৃত করার কারণে তাকে কখনো বিরক্ত ও বিব্রত করা যেতো না। ব্যবচ্ছেদও ঘটতো তার দূরন্তপনায়।
খোঁপেলা বিবি উচ্ছল, চঞ্চল, দুরন্ত; সর্বোপরি প্রচণ্ড মেধাবীনি। পড়াশোনায় যেমন ভালো ছিলো, ঠিক তেমনি দূরন্তপনায় তার কোন জুড়ি ছিলো না। তবে তার উচ্চলতা নেতিবাচক ছিলো না বরং সবসময় সহপাঠিতে মাতিয়ে রাখতো; থাকতো আলোচনায়। সুস্বাস্থ্যের অধিকারীনি অতিউজ্জল বর্ণের এক দীর্ঘাঙ্গীনি। একেবারে ঝাঁসির রাণী লক্ষ¥ীবাঈয়ের আদলে এক জানবাজ স্বাধীনতা সংগ্রামী। লোক কথায় ‘....তারপরে সাজিল কন্যা নামে লোহাজুড়ী/আছড়াইয়া মারিত সে হাতীর শুঁড় ধরি’-এমনই অবস্থা। আমার উচ্চতা প্রায় সাড়ে পাঁচ ফুট হলেও তার মুখাবয়ব দেখতে ওপর দিকে তাকাতে হতো। পুরোদস্তর এক বীরঙ্গনার প্রতিচ্ছবি।
আমাকে নিয়ে তার কৌতুহলের অন্ত ছিলো না। সুযোগ পেলেই ‘মোল্লা’ বলে উতক্ত করতো। সব সময় মোল্লাদের দোষত্রুটি অনুসন্ধান, কোন মৌলভী কয়টা বিয়ে করেছে, ওয়াজের নামে বাটপারী, তাবিজ-কবজের ব্যবসা, লাগামহীন ফতোয়াবাজি আর হিল্লা বিয়ে নিয়ে খোঁপেলা বিবির চিন্তার কোন অন্ত নেই। সবে ইন্টারে পড়া একজন শিক্ষার্থীর মাথায় এতোকিছুর অনুপ্রবেশ ঘটেছে, এটাও রীতিমত গবেষণার বিষয়। কথাবার্তায় মুন্সীয়ানায় মনে হয় আস্ত এক পাকা বুড়ি। সৃষ্টির অনেক অসঙ্গতি নিয়ে তার বেশ চিন্তা। ভাবটা এমন যে, দুনিয়া সৃষ্টির আগে স্রষ্টার তার সাথে পরামর্শ করা সঙ্গত ছিলো। তা না করার কারণেই এতো বিপত্তি ও অসঙ্গতি।
মোল্লাদের দাড়ি নিয়ে তার ঘোরতর আপত্তি। আল্লাহকে রাজীখুশী করা ও ইবাদতের নানা সুযোগ থাকলেও মোল্লা-মৌলভীরা জীবনের শুরুতেই কেন দাড়ি নিয়ে পাগল হয়ে যান তা নিয়ে তার আপত্তি। ক্লাসে দু’এক জনের দাড়ি ছিলো। তা নিয়েও খোঁপেলা বিবির ছিলো বিস্তর মাথাব্যথা। একদিন এক দাড়িওয়ালা বন্ধুকে সে বলেই ফেললো, ‘আর কোন কাজ পাও না ? নোংরা; বিরক্তিকর’। কৌশলী জবাব দিয়েছিলো আবু মূসা। বলেছিলো, ‘সমস্যাটা তো আমাদের না; তোমাদের’। খোঁপেলা বিবি এর কোন জবাব না দিয়ে উচ্চস্বরে হেসেছিলো। মূসা হয়তো তাকে প্রস্তুতি নেওয়ার সুযোগ দেয়নি।
ইন্টারের পর বিচ্ছিন্ন হয়েছিলাম আমরা। সামর্থ ও মেধা অনুযায়ি দেশের একপ্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে ছড়িয়ে পড়েছিলাম আমরা। খোঁপেলার জায়গা হয়েছিলো ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। সে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ চুকার পর বিসিএস পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে আমলাতন্ত্রে যোগ দিয়েছে, এটা আমার শোনা কথা। একজন উচ্চ পদস্থ প্রকৌশলীর সাথে বিয়ে হয়েছে; মাতৃত্বের স্বাদও পেয়েছে একথাও শুনেছি লোক মুখে। বিয়ের সময় বর বাবু ক্লিন সেভড; সাফফান সাফ্ফা হলেও পরে নাকি আখলাক-সুরত পরিবর্তন করে একেবারে হুজুর কেবলা বনে গেছেন। বুক আচ্ছাদন করে পীর সাহেবের আদলে রেখেছেন দাড়ি। লম্বাচওড়া কোর্তা ও আর মাথায় টুপি ব্যবহারে অভ্যস্ত। পকেট খুঁজলে নাকি একটা তসবীহও পাওয়া যায়; যেসব ছিলো খোঁপেলা বিবির খুবই অপছন্দের। এসব শুনে মনে মনে ভাবতাব বৈতালীটার সাথে কোন দিন দেখা হলে এসবের একটা নিকেশ করা যেতো। কিন্তু কোথায় থাকে তা আমার জানা ছিলো না। একজন শীর্ষ আমলার বন্ধুদের নিয়ে ভাববার অবকাশ থোকায়?
