যুক্তরাষ্ট্রের রাজধানী ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত ইন্টারন্যাশনাল মানিটারি ফান্ড (আইএমএফ) ও বিশ্বব্যাংকের বসন্তকালীন সভা উপলক্ষে প্রকাশিত ‘ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক আউট লুক’ শীর্ষক প্রতিবেদনে বিশ্ব অর্থনৈতিক পরিস্থিতির ওপর আলোকপাত করা হয়েছে। এতে বলা হয়, ইরান ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের চলমান যুদ্ধের কারণে বিশ্ব অর্থনীতি চাপের মধ্যে পড়েছে। বিশেষ করে জ¦ালানি তেলের সরবরাহ বিঘ্নিত হবার কারণে বিশ্ব অর্থনীতিতে মন্দাভাব সৃষ্টি এবং প্রবৃদ্ধি কমে যাবার আশঙ্কা সৃষ্টি হয়েছে। এতে আরো বলা হয়, এ বছর (২০২৬) বিশ্ব অর্থনীতি তার গতি হারাতে পারে। ফলে প্রবৃদ্ধির হার কমে যাবে। বিশ্ব জিডিপি প্রবৃদ্ধি অর্জিত হতে পারে ৩ দশমিক ১ শতাংশ,যা আগের দেয়া পূর্বাভাস থেকে শূন্য দশমিক ২ শতাংশীয় পয়েন্ট কম। তবে আগামী বছর (২০২৭) কিছুটা বেড়ে ৩ দশমিক ২ শতাংশে উন্নীত হতে পারে। একই প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অর্থনীতি সম্পর্কেও নেতিবাচক ধারণা দেয়া হয়েছে। এতে বলা হয়, বাংলাদেশ চলতি অর্থবছরে (২০২৫-২০২৬) ৪ দশমিক ৭ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারে। সংস্থাটি এর আগে বলেছিল, বাংলাদেশ ৪ দশমিক ৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করবে। ২০২৬-২০২৭ অর্থবছরে বাংলাদেশের প্রবৃদ্ধি আরো কিছুটা কমে ৪ দশমিক ৩ শতাংশে নেমে আসতে পারে। এদিকে বিশ্বব্যাংক বলেছে, চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশ ৩ দশমিক ৯ শতাংশ প্রবৃদ্ধি অর্জন করবে। আর এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক(এডিবি) বলেছে, চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশ ৪ শতাংশ হারে প্রবৃদ্ধি অর্জন করতে পারে। বিশ্বব্যাংক এবং এডিবি বাংলাদেশের জিডিপি প্রবৃদ্ধি নিয়ে যে প্রক্ষেপন প্রকাশ করে আইএমএফ সাধারণত তার চেয়ে কিছুটা কমে প্রবৃদ্ধি প্রাক্কলন করে থাকে। এবারই প্রথম আইএমএফ বিশ্বব্যাংক ও এডিবি’র চেয়ে জিডিপি প্রবৃদ্ধির প্রাক্কলন বেশি দেখিয়েছে।
আইএমএফ তাদের প্রতিবেদনে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে বিরাজমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। সংস্থাটি বলেছে, বিগত ৪ বছরেরও বেশি সময় ধরে চলমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি আগামীতেও অব্যাহত থাকবে। এমনকি মূল্যস্ফীতি আরো বেড়ে গেলেও অবাক হবার কিছু থাকবে না। বাংলাদেশের উচ্চ মূল্যস্ফীতির পেছনে মূল ভূমিকা পালন করবে ইরান এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইলের মধ্যে চলমান যুদ্ধ। প্রাথমিকভাবে ধারণা করা হচ্ছে চলতি অর্থবছরে বাংলাদেশের গড় মূল্যস্ফীতি ৯ দশমিক ২ শতাংশে সীমিত থাকবে। এর আগে সংস্থাটি বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি নিয়ে যে পূর্বাভাস দিয়েছিল তাতে বলা হয়েছিল ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশের মূল্যস্ফীতি হবে ৮ দশমিক ৭ শতাংশ। তবে ইরান-মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র-ইসরাইল সংঘাত যদি দীর্ঘায়িত হয় তাহলে বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ অর্থনীতিতে বিরাজমান উচ্চ মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে। সে অবস্থায় মূল্যস্ফীতির হার ‘ডাবল ডিজিট’ অতিক্রম করে যেতে পারে। ২০২৬ সালে বৈশ্বিক মূল্যস্ফীতি বেড়ে দাঁড়াতে পারে ৪ দশমিক ৪ শতাংশ।
আইএমএফ’র প্রতিবদনে বিশ্বের বিভিন্ন দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি নিয়েও পূর্বাভাস দেয়া হয়েছে। এতে বলা হয়, ২০২৬ সালে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রবৃদ্ধি হবে ২ দশমিক ৩ শতাংশ, যা ২০২৭ সালে ৩ দশমিক ১ শতাংশে নেমে আসতে পারে। ২০২৬ সালে চীনের প্রবৃদ্ধি হবে ৪ দশমিক ৪ শতাংশ, যা পরবর্তী বছর ৪ শতাংশে নেমে আসতে পারে। প্রবৃদ্ধি অর্জনের ক্ষেত্রে ভারত ভালো অবস্থানে থাকবে। সংস্থাটি বলেছে, ২০২৬ সালে ভারতের প্রবৃদ্ধি হবে ৬ দশমিক ৫ শতাংশ। পরবর্তী বছরেও তা একই মাত্রায় অব্যাহত থাকবে। যুক্তরাজ্যের ক্ষেত্রে এ বছর প্রবৃদ্ধি অর্জিত হবে শূন্য দশমিক ৮ শতাংশ। পরবর্তী বছর তা ১ দশমিক ৩ শতাংশে উন্নীত হতে পারে।
বাংলাদেশের অর্থনীতিতে মন্থরতা নেমে আসবে এটা মোটামুটি নিশ্চিতভাবেই বলা যেতে পারে। এ অবস্থা থেকে উত্তরণের জন্য সর্ব পর্যায়ে কৃচ্ছ্র সাধন করতে হবে। একই প্রাইভেট সেক্টরে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। সর্বশেষ পরিসংখ্যান মোতাবেক, প্রাইভেট সেক্টরে বিনিয়োগে হার দাঁড়িয়েছে জিডিপি’র ২২ দশমিক ৩ শতাংশ, যা বিগত ১০ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন। প্রাইভেট সেক্টরকে চাঙ্গা করার মাধ্যমে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ব্যবস্থা স্বাভাবিক রাখার চেষ্টা চালাতে হবে। বাংলাদেশের সুবিধা হচ্ছে জনগণের খাদ্য চাহিদা মেটানোর জন্য খুব সামান্য খাদ্যপণ্যই আমদানি করতে হয়। সার্বিকভাবে বাংলাদেশ জনগণের চাহিদাকৃত পণ্যের বেশির ভাগই স্থানীয়ভাবে উৎপাদন করে থাকে। মোট ভোগ্য পণ্যের মাত্র ২৫ শতাংশ আমদানির মাধ্যমে পূরণ করা হয়। তাই আমরা যদি এ মুহূর্তে অভ্যন্তরীণ উৎপাদন ব্যবস্থা, বিশেষ করে কৃষি খাতকে চাঙ্গা রাখতে পারি তাহলে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক মন্দা মোকাবেলা করা খুব একটা কঠিন হবে না।