খোঁপেলা বিবি আমলা খেতাব অর্জন করেছে একথা নিয়ে বন্ধুমহলে কৌতুহলের অন্ত ছিলো না। বিষয়টি নিয়ে আমরা বেশ হাসাহাসিই করতাম। যদিও দু’একজন ছাড়া কারো সাথেই তার তেমন যোগাযোগ ছিলো না। আমরা কোন কারণে এক জায়গায় হলেই খোঁপেলা বিবির প্রসঙ্গ উঠতো। কাউকে কাউকে বলতে শুনেছি, ‘ক্লাসে তো সবাইকেই মাতিয়ে রেখেছে; জ¦ালিয়ে মেরেছে। এখন প্রশাসনে কী অবস্থা সৃষ্টি করেছে, তা-ই বা কে জানে’। কারণ তার দুরন্তপনা প্রায় ক্ষেত্রেই উপভোগ্য হলেও কোন কোন ক্ষেত্রে অস্বস্তিও সৃষ্টি করতো। এসব নিয়ে বন্ধু মহলে কৌতুলের অন্ত ছিলো না।
আমাদের দেশের আমলাতন্ত্র নিয়ে সাধারণ মানুষের মধ্যে মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। অভিযোগ রয়েছে, একশ্রেণির বিপথগামী, দলবাজ ও মূল্যবোধহীন আমলার কারণেই আমাদের দেশের আমলাতন্ত্র গণমুখী চরিত্র হারিয়েছে। এজন্য শুধুই আমলাদের পুরোপুরি দায়ি করা ঠিক হবে না। এক টক-শোতে আমার সহ আলোচক বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক তথ্য দিয়ে জানিয়েছিলেন যে, আমলাদের প্রশিক্ষণের শুরুতেই শেখানো হয়, ‘তোমরাই সকল বসের বড় বস’। জানিনা কথাটা গুজব না সত্য। আর গুজব হলেই তো ভালো। তবে সত্য হলে তা শুধু আমলাতন্ত্র নয় বরং পুরো জাতির জন্যই খারাপ খবর। কারণ, আমলারা রাষ্ট্রের মালিক নন; বরং প্রজাতন্ত্রের কর্মচারি। রাষ্ট্রের কর্মচারিদের যদি জনগণের প্রভূ বা মালিক হওয়ার দিক্ষা দেওয়া হয়, তাহলে তো রাষ্ট্রে সুশাসন ও শৃঙ্খলা থাকে না। ফলশ্রুতিতে একশ্রেণির আমলা ছাগলের বিরুদ্ধে জন উপদ্রব সৃষ্টির মামলা, মসজিদের ঈমাম সাহেবকে রোমান্টিক হয়ে ওঠার দিক্ষা (ফিমেল আমলা কর্তৃক), কাউকে পানিতে চোবানোর ভীতি প্রদর্শন, বাপের বয়সীকে কান ধরতে বাধ্য করে ছবি ওঠানোর পর সামাজিক মাধ্যমে পোস্ট এবং দিদি বলায় মাছ বিক্রেতাকে লাথি দিয়ে নর্দমায় ফেলে দেওয়ার মত একেবারে বিচ্ছিন্ন ঘটনা। স্যার না বললে তো একশ্রেণির আমলার মান-ইজ্জতই থাকে না। আর একশ্রেণির আমলা ক্ষমতার অপব্যবহার, পেশাগত অসদাচারণ, স্বেচ্ছাচারিতায় পুরো আমলাতন্ত্রই তো এখন আসামীর কাঠগড়ায়।
খোঁপেলা বিবি আমলাতন্ত্রে গিয়ে গড্ডালিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে দিয়েছে, না সে তার মৌলিকত্ব ধরে রাখতে পেরেছে এ নিয়ে আমাদের বন্ধু মহলে কৌতুহলের অন্ত নেই। একজন সদ্য বনে যাওয়া কথিত মোল্লার সাথে তার দাম্পত্য জীবনই বা কেমন কাটছে তা নিয়েও আমাদের ভাবনার কোন সীমা নেই। কারণ, মোল্লা শ্রেণির মানুষ, ইসলামী আখলাক-সুরত-সংস্কৃতি তার কাছে রীতিমত চক্ষুশূল। আর আমলাতন্ত্রের দেয়াল ভেদ করে এতোকিছু জানা কারো পক্ষে সম্ভব ছিলো না।
লোকমুখে শুনেছি খোঁপেলা বিবি মাঠ পর্যায়ে দায়িত্ব পালন শেষ করে এখন সচিবালয়ে পৌঁছেছে। তবে কোন মন্ত্রণালয়ে কোন দায়িত্বে আছে সে তথ্য আমার কাছে ছিলো না। আমিও প্রায় ১৮ বছর ঢাকায় বসবাস করি। কিন্তু এক সময়ের এ প্রিয় সহপাঠির খবর সংগ্রহ করার ফুরসৎ আমার হয়নি। বিশেষ বৈশিষ্ট্য ও জনপ্রশাসনে চাকরি করায় সকলেই হয়তো তাকে মনে রেখেছে। কিন্তু একজনের পক্ষে সকল বন্ধুদের মনে রাখাও অবাস্তব।
একদিন কাকতালীয়ভাবে অফিসের টেলিফোনটা বেজে উঠেছিলো। খোঁপেলার ফোন। দীর্ঘদিনের অপ্রাপ্তিটা দূর হয়েছিলো আমার। অফিসার্স কোয়াটারে হাজির হয়েছিলাম কোন এক জুমাবারে। প্রকৌশলী সাহেবও সেদিন বাসায় ছিলেন। সেদিন বেশ আঁৎকে উঠেছিলাম খোঁপেলাকে দেখে। সে আর আগের মত নেই। নেই আগের মত দুরন্তপনা। পুরোপুরি হিজাবী না হলেও শরীরের নিরাপত্তা বুহ্যটা খুবই দুর্ভেদ্য। আগের মত বিশালকায় খোঁপাটা সহজে দৃশ্যমান নয় বরং প্রশস্ত ও পুরু অবগুণ্ঠন দিয়ে অবগুন্ঠিত। মনে হয় প্রকৌশলী সাহেবের পুরো প্রভাবটা তাকে শক্তভাবেই আচ্ছাদিত করে ফেলেছে। কথাবার্তার ধারটাও আগের মত নেই। এক শান্তশিষ্ট ও প্রশান্ত আত্মা।
পরিচয় পর্ব শেষে দীর্ঘক্ষণ কথা হলো তার সাথে। পুরনো অভ্যাসবশত কিছুটা খুনসুটি করতেও ছাড়িনি আমরা কেউই। ইঞ্জিনিয়ার সাহেব তা বেশ উপভোগ করছিলেন মনে হলো। দীর্ঘ চাকরি জীবনের নানা অভিজ্ঞতাও বর্ণনা করলো আমাদের কাছে। আমি গুণমুগ্ধ তার সব কথা শুনছিলাম মনোযোগ দিয়ে। অফিসে চায়ের দাওয়াত দিলে বললাম, ‘আমি তো সাংবাদিক। তোমার অফিসে আমাকে নিরাপত্তা দিতে পারবে তো’? ‘কেন’ পাল্টা প্রশ্ন করে বসলো আমাকে। ‘তোমরা প্রথম আলোর রোজিনার কী করেছিলে মনে আছে’? এবার একটু জোরেই হেসেছিলো খোঁপেলা বিবি; অংশ নিয়েছিলেন ইঞ্জিনিয়ার সাহেবও।
শেষে প্রসঙ্গ তুলেছিলো এক সময়ের এক মহিলা প্রতিবেশী। তার ভাষায়, এক বেপর্দা, বেলেল্লা মহিলা। কখনো অভিনয় করে, আবার গান গায়। শরীরে ঠিকমত জামাকাপড় থাকে না। গভীর রাতে বন্ধুদের নিয়ে বাসায় ফিরে। আবার কোন দিন ফেরেও না। স্বামীর সাথে প্রায় কলহ-বিবাদ লেগেই থাকে।
শুধু খোঁপেলার সে মহিলা প্রতিবেশীই যে পাপকাজ করে এমন তো নয়। আমরা তো প্রতিনিয়ত জ্ঞাত বা অজ্ঞাতসারে কত পাপ কাজে লিপ্ত হই। মানুষের অধিকার নষ্ট করি, পিতামাতা, ভাইবোনের হক আদায় করি না। দেই না পাওনাদারের পাওনা। সুদ-ঘুষ তো আমাদের নিত্যসঙ্গী। রাষ্ট্্রীয় ও ধর্মীয় উভয় দিক থেকেই এসব গুরুতর ও অমার্জনীয় অপরাধ।
জানতে চাইলাম, ‘তোমার ফিমেল কলিগদের কারো কারো ঘুষ নেওয়ার অভ্যাস আছে’? সে সহাস্যে উত্তর দিয়ে বললো, ‘ কেউ কেউ তো নেন’। মৃদুহেসে তার দৃষ্টি আকর্ষণ করে বললাম, ‘তাদের সাথে তোমার সম্পর্ক কেমন’ ? খোঁপেলা অবলীলায় জবাব দিয়ে বললো, ‘ভালো, খুবই চমৎকার’। আমি এবার ভারী গলায় জিজ্ঞাসা করলাম, ‘তোমার অতীতের প্রতিবেশী, আর ঘুষখোর কলিগদের মধ্যে তফাৎ কী; অপরাধ কি একই ধরনের নয়’? নিরুত্তর খোঁপেলা বিবি!
www.syedmasud.com